এই ব্লগটি সন্ধান করুন

মঙ্গলবার, ৭ মার্চ, ২০১৭


ঠিকানা যখন শ্বশুরবাড়ী






মেয়েদের জীবনে দুটো অধ্যায় থাকে। বিয়ের আগে এক অধ্যায়, বিয়ের পর শুরু হয় আরেক অধ্যায়। জন্ম থেকে যে জীবনে অভ্যস্ত মেয়েরা, সেই জীবন ছেড়ে নতুন ভাবে আলাদা জীবনে তাকে অভ্যস্ত হতে হয়। লাভ ম্যারেজ হোক বা এরেঞ্জ, মেয়েদের ই নিজের এতদিনের পরিবার, মা-বাবা, বোন-ভাই, চেনা পরিবেশ ছেড়ে আরেক পরিবারে গিয়ে উঠতে হয়। তারপর শুরু হয় পরিবর্তন আর মানিয়ে গুছিয়ে নেওয়া।

বাবার বাড়িতে থাকার সময় হয়তো বারমুডা আর শার্ট  অথমা পাজামা/কুর্তা/ট্রাউজারে থাকলেও কোনো মাথাব্যাথা ছিলো না, সেখানে স্বামীর বাড়িতে শাড়ী পরে পরিপাটি করে থাকতে হবে , রয়েসয়ে লাজলজ্জার আধহাত ঘোমটা টেনে থাকতে হবে। হাজার হোক বউ বলে কথা! যেটা বাবার বাড়িতে থাকতে পছন্দের খাওয়ার ছিলো না, কোনোদিন খায়ওনি, সেটাই হয়তো স্বামীর বাড়িতে খেতে হয়!! সকালে হয়তো দেরী করে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যেস, সেখানে শ্বশুরবাড়ীতে ঠিক সময়ে আলো নিভিয়ে ঘুমোতে হবে, সকালে সবার আগে উঠতে হবে! রান্না করা হয়তো পছন্দের কাজ নয় বা বাবার বাড়িতে রান্না করতে হয়নি কখনো, শ্বশুরবাড়ীতে সকাল সন্ধ্যে সবার জন্যে রাঁধতে হবে, সবার পছন্দ অপছন্দ জানতে হবে! বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারা কমে যাবে! যখন তখন ঘুরতে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। বাড়ীর বউদের আবার ওসব মানায় নাকি!!

অন্যদিকে স্বামী হিসেবে ছেলেদের শ্বশুরবাড়িতে মানিয়ে নেওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। বরং জামাই এর মন জুগিয়ে চলে পরিবারের সবাই। ছেলেটিকে তার মা-বাবা, পরিবার পরিজন ছেড়ে আসতে হয় না। কেউ ছেলেটিকে বলে না 'তুমি অন্যের সম্পদ, তোমার আসল ঠিকানা তোমার শ্বশুরবাড়ী! '  ছেলেদের জন্য শ্বশুরবাড়ী বেড়ানোর জায়গা!!

বিয়ের পর মেয়েদের নাম পরিবর্তন হয়, মিস থেকে মিসেস। ছেলেদের কিন্তু নাম আগের মতো একই থাকে। হিন্দু মেয়েদের শাখা সিঁদুর পরতে হয়, মুসলিম হলে নাকে নাকফুল, হাতে চুড়ি, গলায় চেইন পরতেই হয়। যাতে মানুষ বুঝতে পারে মেয়েটি বিবাহিত। ছেলেদের ওসব কিছুই পরতে হয় না। মেয়েরা স্বামীর মঙ্গলের জন্য শাখা সিঁদুর পরে, কিন্তু ছেলেদের বউয়ের মঙ্গলের জন্য কিছুই পরতে হয় না।হয়তো স্বামীরা বউয়ের মঙ্গল চায় না!!  কথায় আছে না, 'ভাগ্যবানের বউ মরে আর অভাগার গরু ' !


নিজের নামই শুধু নয়,  সন্তানের নামের সাথেও মেয়েটির নাম যোগ হয় না! যোগ হয় স্বামীর নাম বা স্বামীর পরিবারের নাম। কি সুন্দর নিয়ম! দশ মাস দশ দিন পেটে ধরে যে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখালো মেয়েটি, তার নামের সাথে নিজের নাম যোগ করার কোনো অধিকার থাকে না তার!!

 নিজের বাবার বাড়ীতে আসতে হলেও মেয়েটিকে শ্বশুরবাড়ীর অনুমতি  নিয়ে তবে আসতে হয়! অনুমতি যে সবসময় মিলে তাও নয়, আর যদি বা মিলে কদিন থাকবে সে দিনক্ষণ ও শ্বশুরবাড়ী থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়! বেশীদিন বাবার বাড়ী থাকলে মেয়েটির দিকে ছুটে আসে নানা তীর্ষক মন্তব্য!! অথচ ছেলেটি কিন্তু তার ঘরেই থাকে, মা-বাবা, পরিবার পরিজনের সাথেই থাকে!

শ্বশুরবাড়ীতে সবার প্রতি খেয়াল রাখার দায়িত্বও অনিবার্য ভাবে মেয়েটির ঘাড়েই এসে পড়ে, কারন বউয়ের কাজ ই তো সবাইকে দেখে রাখা, সবার চাহিদার যোগান দেওয়া! যে ছেলেটি বড় হয়ে নিজ পরিবারের দায়িত্ব নিতে নিজে হিমশিম খায়, সেখানে কি করে জীবনের অর্ধেক সময় থেকে এসে অন্য ঘরের একটা মেয়ে সবার দায়িত্ব নিজের মাথায় তুলে নেবে?? সবার মন যুগিয়ে চলবে?? তার কতটুকু কষ্ট হয় সবকিছু মানিয়ে গুছিয়ে নিতে, সেকথা কি একবারও স্বামী কিংবা তার পরিবারের লোকজন বুঝতে চায়?? না, বুঝে না।

হাজার হাজৃর পরিবর্তনের সাথে মেয়েটিকেই প্রতিনিয়ত মানিয়ে চলতে হয়। সামান্যতম কোনো ভুল হলে তাকে কাঠগড়ায় উঠতে হয়।

কেউ বুঝে না, হঠাৎ করে অপরিচিত একটা জায়গায় গিয়ে সবকিছু মানিয়ে গুছিয়ে নেওয়া কতটা কষ্টের! নিজের ভিতর কতটা ঝড় বয়ে চলে প্রতিনিয়ত! কতটা একা মনে হয় মাঝে মাঝে মেয়েটির, সেটা ক্ষেত্রবিশেষে  স্বামীটিও বুঝতে চায় না!!

এই পৃথিবীর প্রত্যেকটা নিয়মই মেয়েদের বিপক্ষে বানানো! পুরুষরা একবার ভেবে দেখুন তো কেমন লাগে জীবনের একটা বয়সে নিজের ঘর ছেড়ে অন্য একটা ঘরে গিয়ে অন্যদের মতো নিজেকে মানিয়ে গুছিয়ে নিতে!! অন্যদের মনমর্জি মতো চলতে, না চললে তীর্ষক মন্তব্য শুনতে?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন