এই ব্লগটি সন্ধান করুন

রবিবার, ৮ জুলাই, ২০১৮

সেই ছোটবেলা থেকে লক্ষ্য করেছি আমাদের দেশ-সমাজ-ব্যবস্থা কেমন যেন ভালো মন্দের একটা মাপকাঠি তৈরী করে দেয়। আমাদের তথাকথিত শিক্ষা ব্যবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলে "ভালো ছাত্র" "খারাপ ছাত্র" গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। সেইসব "ভালোছাত্র"দের কাছে প্রত্যাশা থাকে তারা মেধাবী হবে, পড়ুয়া হবে, ভালো রেজাল্ট করবে, ভালো একাডেমিক কেরিয়ার হবে, সবশেষে একটা ভালো ক্যারিয়ারে ঢুকবে। 

মা-বাবা, শিক্ষক, সমাজ, রাষ্ট্র -চাইবে "ভালো ছাত্র"রা সুবোধ হবে, সুশীল হবে। রাজনীতির মতো নোংরা বিষয় তাদের জন্যে নয়। ওসব খারাপ ছাত্রদের জন্য। কোনোক্রমে মাধ্যমিক পাশেদের জন্যে। শিক্ষিত, মেধাবী ছাত্রদের জন্য রাজনীতি করার মতো গর্হিত অপরাধ আর কিচ্ছুটি নেই। খারাপ ছাত্ররা কোনো ইস্যু নিয়ে মিছিল মিটিং করলে তাতে ভালো ছাত্ররা যোগদান করবে না। রীতিমত টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে হয় তাদের। তাও মিছিলের অর্ধেক রাস্তা থেকে তারা লুকিয়ে বাড়ী ফিরে যায়। (নিজের চোখে দেখা)। 

রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজকে খুশী রাখতে গেলে ভালো ছাত্রদের বিভিন্ন কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় বসতে হয়। ভালো ভালো চাকরী ধরতে হয়। এবং এই  ক্রনিক সিস্টেমেটিক ডিসঅর্ডারের মধ্যে দিয়ে এই ছেলে মেয়ে গুলো যেহেতু বেড়ে ওঠে, তাই তারাও মনে প্রাণে বিশ্বাস করে বড় হয়, রাজনীতি বড় নোংরা, ওটা ভালোদের জন্যে নয়। খারাপদের জন্য। ফলত আমার বয়েসী কিংবা আমার পরের প্রজন্মের উচ্চশিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের খুব প্রাউডলি বলতে শুনি - রাজনীতিটা বড় নোংরা। ওসবে কোনো ইন্টারেস্ট নেই। ফালতু, বোগাস কনসেপ্ট। তারা কেউ কেউ হয়তো রাজনীতিতে জড়ায়, কিন্তু সেটা অসুস্থ রাজনীতিতে। নেতাদের দালালী করা রাজনীতিতে। উগ্রজাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট রাজনীতিতে। সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিতে। নিজের  মানুষ হিসেবে বেসিক অধিকারগুলো ভুলে থাকার  রাজনীতিতে। মিথ্যের বেসাতি দিয়ে গড়ে তোলা রাজনীতিতে। 

আর এখানেই আসে শিক্ষকের প্রসঙ্গ। একজন শিক্ষক ই হয়তো পারে ছেলে-মেয়েগুলোকে সুস্থ রাজনীতি সম্পর্কে বোঝাতে, জানাতে, উৎসাহিত করতে। কিন্তু এই শিক্ষকরাও তো এই সিস্টেমের প্রোডাক্ট। সুতরাং এইসব উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকরাও রাজনীতি সম্পর্কে উপরিক্ত মতবাদে বিশ্বাসী। 

তাদের সাথে কথায় জড়ালে আমার বারবার মনে হয় পৃথিবীর সবথেকে নিকৃষ্ট অশিক্ষিত হচ্ছে তারাই। তাদের শিক্ষা তাদের বুঝতে দেয় না, একজন মানুষের জীবনের প্রত্যেকটা ছোটোখাটো বিষয়ের সাথে রাজনীতি জড়িত। সকালের চা থেকে শুরু করে রাতের ভাত, অটো ভাড়া থেকে শুরু করে ট্রেন ভাড়া, স্কুলের ফিস থেকে শুরু করে চাকরীর মাইনে, ওষুধের দাম থেকে শুরু করে বাইক কেনার পয়সা, রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া বা না হওয়া থেকে শুরু করে বিদেশে পড়তে যাওয়া - সবকিছু নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর। অথচ এরাই বুক ফুলিয়ে ঘোষনা দেয় রাজনীতি ঘৃণ্য বস্তু। এসবে যেতে নেই। এরা এতটাই মুর্খ, এতটাই বোকা যে, এরা সারাজীবনেও বুঝে উঠতে পারে না, এদের এই রাজনীতি বিমুখতা কিংবা অজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় দূর্নীতিবাজ দালাল নেতা মন্ত্রী আমলা। এদের এই মুর্খতা থেকেই জন্ম নেয় বেশ্যা, রাষ্ট্রহীন নাগরিক, ডিটেনশন ক্যাম্প, বেকার, উগ্রপন্থী, ডাকাত, ক্রিমিন্যাল, অভাব, অনাহারে মৃত্যু। এরা সারাজীবন ভালো ছাত্র হওয়ার লক্ষ্যে শুধু পড়েই যায়, কিন্তু পড়া শেষে যখন বেকার হাঁটতে হাঁটতে  জুতোর ফিতা ছিঁড়ে তখন বুঝে আসলে খেতে না পেয়ে আত্মহত্যা করা পরিবারটির সাথে তার কোনো তফাৎ নেই, হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া ছেলেটির সাথেও তার কোনো তফাৎ নেই। পৃথিবীতে একটাই রাজনীতি - বেঁচে থাকার এবং মরে যাওয়ার। তখন সে বুঝতে পারে জে এন ইউ নিয়ে সে যে কানাইয়ার গলা কাটতে চেয়েছিলো সে আসলে তার কথাই  বলেছিলো... আরো অনেক ছেলে মেয়েরা - যাদের সে দেশদ্রোহী তকমায় ভূষিত করে ফেবু ফাটায়, তারা আসলে তার কথাই বলছে!!   

এরা রাজনীতিকে ঘৃণা করি বলে নিজেরা প্রাইভেট কোম্পানীতে উদয়অস্ত চাকরের মতো কাজ করে, এবং কর্মচারীদের স্ট্রাইক কিংবা কৃষক বিক্ষোভকে "প্রতিবাদ ফ্যাশন" বলে আখ্যা দেয়। দৈনিক আট ঘন্টা কাজের ইতিহাস তারা ভুলে যায়, এবং শ্রমিক দিবসকে নেহাৎ এক ছুটির দিন ভেবে বউ/স্বামী ছেলে মেয়ে নিয়ে চিড়িয়াখানা দেখে ছুটি কাটায়। অথচ নিজে যখন কোম্পানীর কাছে লাথ খেয়ে বাস্তবে ফিরে আসে তখন সেই গিয়ে ট্রেড ইউনিয়নের খাতায় নাম লেখায়। তখন বুঝতে পারে দিনশেষে সে নিজেও একজন শ্রমিক। তার সাথে মহারাষ্ট্রের "কৃষক লং মার্চে" খালি পায়ে হাঁটা লোকটার আসলে কোনো তফাৎ নেই। দুজনেরই দাবী এক। তখন হয়তো বুঝার চেষ্ঠা করে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার প্রত্যেকজন নাগরিকের অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, যাতে রাষ্ট্র ব্যর্থ।  

তারা সারা ফেইসবুক, সারা অফিস, সারা রাস্তা, বাজার হাটে, ক্লাবে শুধু হিন্দু-মুসলমান, লাভজেহাদ, দেশদ্রোহী, কাশ্মীর, উন্নাও করে গলা ফাটায়, নিজের সন্তানকে স্কুলে অন্য ধর্মের ছেলে-মেয়ের টিফিন খেতে মানা করে, সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের গল্পে ভুলে বাজি ফাটায়, নোটবন্দীতে কি কি লাভ হলো তার ফিরিস্তি লিস্টি ধরে শোনায়, অথচ বুঝতে পারে না দিনশেষে একজন গরীব মুসলমান আর একজন গরীব হিন্দুর স্ট্যাটাস আসলে একই। দুজন ই শোষিত। নির্যাতিত। দুজনের ঘরেই বউয়ের অসুখ, সন্তানের বেকারত্ব, মেয়ের বিয়ের বোঝা, টাকার আকাল। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অব্দি তাদের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার প্রত্যেকটা অধিকার দুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে।   

আমি এদের মুর্খ বলি। চুড়ান্ত অশিক্ষিত এরা। কেঁচোর মতো অমেরুদন্ডী প্রাণী এরা। দুঃখ হয় এদের জন্যে। করুণা হয়। বেঁচে থাকতে যারা মৃত, যাদের জ্ঞানচক্ষু ফোঁটেনি এখনো, তাদের করুণা ছাড়া কি ই বা করতে পারি? 

তবে হ্যাঁ, এক্সেপশন অবশ্যই আছে। কিছু ছেলে মেয়েকে দেখি ভালোছাত্রের মিথ পায়ের তলায় দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে, ক্যারিয়ারের তোয়াক্কা না করে সিস্টেম পাল্টানোর রাজনীতিতে ঝাপিয়ে পড়তে। মানুষের জন্যে, মানুষের হয়ে কাজ করতে। কিন্তু সেখানেও বৈষম্য আছে অবশ্যই। সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র তাদের বখে যাওয়া , উচ্ছন্নে যাওয়া, দেশদ্রোহী তকমা দেয়। কারন তাদের অপরাধ তারা এই সমাজে, এই ব্যবস্থায় বিশ্বাস হারিয়েছে। তবু এদের জন্যেই আশা জাগে আজোও। এদের জন্যেই স্বপ্ন দেখি - 

"আমাদের ক্ষেতগুলি পরের জিম্মা থেকে নিয়ে আসা হবে
আমাদের ইস্কুল কলেজ কারখানা
পরের জিম্মায় আর রাখতে দেব না।"

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন