এই ব্লগটি সন্ধান করুন

মঙ্গলবার, ৭ মার্চ, ২০১৭


নবী দিবস/সরস্বতী পূজো ও ধর্মনিরপেক্ষতা






স্কুল কলেজ বা যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে 'নবী দিবস ' কেন হবে?? নবী দিবস সম্পূর্ণ ইসলামিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান । স্কুল কলেজে তো সব ধর্মের ছেলেমেয়েরা পড়তে যায়, সেটা তো শিক্ষালাভের জায়গা, কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নয় ! উলুবেরিয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক 'নবী দিবসের' অনুমতি না দিয়ে একদম সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছেন । আর যারা ঐ এলাকায় এটা নিয়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে তারা মানুষের কোনো পর্যায়ে পড়ে না ! 

এর সাথেই সম্পর্ক রেখে আমি আরও কিছু বলতে চাই! 

ভারতীয় সংবিধানের ২৮(১) নং ধারায় সরকারি বা সম্পূর্ণভাবে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান/শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধর্মাচারণ  ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার। 

তাহলে স্কুল-কলেজের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজো কেন হবে!!? নবী দিবস ই বা কেন হবে!!? আর যদি কোনো স্কুল কলেজ কোনো একটাতে অনুমতি দেয়, এবং অন্যটাতে দেয় না, তাহলে কি সমস্যার সৃষ্টি হবে না?? সেটা কি বৈষম্যমূলক নয়?? স্কুল কলেজে তো বৈষম্য মূলক আচরন হওয়ার কথা নয়?? আজকে যদি দেখা যেত স্কুলে নবী দিবস হচ্ছে কিন্তু সরস্বতী পূজো হচ্ছে না , তাহলে কি সমস্যা হতো না?? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চরিত্র ধর্মনিরপেক্ষ হবে, সেটাই তো কাম্য। ধর্মের ভিত্তিতে শিশুদের পরিচয় নির্ধারণ করা, শিশুমনের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাতে ধর্মীয় মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া মানে কি শিশুর মৌলিক অধিকার খর্ব করা নয়? 

আজকে বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগুরু, সেখানে মন্দির ভাঙা, হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে না?? ভারতে হিন্দু সংখ্যাগুরু, এখানে ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা সন্দেহে পিটিয়ে খুন হচ্ছে না?? এই কথাগুলো এজন্য বললাম, কারন অঞ্চল ভেদে ধর্মীয় সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু আছে! এবং সব ধর্মেই  উগ্র ধর্মীয় বোধ সম্পন্ন কিছু অমানুষ আছে! তারা সুযোগ পেলে ধর্মীয় উগ্রতা ছড়াবেই! এবং তার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগ ও থাকে! 

এবারে আমার প্রশ্নটা হলো, যারা নিজেদের সেকুলার বলে দাবী করে ! তারা যদি  বলে 'নবী দিবস' কেন হবে এবং তা স্কুলে না হওয়ায় কিছু ধর্মান্ধ মুসলমানরা কেন স্কুল বন্ধ করবে, আর অন্যদিকে স্কুলে সরস্বতী পূজোকে প্রথা বলে সাপোর্ট করে যায়, তাহলে কি তাদের সেকুলার হওয়ার বড়াইটা প্রশ্নের মুখে পড়ে না?? তারা যদি বলে, সরস্বতী পূজো যেহেতু অনেকদিন থেকে চলে আসছে, যদি মুসলমানদের নবী দিবস করতেই হয় তবে তারা লিগ্যাল প্রসেস অনুযায়ী আসুক, তাহলে তাদের এই যুক্তিটা হাস্যকর নয়??

আমি এখানে 'নবী দিবস' হওয়াকে জাষ্টিফায়েড করতে বসিনি। আমি বলতে চাইছি  গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সমস্ত সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে 'নবী দিবস' , 'সরস্বতী পূজা' সহ সমস্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করুন। এবং তারপর নবী দিবস কেন হবে সেটা নিয়ে গলা ফাটিয়ে প্রতিবাদ করুন! 

আর বিদ্যার দেবীর আরাধনা যদি করতেই হয়, তাহলে সেই নির্ভীক নারীর করুন,  যিনি নারীকে ভোগের সামগ্রী থেকে আলোকময়ী করে তোলার জন্য শ্লোগান তুলেছিলেন, “হাম ভারত কি নারী হ্যায়, ফুল নাহি চিঙ্গারী হ্যা”! 

তিনি সাবিত্রী ফুলে। মহামানব জ্যোতি রাও ফুলের সহধর্মিণী। সমগ্র এশিয়ার প্রথম শিক্ষিকা। ১৮৪৭ সালে তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মা সগুনা ছিলেন তার অন্যতমা সহযোগী। ১৮৪৮ সালে পুনের বিদেওয়াড়ায় বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৫২ সালের ১৬ই নভেম্বর শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ফুলে দম্পতিকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করা হয়।সবিত্রী ফুলেকে সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৮৮০ সালে জ্যোতি রাও ফুলে হান্টার কমিশনের বিশেষ পরামর্শদাতা হিসবে নিয়োজিত হলে মা সাবিত্রী ফুলে ভারতের সমস্ত মানুষের জন্য শিক্ষার দ্বার খুলে দেবার পরামর্শ দেন। হান্টার কমিশন এই প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং পরবর্তী কালে তা ভারত শাসন আইনে গৃহীত হয়। ১৮৯৭ সালের ১০ই মার্চ প্লেগ রোগীদের মধ্যে কাজ করতে করতে তিনি মারা যান।

তাই ভারতবর্ষের সার্বজনীন শিক্ষার জন্য যদি কোন মহামানবীকে পূজা করতে হয় তবে অবশ্যই এই পূজা গ্রহণের যোগ্য অধিকারী মা সাবিত্রী ফুলে। এবং নবী দিবস আর সরস্বতী পূজা বাদ দিয়ে সব ধর্মের ছেলেমেয়েকে তাঁকে পূজা করতে উৎসাহিত করুন! 

অন্যথায় কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জাষ্টিফিকেশন দিতে এলে আমি তাদের উপর উগ্র হিন্দুত্ব বা উগ্র মুসলমানিত্বের তকমা লাগাবোই ! এবং সেটা করতে তারাই আমায় বাধ্য করবে!! 






কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন