কন্ডোম ও ধর্মীয় ভাবাবেগ
__________________________
__________________________
"আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে—
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!’ -
শ্রীজাতের লেখা এই লাইনদুটো নিয়ে সোস্যাল মিডিয়া, সমাজ, রাজ্য (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম) উত্তাল!! উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের গায়ে আগুন লেগে গেছে!! শ্রীজাত নাকি ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করেছেন!! কিন্তু একজন মানুষ ও এটা বলছেন না, শ্রীজাতের ঐ লাইন ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, একজন মানুষের (যিনি কিনা ভারতের বৃহত্তম রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী!!) করা মন্তব্যের প্রতিউত্তর! তার জনসভায় বলা হয়েছিল "মুসলিম মহিলাদের কবর থেকে তুলে এনে ধর্ষন করা হোক"!
একইভাবে শ্রীজাত মুসলিম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধেও লিখেছিলেন তার অন্ধকার কাব্যগুচ্ছ। তখন তো আপনারাই বাহবা দিয়েছিলেন! শেয়ার করে চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন! তবে আজ কি হলো!??
আজকে যারা শ্রীজাতের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের কথা বলছেন, তাদের তো একবারের জন্যেও যোগী আদিত্যনাথের এই মন্তব্যের বিরোধীতা করতে দেখিনি!! একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর জনসভায় এইধরনের উস্কানিমূলক মন্তব্যে প্রতিবাদ করতে তো কাউকে দেখিনি!! প্রকারান্তে ধর্ষনের সংস্কৃতিকে বাহবা দেওয়ার প্রতিবাদ তো কাউকে করতে দেখিনি!! একজন মহিলা, সে হিন্দু হোক বা মুসলিম, তাকে ধর্ষন করার ফতোয়া দেওয়ার অধিকার পায় কি করে এরা!! এর বিরুদ্ধে কাউকে তো সোচ্চার হতে দেখিনি!! আজকে যারা ধর্মীয় ভাবাবেগ আহত হওয়ার কথা বলছেন, তার একবার 'মুসলিম মহিলার' জায়গায় নিজের মা-বোনকে বসিয়ে দেখুন তো কেমন লাগে!! কোনো ভাবাবেগ আহত হয় কি না!??
শুধু কি এই মন্তব্য!! একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি হয়া সত্ত্বেও একের পর এক বিদ্ধেষপূর্ণ মন্তব্য তিনি করে গেছেন! কৈ, কাউকে তো প্রতিবাদ করতে দেখিনি!! একটা রাজ্য, দেশ মানে শুধু কোনো একটা ধর্মাবলম্বী লোকদের একার সম্পত্তি নয়! দেশ মানে যেখানে সব জনজাতি/সব ধর্মাবলম্বী লোকের বাস! সবার সমঅধিকার! সেখানে কেবলমাত্র একতরফা বিদ্ধেষপূর্ণ মন্তব্য যারা করে, উগ্র ধর্মান্ধতা যারা ছড়াতে চায়, যারা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, সে হিন্দু হোক বা মুসলমান, সেইরকম কোনো ব্যক্তিকে কোন ভিত্তিতে বাছাই করা হয় একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে?
এই স্বাভাবিক প্রশ্ন করলে, যারা মা-বাবা তুলে গালি দিচ্ছেন তারা একবার নিজের যুক্তিগুলো ভেবে দেখুন তো!! একবার আয়নার নিজের মুখটা দেখে বলুন তো নিজেকে মানুষ লাগছে না হিন্দু/মুসলমান লাগছে??
যারা শ্রীজাত কে নিয়ে পাল্টা কবিতা লিখছেন, তার একটা নমুনা দিচ্ছি..! সব্যসাচী ভট্টাচার্য বলে একজন লিখেছে,
"কন্ডোম নিয়ে কবিতা লেখো, এ কেমন কবি,
স্ত্রী সাথে করেছো নিশ্চয় কোনোদিন নীলছবি ।
কবি তোমার টাকে কন্ডোম, গোপনাঙ্গে হাত
বনমানুষের নাম দিয়েছে আবার শ্রীজাত ।
বেজাত নামটাই শ্রেয় ছিল, জারজ বলে কথা
কবি সেজে দিয়েছো তাই ধর্মানুভূতিতে ব্যাথা ।
ত্রিশূল নিয়ে লিখছো তাই অক্ষত আছে হাত,
ইসলাম নিয়ে লিখলে বুঝতে পারতে শ্রীজাত ।
তুমি কোন চুলের কবি, ধর্মকে করো অপমান,
কন্ডোম ছাড়া কি আর কিছুর নিতে পারোনা নাম ।
জারজ বলেই এসব বলো, ব্রা প্যান্টিতে আন্দোলন,
শুনেছি নাকি পাকিস্তান গিয়েছে তোমার আপন বোন ।
তোমার বাবা নাকি ধ্বজভঙ্গ, ফলাতে পারেনি তোকে,
তোর মা নাকি ছুটে গেছিল লাহোরের কোন ঝোপে ।
তোর মাথাতে কন্ডোম পরাবো, কুকুর দিয়ে করাবো ধর্ষন,
বাকস্বাধীনতার কবিতা কাকে বলে এবার দেখুন বুদ্ধিজীবিগন"
এই কু-লেখা দেখা আপনাদের ভাবাবেগ আহত হচ্ছে না!! আপনারা বলুন, যে ধর্মান্ধ গুলো, শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে কারো মা-বোন-বউকে কুৎসিত আক্রমন করে, তাদের দেখে আপনাদের ধর্মীয় ভাবাবেগ আহত হয় না?? ধর্মীয় ভাবাবেগের নামে কোনো জাতি-গোষ্ঠীকে আক্রমন করতে যারা তাদের মা-বোন-মেয়ে কে ধর্ষনের কথা বুক ফুলিয়ে বলে, কুকুর দিয়ে ধর্ষন করানোর কথা বলে, তাদের দেখে আপনাদের মনুষ্যত্ব আহত হয় না?? পেটে বর্শা-ত্রিশুন খুচিয়ে অপরিণত ভ্রুণ টেনে এনে যারা পৈচাশিক আনন্দে মেতে ওঠে, তাদের দেখে আপনাদের ধর্মীয় ভাবাবেগ, মনুষ্যত্ব আহত হয় না?? অনার কিলিং দেখে আপনাদের যাবতীয় ভাবাবেগ আহত হয় না?? কন্ডোম শব্দে ভাবাবেগ আহত হয়, ধর্ষনে ভাবাবেগ আহত হয় না??
যদি হয়, তবে বলবো আগে এগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখুন, মানুষে মানুষে হানাহানির প্রতিবাদ করুন, ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন! আর যদি না হয়, তাহলে বলবো আপনাদের আকার আকৃতি মানুষের মতো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আপনারা একটা জানোয়ারের থেকেও অধম!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন