এই ব্লগটি সন্ধান করুন

মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ, ২০১৭


সাম্প্রদায়িকতার আবহে ভারতবর্ষ



সাম্প্রদায়িকতা ভারতবর্ষের মানুষের রক্তে রক্তে। আমাদের ইতিহাস এর সাক্ষী। ইংরেজরা ভারতবর্ষের বুকে ‘সাম্প্রদায়িকতার’ বীজ পুতে গেছে - এটা একদমই ভুল ধারনা! আসলে  দু’শ বছর দেশ শাসন করে ইংরেজরা জেনে গেছিলো, আমাদের দেশের মানুষের দুর্বল স্থান কোথায়! উপযুক্ত স্পর্শকাতর জায়গাটুকু  চিহ্নিত করে ব্যবহার করেছে মাত্র। 

এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন , “আজ আমরা সকলেই এই কথা বলিয়া আক্ষেপ করিতেছি যে, ইংরেজ মুসলমানদিগকে গোপনে হিন্দুর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিয়া দিতেছে। কথাটা যদি সত্যই হয় তবে ইংরেজের বিরুদ্ধে রাগ করিব কেন। দেশের মধ্যে যতগুলি সুযোগ আছে ইংরেজ তাহা নিজের দিকে টানিবে না, ইংরেজকে আমরা এতবড়ো নির্বোধ বলিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিব এমন কী কারণ ঘটিয়াছে। মুসলমানকে যে হিন্দুর বিরুদ্ধে লাগানো যাইতে পারে এই তথ্যটাই ভাবিয়া দেখিবার বিষয়, কে লাগাইল সেটা তত গুরুতর বিষয় নয়। শনি তো ছিদ্র না পাইলে প্রবেশ করিতে পারে না; অতএব শনির চেয়ে ছিদ্র সম্বন্ধেই সাবধান হইতে হইবে। আমাদের মধ্যে যেখানে পাপ আছে শত্রু সেখানে জোর করিবেই– আজ যদি না করে তো কাল করিবে, এক শত্রু যদি না করে তো অন্য শত্রু করিবে– অতএব শত্রুকে দোষ না দিয়া পাপকেই ধিক্কার দিতে হইবে। হিন্দু-মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশের একটা পাপ আছে; এ পাপ অনেক দিন হইতে চলিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা না ভোগ করিয়া আমাদের কোনোমতেই নিষ্কৃতি নাই। ”

ইংরেজ সৈন্যরা যতো না ভারতীয়দের মেরেছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ দেশভাগের সময় দাঙ্গায় মারা গিয়েছিলো।তাই ইংরেজরা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে নি আমাদের,  আমরা প্রথম থেকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েই ছিলাম | ইংরেজরা মুসলিম লীগ ও বানায়নি আর হিন্দু মহাসভা ও বানায়নি! ইংরেজরা আর এস এস বানিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লেলিয়েও দেয়নি! সিপাহী বিদ্রোহ ও ধর্ম দ্বারাই অনুপ্রাণিত ছিল, স্বাধীনতা বা  স্বদেশপ্রেমের গপ্প ছিল না তাতে! 

এদেশের প্রচুর সংখ্যক মানুষ ভিতরে ভিতরে তীব্র সাম্প্রদায়িক। তারা অনেকেই অগোচরে হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলে সম্বোধন করে, মুসলমানদের 'যবন', 'নুনুকাটা', 'বাঙ্গাল' বলে সম্বোধন করে! হিন্দুরা মুসলমানের ছোঁয়া অব্দি খায়না অনেক ক্ষেত্রে!! আমার অদ্ভুত লাগে একটা বিষয়, আমাকে দেখে অনেক বন্ধু, পরিচিতরা বলে, 'ঈস! তুই একদম মুসলিমদের মতো না, একদম আমাদের মতো!' প্রশ্ন করেছিলাম, মুসলিমদের মতো না মানে? ওরা কি আলাদা গ্রহের প্রাণী? উত্তর এসেছিল, "না, ঠিক তা না, তবে ওরা অন্যরকম হয়!" কিরকম হয়, সেটা আজও জানতে পারিনি! মানুষের মুখ দেখে কি করে হিন্দু-মুসলমান বোঝা যায় , সেই আর্ট টা এখনো শিখতে পারিনি!! আবার অনেকে বলে, "তুই নিশ্চয় আগের জন্মে হিন্দু ছিলি, এজন্মে ভুল করে মুসলমান হয়েছিস!" অবাক হয়ে তাকানো ছাড়া আর কোনো কথা আসেনি মুখে! অনেক ছেলে প্রপোজ করার পর যখন জানতে পেরেছিল আমি মুসলিম তখন তাদের এক্সপ্রেশনটা দেখার মতো ছিলো! একবার আমার একজন স্যার আমার পরিচয় দিচ্ছিলেন অন্য ছাত্রদের এই বলে যে, "ও মুসলিম, কিন্তু বামপন্থী!" আমি বামপন্থী শব্দের মানে জানি, কিন্তু 'মুসলিম বামপন্থী' শব্দের মানে আজ অব্দি খুঁজে পাইনি! সারাজীবন ধরে দেখছি আমি যতবার নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে যাই, ততবারই আমার উপর আমার মুসলমান পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া হয়!! হয়তো এটাই আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতি, ট্রাডিশন! 

আমি জন্মেছিলাম একেবারে ন্যাংটো একটা শিশু হয়ে, যেরকম সব মানুষ পৃথিবীর আলো দেখে। ভারতেই জন্মাবো, বাঙালি হয়েই জন্মাবো, মুসলিম ঘরেই জন্মাবো – এমন কোনও প্ল্যান ছিল না। সব আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে জন্মের পরে। কথা বলতে পারতাম না , তাই আমার মতামত কেউ নেয় নি। তাই এই হিন্দু-মুসলমান-খ্রীষ্টান পরিচয়গুলোকে আমি স্রেফ ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট হিসেবেই ভাবি, এর জন্য আলাদা করে কোনও গর্ব বা ঘেন্না অনুভব হয় না।ধর্ম জাত-পাত মন থেকে ঘৃণা করি। যারা গোরুকে মা মনে করেন এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদ, হিন্দুজাতীয়তাবাদকে প্রোজেক্ট  করার নিরন্তর চেষ্টা করেন, আর যারা শুওরের মাংসকে “হারাম” বলে মনে করেন আর ইসলাম বাদে বাকি ধর্মকে মনে প্রানে ঘৃণা করেন, অস্বীকার করতে চান – দুই দলকেই আমি সমান অপছন্দ করি।



আর শুধু কি ধর্ম ? উঁচু জাত, নীচু জাত, মেথর, হরিজন, মুচি থেকে শুরু করে গায়ের কালো রঙ, হিজড়া, সমকামী নিয়েও ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে প্রচন্ডভাবে সাম্প্রদায়িকতা বা রেসিজম কাজ করে!  

ভারতবর্ষে এই মুখে উদার সাজা, ভেতরে প্রচন্ড রকমের সাম্প্রদায়িকতা পোষন করা লোকের ভিড়ে এখন আামি এবং আমাদের মতো মানুষরাই হয়ে পড়ছি সবচেয়ে বেশি সংখ্যালঘু। আমরা যারা ঈদের দিনে সেমাই খাই, নতুন কাপড় নেই, রোজা রাখি, নামাজ পড়ি, আবার মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও পূজার মণ্ডপে, রথের মেলায়, কীর্তনের আসরে, ক্রিসমাসে গাছ সাজাতে উৎসাহ নিয়ে অংশ নেই, কিংবা যারা হিন্দু হয়ে পূজা করা সত্ত্বেও মুসলমান বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার খাই, ঈদে মুসলিম বন্ধুদের বাড়ী গিয়ে সেমাই খাই, এবং যারা নারী-পুরুষের ও সব মানুষের সমঅধিকারে বিশ্বাস করি সেই আমরাই এই ভারতবর্ষে সংখ্যালঘু ।আমরা যারা সাম্প্রদায়িকতার তিলমাত্রও মনে লালন-পালন করি না সেই আমরাই সংখ্যালঘু। আমরা যারা রমেশ আর রহিম কে একই রকম মানুষ মনে করি সেই আমরাই সংখ্যালঘু।

আমি এবং আমরা সংখ্যালঘু হয়েছি সেইদিন থেকে, যেদিন থেকে আমরা হিন্দু বা মুসলমানের চেয়ে মানুষ হয়ে উঠেছি। আমরা আমাদের দেশে আর একটিবারের জন্যও দাঙ্গা দেখতে চাই না, তাই আমরা সংখ্যালঘু। আমরা আমাদের দেশে আর ধর্মীয় উগ্রতা দেখতে চাই না, তাই আমরা সংখ্যালঘু।  

যেদিন আমরা এবং আমাদের মতো মানুষরা ভারতবর্ষে সংখ্যাগুরু হয়ে উঠবে, হয়তো সেদিনই ভারতবর্ষ সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক দেশ হয়ে উঠবে!! জানিনা সেদিন কখনো আসবে কি না!! 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন