এই ব্লগটি সন্ধান করুন

শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ২০১৭

কোন এক গ্রীষ্মে আমরা ঠিক দ্বিগুণ হবো! 





প্রিয় নাম না জানা মেয়েটি, 

তোমাকেই বলছি। হয়তো তুমি আমার সমবয়সী। হয়তো বা আমাদের বয়সের ব্যবধান বিস্তর।তোমার আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা হয়তো আলাদা, কিন্তু তুমি যখন রুখে দাড়াও অন্যায়ের প্রতিবাদে, বিনিময়ে তোমায় দেওয়া হয় বেশ্যা উপাধি, তুমি যখন তোমার অধিকার নিয়ে কথা বলো, বিনিময়ে পাও গণধর্ষনের হুমকি ; তুমি যখন দূর্ণীতির বিরুদ্ধে মিছিল করায়, জেল হাজতে তোমার অন্তর্বাস খুলতে বাধ্য করা হয়;  কিন্তু এতকিছুর পরও যখন তোমার সাহসকে ভাঙা যায় না, তুমি হাতের মুঠো আরো শক্ত করে শুন্যে তোলো, তখনই মনে হয় আসলে তোমার আমার বেঁচে থাকায় খুব বিশাল কোনো ব্যবধান নেই l

মেয়ে, তুমি হয়তো জানো, নারীজন্মে জীবনের বেশীরভাগ সময় কোনো না কোনো অজুহাতে বেশ্যা, খানকি, মাগী(আঞ্চলিক ভাষায় আরো কত কি) শুনতেই হয়,  ধর্ষন, গনধর্ষনের হুমকি পেতেই হয়। এই সমাজ, এই রাষ্ট্র   চরমভাবে  শিশ্নপ্রধান। আর এই শিশ্নপ্রধান সমাজে ক্ষমতাধর নারীটিও চরম অসহায়।যদি তুমি ওড়না না পরতে চাও, তুমি বেশ্যা। পুরুষদের মতের বিরুদ্ধে বলেছো, তোমার এত সাহস- তুমি বেশ্যা। তোমাকে সকলের সামনে গনধর্ষনের হুমকি দেওয়া হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছ! সামান্য মেয়েমানুষের এত আস্পর্ধা!! তুমি বেশ্যা। পড়াশুনার চাপে বা চাকরি বা ক্যারিয়ারের জন্য হয়তো সন্তান ধারনে অনীহা, তুমি ফিগার ঠিক রাখতে চাওয়া বেশ্যা। নারীজন্মে সারাজীবন ধরে চলে বেশ্যা সমাচার। 

আসলে এই সমাজ/রাষ্ট্রে, ধর্ষন পুরুষের ক্ষমতার বহি:প্রকাশ। ধর্ষণ হলো পৌরুষের একাধিপত্যের নিশান। তারা পুরুষ, তাদের একখানা লিঙ্গ আছে এবং ঠিক সেকারনেই তারা যখন তখন যে কোনো নারীকে ধর্ষনের হুমকি দিতে পারে, গনধর্ষনের হুমকি দিতে পারে, কুকুর দিয়ে ধর্ষন করানোর হুমকি দিতে পারে, কবর থেকে তুলে ধর্ষন করার কথা বলতে পারে। তোমাকে অবলীলায় বেশ্যা উপাধিতে ভুষিত করতে পারে,  সে ফেইসবুক পোষ্ট হোক অথবা প্রাত্যহিক জীবনে। তাদের কোনো শাস্তি হয় না, কোনো প্রতিবাদ হয়না, আইন, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের নাগরিক তাদের দেখে মুচকি হাসে। তাদের দেখে নতুন করে জেগে ওঠে আরো কত পটেনশিয়াল ধর্ষক।  তুমি নারী,তুমি একটা মাংস পিন্ড, এবং যেহেতু  তোমার যোনি আছে, তুমি  পাঁচ বছর বয়সের হোও বা পঞ্চাশ বছরের, তোমায় ধর্ষন করা, বা ধর্ষনের হুমকি দেওয়া পুরুষ, পুরুষপ্রধান রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার। 

মেয়ে, তুমি তো জানোই, মৌলবাদের- সে হিন্দু মৌলবাদ হোক বা মুসলিম মৌলবাদ, কোনো পার্থক্য নেই। এই দুই মৌলবাদেরই প্রধান কাজ নারীদের আটকে রাখা। কারন, এই দুই মৌলবাদী শক্তিকেই চালায় পুরুষেরা। এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ধ্বজ্জাধারী পুরুষ পাষণ্ডের কাছে নারী নিছক ‘ সেক্স অবজেক্ট ' ছাড়া আর কিছু নয়। আর কিছু ভাবতে চায় ও না তারা। 

তাই তোমার রাজনৈতিক মতামতের প্রতি, তোমার নিজের অধিকার চাওয়ার প্রতি তারা প্রতিক্রিয়াশীল আচরন করে। তাদের তথাকথিত মতের বিরুদ্ধে গেলেই অক্টোপাসের মতো হাত-পা ছড়িয়ে তারা তোমায় কুৎসিত আক্রমন করে। তারা খুব বিরক্ত হয় যখন তুমি তাদের কাছে মাথা নত করো না। 

তোমার প্রতিবাদ কেন  তাদের শান্তি নষ্ট করে তার কারণ আমি জানি। তুমি যখন তাদের  সহানুভুতি চাও না, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে তাদের কাছে অধিকার ভিক্ষা করতে  যাও না; (তারা মহান পুরুষ দেখতে চায়, তুমি নাকিকান্না কেঁদে তাদের কাছে বঞ্চনার প্রতিকার চাইবে) তাদের সে ইচ্ছেয় গুড়েবালি দিয়ে তোমার লড়াই যখন তুমি নিজে করো, তারা ক্ষুদ্ধ হয়, রাগ করে।চিৎকার করে তোমায় থামাতে চায়। তারা তোমাকে ভয় পায়। তোমার মাথা না -নুয়ানোর সাহসকে ভয় পায়। যুগযুগ ধরে পুরুষতন্ত্র তাদের পইপই করে শিখিয়েছে, নারীর স্থান পুরুষের পায়ের নীচে। তাই আজ যখন তারা দেখে নারী তাদের বাধা-নিষেধকে তোয়াক্কা না করে মাথা তুলে দাড়াতে চাইছে, তারা ভীষন ভয় পেয়ে যায়।  একজন প্রতিবাদী নারীকে দেখে বিহ্বল হয়ে পড়ে তারা। মেয়ে হয়ে হাজার-কোটি বছরের ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে মাথা তুলে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ছে, সে পরিবর্তনের কথা বলছে, সমান অধিকারের কথা বলছে, অনেকক্ষেত্রে সে পুরুষকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে - এসব তারা মেনে নিতে পারে না। তাদের এতদিনের সিংহাসন চলে যাওয়ার ভয় পায় তারা। তাই ঐসব তকমা দিয়ে, গণধর্ষনের হুমকি দিয়ে তারা তোমায় দমন করতে চায়, আটকে রাখতে চায়। একজন নারীর চলার পথকে দুর্গম আর কষ্টময় করতে তার চরিত্রের উপর আঘাত হানা, তাকে ধর্ষনের হুমকি দেওয়াই তাদের শেষ হাতিয়ার।

তুমি তো জানোই মেয়ে, নারীবাদ মানে মস্তিষ্কে চেপে বসা কোনো ভূতুড়ে খামখেয়াল নয়, নারীবাদ মানে পুরুষবিদ্ধেষী হয়ে ওঠাও নয়। নারীবাদ একটা নিরন্তর লড়াই, যে লড়াই নারী স্বাধীনতা-প্রত্যাশী।চোখের ছানির মতো পুরুষতান্ত্রিকতাও আসলে একপ্রকার সামাজিক ছানি এবং নারীবাদ তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক ওষুধ। 

তাই আজ খুব জরুরি, পুরুষতন্ত্র নামক ছানিটাকে কাটা যা আদপে ধর্ষণ নামক ক্ষমতাপ্রদর্শনের শেকড় । পুরুষতন্ত্রের প্রমোটররা আমাদের  প্রতিপক্ষ তো বটেই। তাদের সাথে লড়াই আমাদের লিঙ্গের নয়, যোগ্যতার। জন্মসূত্রে পাওয়া এক লিঙ্গের জোরে তারা যতদিন নিজেদের  প্রথম আর আমাদের দ্বিতীয় লিঙ্গ ভাবতে থাকবে, আমরা ততদিন ওই লিঙ্গ বিভেদকে চ্যালেঞ্জ করে  তাদেরকে মানুষ বানানোর লড়াই করে যাবো। তারা  যতদিন পুরুষ হয়ে নারীকে শোষণ করবে,আমরা মানুষ হয়ে তাদের মোকাবেলা করবো। তারা যত নিয়ন্ত্রণ করবে আমাদের, তাদের তত বেশী করে স্বাধীনতা শেখাবো আমরা। যতদিন তারা নারীকে দমন পীড়ন  করবে, ততদিন আমরা তাদের মানুষের শক্তি দেখাবো। যতোবার তারা  নারীকে দমিয়ে রাখতে ধর্ষন, গনধর্ষনের হুমকি দেবে, ততোবার আমরা  মানুষ হয়ে শাবল চালাবো তাদের বুকে ; পুরুষতন্ত্রের বুকে।

তুমি তো জানোই মেয়ে,  আমাদের শুরুটা বেশিদিনের নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বয়ে আসা সংস্কারকে এক তুড়ি মেরে- তাতে পরিবর্তনের আশা আমরা করিনা । দু’চার বছরের ভেতর যে সবকিছু বদলে যাবে এমন আশাও করি না। কারন পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি একটা প্রসেস। আমরা  শতাব্দীর হিসাব করে লিখি বা বলি; রাতারাতি কোনকিছু পরিবর্তনের আশায় নয়। তবুও আমাদের  জীবদ্দশায় আমাদের কথা শুনে, লেখা পড়ে  যদি একটা মেয়েও ঘুরে দাঁড়ায়, একটা ছেলেও যদি মেয়েটার হাত ধরে পাশে দাঁড়ায়, তবে তো সেটাই আমাদের প্রাপ্তি বলো! সেটাই তো আমাদের বলা হাজারটা কথার, লেখার, স্বপ্নের পূর্ণতা!

তাই যতই বাধা আসুক মেয়ে, যতই পুরুষতন্ত্রেরা হায়েনা রা আমাদের ছিঁড়ে খেতে আসুক, যত নোংরা মন্তব্য উড়ে আসুক আমাদের দিকে, হার মেনোনা কখনো। বরং আরো জোরে চিৎকার করো, সেই  চিৎকারে যেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটা একটা ইট খসে পড়ে। আজকে হয়তো আমরা সংখ্যাই কম, কিন্তু কোন এক গ্রীষ্মে আমরা ঠিক দ্বিগুণ হবো। 

প্রিয় মেয়ে, লড়াইটা ততোদিন চালিয়ে যেতে হবে তো। 


















বুধবার, ২৯ মার্চ, ২০১৭

বৌদ্ধ দর্শন কিভাবে বৌদ্ধ ধর্মে পরিণত হল!
_______________________________________





বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি ভারতবর্ষে। কিন্তু কেন নাস্তিক বুদ্ধের কপালে দেওয়া হল ভগবানের টিকা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন বৌদ্ধ পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন উনার ‘ভারতমে বৌদ্ধ ধরম কা উত্তান ঔর পতন’ নামক বই এ।
রাহুল সাংকৃত্যায়ন মতে ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের মূল বিলোপ সাধন হয়েছে চতুর্দশ শতকে, তবে সে কারণটি ছিল বুদ্ধের মৃত্যুর পর থেকে। তাই সময়ের কালক্রমে সিদ্ধার্থ গৌতমের নামের পূর্বে ‘ভগবান’ যোগ হয়ে হয়েছে, ভগবান গৌতম বুদ্ধ। বৌদ্ধ ধর্মের বিকৃত হওয়ার প্রধান কারণ ছিল, তৎকালীন যুগে বুদ্ধের দর্শনে মানুষকে বেশী আকর্ষিত করায়, পার্শ্ববর্তী নানা ধর্মীয় সমাজ বুদ্ধকে তাদের দলে টেনে নিয়ে বিকৃত করার রুপকে শতভাব সার্থকতা দিয়েছে। বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষা ছিল মৌখিক, যারা এই
শিক্ষা ধরে রাখতেন তাদেরকে মতিকা-ধর বলা হয়। তিনি বুদ্ধের দর্শনের বিকৃতিতে প্রাধন্য দিয়েছেন হস্তান্তরের ফলে তত্ত্ব বিকৃতির সত্যতাকে। দ্বিতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতিতে ভিক্ষুরা একমত হতে না পেরে মহসঙ্ঘ নাম দিয়ে আরেকটি সম্মেলন হয়েছিল।যা ছিল বুদ্ধ দর্শনের বিলুপ্তির মূল কারণ এবং বৌদ্ধ ধর্মের সূচনা।

কুশান বংশের রাজা কনিস্কের সময় তৈরি হয় বুদ্ধের মূর্তি নির্মাণের কাহিনী। সেই সময় মানবপুত্র বুদ্ধকে বসানো হয় ভগবানের আসনে। বুদ্ধের মূল দর্শনে আনা হয় দেবতা এবং মিথের সমষ্টি। বুদ্ধের দর্শন বিকৃতিতে যোগ হল স্বর্গ নরক, জাতক, বুদ্ধের জন্ম মৃত্যুর নানা কাহিনী নিয়ে হাজারো মিথ। তৎকালীন মানুষ ধ্যান সাধনা পরিত্যাগ করে জামজমক ভাবে বুদ্ধের পুজায় লিপ্ত হলেন। শুরু হল মহাজন এবং তন্ত্রজান বুদ্ধ ধর্মের ধারনি, মঞ্জুশ্রী মূল কল্প, গুহ্য সমাজ, চক্র সংবর, তৎকালীন ব্রত শ্চারন, বলি পূজা, পুরশ্চরন ইত্যাদি তপ-জপ ও তন্ত্র-মন্ত্রের
প্রভাবে বৌদ্ধ ধর্ম আজকের রূপে এসে পৌছাল। যাতে হারিয়েছে গেছে বৌদ্ধ দর্শনের প্রকৃত সত্তা। সেখান থেকে উদ্ভব হয় স্তবিরবাদ এবং মহাসঙ্ঘবাদ।যে কারনে রচিত হয় বুদ্ধের নামে নানা সূত্র এবং পার্থক্য দেখা যায় সূত্র-পিটক এবং বিনয়-পিটকের মাঝে।

অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম শুরু হয় বৌদ্ধ ধর্মের ভারতের বাইরে প্রচার। অশোকের অবদানের ফলে মূলত আজ বৌদ্ধ ধর্ম এত বেশী প্রসার পেয়েছে। আধুনিক ত্রিপিটক সংরক্ষণ হয় শ্রীলংখ্যায় খ্রীষ্টিয় প্রথম শতকে। কিন্তু ততদিনে বৌদ্ধ দর্শনে ভারত থেকে হিন্দুত্বের প্রভাব ঢুকে পরে। যে কারনে বৌদ্ধ দর্শনে হিন্দু ধর্মের এবং স্বর্গ-নরকের বর্ণনা পাওয়া যায়। মৌর্য
সম্রাটদের অতীব ভক্তির কারনে তারা নির্মাণ শুরু করে হাজার হাজার স্তূপ, আর সেখান থেকেই ধারনা লাভ করে আধুনিক তীর্থ যাত্রার। খৃষ্টের জন্মের দুইশ বছর পর মৌর্য শাসনে এলো বিশাল পরিবর্তন , শাসকরা ছিল অব্রাহ্মণ ধর্মের বিদ্বেষী। যা বুদ্ধ দর্শনের বিলুপ্তির পথকে সুগম করেছে। মৌর্য শাসনের পর ব্রাহ্মণদের কর্তৃক গ্রন্থ সূচনা শুরু হয় । সে সময় রচিত হয় মহাভরতের প্রথম সংস্করণ।ব্রাহ্মণবাদের প্রভাবে বৌদ্ধ জনপদে পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় বৌদ্ধরা তাদের মূল জনপদ ছেড়ে স্থানান্থরিত হতে লাগলো। কঠোরভাবে পুরানো রীতি স্থবিরবাদও দেশ, কাল, ব্যক্তিভেদে নানা রূপে আবির্ভূত হতে লাগলো।সর্বাস্তিবাদীরা মাথুরায় স্থানান্তর হয়ে সংস্কৃত ভাষায় ত্রিপিটক লিপিবদ্ধ করেন। ফলে নতুনভাবে সূচিত হল মহাসক্তিক, লোকেত্তরবাদ নামে আরও কয়েকটি নিকায়। স্থবিরবাদের থেকে সর্বাস্তিবার বাদের আবির্ভাব। সর্বাস্তিবাদের
উৎপত্তি যবন রাজাদের কারনে।

কুশান বংশের রাজা কনিস্ক সর্বাস্তিবাদী ভিক্ষুদের নিয়ে একটি মহাসভা করেন। সেই সভায়ও বৌদ্ধ দর্শনে নানা মতবিরোধ দেখা দিলো। খৃষ্টীয় প্রথম শতকে আচার্য নাগার্জুনের আবির্ভাব হয়। তিনি শূন্য বাদের
দর্শন প্রচার করেন। মহাজন এবং শূন্যবাদের দর্শন যোগে তৈরি হয় মহাজান সম্প্রদায় এবং তা অন্তর্ভুক্ত হয় ত্রিপিটকে। ফলে আবারও বিকৃত
হয় বৌদ্ধ দর্শন।চতুর্থ শতকে পেশোয়ারের আচার্য বসুবন্ধু বৈভাষিক মতভেদে নতুন গ্রহন্ত লিখেন যার নাম অভিধর্ম কোষ। তাই চতুর্থ শতকে এসে বৌদ্ধধর্মে বৈভাষিক, সৌত্রান্তিক যোগাছার এবং মাধ্যমিক সম্প্রদায়রূপে রূপান্তরিত হয়। বুদ্ধের অলৌকিক কর্মকাণ্ডে প্রচারে মূল ভূমিকা ছিল মূলত মহাযান পন্থীদের। বোধিস্বত্বের মাহাত্ম্য প্রদর্শনে তারা যোগ করেছিল অবলোকিতেশর, মঞ্জুস্রী, আকাশ মার্গী প্রভৃতি শত শত কল্পনা।

বুদ্ধের মৃত্যুর চারশো বছর পর যখন রাজা কনিস্ক প্রথম বৌদ্ধ মূর্তি নির্মাণ করেন মহাযান ধর্মপন্থীরা তখন শুরু করলেন জাক জমক পূর্ণ বুদ্ধপুজার
আনুষ্ঠানিকতা। দেব দেবীর ন্যায় শুরু হল বুদ্ধ থেকে কামনা পূর্ণ করার পর্ব। চারিদিকে বুদ্ধের মূর্তি এবং বড় বড় বিহার নির্মাণ শুরু হল। এমনকি মহাযান পন্থীরা সুত্র পর্যন্ত বিকৃত করেছিলেন নিজেদের সুবিধার্থে, যার প্রাদুর্ভাব ত্রিপিটকে আছে। বৌদ্ধ নিকায়ের মধ্যে গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রারম্ভিক কাল থেকে হর্ষবর্ধনের সময় মঞ্জুশ্রী মূলকল্প, গুহ্য সমাজ ও চক্র সংবর ইত্যাদি অনেক তন্ত্রের উদ্ভব হয়। এই সময় আবিষ্কার হয় বুদ্ধ পূজার যা আজো চলে আসছে ভারতবর্ষ তথা এই উপমহাদেশে। অষ্টম শতাব্দীতে বুদ্ধের সরল দর্শনের প্রতি বিশ্বাস উঠে যায় বজ্রযানদের তারাও ভিড় জমায় মহাযানপন্থীদের দলে। এই সময় প্রচলন হয় মানুষের মাথার খুলি নিয়ে শ্মশানে ধ্যান সাধনার। সাধারণ মানব বুদ্ধের অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি মানুষের বিশ্বাস বাড়তে থাকে। বজ্রযানপন্থীরা মধ্যে একদল মাতাল প্রকাশ্যে স্ত্রী ভোগ এবং মদ পানে লিপ্ত হতেন, তাদের সহযোগিতা করতেন রাজা মহারাজারা। এমনকি এক সময় বলি পূজা পর্যন্ত বুদ্ধ দর্শনে আনার চেষ্টা করা হয়।ভারতীয় জনগন বুদ্ধের দর্শনকে ধর্মে রূপান্তর করে অন্ধবিশ্বাসে লিপ্ত হয়।কিন্তু কালক্রমের তাও বিলুপ্ত হয়ে পরে।
কন্ডোম ও ধর্মীয় ভাবাবেগ
__________________________





                          "আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে—
                      কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!’ - 

শ্রীজাতের লেখা এই লাইনদুটো নিয়ে সোস্যাল মিডিয়া, সমাজ, রাজ্য (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম) উত্তাল!!  উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের গায়ে আগুন লেগে গেছে!! শ্রীজাত নাকি ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করেছেন!! কিন্তু একজন মানুষ ও এটা বলছেন না, শ্রীজাতের ঐ লাইন ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, একজন মানুষের (যিনি কিনা ভারতের বৃহত্তম রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী!!) করা মন্তব্যের প্রতিউত্তর!  তার জনসভায় বলা হয়েছিল "মুসলিম মহিলাদের কবর থেকে তুলে এনে ধর্ষন করা হোক"!  

একইভাবে শ্রীজাত মুসলিম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধেও লিখেছিলেন তার অন্ধকার কাব্যগুচ্ছ। তখন তো আপনারাই বাহবা দিয়েছিলেন! শেয়ার করে  চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন! তবে আজ কি হলো!?? 


আজকে যারা শ্রীজাতের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের কথা বলছেন, তাদের তো একবারের জন্যেও যোগী আদিত্যনাথের এই মন্তব্যের বিরোধীতা করতে দেখিনি!! একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর জনসভায় এইধরনের উস্কানিমূলক মন্তব্যে প্রতিবাদ করতে তো কাউকে দেখিনি!! প্রকারান্তে ধর্ষনের সংস্কৃতিকে বাহবা দেওয়ার প্রতিবাদ তো কাউকে করতে দেখিনি!! একজন মহিলা, সে হিন্দু হোক বা মুসলিম, তাকে ধর্ষন করার ফতোয়া দেওয়ার অধিকার পায় কি করে এরা!! এর বিরুদ্ধে কাউকে তো সোচ্চার হতে দেখিনি!! আজকে যারা ধর্মীয় ভাবাবেগ আহত হওয়ার কথা বলছেন, তার একবার 'মুসলিম মহিলার' জায়গায় নিজের মা-বোনকে বসিয়ে দেখুন তো কেমন লাগে!! কোনো ভাবাবেগ আহত হয় কি না!?? 

শুধু কি এই মন্তব্য!! একজন  দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি হয়া সত্ত্বেও একের পর এক বিদ্ধেষপূর্ণ মন্তব্য তিনি করে গেছেন! কৈ, কাউকে তো প্রতিবাদ করতে দেখিনি!! একটা রাজ্য, দেশ মানে শুধু কোনো একটা ধর্মাবলম্বী লোকদের একার সম্পত্তি নয়! দেশ মানে যেখানে সব জনজাতি/সব ধর্মাবলম্বী লোকের বাস! সবার সমঅধিকার! সেখানে কেবলমাত্র একতরফা বিদ্ধেষপূর্ণ মন্তব্য যারা করে, উগ্র ধর্মান্ধতা যারা ছড়াতে চায়, যারা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, সে হিন্দু হোক বা মুসলমান, সেইরকম কোনো  ব্যক্তিকে কোন ভিত্তিতে বাছাই করা হয় একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে? 
এই স্বাভাবিক প্রশ্ন করলে, যারা মা-বাবা তুলে গালি দিচ্ছেন তারা একবার নিজের যুক্তিগুলো ভেবে দেখুন তো!! একবার আয়নার নিজের মুখটা দেখে বলুন তো নিজেকে মানুষ লাগছে না হিন্দু/মুসলমান লাগছে?? 

যারা শ্রীজাত কে নিয়ে পাল্টা কবিতা লিখছেন, তার একটা নমুনা  দিচ্ছি..! সব্যসাচী ভট্টাচার্য বলে একজন লিখেছে, 

"কন্ডোম নিয়ে কবিতা লেখো, এ কেমন কবি,
স্ত্রী সাথে করেছো নিশ্চয় কোনোদিন নীলছবি ।
কবি তোমার টাকে কন্ডোম, গোপনাঙ্গে হাত
বনমানুষের নাম দিয়েছে আবার শ্রীজাত ।
বেজাত নামটাই শ্রেয় ছিল, জারজ বলে কথা
কবি সেজে দিয়েছো তাই ধর্মানুভূতিতে ব্যাথা ।
ত্রিশূল নিয়ে লিখছো তাই অক্ষত আছে হাত,
ইসলাম নিয়ে লিখলে বুঝতে পারতে শ্রীজাত ।
তুমি কোন চুলের কবি, ধর্মকে করো অপমান,
কন্ডোম ছাড়া কি আর কিছুর নিতে পারোনা নাম ।
জারজ বলেই এসব বলো, ব্রা প্যান্টিতে আন্দোলন,
শুনেছি নাকি পাকিস্তান গিয়েছে তোমার আপন বোন ।
তোমার বাবা নাকি ধ্বজভঙ্গ, ফলাতে পারেনি তোকে,
তোর মা নাকি ছুটে গেছিল লাহোরের কোন ঝোপে ।
তোর মাথাতে কন্ডোম পরাবো, কুকুর দিয়ে করাবো ধর্ষন,
বাকস্বাধীনতার কবিতা কাকে বলে এবার দেখুন বুদ্ধিজীবিগন" 



এই কু-লেখা দেখা আপনাদের ভাবাবেগ আহত হচ্ছে না!! আপনারা বলুন, যে ধর্মান্ধ গুলো, শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে কারো মা-বোন-বউকে কুৎসিত আক্রমন করে, তাদের দেখে আপনাদের ধর্মীয় ভাবাবেগ আহত হয় না?? ধর্মীয় ভাবাবেগের নামে কোনো জাতি-গোষ্ঠীকে আক্রমন করতে যারা তাদের মা-বোন-মেয়ে কে ধর্ষনের কথা বুক ফুলিয়ে বলে, কুকুর দিয়ে ধর্ষন করানোর কথা বলে, তাদের দেখে আপনাদের মনুষ্যত্ব আহত হয় না?? পেটে বর্শা-ত্রিশুন খুচিয়ে অপরিণত ভ্রুণ টেনে এনে যারা পৈচাশিক আনন্দে মেতে ওঠে, তাদের দেখে আপনাদের ধর্মীয় ভাবাবেগ, মনুষ্যত্ব আহত হয় না?? অনার কিলিং দেখে আপনাদের যাবতীয় ভাবাবেগ আহত হয় না?? কন্ডোম শব্দে ভাবাবেগ আহত হয়, ধর্ষনে ভাবাবেগ আহত হয় না?? 

যদি হয়, তবে বলবো আগে এগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখুন, মানুষে মানুষে হানাহানির প্রতিবাদ করুন, ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন! আর যদি না হয়, তাহলে বলবো আপনাদের আকার আকৃতি মানুষের মতো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আপনারা একটা জানোয়ারের থেকেও অধম! 

















"আমি কি ডরাই সখা 'খানকি' গালিরে!!"
___________________________________

ফেইসবুক এবং বাস্তব জীবনে আমি একশ্রেনীর মানুষের সাথে ভালোভাবে কথা বলে দেখেছি, ওদের মতো নোংরা ভাষায় কথা বলে দেখেছি, ইগনোর করে দেখেছি - এবং এত সবকিছুর পর একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছি, আসলে ওরা আমাকে ভয় পায়! ওরা ভয় পায়, কারন ওরা জানে আমি শক্তিমান, দৃড়চেতা। আমাকে সহজে টলানো যায় না।  তারা আমার শক্তিকে ভয় পায় বলেই আমার দিকে ঢিল ছুঁড়ে, কিন্তু ঢিলটা যে আমার গায়েই লাগছে না তা তারা টের পায়না!!


আমি ভেবে দেখলাম, ওরা যখন আমার বিভিন্ন পোষ্টে আমাকে বেশ্যা/মাগি/খানকি বলে গালি দেয় তখন তাদের উদ্দেশ্যটা কী থাকে? তারা কি সত্যিই ভাবে আমি খানকি? না, আসলে আমাকে দমানোর আর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে মরিয়া হয়ে উঠে তারা আমায় ওইসব উপাধিতে ভূষিত করে!  আমার তাদের জন্য বড় করুনা হয়। করুনা হয় তাদের আমাকে ছোট করতে চাওয়ার/দমিয়ে রাখার নিরলস এবং ব্যাকুল প্রচেষ্টার ব্যর্থতা দেখে!  

আমার রাজনৈতিক এবং নারীঅধিকার নিয়ে লেখা পোষ্টগুলোতে তারা প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করে। তাদের তথাকথিত মতের বিরুদ্ধে গেলেই তারা আমায় বেশ্যা, মাগি তকমা দেয়! হিংসার বিপক্ষে শান্তির কথা বললে তারা ভয় পেয়ে যায়! ধর্মনিরপেক্ষতায় তাদের ভয়! সাম্যের কথা বললে তারা আরো ভয় পায়! তারা প্রাণপনে থামাতে চায় আমায়।তারা খুব বিরক্ত হয় যখন আমি পুরুষতন্ত্রের কাছে মাথা নত করি না। তারা ভয় পায় যখন আমার নিজের অধিকার আমি নিজেই দাবি করি। তারা পৌরুষিক আক্রমণে তেড়ে আসতে আসতে বলে, 'নারীবাদী মানে ভুঁইফোড় চরিত্রহীন ঘর ভাঙ্গানি নারীর দল'। তারা আরো একধাপ এগিয়ে আমাকে বেশ্যা, খানকি তকমা দেন! আসলে, একজন প্রতিবাদী নারীকে দেখে বিহ্বল হয়ে পড়ে তারা। মেয়ে হয়ে হাজার-কোটি বছরের ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে মাথা তুলে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ছে, সে পরিবর্তনের কথা বলছে, সমান অধিকারের কথা বলছে, অনেকক্ষেত্রে সে পুরুষকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে - এতে তারা ভয় পেয়ে যায়! তাই ঐসব তকমা দিয়ে তারা আমাকে দমন করতে চায়, আটকে রাখতে চায়। 

আমার ক্ষমতা আর সাহসকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তাদের। তাই তারা  অবলীলায় আমাকে বেশ্যা বলে গালি দেয়, কারণ একটি মেয়ের নৈতিক চরিত্রকে  তারা এবং তাদের সমাজ অনেক আগেই ট্যাবু বানিয়ে রেখেছে। একটা মেয়ের চলার পথকে দুর্গম আর কষ্টময় করতে তার চরিত্রের উপর আঘাত হানাই তাদের শেষ এবং মোক্ষম হাতিয়ার।

কিন্তু তারা জানে না, যে মেয়ে একা হাঁটতে জানে, তাদের ছুঁড়ে দেয়া অপমানের ঢিল আর তার গায়ে লাগে না। তার কাছে বদলে গেছে মান-অপমান ভাল-মন্দের সংজ্ঞা।তার সম্মানবোধ যোনির বেড়া ছাড়িয়ে, দেহের সীমানা পেরিয়ে অন্যত্র স্থান পেয়েছে।তাদের বানানো চরিত্রশুদ্ধির বর্ম, অনেক আগেই পায়ের নীচে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে সে এগিয়ে চলেছে সামনে। 

মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ, ২০১৭


সাম্প্রদায়িকতার আবহে ভারতবর্ষ



সাম্প্রদায়িকতা ভারতবর্ষের মানুষের রক্তে রক্তে। আমাদের ইতিহাস এর সাক্ষী। ইংরেজরা ভারতবর্ষের বুকে ‘সাম্প্রদায়িকতার’ বীজ পুতে গেছে - এটা একদমই ভুল ধারনা! আসলে  দু’শ বছর দেশ শাসন করে ইংরেজরা জেনে গেছিলো, আমাদের দেশের মানুষের দুর্বল স্থান কোথায়! উপযুক্ত স্পর্শকাতর জায়গাটুকু  চিহ্নিত করে ব্যবহার করেছে মাত্র। 

এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন , “আজ আমরা সকলেই এই কথা বলিয়া আক্ষেপ করিতেছি যে, ইংরেজ মুসলমানদিগকে গোপনে হিন্দুর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিয়া দিতেছে। কথাটা যদি সত্যই হয় তবে ইংরেজের বিরুদ্ধে রাগ করিব কেন। দেশের মধ্যে যতগুলি সুযোগ আছে ইংরেজ তাহা নিজের দিকে টানিবে না, ইংরেজকে আমরা এতবড়ো নির্বোধ বলিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিব এমন কী কারণ ঘটিয়াছে। মুসলমানকে যে হিন্দুর বিরুদ্ধে লাগানো যাইতে পারে এই তথ্যটাই ভাবিয়া দেখিবার বিষয়, কে লাগাইল সেটা তত গুরুতর বিষয় নয়। শনি তো ছিদ্র না পাইলে প্রবেশ করিতে পারে না; অতএব শনির চেয়ে ছিদ্র সম্বন্ধেই সাবধান হইতে হইবে। আমাদের মধ্যে যেখানে পাপ আছে শত্রু সেখানে জোর করিবেই– আজ যদি না করে তো কাল করিবে, এক শত্রু যদি না করে তো অন্য শত্রু করিবে– অতএব শত্রুকে দোষ না দিয়া পাপকেই ধিক্কার দিতে হইবে। হিন্দু-মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশের একটা পাপ আছে; এ পাপ অনেক দিন হইতে চলিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা না ভোগ করিয়া আমাদের কোনোমতেই নিষ্কৃতি নাই। ”

ইংরেজ সৈন্যরা যতো না ভারতীয়দের মেরেছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ দেশভাগের সময় দাঙ্গায় মারা গিয়েছিলো।তাই ইংরেজরা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে নি আমাদের,  আমরা প্রথম থেকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েই ছিলাম | ইংরেজরা মুসলিম লীগ ও বানায়নি আর হিন্দু মহাসভা ও বানায়নি! ইংরেজরা আর এস এস বানিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লেলিয়েও দেয়নি! সিপাহী বিদ্রোহ ও ধর্ম দ্বারাই অনুপ্রাণিত ছিল, স্বাধীনতা বা  স্বদেশপ্রেমের গপ্প ছিল না তাতে! 

এদেশের প্রচুর সংখ্যক মানুষ ভিতরে ভিতরে তীব্র সাম্প্রদায়িক। তারা অনেকেই অগোচরে হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলে সম্বোধন করে, মুসলমানদের 'যবন', 'নুনুকাটা', 'বাঙ্গাল' বলে সম্বোধন করে! হিন্দুরা মুসলমানের ছোঁয়া অব্দি খায়না অনেক ক্ষেত্রে!! আমার অদ্ভুত লাগে একটা বিষয়, আমাকে দেখে অনেক বন্ধু, পরিচিতরা বলে, 'ঈস! তুই একদম মুসলিমদের মতো না, একদম আমাদের মতো!' প্রশ্ন করেছিলাম, মুসলিমদের মতো না মানে? ওরা কি আলাদা গ্রহের প্রাণী? উত্তর এসেছিল, "না, ঠিক তা না, তবে ওরা অন্যরকম হয়!" কিরকম হয়, সেটা আজও জানতে পারিনি! মানুষের মুখ দেখে কি করে হিন্দু-মুসলমান বোঝা যায় , সেই আর্ট টা এখনো শিখতে পারিনি!! আবার অনেকে বলে, "তুই নিশ্চয় আগের জন্মে হিন্দু ছিলি, এজন্মে ভুল করে মুসলমান হয়েছিস!" অবাক হয়ে তাকানো ছাড়া আর কোনো কথা আসেনি মুখে! অনেক ছেলে প্রপোজ করার পর যখন জানতে পেরেছিল আমি মুসলিম তখন তাদের এক্সপ্রেশনটা দেখার মতো ছিলো! একবার আমার একজন স্যার আমার পরিচয় দিচ্ছিলেন অন্য ছাত্রদের এই বলে যে, "ও মুসলিম, কিন্তু বামপন্থী!" আমি বামপন্থী শব্দের মানে জানি, কিন্তু 'মুসলিম বামপন্থী' শব্দের মানে আজ অব্দি খুঁজে পাইনি! সারাজীবন ধরে দেখছি আমি যতবার নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে যাই, ততবারই আমার উপর আমার মুসলমান পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া হয়!! হয়তো এটাই আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতি, ট্রাডিশন! 

আমি জন্মেছিলাম একেবারে ন্যাংটো একটা শিশু হয়ে, যেরকম সব মানুষ পৃথিবীর আলো দেখে। ভারতেই জন্মাবো, বাঙালি হয়েই জন্মাবো, মুসলিম ঘরেই জন্মাবো – এমন কোনও প্ল্যান ছিল না। সব আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে জন্মের পরে। কথা বলতে পারতাম না , তাই আমার মতামত কেউ নেয় নি। তাই এই হিন্দু-মুসলমান-খ্রীষ্টান পরিচয়গুলোকে আমি স্রেফ ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট হিসেবেই ভাবি, এর জন্য আলাদা করে কোনও গর্ব বা ঘেন্না অনুভব হয় না।ধর্ম জাত-পাত মন থেকে ঘৃণা করি। যারা গোরুকে মা মনে করেন এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদ, হিন্দুজাতীয়তাবাদকে প্রোজেক্ট  করার নিরন্তর চেষ্টা করেন, আর যারা শুওরের মাংসকে “হারাম” বলে মনে করেন আর ইসলাম বাদে বাকি ধর্মকে মনে প্রানে ঘৃণা করেন, অস্বীকার করতে চান – দুই দলকেই আমি সমান অপছন্দ করি।



আর শুধু কি ধর্ম ? উঁচু জাত, নীচু জাত, মেথর, হরিজন, মুচি থেকে শুরু করে গায়ের কালো রঙ, হিজড়া, সমকামী নিয়েও ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে প্রচন্ডভাবে সাম্প্রদায়িকতা বা রেসিজম কাজ করে!  

ভারতবর্ষে এই মুখে উদার সাজা, ভেতরে প্রচন্ড রকমের সাম্প্রদায়িকতা পোষন করা লোকের ভিড়ে এখন আামি এবং আমাদের মতো মানুষরাই হয়ে পড়ছি সবচেয়ে বেশি সংখ্যালঘু। আমরা যারা ঈদের দিনে সেমাই খাই, নতুন কাপড় নেই, রোজা রাখি, নামাজ পড়ি, আবার মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও পূজার মণ্ডপে, রথের মেলায়, কীর্তনের আসরে, ক্রিসমাসে গাছ সাজাতে উৎসাহ নিয়ে অংশ নেই, কিংবা যারা হিন্দু হয়ে পূজা করা সত্ত্বেও মুসলমান বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার খাই, ঈদে মুসলিম বন্ধুদের বাড়ী গিয়ে সেমাই খাই, এবং যারা নারী-পুরুষের ও সব মানুষের সমঅধিকারে বিশ্বাস করি সেই আমরাই এই ভারতবর্ষে সংখ্যালঘু ।আমরা যারা সাম্প্রদায়িকতার তিলমাত্রও মনে লালন-পালন করি না সেই আমরাই সংখ্যালঘু। আমরা যারা রমেশ আর রহিম কে একই রকম মানুষ মনে করি সেই আমরাই সংখ্যালঘু।

আমি এবং আমরা সংখ্যালঘু হয়েছি সেইদিন থেকে, যেদিন থেকে আমরা হিন্দু বা মুসলমানের চেয়ে মানুষ হয়ে উঠেছি। আমরা আমাদের দেশে আর একটিবারের জন্যও দাঙ্গা দেখতে চাই না, তাই আমরা সংখ্যালঘু। আমরা আমাদের দেশে আর ধর্মীয় উগ্রতা দেখতে চাই না, তাই আমরা সংখ্যালঘু।  

যেদিন আমরা এবং আমাদের মতো মানুষরা ভারতবর্ষে সংখ্যাগুরু হয়ে উঠবে, হয়তো সেদিনই ভারতবর্ষ সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক দেশ হয়ে উঠবে!! জানিনা সেদিন কখনো আসবে কি না!! 

মঙ্গলবার, ৭ মার্চ, ২০১৭


নবী দিবস/সরস্বতী পূজো ও ধর্মনিরপেক্ষতা






স্কুল কলেজ বা যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে 'নবী দিবস ' কেন হবে?? নবী দিবস সম্পূর্ণ ইসলামিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান । স্কুল কলেজে তো সব ধর্মের ছেলেমেয়েরা পড়তে যায়, সেটা তো শিক্ষালাভের জায়গা, কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নয় ! উলুবেরিয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক 'নবী দিবসের' অনুমতি না দিয়ে একদম সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছেন । আর যারা ঐ এলাকায় এটা নিয়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে তারা মানুষের কোনো পর্যায়ে পড়ে না ! 

এর সাথেই সম্পর্ক রেখে আমি আরও কিছু বলতে চাই! 

ভারতীয় সংবিধানের ২৮(১) নং ধারায় সরকারি বা সম্পূর্ণভাবে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান/শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধর্মাচারণ  ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার। 

তাহলে স্কুল-কলেজের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজো কেন হবে!!? নবী দিবস ই বা কেন হবে!!? আর যদি কোনো স্কুল কলেজ কোনো একটাতে অনুমতি দেয়, এবং অন্যটাতে দেয় না, তাহলে কি সমস্যার সৃষ্টি হবে না?? সেটা কি বৈষম্যমূলক নয়?? স্কুল কলেজে তো বৈষম্য মূলক আচরন হওয়ার কথা নয়?? আজকে যদি দেখা যেত স্কুলে নবী দিবস হচ্ছে কিন্তু সরস্বতী পূজো হচ্ছে না , তাহলে কি সমস্যা হতো না?? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চরিত্র ধর্মনিরপেক্ষ হবে, সেটাই তো কাম্য। ধর্মের ভিত্তিতে শিশুদের পরিচয় নির্ধারণ করা, শিশুমনের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাতে ধর্মীয় মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া মানে কি শিশুর মৌলিক অধিকার খর্ব করা নয়? 

আজকে বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগুরু, সেখানে মন্দির ভাঙা, হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে না?? ভারতে হিন্দু সংখ্যাগুরু, এখানে ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা সন্দেহে পিটিয়ে খুন হচ্ছে না?? এই কথাগুলো এজন্য বললাম, কারন অঞ্চল ভেদে ধর্মীয় সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু আছে! এবং সব ধর্মেই  উগ্র ধর্মীয় বোধ সম্পন্ন কিছু অমানুষ আছে! তারা সুযোগ পেলে ধর্মীয় উগ্রতা ছড়াবেই! এবং তার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগ ও থাকে! 

এবারে আমার প্রশ্নটা হলো, যারা নিজেদের সেকুলার বলে দাবী করে ! তারা যদি  বলে 'নবী দিবস' কেন হবে এবং তা স্কুলে না হওয়ায় কিছু ধর্মান্ধ মুসলমানরা কেন স্কুল বন্ধ করবে, আর অন্যদিকে স্কুলে সরস্বতী পূজোকে প্রথা বলে সাপোর্ট করে যায়, তাহলে কি তাদের সেকুলার হওয়ার বড়াইটা প্রশ্নের মুখে পড়ে না?? তারা যদি বলে, সরস্বতী পূজো যেহেতু অনেকদিন থেকে চলে আসছে, যদি মুসলমানদের নবী দিবস করতেই হয় তবে তারা লিগ্যাল প্রসেস অনুযায়ী আসুক, তাহলে তাদের এই যুক্তিটা হাস্যকর নয়??

আমি এখানে 'নবী দিবস' হওয়াকে জাষ্টিফায়েড করতে বসিনি। আমি বলতে চাইছি  গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সমস্ত সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে 'নবী দিবস' , 'সরস্বতী পূজা' সহ সমস্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করুন। এবং তারপর নবী দিবস কেন হবে সেটা নিয়ে গলা ফাটিয়ে প্রতিবাদ করুন! 

আর বিদ্যার দেবীর আরাধনা যদি করতেই হয়, তাহলে সেই নির্ভীক নারীর করুন,  যিনি নারীকে ভোগের সামগ্রী থেকে আলোকময়ী করে তোলার জন্য শ্লোগান তুলেছিলেন, “হাম ভারত কি নারী হ্যায়, ফুল নাহি চিঙ্গারী হ্যা”! 

তিনি সাবিত্রী ফুলে। মহামানব জ্যোতি রাও ফুলের সহধর্মিণী। সমগ্র এশিয়ার প্রথম শিক্ষিকা। ১৮৪৭ সালে তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মা সগুনা ছিলেন তার অন্যতমা সহযোগী। ১৮৪৮ সালে পুনের বিদেওয়াড়ায় বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৫২ সালের ১৬ই নভেম্বর শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ফুলে দম্পতিকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করা হয়।সবিত্রী ফুলেকে সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৮৮০ সালে জ্যোতি রাও ফুলে হান্টার কমিশনের বিশেষ পরামর্শদাতা হিসবে নিয়োজিত হলে মা সাবিত্রী ফুলে ভারতের সমস্ত মানুষের জন্য শিক্ষার দ্বার খুলে দেবার পরামর্শ দেন। হান্টার কমিশন এই প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং পরবর্তী কালে তা ভারত শাসন আইনে গৃহীত হয়। ১৮৯৭ সালের ১০ই মার্চ প্লেগ রোগীদের মধ্যে কাজ করতে করতে তিনি মারা যান।

তাই ভারতবর্ষের সার্বজনীন শিক্ষার জন্য যদি কোন মহামানবীকে পূজা করতে হয় তবে অবশ্যই এই পূজা গ্রহণের যোগ্য অধিকারী মা সাবিত্রী ফুলে। এবং নবী দিবস আর সরস্বতী পূজা বাদ দিয়ে সব ধর্মের ছেলেমেয়েকে তাঁকে পূজা করতে উৎসাহিত করুন! 

অন্যথায় কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জাষ্টিফিকেশন দিতে এলে আমি তাদের উপর উগ্র হিন্দুত্ব বা উগ্র মুসলমানিত্বের তকমা লাগাবোই ! এবং সেটা করতে তারাই আমায় বাধ্য করবে!! 







ঠিকানা যখন শ্বশুরবাড়ী






মেয়েদের জীবনে দুটো অধ্যায় থাকে। বিয়ের আগে এক অধ্যায়, বিয়ের পর শুরু হয় আরেক অধ্যায়। জন্ম থেকে যে জীবনে অভ্যস্ত মেয়েরা, সেই জীবন ছেড়ে নতুন ভাবে আলাদা জীবনে তাকে অভ্যস্ত হতে হয়। লাভ ম্যারেজ হোক বা এরেঞ্জ, মেয়েদের ই নিজের এতদিনের পরিবার, মা-বাবা, বোন-ভাই, চেনা পরিবেশ ছেড়ে আরেক পরিবারে গিয়ে উঠতে হয়। তারপর শুরু হয় পরিবর্তন আর মানিয়ে গুছিয়ে নেওয়া।

বাবার বাড়িতে থাকার সময় হয়তো বারমুডা আর শার্ট  অথমা পাজামা/কুর্তা/ট্রাউজারে থাকলেও কোনো মাথাব্যাথা ছিলো না, সেখানে স্বামীর বাড়িতে শাড়ী পরে পরিপাটি করে থাকতে হবে , রয়েসয়ে লাজলজ্জার আধহাত ঘোমটা টেনে থাকতে হবে। হাজার হোক বউ বলে কথা! যেটা বাবার বাড়িতে থাকতে পছন্দের খাওয়ার ছিলো না, কোনোদিন খায়ওনি, সেটাই হয়তো স্বামীর বাড়িতে খেতে হয়!! সকালে হয়তো দেরী করে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যেস, সেখানে শ্বশুরবাড়ীতে ঠিক সময়ে আলো নিভিয়ে ঘুমোতে হবে, সকালে সবার আগে উঠতে হবে! রান্না করা হয়তো পছন্দের কাজ নয় বা বাবার বাড়িতে রান্না করতে হয়নি কখনো, শ্বশুরবাড়ীতে সকাল সন্ধ্যে সবার জন্যে রাঁধতে হবে, সবার পছন্দ অপছন্দ জানতে হবে! বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারা কমে যাবে! যখন তখন ঘুরতে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। বাড়ীর বউদের আবার ওসব মানায় নাকি!!

অন্যদিকে স্বামী হিসেবে ছেলেদের শ্বশুরবাড়িতে মানিয়ে নেওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। বরং জামাই এর মন জুগিয়ে চলে পরিবারের সবাই। ছেলেটিকে তার মা-বাবা, পরিবার পরিজন ছেড়ে আসতে হয় না। কেউ ছেলেটিকে বলে না 'তুমি অন্যের সম্পদ, তোমার আসল ঠিকানা তোমার শ্বশুরবাড়ী! '  ছেলেদের জন্য শ্বশুরবাড়ী বেড়ানোর জায়গা!!

বিয়ের পর মেয়েদের নাম পরিবর্তন হয়, মিস থেকে মিসেস। ছেলেদের কিন্তু নাম আগের মতো একই থাকে। হিন্দু মেয়েদের শাখা সিঁদুর পরতে হয়, মুসলিম হলে নাকে নাকফুল, হাতে চুড়ি, গলায় চেইন পরতেই হয়। যাতে মানুষ বুঝতে পারে মেয়েটি বিবাহিত। ছেলেদের ওসব কিছুই পরতে হয় না। মেয়েরা স্বামীর মঙ্গলের জন্য শাখা সিঁদুর পরে, কিন্তু ছেলেদের বউয়ের মঙ্গলের জন্য কিছুই পরতে হয় না।হয়তো স্বামীরা বউয়ের মঙ্গল চায় না!!  কথায় আছে না, 'ভাগ্যবানের বউ মরে আর অভাগার গরু ' !


নিজের নামই শুধু নয়,  সন্তানের নামের সাথেও মেয়েটির নাম যোগ হয় না! যোগ হয় স্বামীর নাম বা স্বামীর পরিবারের নাম। কি সুন্দর নিয়ম! দশ মাস দশ দিন পেটে ধরে যে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখালো মেয়েটি, তার নামের সাথে নিজের নাম যোগ করার কোনো অধিকার থাকে না তার!!

 নিজের বাবার বাড়ীতে আসতে হলেও মেয়েটিকে শ্বশুরবাড়ীর অনুমতি  নিয়ে তবে আসতে হয়! অনুমতি যে সবসময় মিলে তাও নয়, আর যদি বা মিলে কদিন থাকবে সে দিনক্ষণ ও শ্বশুরবাড়ী থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়! বেশীদিন বাবার বাড়ী থাকলে মেয়েটির দিকে ছুটে আসে নানা তীর্ষক মন্তব্য!! অথচ ছেলেটি কিন্তু তার ঘরেই থাকে, মা-বাবা, পরিবার পরিজনের সাথেই থাকে!

শ্বশুরবাড়ীতে সবার প্রতি খেয়াল রাখার দায়িত্বও অনিবার্য ভাবে মেয়েটির ঘাড়েই এসে পড়ে, কারন বউয়ের কাজ ই তো সবাইকে দেখে রাখা, সবার চাহিদার যোগান দেওয়া! যে ছেলেটি বড় হয়ে নিজ পরিবারের দায়িত্ব নিতে নিজে হিমশিম খায়, সেখানে কি করে জীবনের অর্ধেক সময় থেকে এসে অন্য ঘরের একটা মেয়ে সবার দায়িত্ব নিজের মাথায় তুলে নেবে?? সবার মন যুগিয়ে চলবে?? তার কতটুকু কষ্ট হয় সবকিছু মানিয়ে গুছিয়ে নিতে, সেকথা কি একবারও স্বামী কিংবা তার পরিবারের লোকজন বুঝতে চায়?? না, বুঝে না।

হাজার হাজৃর পরিবর্তনের সাথে মেয়েটিকেই প্রতিনিয়ত মানিয়ে চলতে হয়। সামান্যতম কোনো ভুল হলে তাকে কাঠগড়ায় উঠতে হয়।

কেউ বুঝে না, হঠাৎ করে অপরিচিত একটা জায়গায় গিয়ে সবকিছু মানিয়ে গুছিয়ে নেওয়া কতটা কষ্টের! নিজের ভিতর কতটা ঝড় বয়ে চলে প্রতিনিয়ত! কতটা একা মনে হয় মাঝে মাঝে মেয়েটির, সেটা ক্ষেত্রবিশেষে  স্বামীটিও বুঝতে চায় না!!

এই পৃথিবীর প্রত্যেকটা নিয়মই মেয়েদের বিপক্ষে বানানো! পুরুষরা একবার ভেবে দেখুন তো কেমন লাগে জীবনের একটা বয়সে নিজের ঘর ছেড়ে অন্য একটা ঘরে গিয়ে অন্যদের মতো নিজেকে মানিয়ে গুছিয়ে নিতে!! অন্যদের মনমর্জি মতো চলতে, না চললে তীর্ষক মন্তব্য শুনতে?