এই ব্লগটি সন্ধান করুন

শনিবার, ৪ মার্চ, ২০১৭


দেশদ্রোহী কারা?



"শালা আমাদের ট্যাক্সের টাকায় পড়বে আর দেশের নামে গদ্দারি করবে?
মারো সালে কো।
পিটো সালে কো।
ফাঁসি পে লটকা দো চুতিয়া কো।
ভারতমাতা কী জয়!
বন্দে মাতরম্।"

আমার পরিচিত বন্ধু, অবন্ধু, শত্রু, কলিগ, সর্বোপরি আমজনতা, দেশপ্রেম আর দেশদ্রোহের দ্বন্দ্বে উত্তাল বিগত কয়েকদিন থেকে। কিছু মনগড়া ধারণা আর কিছু মিডিয়ার খাওয়ানো খবরের ভিত্তিতে তারা তৈরি করছেন তাদের নিজস্ব মতবাদ/দেশপ্রেম,দেশদ্রোহী থিয়োরী। 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘আত্মপরিচয়’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, " মানুষের হাতে দেশের জল যদি যায় শুকিয়ে, ফল যদি যায় মরে, মলয়জ যদি বিষিয়ে ওঠে মারীবীজে, শস্যের জমি যদি হয় বন্ধ্যা, তবে কাব্যকথায় দেশের লজ্জা চাপা পড়বে না। দেশ মাটিতে তৈরি নয়, দেশ মানুষে তৈরি।” 

দেশপ্রেম মানে তো দেশবাসীর প্রতি প্রেম। শ্রমিক, কৃষক, হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, শিখ, পাঞ্জাবী, আধিবাসী, প্রত্যেকের প্রতি প্রেম। প্রত্যেকটা মানুষের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার নাম ই তো দেশপ্রেম।  

কিন্তু আমাদের দেশের তথাকথিত দেশপ্রেমিকরা মানলে/জানলে/বুঝলে  তো?? তারা বর্তমানে সদা শশব্যস্ত  ‘দেশপ্রেমিক’/'দেশদ্রোহী' খুঁজতে।  প্রায়ই ফেসবুকে কিছু পোস্ট দেখি – “আপনি কি ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চান ? যারা চান না তারা লাইক করুন, যারা চান তারা কমেন্টস করুন”। অথবা যুদ্ধরত সৈনিকদের ছবি/ মৃত সৈনিকদের ছবি দিয়ে লেখা হয় প্রকৃত ভারতীয় হলে লাইক করুন! " কী সহজ উপায় দেশদ্রোহী/দেশপ্রেমী বিচার করার!  

আচ্ছা, দেশপ্রেম/দেশদ্রোহিতার সমীকরণ এতই সোজা? আফজল গুরুর ফাঁসি সমর্থন করলেই আপনি দেশপ্রেমী, আর সাধারন  কাশ্মীরীদের পেলেটগানে মৃত্যু না চাইলে আপনি দেশদ্রোহী?? সেনার জন্য সকাল সন্ধ্যে চোখের জল নাকের জল এক করলে আপনি দেশপ্রেমী, আর সেনারা খাদ্যে দূর্নীতির প্রতিবাদ করলে মদ্যপ/ দেশদ্রোহী?? সেনাদের জন্য বরাদ্ধ ফ্ল্যাট নিয়ে দূর্ণীতি করলে দেশপ্রেমী, আর সেই দূর্নীতির বিরোধিতা করলে দেশদ্রোহী??   জে এন ইউ'র ছাত্ররা আপনাদের করে'র টাকায় পড়ে, তাই তাদের উপর আক্রমন করলে আপনি দেশপ্রেমিক , আর সাধারণ মানুষের করের পয়সায় পার্লামেন্ট ক্যান্টিনে যে মন্ত্রীরা ১০টাকা ৯০পয়সার মটন কাটলেট চিবিয়ে দেশোদ্ধার  করেন, তাদের উপর প্রশ্ন তুললে আপনি দেশদ্রোহী??  সুপ্রীম কোর্ট ও সংবিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বাবরি মসজিদ ভাঙা দেশপ্রেম? যখন রাষ্ট্রনেতারা যুদ্ধে মাতেন আবার কিছুদিন পরে সেই শত্রুদেশের নায়কদের সঙ্গে কোলাকুলি করে চা খান সেগুলো দেশপ্রেম? আর যে দেশের শতকরা ষাটভাগ মানুষের ঘরে পানযোগ্য জল নেই, না আছে শিক্ষা না আছে দু মুঠো ভাত, মাথার উপর না আছে চাল,না চিকিৎসার সুযোগ, তাদের অধিকারের কথা বললে আপনি ‘দেশদ্রোহী’? খুন-ধর্ষণসহ অন্যান্য অভিযোগে অভিযুক্ত প্রার্থীদের বিপুল সংখ্যক ভোট দিয়ে নির্বাচনে জিতিয়ে মন্ত্রী  করার দায়িত্ব নেন যারা,  গর্হিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি জেলে থাকার পরও তাকে বিপুল সংখ্যক ভোট দিয়ে জিতিয়ে আনেন যারা , তারাই কি আমাদের প্রকৃত দেশপ্রেমীকগন ? 
শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছে, কৃষকরা আত্মহত্যা করছে। এই উৎপাদকরাই ভারতীয় জনগনের আশি শতাংশ। যে দেশপ্রেম আশি শতাংশ মানুষের ব্যথা-যন্ত্রণা বোঝে না,  বোঝে শুধু আম্বানি-আদানি- বিজয় মালিয়াদের  স্বার্থ, সেই দেশপ্রেম নিয়ে কী করবেন, হে আমজনতা?? ভেবে দেখেছেন কখনো? 

দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট বিতরণের অথেন্টিকেট কর্মকর্তাগন, আপনাদের বলছি,  চিপস খেয়ে যেখানে ইচ্ছে প্যাকেট ফেলে, রজনীগন্ধা/পানের পিকে দেওয়াল ভিজিয়ে দিয়ে, কর ফাঁকি দিয়ে, রিক্সায়ালা দশটাকা বেশী চাইলে তার গায়ে হাত তুলে, সব্জিয়ালা/মাছয়ালার সাথে দুটাকা নিয়ে হাতাহাতি করে, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে পড়ে, বিদেশের মাল্টিন্যাশনেল কোম্পানিতে বনের মোষ তাড়িয়ে, জেএনইউ, আরো বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের ভিডিও জাল করে, তাদের গুন্ডার মতো মেরে, শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলে তাদের হসপিটাল পাঠিয়ে, নাগপুরে বিজয়উল্লাস করে, ফেসবুকে সেলফি ঝুলিয়ে, ‘ভারত মাতা কি জয়’ শ্লোগানে আকাশ-বাতাস কল্লোলিত করে যদি "দেশপ্রেমের" প্রমাণ দিতে হয়, তাহলে বলি শুনুন,  এরকম দেশপ্রেমিক হওয়ার চেয়ে আমরা খুশীমনে আপনাদের কাছে দেশদ্রোহী হতে রাজি আছি! 


ভারতবর্ষ বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে দাবি করা হয়। এ কেমন গণতন্ত্র যা কাশ্মীরি সাধারন জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কোনও মর্যাদা দেয় না? যারা সামরিক বাহিনীর জোরে কাশ্মীরকে দখলে রাখা যাবে তারা ভুল ভাবছেন। এর সমাধান ভারত, পাকিস্তান ও কাশ্মীরি জনগণ এই তিন পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। 

পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখুন। স্কটল্যান্ড গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে থাকা নিয়ে  গণভোট হয়। কুইবেক প্রদেশ কানাডার মধ্যে থাকবে কিনা সেটা নিয়েও কয়েকবার গণভোট হয়েছে। এটাই গনতন্ত্রের নিয়ম, চাহিদা। অথচ ভারতবর্ষে কেউ যদি কাশ্মীরিদের গণভোটের দাবি তোলে, সে হয়  ‘দেশদ্রোহী’ !! বাহ্!!


সবশেষে একটা কথা বলি আমার দেশপ্রেমিক ভাইবোনদের,  দেশের  সংবিধান, আইন মানেন তো?? দেশের আইনে লেখা আছে, অপরাধ প্রমান না হওয়া অব্দি কাউকে অপরাধী বলা যাবে না! তাহলে কোন যুক্তিতে কানাইয়া, ওমর খালিদ, শেলা রশিদকে দেশদ্রোহী বলছেন আপনারা?? কোন যুক্তিতে ওমর খালিদ আর শেলা রশিদকে রামযশ কলেজের সেমিনারে আসতে বাধা দেওয়া হলো? কোন যুক্তিতে কলেজের সেমিনারে যোগ দেওয়া ছাত্রছাত্রী, AISA, SFI সদস্যদের, শিক্ষকদের দিল্লি পুলিশের মদত নিয়ে এবিভিপি-র গুণ্ডারা ইচ্ছেমতো মারধর করলো?

তাদের বিরুদ্ধে মামলার জাজমেন্ট এখনো হয়নি! আর জাজমেন্ট হওয়ার আগে কাউকে "দেশদ্রোহী" বলাটাও "দেশদ্রোহীতা"। কোর্টে কিন্তু প্রমান ও হয়েছে যে ভিডিও গুলো প্রডিউস করা হয়েছিল, সেগুলো জাল! এটা জানেন না? আগে দেশের আইন সম্পর্কে জানুন, বুঝুন! আর জাজমেন্টে যদি ওরা দোষী প্রমানিত হয়, তখন নাহয় চাড্ডি পরে বা চাড্ডি খুলে নাগপুরের সামনে মিষ্টি বিলোবেন !! তার আগে অব্দি নিজের জং ধরা মানসিকতা আর ভুয়ো দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট নিয়ে দেশপ্রেমী/দেশদ্রোহী খোঁজা বন্ধ করুন!!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন