প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিক নারীদিবস ও নারীর পারিবারিক/সামাজিক অবস্থান
৮ই মার্চ , আর্ন্তজাতিক নারী দিবস। নারীর সংগ্রামের ইতিহাসে বোনা এই আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীর অর্জন, অগ্রযাত্রার প্রতীক এই নারী দিবস। প্রতিবছর নারীদিবসে জাতিসংঘের একটি থিম থাকে। এবছর ও তার ব্যতিক্রম নয়। এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জাতিসংঘের থিম হলো -
‘Be Bold for Change!
Be Bold! Be the Change!'
আমাদের দেশে দিবসটি এমন একসময় উদযাপিত হচ্ছে যখন নারী নির্যাতন বিশেষ করে নারীর প্রতি সহিংসতা দেশের আনাচে কানাচে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। সমীক্ষা ও ন্যাশনাল ক্রাইম রের্কড ব্যুরো'র রিপোর্ট বলছে-
* নারী পাচার, যৌন নির্যাতন,শিশুবিবাহ, অনার কিলিংস এর হারে আমাদের দেশ পৃথিবীর মধ্যে চতুর্থ।
*প্রতি বছর ১২ হাজারেরও বেশী মেয়েকে পণ দিতে না পারার কারণে হত্যা করা হয়।
* প্রতি ৫৪ মিনিটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়।
* প্রতি ২৬ মিনিটে একজন নারী শ্লীলতাহানীর শিকার হয়।
* প্রতি ৪৩ মিনিটে একজন নারী অপহরণ হয়।
* প্রতি ৫১ মিনিটে একজন নারী ইভ-টিজিং এর শিকার হয়।
* প্রতি ১ ঘন্টা ৪২ মিনিটে যৌতুকের জন্য নির্যাতনে একজন নারীর মৃত্যু হয়।
* প্রতি ৭ মিনিটে একজন নারীর প্রতি অন্যায় হয়।
আমাদের দেশে প্রায় প্রতিটা মেয়ে তাঁর জীবনে কোন না কোন সময় যৌন হেনস্তার শিকার হয়, সে টিজিং হোক, পারিবারিক হিংসা হোক, চাইল্ড এবিউজ হোক, বাসে ট্রেনে শ্লীলতাহানী হোক বা অশ্লীল কমেন্ট !
শুধু ধর্ষন বা শ্লীলতাহানি নয়, জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে মেয়েরা নানাধরনের নির্যাতনের শিকার। কোন অন্যায়, ভুল না করলেও প্রায় সবক্ষেত্রেই মেয়েরা শাস্তি পায়। মা-বাবা যৌতুক দিতে না পারলে পুড়ে মরতে হয় তাকে, ছেলে সন্তান না হলে অত্যাচার সইতে হয় তাকে, দেখতে কালো হলে ঘরে বাইরে মানসিক, অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতন সইতে হয় তাকে, দেখতে সুন্দর হলেও তার রেহাই নেই, বিধবা/ডিভোর্সী হলেও তাকে সামাজিক এবং পারিবারিক নির্যাতন সইতে হয়, স্বামীর চেয়ে বেশী যোগ্য হলেও তার রেহাই নেই!! বখাটে প্রেমিককে পছন্দ না করলে এসিড ছোঁড়া হবে তার উপর অথবা ধর্ষিত হতে হবে তাকে, স্বামীর অত্যাচারে বাধা দিলে/স্বামীকে ডিভোর্স দিতে চাইলে/স্বামীকে ২য়, ৩য় বিয়ের অনুমতি না দিলে, এই সমাজ , পরিবার তাকে 'নষ্টা', 'বেশ্যা' উপাধি দেবে, ভাত দিতে দেরী হলেও মার খেতে হয় তাকে এখন ও! প্রত্যন্ত অঞ্চলের পুরুষ রা এই শতাব্দীতে এসেও ভাবে, স্ত্রীকে অনুগত রাখতে হলে তাদের মারতে হয়, শক্ত হাতে দমন করতে হয়, নাহলে তারা মাথায় উঠবে! হাজার অত্যাচার হলেও মা-বাবা চায় না তাদের মেয়ে ঐ অত্যাচারী স্বামীটিকে ডিভোর্স/তালাক দিক! কারন ডিভোর্সী মেয়েদের সমাজ খুব ছোট চোখে দেখে! এমনিতেই আমাদের দেশে মেয়েদের ভালো বিয়ে হওয়া সহজ নয়, তার উপর ডিভোর্সী হলে ঐ মেয়ের ভরন পোষনের দায় কে নেবে? বাবা? ভাই? তাই স্বামী বা তার পরিবার যতই অত্যাচার করুক মেয়েটিকে মুখ বুজে সব সইতে হবে!
মাথার উপরে কোনো পুরুষ মানুষ(বাবা/ভাই/স্বামী/ছেলে) না থাকলে আমাদের সমাজে মেয়েরা আরো বেশী নির্যাতনযোগ্য হয়ে চায়! একলা মেয়ে মানেই ধর্ষনযোগ্যা, তার সাথে যা খুশী করা যায়!
নারীর প্রতি গোটা পুরুষকুলের চিন্তা/ দর্শনটাই হলো, ভোগ্য পণ্য, যৌন বস্তু !! এর বাইরে তারা মেয়েদের ভিন্ন কিছু ভাবে না। ভাবতে চায় ও না। আর ওই ভাবনা/চিন্তাটাই ভয়াবহ। একে শেকল পরিয়ে রাখা যায় না। আইন দিয়েও বেঁধে রাখা যায় না। আর এই ভাবনাটাকে ছোট থেকে একটা শিশুর মনে গেঁথে দেয় তার পরিবার, সমাজ। একটি ছেলেকে মেয়েদেরকে ‘মানুষ’ না ভেবে তার অধীনস্ত নীচু শ্রেণীর ফালতু জীব ভাবতে শেখায় তার পরিবার, সমাজ। অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন পরিবার, সমাজ কি করে শিশুকে নারী নির্যাতনকারী বানায়? চলুন দেখা যাক কিভাবে কেন, কখন, একটা ছেলেশিশু ধীরে ধীরে নারী নির্যাতনকারী হয়ে ওঠে এবং মেয়ে শিশুটি নিজেকে হীন, অবলা, দুর্বল ভাবতে শেখে -
● কোন শিশু জন্মের পরেই বুঝতে পারে না সে নারী না পুরুষ। পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাকে নারী বা পুরুষ হিসাবে গড়ে তোলা হয়। মেয়েদের গণ্ডিবাঁধা অচঞ্চল চোখমুখ, লজ্জা, নির্ভরতা, ভীতু, স্বল্পভাষী ও নিচুকণ্ঠের শিক্ষা দেয়া হয়। আর পুরুষকে দেয়া হয় দুঃসাহস, দম্ভ, ক্রোধ এবং চাঞ্চল্যের। ছেলেগুলোকে শেখানো হয় ছেলেদের কাঁদতে নেই। ছেলেদের শক্ত হতে হয়। ছেলেদের আবেগী হতে হয় না। শুধু রূঢ়তাতেই পৌরুষের পূর্ণতা। আর যদি বা কখনো কোনো ছেলে এর উল্টো স্বভাবের হয়, তবে সে হয়ে যাবে “হাফ লেডিস”। মেয়েরা টমবয় হতেই পারে, কিন্তু ছেলেরা হাফলেডিস? অসম্ভব। বিলকুল নেহি! হায় হায়! ছেলে হয়ে তুই “লেডিস”? হাফ লেডিস? লেডি হওয়া কতোই না লজ্জার! শান্ত স্বভাবী পুরুষটাকে বলা হয় মেনীমুখো পুরুষ, স্ত্রৈন, হাদা ইত্যাদি ইত্যাদি।
● ছোটবেলা থেকেই শিশুরা পরিবার, প্রতিবেশী, স্কুল, শিক্ষক, সমাজ – এদের থেকে একটু একটু করে শেখে যে মেয়েরা কোনমতেই মানুষ নয়, মেয়েমানুষ। শিশুরা তাদের সামনে করা বড়দের নানা ব্যবহার এবং আচরন থেকে এমন ধারণা পায়। তাই পরবর্তীতে সেও বড়দের মতই হওয়ার চেষ্ঠা করে।
● মা/মেয়েরা বাড়ীর কাজ করে। এবং তারা যত কাজই করুক, সে কাজের কোন পারিশ্রমিক পায়না। আর মা যেহেতু টাকা আয় করেনা, তাই মায়ের কাজের কোনো দাম নেই। কাজ করা বাবার হাবভাব দেখেই শিশুদের মনে এই ধারনা পাকাপোক্ত হয়।
● রোববার ছুটির দিনে বাবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যায়, টিভি দেখে, আরাম করে। আর মা সেদিন বাবার আরামের বিশেষ খেয়াল রাখে, ভালমন্দ খাবারের ব্যবস্থা করে, তার কাপড় কেচে দেয়। রোজ কাজ থেকে ফিরেও বাবা আরাম করে।মায়ের ছুটি থাকতে নেই, আরাম, বিনোদন থাকতে নেই। কারণ মা তো সারাদিন বাড়ীতে বসে বসে আরামই করে, পরিবারের বড়দের হাবেভাবে এটাই প্রকাশ পায়, এটাই ছোটরা শেখে।
● নাটক, সিনেমা, খবরে প্রতিনিয়ত শিশুরা দেখে যে, মেয়েরা আক্রান্ত হয়, যার কোনো প্রতিকার হয় না। অর্থাৎ মেয়েদের প্রতি অন্যায় করে পার পাওয়া যায়। পুরুষ দোষ করলেও সমাজ মেয়েদেরকেই দায়ী করে।
● সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাবা নেন। তার মতই সব। মায়ের মত গুরুত্বহীন। তাই শিশুরা ধরেই নেয়, বাবার বুদ্ধি বেশী, মায়ের বুদ্ধি কম। মেয়েমানুষের বুদ্ধি কম, এটা পরিবার-সমাজে সবাই জানে, মানে। তাই মেয়েদের মতের কোন দাম দেয়া হয়না।
● বাবা মালিক, মা চাকর। বাবাকে না খাইয়ে মা খায়না, খেতে পারেনা। সব ভাল খাবার বাবা, ছেলে, বাড়ীর গুরুজনদের দিয়ে তারপর মেয়েদের দেয়। সবার খাওয়া হয়ে গেলে মা নিজে হাসিমুখে যা থাকে তাই খায় বা কখনও কখনও বাসি বা উচ্ছিষ্ট খাবার খায়। মায়েরা কখনোই একসাথে খায়না। সবার জামাকাপড় কিনে তারপর মায়ের জন্য কেনে।
● মা বাচ্চাকে বলে, “এটা কর বা ওটা করোনা, বাবা রাগ করবে।” ফলে শিশু বোঝে, পরিবারে পুরুষরাই শ্রেষ্ঠ, তার কথাই শেষ কথা।
● ডিভোর্স হয়েছে শুনেই বলা হয় নিশ্চয় মেয়ের দোষ, রেপ হয়েছে শুনেই বলা হয়, নিশ্চয় খোলামেলা পোষাক পরেছিল, স্বামী মেরেছে শুনেই বলে মারতেই পারে, সে তো স্বামী, দোষ না করলে এমনি মারে? ফলে মেয়েরাও মেনে নেয় যে তার প্রতি নির্যাতন হওয়াটাই স্বাভাবিক। সেটাই ন্যায্য।
● ছোটবেলা থেকেই সব ভাল জিনিসটা বরাদ্দ থাকে ছেলেদের জন্য। সবসময় ছেলের সুবিধার কথা আগে ভাবা হয়, পরে মেয়েদের। যত্ন ও ভালবাসাও ছেলের জন্যই বেশী। ফলে মেয়েরা নিজেদেরকে ছেলেদের তুলনায় কম কাঙ্খিত ও কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে বাধ্য হয়।
● সব খারাপ বা নেতিবাচক ঘটনার জন্য মেয়েদেরকে দায়ী করা হয়। যেমন- সন্তান ফেল করলে, বখে গেলে, দোষ করলে, ভুল করলে, প্রেম করলে, চুরি করলে, তার দায় মায়ের। কারণ বাবা আয় করেন, তাই বাকী আর কিছু সে করবেনা। সন্তান লালন-পালন, পড়াশোনা, সব দায় একা মায়ের। শিশুরা এসব দেখে দেখে মেয়েদের অশ্রদ্ধা করতে শেখে। ছেলে শিশুরা নিজেদেরকে বাবার মত ক্ষমতাধর ভাবতে শেখে আর মেয়েরা নিজেদেরকে দূর্বল, পরনির্ভরশীল ও হেয় ভাবতে শেখে।
● ছোটবেলা থেকে মেয়েদেরকে বিয়ে করে সংসার করার জন্য তৈরী করা হয়। তারা পড়াশুনা, চাকরী, রূপচর্চা, শরীর ঠিক রাখা- এসবই পুরুষের জন্য করে যাতে তার ভাল বিয়ে হয়। অর্থাৎ মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হল ভাল বিয়ে হওয়া। নিজেকে স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কোন চেষ্টাই সে করেনা। কারণ সে জানে, একা সে টিকতে পারবেনা, তাকে টিকতে দেয়া হবেনা।
● মেয়েরা ধর্ষিত বা শারীরিক ভাবে নির্যাতিত হলে গোপন করে রাখা হয় বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। কারণ মেয়েটিকেই সবাই অস্পৃশ্য মনে করবে, তার ভাল বিয়ে হবেনা, তার পরিবারের বদনাম হবে। অথচ যারা অন্যায় করল, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ হয়না। এটাও নারীকে মানসিকভাবে ছোট ও দূর্বল ভাবতে শেখায়। পুরুষ রেপ করলে, পতিতালয়ে গেলে, পরকীয়া করলে, প্রেমিকার সাথে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করলেও তার কিছু হয়না, তাকে কেউ কিছু বলেনা। দিব্বি আবার বিয়ে করতে পারে, তার মান এতটুকু কমেনা। কিন্তু মেয়েরা সমাজের চোখে একবার নষ্টা খেতাব পেলে তার বেঁচে থাকা দায় হয়ে যায়।
● শিশুরা ছোটবেলা থেকে দেখে, বাবা অনেকসময় মাকে মারে, গালি দিতে পারে। কিন্তু মা কখনোই বাবাকে মারে না, সেটা পারেনা। মা গালি বা মার খেয়েও আবার সংসার করে। বাবার কোন আচরণকেই অন্যায় মনে করা হয়না। তাই বাবার মর্যাদা বেশী, মায়ের কম। শিশুরাও দেখে শেখে, মা'দের, মেয়েদের মারতে বা বকতে হয় মাঝে মাঝে, এবং এটা একমাত্র বাবাদেরই অধিকার।
● ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের দ্বারা আক্রান্ত হবার ভয়ে বা প্রেমে পড়ার ভয়ে ছেলেমেয়েকে অভিভাবকরা একসাথে রাখেনা। আলাদা খেলা, আলাদা শোয়া, আলাদা খাবার, আলাদা সুবিধা, আলাদা স্কুল, কলেজ। এমন কি একই স্কুলের ক্লাসেও ছেলে-মেয়ে আলাদা আলাদা বেঞ্চে বসে।
আর একসাথে রাখেনা বলেই মেয়েদের প্রতি ছেলেদের আকর্ষণ, লোভ, আগ্রহ কমেনা। এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, গোপন ও অসহজলভ্য কোনকিছুর প্রতি মানুষের কৌতুহল, আগ্রহ সবচেয়ে বেশী।
● পুরুষরা কাজ বা চাকরি শেষে বাড়ী ফিরে আরাম করে, বৌ-মেয়ে-বোন-মা তার সেবা করে, কারণ সে সংসার চালানোর জন্য টাকা আনে। এটাই দেখেই একটা ছেলে শিশু এবং মেয়ে শিশু বড় হয়। ফলত সে ভাবে সংসারে পুরুষের গুরুত্ব নারী থেকে বেশী।
● মেয়েদেরকে একা কোথাও যেতে দেওয়া হয়না, সন্ধ্যার পর বাইরে যেতে বা থাকতে দেয়া হয়না, ভীড়ে একা ছাড়া হয়না, ছেলেদের সাথে মিশতে দেয়া হয়না, সব পরিবেশে যেতে দেওয়া হয়না, সব কাজ করতে দেয়া হয়না ইত্যাদি। অর্থাৎ মেয়েরা আক্রমণযোগ্য প্রাণী। যেকোন সময় যেকোন পুরুষ দ্বারা সে আক্রমনিত হতে পারে, এই ভয় তার মনে বদ্ধমূল করে দেয়া হয় বলে সে নিজেকে দূর্বল ভাবে, ভয়ে ভয়ে সাবধানে চলে এবং নিজেকে গুটিয়ে রাখে।
● বাবা, ভাই, স্বামী বা ছেলে, কোন না কোন পুরুষ মেয়েদের পরিচালিত হতে হয়। নিজের ইচ্ছামত সে কিছু করতে পারেনা। সে কি করবে, কি করবেনা, সেটা সে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা, নিতে দেওয়া হয়না। তার জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় পুরুষ। ফলে শিশুরা মেয়েদেরকে পরনির্ভরশীল বা পুরুষের পরগাছা ভাবে, কখনোই স্বাধীন সত্ত্বা ভাবতে পারেনা।
● যেকোন বয়সী পুরুষ খুব সহজে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে। কিন্তু মেয়েরা পারেনা, বিশেষ করে সন্তান থাকলে তো কথাই নেই।
● বিয়ের পর মেয়েদের নাম পরিবর্তন হয়,মিস থেকে মিসেস। অথচ ছেলেদের কিন্তু মিস্টারই থাকে। শুধু কি নিজের নাম? সন্তানের নামের সাথে যোগ করতে হয় স্বামীর পরিবারের নাম। কপালে পরতে হয় সিঁদুর, হাতে চুড়ি, নাকে নাকফুল, গলায় চেইন। যাতে তাদের বিবাহিত লাগে। ছেলেদের ওসব কিছুই পরতে হয় না। বিয়ের পর স্বামীরা বউদের অধীনে যায় না, যায় না বলেই তাদের শরীরে বাড়তি কিছু নেই। বউরা স্বামীর অধীনে যায় বলেই তাঁকে পরিবার ছেড়ে উঠতে হয় স্বামীর বাড়িতে। পরিবারের সকলের খেয়াল রাখার দায়িত্ব মেয়েটির, কারন “বউয়ের কাজ সবাইকে দেখে রাখা”। তাকে সব কিছুর সাথে মানিয়ে নিতে হবে। অপরদিকে জামাই হিসেবে ছেলেদের অন্য বাড়িতে গিয়ে মেনে নেওয়ার পর্ব নেই। বরং তার মন জুগিয়ে চলার জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যেহেতু সে জামাই। তাকে তার বাবা-মা ছেড়ে আসতে হয় না। তাকে কেউ বলে না, তুমি পরের আমানত, তোমার আসল ঠিকানা তোমার শ্বশুরবাড়ি। ছেলেদের জন্য শ্বশুরবাড়ি বেড়ানোর জায়গা, মেয়েদের জন্য আসল ঠিকানা। এসব কিছুই ঘটে সবার চোখের সামনে। কেউ কোনো আপত্তি করে না! মেয়েটি সবকিছু মানিয়ে নিতে শেখে, আর ছেলেটি শেখে হুকুম চালানো।
●আমাদের দেশের 98% মা-বাবা নিজে এবং মেয়েটিকেও ভাবতে বাধ্য করান বৈবাহিক জীবনের পূর্ব শর্তই হল যেনতেন ভাবে নিজেকে কুমারী প্রমান করা !!
ছেলেদের সতীত্ব পরিক্ষা নিতে কেউ আসে না। প্রয়োজন ও পড়ে না।
এই ক্রনিক বা সিস্টেমেটিক অর্ডারে খুব সুচারু ভাবে সমাজে ছড়ানো হয় জেন্ডার বৈষম্য !
একটা শিশু কিন্তু জন্মের পর বুঝতে পারে না সে নারী না পুরুষ। পরিবার এবং সমাজ ই তাকে ধীরে ধীরে পুরুষ বা নারী করে গড়ে তুলে। যে সমাজে আমরা বাস করি তা নিতান্ত ইতর, অসভ্য ও অমানবিক। এখানে মানুষের মূল্য নেই, নেই মানবিকতার মূল্য। এখানে মানুষের চেয়ে ‘লিঙ্গ’ বড় ও প্রধান হয়। ছোটোবেলা থেকে নিজের শিশুটিকেও এই লিঙ্গ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হয়। তাই মা-বাবারা, প্লিজ নিজের শিশুটিকে শেখান বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে শ্রদ্ধা কীভাবে করতে হয়! আপনার শিশুটিকে ছেলে-মেয়ের গৎবাধা নিয়ম থেকে বেরিয়ে মানুষ হিসেবে বড় করে তুলুন! এই সংস্কার কাজে প্রত্যেকটা পরিবার ও সমাজ এখনই মনোনিবেশ করলে আগামী দুই/তিন প্রজন্মের বেড়ে ওঠার মধ্যদিয়ে ইতিবাচক সমাজের দেখা মিলতে পারে।
আর মেয়েদের বলছি, তুমি জন্মেই নারী নও, তাই লাজ-লজ্জার ঘেরাটোপ পেরিয়ে তুমি মানুষ হয়ে ওঠো। লড়াইটা তোমার এবং তোমাকেই লড়ে যেতে হবে। পরিবর্তন আনতে হলে এই তোমাদেরই জাগতে হবে। একে অন্যের পাশে থাকতে হবে। অনেকভাবে ভাবতে হবে, দেখতে হবে, দেখাতে হবে।আর কত বছর বোকার মতন নিজেদের বঞ্চিত ভাবা? সাহসী হতে হবে নিজেদের কথাগুলো বলার জন্যও ,মনের কথা মনে রেখে দিলে প্রতিকার যেমন হবে না, তেমনি প্রকাশিত হবে না ‘পুরুষতান্ত্রিক দানব রূপটি! তাই সাহসী হও , গোপন করা নয়, লজ্জা নয়, ভয় নয়, খুলে বলো মনের সব কথা।
এবার নিজেকে বলো মেয়ে,
‘Be Bold for Change!
Be Bold! Be the Change’।