এই ব্লগটি সন্ধান করুন

বুধবার, ২৯ মার্চ, ২০১৭

বৌদ্ধ দর্শন কিভাবে বৌদ্ধ ধর্মে পরিণত হল!
_______________________________________





বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি ভারতবর্ষে। কিন্তু কেন নাস্তিক বুদ্ধের কপালে দেওয়া হল ভগবানের টিকা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন বৌদ্ধ পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন উনার ‘ভারতমে বৌদ্ধ ধরম কা উত্তান ঔর পতন’ নামক বই এ।
রাহুল সাংকৃত্যায়ন মতে ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের মূল বিলোপ সাধন হয়েছে চতুর্দশ শতকে, তবে সে কারণটি ছিল বুদ্ধের মৃত্যুর পর থেকে। তাই সময়ের কালক্রমে সিদ্ধার্থ গৌতমের নামের পূর্বে ‘ভগবান’ যোগ হয়ে হয়েছে, ভগবান গৌতম বুদ্ধ। বৌদ্ধ ধর্মের বিকৃত হওয়ার প্রধান কারণ ছিল, তৎকালীন যুগে বুদ্ধের দর্শনে মানুষকে বেশী আকর্ষিত করায়, পার্শ্ববর্তী নানা ধর্মীয় সমাজ বুদ্ধকে তাদের দলে টেনে নিয়ে বিকৃত করার রুপকে শতভাব সার্থকতা দিয়েছে। বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষা ছিল মৌখিক, যারা এই
শিক্ষা ধরে রাখতেন তাদেরকে মতিকা-ধর বলা হয়। তিনি বুদ্ধের দর্শনের বিকৃতিতে প্রাধন্য দিয়েছেন হস্তান্তরের ফলে তত্ত্ব বিকৃতির সত্যতাকে। দ্বিতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতিতে ভিক্ষুরা একমত হতে না পেরে মহসঙ্ঘ নাম দিয়ে আরেকটি সম্মেলন হয়েছিল।যা ছিল বুদ্ধ দর্শনের বিলুপ্তির মূল কারণ এবং বৌদ্ধ ধর্মের সূচনা।

কুশান বংশের রাজা কনিস্কের সময় তৈরি হয় বুদ্ধের মূর্তি নির্মাণের কাহিনী। সেই সময় মানবপুত্র বুদ্ধকে বসানো হয় ভগবানের আসনে। বুদ্ধের মূল দর্শনে আনা হয় দেবতা এবং মিথের সমষ্টি। বুদ্ধের দর্শন বিকৃতিতে যোগ হল স্বর্গ নরক, জাতক, বুদ্ধের জন্ম মৃত্যুর নানা কাহিনী নিয়ে হাজারো মিথ। তৎকালীন মানুষ ধ্যান সাধনা পরিত্যাগ করে জামজমক ভাবে বুদ্ধের পুজায় লিপ্ত হলেন। শুরু হল মহাজন এবং তন্ত্রজান বুদ্ধ ধর্মের ধারনি, মঞ্জুশ্রী মূল কল্প, গুহ্য সমাজ, চক্র সংবর, তৎকালীন ব্রত শ্চারন, বলি পূজা, পুরশ্চরন ইত্যাদি তপ-জপ ও তন্ত্র-মন্ত্রের
প্রভাবে বৌদ্ধ ধর্ম আজকের রূপে এসে পৌছাল। যাতে হারিয়েছে গেছে বৌদ্ধ দর্শনের প্রকৃত সত্তা। সেখান থেকে উদ্ভব হয় স্তবিরবাদ এবং মহাসঙ্ঘবাদ।যে কারনে রচিত হয় বুদ্ধের নামে নানা সূত্র এবং পার্থক্য দেখা যায় সূত্র-পিটক এবং বিনয়-পিটকের মাঝে।

অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম শুরু হয় বৌদ্ধ ধর্মের ভারতের বাইরে প্রচার। অশোকের অবদানের ফলে মূলত আজ বৌদ্ধ ধর্ম এত বেশী প্রসার পেয়েছে। আধুনিক ত্রিপিটক সংরক্ষণ হয় শ্রীলংখ্যায় খ্রীষ্টিয় প্রথম শতকে। কিন্তু ততদিনে বৌদ্ধ দর্শনে ভারত থেকে হিন্দুত্বের প্রভাব ঢুকে পরে। যে কারনে বৌদ্ধ দর্শনে হিন্দু ধর্মের এবং স্বর্গ-নরকের বর্ণনা পাওয়া যায়। মৌর্য
সম্রাটদের অতীব ভক্তির কারনে তারা নির্মাণ শুরু করে হাজার হাজার স্তূপ, আর সেখান থেকেই ধারনা লাভ করে আধুনিক তীর্থ যাত্রার। খৃষ্টের জন্মের দুইশ বছর পর মৌর্য শাসনে এলো বিশাল পরিবর্তন , শাসকরা ছিল অব্রাহ্মণ ধর্মের বিদ্বেষী। যা বুদ্ধ দর্শনের বিলুপ্তির পথকে সুগম করেছে। মৌর্য শাসনের পর ব্রাহ্মণদের কর্তৃক গ্রন্থ সূচনা শুরু হয় । সে সময় রচিত হয় মহাভরতের প্রথম সংস্করণ।ব্রাহ্মণবাদের প্রভাবে বৌদ্ধ জনপদে পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় বৌদ্ধরা তাদের মূল জনপদ ছেড়ে স্থানান্থরিত হতে লাগলো। কঠোরভাবে পুরানো রীতি স্থবিরবাদও দেশ, কাল, ব্যক্তিভেদে নানা রূপে আবির্ভূত হতে লাগলো।সর্বাস্তিবাদীরা মাথুরায় স্থানান্তর হয়ে সংস্কৃত ভাষায় ত্রিপিটক লিপিবদ্ধ করেন। ফলে নতুনভাবে সূচিত হল মহাসক্তিক, লোকেত্তরবাদ নামে আরও কয়েকটি নিকায়। স্থবিরবাদের থেকে সর্বাস্তিবার বাদের আবির্ভাব। সর্বাস্তিবাদের
উৎপত্তি যবন রাজাদের কারনে।

কুশান বংশের রাজা কনিস্ক সর্বাস্তিবাদী ভিক্ষুদের নিয়ে একটি মহাসভা করেন। সেই সভায়ও বৌদ্ধ দর্শনে নানা মতবিরোধ দেখা দিলো। খৃষ্টীয় প্রথম শতকে আচার্য নাগার্জুনের আবির্ভাব হয়। তিনি শূন্য বাদের
দর্শন প্রচার করেন। মহাজন এবং শূন্যবাদের দর্শন যোগে তৈরি হয় মহাজান সম্প্রদায় এবং তা অন্তর্ভুক্ত হয় ত্রিপিটকে। ফলে আবারও বিকৃত
হয় বৌদ্ধ দর্শন।চতুর্থ শতকে পেশোয়ারের আচার্য বসুবন্ধু বৈভাষিক মতভেদে নতুন গ্রহন্ত লিখেন যার নাম অভিধর্ম কোষ। তাই চতুর্থ শতকে এসে বৌদ্ধধর্মে বৈভাষিক, সৌত্রান্তিক যোগাছার এবং মাধ্যমিক সম্প্রদায়রূপে রূপান্তরিত হয়। বুদ্ধের অলৌকিক কর্মকাণ্ডে প্রচারে মূল ভূমিকা ছিল মূলত মহাযান পন্থীদের। বোধিস্বত্বের মাহাত্ম্য প্রদর্শনে তারা যোগ করেছিল অবলোকিতেশর, মঞ্জুস্রী, আকাশ মার্গী প্রভৃতি শত শত কল্পনা।

বুদ্ধের মৃত্যুর চারশো বছর পর যখন রাজা কনিস্ক প্রথম বৌদ্ধ মূর্তি নির্মাণ করেন মহাযান ধর্মপন্থীরা তখন শুরু করলেন জাক জমক পূর্ণ বুদ্ধপুজার
আনুষ্ঠানিকতা। দেব দেবীর ন্যায় শুরু হল বুদ্ধ থেকে কামনা পূর্ণ করার পর্ব। চারিদিকে বুদ্ধের মূর্তি এবং বড় বড় বিহার নির্মাণ শুরু হল। এমনকি মহাযান পন্থীরা সুত্র পর্যন্ত বিকৃত করেছিলেন নিজেদের সুবিধার্থে, যার প্রাদুর্ভাব ত্রিপিটকে আছে। বৌদ্ধ নিকায়ের মধ্যে গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রারম্ভিক কাল থেকে হর্ষবর্ধনের সময় মঞ্জুশ্রী মূলকল্প, গুহ্য সমাজ ও চক্র সংবর ইত্যাদি অনেক তন্ত্রের উদ্ভব হয়। এই সময় আবিষ্কার হয় বুদ্ধ পূজার যা আজো চলে আসছে ভারতবর্ষ তথা এই উপমহাদেশে। অষ্টম শতাব্দীতে বুদ্ধের সরল দর্শনের প্রতি বিশ্বাস উঠে যায় বজ্রযানদের তারাও ভিড় জমায় মহাযানপন্থীদের দলে। এই সময় প্রচলন হয় মানুষের মাথার খুলি নিয়ে শ্মশানে ধ্যান সাধনার। সাধারণ মানব বুদ্ধের অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি মানুষের বিশ্বাস বাড়তে থাকে। বজ্রযানপন্থীরা মধ্যে একদল মাতাল প্রকাশ্যে স্ত্রী ভোগ এবং মদ পানে লিপ্ত হতেন, তাদের সহযোগিতা করতেন রাজা মহারাজারা। এমনকি এক সময় বলি পূজা পর্যন্ত বুদ্ধ দর্শনে আনার চেষ্টা করা হয়।ভারতীয় জনগন বুদ্ধের দর্শনকে ধর্মে রূপান্তর করে অন্ধবিশ্বাসে লিপ্ত হয়।কিন্তু কালক্রমের তাও বিলুপ্ত হয়ে পরে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন