এই ব্লগটি সন্ধান করুন

বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

ধর্ম নয়, ভালোবাসাই বাঁচিয়ে রাখে সভ্যতাকে
_________________________________________









ভারতবর্ষের মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক, বর্ণবিদ্বেষী, জাতিবিদ্বেষী দেশে জন্মালে ধর্ম, জাত, বর্ণ, গোত্র দেখে তবেই ভালোবাসতে হয়। প্রেম করতে হয়। বিয়ে করতে হয়। এর অন্যথা হলে আমাদের সমাজের তথাকথিত ধর্মের পতাকাধারীরা তা মেনে নেন না, এটা  ভুলে যাওয়া অঙ্কিতের সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিলো। 

যতই আমাদের সংবিধানে লেখা থাক প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর যে কোনো ছেলে বা মেয়ে যে কোনো ধর্মের, জাতের, গোত্রের কাউকে বিয়ে করতে পারে ; প্রত্যেকটি মানুষের  নিজের পছন্দের মানুষ নির্বাচনের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে এবং তাতে ধর্মের, রাষ্ট্রের, সমাজের মাথা গলানোর কোনো অধিকার নেই। যতই স্পেশাল ম্যারেজ এক্টের ব্যবস্থা থাকুক দেশের আইনে, যতই সুপ্রীম কোর্ট রায় দিক, ভিন্ন ধর্মে বিয়ে করলেও কোনো মেয়েকে যে ধর্ম বদলাতে হবেই এর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, সে তার নিজের ধর্ম চর্চা করতে পারে  - আমাদের দেশের ধর্মান্ধ নারী-পুরুষ তা মানতে বা বুঝতে চান না। 

মুসলমান হয়ে হিন্দু ছেলেকে ভালোবাসবে!! হিন্দু হয়ে মুসলমান ছেলের সাথে প্রেম করবে!! ধর্ম নষ্ট করবে আমাদের? পরিবারের সম্মান নষ্ট করবে? লাভ জেহাদ করবে? মারো শালাদের, খুন করে ফেলো পিটিয়ে। জ্যান্ত জ্বালিয়ে বার্তা দেও সমাজে, ভিন ধর্মীকে ভালোবাসলে এই অবস্থা হবে।  মিথ্যে ঘটনা, ফটোশফড ছবি দিয়ে প্রচার চালাও মানুষে মানুষে ভালোবাসা, প্রেম আসলে লাভজেহাদ। 

এবং বাকী সব বিষয়ে এরা একে অন্যের শত্রু হলেও এই একটা ক্ষেত্রে হিন্দু - মুসলমান সম্প্রদায়ের খুব মিল। হিন্দু সমাজও মুসলমান কারুর সাথে প্রেম, বিয়ে মেনে নেয় না, মুসলমান সমাজ ও হিন্দু কারুর সাথে প্রেম, বিয়ে মেনে নেয় না। যদি দৈবাৎ কোনো ছেলে-মেয়ে তাদের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বিয়ে করেও নেয়, সেক্ষেত্রে হয় ছেলে-মেয়েকে পিটিয়ে খুন করা হয়, রাস্তাঘাটে হিউমিলিয়েট করা হয়, সমাজে একঘরে করে রাখা হয়; নতুবা ছেলে বা মেয়েটিকে কোনো একটি বিশেষ ধর্ম বেছে নিতে হয়!! আর এইক্ষেত্রে প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্রলোক  থেকে নিম্নশ্রেণীর অশিক্ষিত - সব সমান। 

অতীত থেকে আজ অব্দি, শুধু ধর্মের কারনে যত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আর কোনো কারনে বোধহয় ততো হত্যা হয়নি। ধর্ম দেশভাগ করিয়েছে, মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ, মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির করিয়েছে, জাতি দাঙ্গা করিয়েছে, মানুষ খুন করিয়েছে,  যুদ্ধ করিয়েছে, হাজার নারীপুরুষকে ভেলায় চাপিয়ে মাঝ সমুদ্রে অজানার উদ্দেশ্যে ভাসিয়েছে। কিন্তু ভালোবাসায় মানুষের  হাত স্পর্শ করেনি কখনো।

মানুষ কোনোদিন বুঝতে পারেনি, বুঝতে চায়নি ভালোবাসার মতো অপূর্ব সুন্দর জায়গা আর কোথাও নেই, কোনোদিন ছিলো না। ধর্ম যতবার মানুষকে রক্তাক্ত করেছে, বলি দিয়েছে, জবেহ করেছে, ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লড়িয়েছে, যুদ্ধ করিয়েছে, ধর্ষণ করিয়েছে, ততবার ভালোবাসা এসে তার স্পর্শ রেখেছে বলেই এখনো সভ্যতা টিকে আছে। ডাইনোসরের মতো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি এত রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পরও। 

পৃথিবীর যত ভালো কিছু আছে, যত শিল্প আছে, যত প্রেমের দর্শন আছে , যত সৌন্দর্য্য  আছে তাতে কিন্তু ধর্ম অথবা তার এজেন্ট মোল্লা, পুরোহিত, পাদ্রী কারুর হাত নেই , ভালোবাসার হাত আছে। তাই যুদ্ধে শত শত মানুষ খুন করা মোগল সম্রাটকেও প্রেমের কাছে মাথা নত করে প্রেমের সৌধ নির্মান করতে হয়েছে। ভালোবাসা যদি না থাকতো ধর্মের কারাগারে  আটক থাকতে থাকতে মানুষ উন্মাদ হয়ে যেত। একে অন্যের মাংস ছিড়ে খেত! 

ধর্ম ত্রিশুল আর চাপাতি ধরা ছাড়া আর কিচ্ছু শেখায়নি  এটা মানুষ বুঝতে পারে না। আর পারেনা বলেই ভালোবাসাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে ধর্মের জন্যে। লালন সাঁই বলেছিলেন, 

“এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে…”

এই উপমহাদেশের মানুষ সত্যি যদি এই কথাটা বুঝতো, তাহলে হয়তো আর কোনো অঙ্কিতকে ভালোবাসার জন্যে খুন হতে হত না, আর কোনো আফরাজুলকে লাভ জেহাদের নামে খুন হতে হত না। আর কোনো ছেলে বা মেয়েকে ধর্ম, সমাজের ভয়ে নিজের ভালোবাসাকে ছেড়ে যেতে হতো না!! 







আচ্ছা, আজ নাকি চুমু দিবস ছিলো। তো চুমু বলতে আমার টিনএজ বেলার এক ঘটনার কথা মনে পড়লো। যেভাবে চুমুর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিলো আরকি সেইটার কথা।

তখন আমি ক্লাস টেন। মাধ্যমিক দেব। তো মাধ্যমিকের আগে বাপী টেস্ট পেপার এনে দিলেন। টেস্ট পেপারে বাংলা, অসমীয়া, হিন্দি, বড়ো সব ভাষায় লেখা থাকতো। সব পেপারগুলোও এই একটা বইয়ে থাকতো। এবং তিন চার বছরের প্রশ্নপত্র ও তাতে থাকতো সল্ভ করা।  তখনো আমার অসমীয়া ভাষার সাথে পরিচয় হয় নাই। টেস্টপেপার নিয়ে এক দুপুরে বসেছি পড়তে, উল্টে পাল্টে দেখছি। অসমীয়া প্রশ্নটা পড়ার চেষ্ঠা করছিলাম। অসমীয়া অনেকটা বাংলার মতো বলে একটু চেষ্টা করলে ভাঙা ভাঙা পড়া যায়। দেখি এক জায়গায় লেখা - 

"চুমু টিকা লিখ" - 

ততদিনে টিভির দৌলতে আর সুনীল গাঙ্গুলীর পূর্ব-পশ্চিমের দৌলতে চুমু শব্দটার সাথে পরিচয় ঘটে গেছে। মানে এটা যে বেশ একটা ইয়ে ইয়ে ব্যাপার সেটা একটু আধটু বুঝে গেছি আরকি। আমি তো ভেবে পাচ্ছি না টেস্টের বইয়ে চুমু লেখা ক্যান!! ওদিকে ঘরের কাউকে লজ্জায় দেখাতেও পারছি না!! শেষে আমি মহা পন্ডিত ভাবলাম আর কি, নাহ এই অসভ্য শব্দটাকে বইয়ের পাতায় রাখবো না। সব 'চুমু' কলম দিয়ে কেটে কেটে একদম কালো করে রেখে দিলাম!  পরেরদিন স্যারের বাড়ী গিয়ে বান্ধবীদের সাথে এ নিয়ে বিষদে আলোচনা করে ঠিক করলাম এই শব্দটা কারুর বইয়েই থাকা উচিত না। সবাই কেটে কালো করলো, কয়েকজনকে আমিও সাহায্য করলুম কাটতে, নৈতিক দায়িত্ব ভেবে। 

যাইহোক তিন/চার বছর আগে যে কলেজে চাকরী করতাম সেখানে অসমীয়া একটা সাবজেক্ট থাকায়, আর  বড়দি, মেজদি যেহেতু অসমীয়া জানে, তাদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম - 

"চুমু টিকা লিখ"  মানে  "সংক্ষিপ্ত টিকা লিখ"....  

বৃহস্পতিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

অথঃ নারীর 'ইমাম' হওয়া
________________________

সম্প্রতি খবরে দেখলাম কেরলের মালাপ্পুরমে "কোরান সুন্নত সোসাইটি"র সাধারণ সম্পাদক জামিদা টিচার নামে একজন মহিলা জুম্মাবারে পুরুষ-মহিলা মিলিয়ে প্রায় আশি জনের নামাজের ইমামতি করেছেন। এবং স্বভাবতই এ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। একশ্রেনীর ধর্মবিশ্বাসীদের ধারনা জামিদা ধর্মকে আঘাত করেছেন, ধর্মকে অশুচি করেছেন। এবং স্বভাবতই তাকে নিয়ে কটুক্তি, ধমকি, প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া চলছে..!! কিছু মিডিয়া রিপোর্ট এবং মানুষজন বলছেন জামিদা'র নামাজ পড়ানোর প্রক্রিয়া ভুল এবং এতে গৈরিক রাজনীতির প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে হাত আছে। 

এবারে হলো কি খবরটা শুনে আমি খুব উৎসাহ নিয়ে  একটু খুঁজাখুঁজি, পড়াশুনা শুরু করলাম। জানতে পারলাম জামিদাই প্রথম নন। এর আগে ২০০৮ সালে আমেরিকায় আমিনা ওয়াদুদ নামের একজন নারী জামাতে নামাজ পড়ানোর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ৪০ জনেরও কম লোকের একটি জামায়াতে নামাজ পড়ান। তারপর ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যে রাহেল রাজা নামের একজন  কানাডিয়ান লেখিকাকে  জুম্মার নামাজের ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রায়  ১০০ লোকের জামাতে ইমামতি করেন। এবং যথারীতি এ নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি!! 

ফিদা হুসেন দাদার থেকে জানতে পারলাম হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর সময়কালের উম্মে ওয়াকারা (রা.) বলে একজন নারীর নাম, যার সম্পূর্ণ কোরান শরীফ মুখস্থ এবং ঠোঁটস্ত ছিলো। যিনি পুরুষ-নারীর যৌথ নামাজেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ফিদা দাদা আমায় উইকি'র লিঙ্কও দেন। আমি উইকি খুলে দেখি ঠিকই,  লেখা আছে, "Because of the strength of the evidence, the example of Umm Waraqah serves as the basis for the opinion among some Islamic jurists that women are permitted to not only lead other women in prayer, but that they may also lead mixed-sex congregations . This is for instance a minority opinion in the Hanbali (a Islamic Law School) tradition.

উইকি ছাড়া #মার্টিন_লিং এর বইয়েও এই বিষয়ে রেফারেন্স আছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাই,  নবী পরবর্তী কিছু কিছু  হাদিস নারীকে শুধু নারীদের নামাজের ইমামতি করার সুযোগ দিলেও পুরুষদের নামাজ পড়ানোর কোনো অধিকার দেয় নি!!  

চৌদ্দশো বছর আগের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে পেলাম -

ক) হজরত আয়শা, উম্মে সালমা এবং উম্মে ওয়ারাকা (রা.) নারীদের নিয়ে জামাত করতেন এবং নিজেরা ইমাম হতেন। 

খ) উম্মে ওয়াকারার জামাতের জন্য হজরত মোহাম্মদ (সা.) একজন মুয়াজ্জিনও নিযুক্ত করেছিলেন।

গ) মধ্যযুগীয় আরবে খাদিজা বিধবা হয়েও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন।  

ঘ) উম্মে সালমা নামের একজন মুসলিম নারী ছিলেন সেই সময়ের যিনি হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছেন উহুদের যুদ্ধের সময়।

ঙ) হজরত আয়েশাও পরবর্তীতেও যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন।  

চ)  ইসলামিক আরেকটা ল্ স্কুল 'হানাফি'র কিছু সংখ্যক বিশেষজ্ঞ নারীর ইমামতিকে অপছন্দনীয় বলার প্রতিবাদ করেছেন এবং বৈধ বলেছেন। 

এবারে কোরান বা ইসলামে  নারীর অবস্থান, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি কেমন সেটা নিয়ে পরে কখনো আলোচনা-সমালোচনা করা যেতেই পারে। কিন্তু  এক্ষেত্রে আমি কোরানের আলোয় সমস্ত বিষয়টা বিচার করার চেষ্ঠা করবো, কারন যেহেতু কিছু মুসলিম কট্টরপন্থীরা বলছেন ইসলামে নারীর ইমামতি সম্পূর্ণ হারাম! 

আমরা জানি, মোহাম্মদের বর্নিত কোরান হলো আল্লাহর বানী। ইসলাম ধর্মে একটাই ধর্মগ্রন্থ এবং মুসলিম হিসেবে প্রত্যেককে সেই ধর্মগ্রন্থ মেনে চলতেই হয়। সমস্ত মুসলিম আইন-কানুনও তৈরী হয় তার থেকে। নারীর নেতৃত্ব এবং ইমাম হওয়াকে  যারা হারাম ঘোষণা করেছেন এবং হাদীস কোরান এইসবের ভিত্তিতে অবৈধ ঘোষনা করছেন,  ঠিক একইভাবে তাকে বৈধ  বলার ব্যাপারেও কুরআন, এবং ঐতিহাসিকভিত্তিক দলীল রয়েছে।

প্রথমত দেখি কোরান শরীফ এ ব্যাপারে কি বলেছে? 

কোরান শরীফে স্পষ্ট লেখা আছে, ইসলাম ধর্ম নারী-পুরুষের বৈষম্য সমর্থন করে না। কোরান বলছে, "হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে, তারপর তোমদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে করে তোমরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে বেশি আল্লাহভিরু-মোত্তাকি। (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩)। 

কোরান বলছে, "কোনো পুরুষ বা নারী ঈমানের সঙ্গে সৎকাজ করলে অবশ্যই তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তাদের প্রতি বিন্দু পরিমাণও অবিচার করা হবে না।’ (সূরা নিসা, ৪:১২৪; সূরা নাহল, ১৬:৯৭)। 

কোরান বলছে, "তারা অর্থাৎ নারীরা তোমাদের পোশাক আর তোমরা তাদের পোশাক।" (সূরা বাকারা, ২:১৮৭)। 

কোরান বলছে, "নারীদের জন্য ঠিক তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে যেমন পুরুষদের অধিকার আছে তাদের ওপর। তবে দায়িত্ব-কর্তব্যের দিক থেকে নারীর ওপর পুরুষের একটি মর্যাদা রয়েছে। আর আল্লাহ সর্বময় শক্তিমান মহাপ্রজ্ঞাময়।" (সূরা বাকারা, ২:২২৮)।

অর্থাৎ বুঝানো হচ্ছে আল্লাহ মানবজাতি তথা নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেছেন। এবং আল্লাহ'র হুকুম মেনে চললে একজন পুরুষ যেমন তার প্রতিদান পাবেন, একইরকমভাবে একজন নারীও পাবেন। আবার অবাধ্য হলে একই রকম শাস্তিও দুজনেই পাবেন। একজন পুরুষকে যেরকম কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব প্রদান করা হয়েছে, অনুরুপ ভাবে নারীকেও সুযোগ প্রধান করা হয়েছে। সমস্ত কোরান শরীফের  কোথাও লেখা নেই নারী ইমাম হতে না পারার কথা। ইসলামে অন্যান্য অনেক বিষয়ে নারীর প্রতি বৈষম্য থাকলেও ,  ধর্মীয় আচার-বিচারে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। যেকোনো সাধারন মুসলিমের ও কোরান পড়লে একই ধারনা হবে।

এবারে প্রশ্ন জাগলো,  যেখানে  কোরান বলছে ধর্মীয় জীবনে নারী-পুরুষ সমান, সেখানে নামাজের ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে নারী কেন ইমামের মতো  দায়িত্ব পালন করতে পারবে না?? বরং এরকম হলে তো দেশ বিদেশের মুসলিম সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমবে!! সর্বোপরি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে! 

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে হজরত মোহাম্মদের সময়কালে এবং তার পরবর্তী সময়কালে। ইমাম বুখারীসহ অন্যান্য হাদিস সংগ্রহকারীরা কেউই হজরত মোহাম্মদে' (সাঃ) এর মুখ থেকে শুনে হাদিস লিখেননি। হজরত  মোহাম্মদের মৃত্যুর  প্রায় আড়াইশো/তিনশো বছর পর যখন সেই সময়ের কেউ জীবিতই ছিলেন না, কয়েক প্রজন্ম ধরে লোক মুখে গল্পের মত চালু কাহিনীগুলোকেই হাদিস হিসেবে লিখেছেন। কোরানের অনেক আয়াত, সুরার অন্য মানে করে এইসব হাদিসে উপস্থাপন করা হয়েছে। এবং ধর্মীয় কাজে নারী-পুরুষ বিভেদও সেইসময়কার কিছু মুসলিম পন্ডিতদের সৃষ্টি। অনেকক্ষেত্রে নতুন সংযোজনও করা হয়েছে। মরুভুমির গরম  বালির চেয়েও সাংঘাতিক এই হাদিসগুলো। এবং  ইমাম বুখারী সহ অন্যান্য হাদিস লিখিয়েরা  এই হাদিসগুলোর সত্যতা যাচাই করার কোন সূত্রই রেখে যাননি। 

এবারে হাদীসের সমালোচনা করলেই ইসলমাবিদেরা যুক্তি হাজির করেন যে হাদীস ইসলামের আবশ্যকীয় গ্রন্থ নয়। কোরানই একমাত্র অফিশিয়াল গ্রন্থ। কাজেই কিছু হাদীসে ভুল থাকলেও থাকতে পারে। তাহলে সেক্ষেত্রেও তো একটাই কথা থাকে, কোরান শরীফের কোথাও তো নারী ইমাম হতে পারবে না, এরকম কিছুই লেখা নেই!! 

এতসব পড়ে আমার মনে হলো, হজরত মোহাম্মদের চরিত্রে যদি সত্যিই কেউ কালি লাগিয়ে থাকে তবে তারা তো নাস্তিক বা বিধর্মীরা নয়, সবচেয়ে বড় কালিমালিপ্ত করার কাজটি করে গেছে এসব হাদীস লিখিয়েরা। কিন্তু এসব হাদিস লিখিয়েদের বিরুদ্ধে তো কোনো কট্টর ইসলামপন্থীদের কখনো দেখলাম না 'কল্লা কাটা' অথবা 'চাপাতি চালানো'র ফতোয়া দিতে ?? বরং হাদিসগুলোকে ইতিহাস এবং কোরান শরীফের ভিত্তিতে কেউ রিসার্চ করতে গেলে তারা হয়ে যায় ইসলামের শত্রু!! এইমূহূর্তে এই লেখা পড়ে অনেকের হয়তো আমার সম্পর্কেও এটা মনে হবে! 

যাইহোক, ইসলামে কোরান শরীফ একটি সম্পূর্ণ পূর্ণ কিতাব। কোরানই একমাত্র সত্য। একথা কোরান শরীফে অনেকবার লেখা আছে। যেমন -  

সূরা নামল ২৭ আয়াত ৭৫ : "আকাশে ও পৃথিবীতে এমন কোন গোপন ভেদ নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে না আছে।" 

সুরা কাহফ ১৮:২৭ : "আপনার প্রতি আপনার পালনকর্তার যে, কিতাব নাজিল করা হয়েছে, তা পাঠ করুন। তাঁর বাক্য পরিবর্তন করার কেউ নাই। তাঁকে ব্যতীত আপনি কখনই কোন আশ্রয় স্থল পাবেন না।"

সূরা আশ-শুরা ৪২:৭ আয়াতঃ  "এমনি ভাবে আমি আপনার প্রতি আরবী ভাষায় কোরান নাযিল করেছি, যাতে আপনি মক্কা ও তার আশ-পাশের লোকদের সতর্ক করেন এবং সতর্ক করেন সমাবেশের দিন সম্পর্কে, যাতে কোন সন্দেহ নেই। একদল জান্নাতে এবং একদল জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" 

সূরা জাসিয়া ৪৫:৬ আয়াতঃ "এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি আপনার কাছে আবৃত্তি করি যথাযথরূপে। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা কোন কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে।"

সূরা জাসিয়া ৪৫:১৮ আয়াতঃ "এরপর আমি আপনাকে রেখেছি ধর্মের এক বিশেষ শরীয়তের উপর। অতএব, আপনি (কোরান) এর অনুসরণ করুন এবং অজ্ঞানদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না।"

সূরা বাকারা ২:৭৯ আয়াতঃ "অতএব তাদের জন্যে আফসোস! যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ-যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে। অতএব তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাতের লেখার জন্য এবং তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের উপার্জনের জন্যে।"

অনেক আলেম ওলামারা বলেন, কোরানে অনেক কিছু নেই তাই হাদিস পড়তে হয়!! অথবা হাদিস ছাড়া কোরানে শরীফের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা সম্ভব নয়!  উপরের প্রত্যেকটা আয়াতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কোরান ছাড়া কোন পথ নেই, তাকেই আকড়ে ধরতে বলা হয়েছে বারবার। আগেই বলেছি  হাদিস লেখা  হয়েছে হজরত মোহাম্মাদ (সাঃ) মারা যাওয়ার প্রায় আড়াইশো থেকে তিনশো বছর পর। হাদিস ছাড়া কোরান যদি অসম্পূর্ণ হতো, তাহলে হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) জীবিত সময়ে হাদিস এলো না কেন?? 

অনেকে সূরা নিসার-১১৩ নং আয়াত " আল্লাহ দুটো জিনিস নাজিল করেছেন। কিতাব ও হিকমাহ।" -  এটা বলে বলেন, কিতাব মানে কোরান এবং হিকমাহ মানে হাদিস। তো আরবি থেকে শুরু করে অন্যান্য  অভিধান-টভিধান খুঁজে আমি এই শব্দগুলোর মানে পেয়েছি - 

হাদিস= বাণী,উক্তি,ভাষণ 

ছুন্নাহ= বিধান,গঠনতন্ত্র 

হিকমাহ=জ্ঞান,বিজ্ঞান,ক্ষমতা,বুদ্ধি, কর্তৃত্ব,বিচক্ষণতা

শরিয়ত অনুযায়ী হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর  মূখ থেকে  নিঃসৃত কথাগুলিকেই হাদিছ বলে। আর আমরা জানি হজরত মোহাম্মদের মুখ নিঃসৃত বাণী কোরানশরীফ। সুতরাং কোরানের অপর নামই হাদিস। 
তাহলে এতসব প্রমাণ থাকতে একজন প্রকৃত ইসলাম ধর্মাবলম্বী হিসেবে আমরা কেন হজরত মোহাম্মদের মৃত্যুর আড়াইশো থেকে তিনশো বছর পর বোখারীদের লিখিত  কিতাবকে হাদিস নাম দিয়ে দু-নম্বর ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করবো?? 

এবারে দেখা যাক বিভিন্ন আলেম ওলামার কথায় এবং হাদিসে কোন যুক্তিতে নারীর ইমামতিতে বাধা দেওয়া হয়েছে? -

প্রথমত,  "পুরুষদের কাছে ইসলাম প্রচার নারীদের জন্য অনুমোদিত নয়। যখন কোনো নারী পুরুষদের সামনে দাঁড়িয়ে ইমামতি করবে তখন তার এবং পুরুষদের মাঝে পর্দার বিধান লংঘন হবে।"

আমার প্রশ্ন, এটা কোরান শরীফের কোথায়, কোন আয়াত বা সুরায় লেখা আছে? একজন  নারী সম্পূর্ণ পর্দা করেও নামাজ পড়াতে পারে! সেক্ষেত্রে পর্দা কিভাবে বাধার সৃষ্টি করছে?

দ্বিতীয়ত, "নারী-পুরুষ উভয়ই সমান হলেও পুরুষের দায়িত্ব বেশি। সন্তান ধারণের জন্য প্রাকৃতিকভাবেই নারীকে পুরুষের চেয়ে কোমল ও দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সম্পদ উপার্জন, সন্তান পরিচালনা এবং নেতৃত্বের জন্য পুরুষকে দৈহিকভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে। আর যেহেতু নারীকে তুলনামূলক কোমল গঠনে সৃষ্টি করা হয়েছে তাই নারীর সার্বিক দায়িত্ব পুরুষদের ওপর দেয়া হয়েছে। এ কারণে নারীর চেয়ে পুরুষের মর্যাদা অর্থাৎ দায়িত্ব এক স্তর ওপরে।"

এবারে আমার মতে :  মর্যাদা বেশীর সাথে নামাজ পড়ানোর কোনো সম্পর্ক নেই। আর কোরান শরীফে স্পষ্ট লেখা আছে ধর্মীয় ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের কোনো পার্থক্য নেই। এখানে কোরান শরীফের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।  একজন নারী সব দায়িত্ব সামলে যদি চাকরী বা কাজে যেতে পারে, অথবা হজরতের সময়ে তাঁর পাশে থেকে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে  পেরেছে তবে সে নামাজও পড়াতে পারবে। 

তৃতীয়ত :  "নামাজে বেশ কিছু শারীরিক পরিশ্রম রয়েছে। যেমন-দাঁড়ানো, রুকু, সেজদা ইত্যাদি। ইমামকে শুক্রবারের খুতবা দিতে হয় মুসল্লিদের দিকে ফিরে, নামাজ পড়াতে হয় মুসল্লিদের দিকে পেছন দিয়ে। যদি একজন নারী নামাজে নেতৃত্ব দেন তবে জামায়াতের পিছনে যে সকল পুরুষ নামাজ পড়বে তারা এবং ইমাম উভয়ের পক্ষে এটি বেশ বিব্রতকর হবে। এবং পুরুষেরা কোন মহিলাকে এই দু স্থানে দেখলে মনে আল্লাহর ভালোবাসা না হোক কিছু একটা টেম্পটেশান হতে পারে।"  

এবারে আমার মতে : একথা কোরান শরীফে কোথাও লেখা নেই। এটা এনাদের মনগড়া ব্যাখ্যা। মানে এনারা ভেবে নিয়েছেন। আর ভাবার কারন এখানে খোলসা করে না বললেও আপনার বুঝে নেবেন আশা করি। 

চতুর্থত :  মেয়েরা কিছুদিন নামাজ পড়েনা, পিরিয়ডের কারণে। এবং গর্ভবতী হলেও সে নামাজ পড়াতে পারবে না। 

এবারে আমার মত:  পিরিয়ডের সময়ে নামাজ রোজা রাখার নিয়ম বা বিধান সম্পর্কে কোরান শরীফে স্পষ্ট লেখা আছে। আর একটা মেয়ের পিরিয়ড ম্যাক্সিমাম সাতদিন থাকে। এই সাতদিন মেয়ে ইমামকে ছুটি দিয়ে  অন্য কোনো ইমাম নামাজ পড়ালেই হয়!! নারীদের মত পুরুষেরাও তো বিভিন্ন কারণে অসুস্থ হয়।তার জন্য তারা নামাজ পড়ানো থেকে বঞ্চিত হয় কি? এখানে উল্লেখ্য যে, হজরত মোহাম্মদ(সাঃ) এর সময় যখন তিনি অসুস্থ হতেন তখন তিনি জামাতের সময় ইমামতি করতেন না।বরং তখন আবূ বকর সিদ্দিক (রাঃ) সর্বদা ইমামতি করতেন।নবম হিজরীতে মুসলিমগণ যে হজ্ সম্পাদন করেছিলেন তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আবূ বকর সিদ্দিক (রাঃ)।তার দ্বারা কিন্তু হজরত মোহাম্মদ(সাঃ) এর নেতৃত্বকে অথবা নামাজ পড়ানোর অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় নি। তাই নারীর প্রকৃতিগত কারণ দেখিয়ে নারী ইমাম হওয়ার  প্রতি যে অবৈধতা দেওয়া হয়েছে তা নিতান্ত অযৌক্তিক।

কোরান শরীফে নারী-পুরুষ উভয়কে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, “আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে।" কোথাও নারীর ইমাম হওয়ার উপর কোনো বাধা-নিষেধ অস্পষ্টভাবেও উল্লেখ নেই। নারীর উপর ইসলাম ধর্ম অন্যান্য অনেক বিষয়ে বাধা-নিষেধ হয়তো আরোপ করেছে, কিন্তু ধর্মপালন/ ধর্মচারনের  ক্ষেত্রে নারী-পুরুষকে সমান মর্যাদা এবং অধিকার দেওয়া হয়েছে। নারীর ইমামতি অথবা ধর্মচারনের উপর যেটুকু বাধা আসছে, সেটা কোরানের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে কিছু স্বঘোষিত আলেম ওলেমাদের রচিত হাদিসের কারনে। সাধারন মুসলিমদের এভাবেই যুগ যুগ ধরে আল্লাহ নবীর নামে বোকা বানানো হচ্ছে। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে আপনার কোরান শরীফের উপর বিশ্বাস রাখা উচিত। এবং আজকাল বাংলা, হিন্দি সহ বিভিন্ন ভাষায় কোরান শরীফ পাওয়া যায়। পড়ুন। বুঝুন। তারপর বলুন। 

এবারে একজন সাধারন যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে বলি। বর্তমান সময়ে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে। পড়াশুনো, খেলাধুলা, চাকরি নোকরি, সহ সব ক্ষেত্রে। তাহলে ধর্মীয়ক্ষেত্রে নারী সুযোগ পাবে না কেন?? কোনো নারীর শিক্ষক , পুলিশ, উকিল, জজ্ হওয়ার ইচ্ছে থাকলে, সে চাইলে তা  হতে পারে। কিন্তু মাদ্রাসা পড়ুয়া অথবা এমনিই কোনো ধার্মিক নারী যদি ধর্ম সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান আহরন করে ইমাম হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাহলে তার সেই স্বপ্নপূরণের অধিকার কোন যুক্তিতে খারিজ করা হচ্ছে?? সে ইমাম হতে পারবে না কেন?? 

আমি জানি না বা জানলেও পুরোপুরি নিশ্চিত নই জামিদার নামাজ পড়ানোর পিছনে কোনো রাজনীতি, গেরুয়াকরন আছে কি না! (কারন কিছু রিপোর্টে পড়লাম অনেকে বলছেন এতে গেরুয়া রাজনীতির হাত আছে।) । থাকলেও আমি বিষয়টাকে এভাবে দেখতে চাইছি না। যদি গেরুয়া রাজনীতি অন্য কোনো উদ্দেশ্য থেকেও এসব করিয়ে থাকে, তবে বলবো, তারা খারাপ করতে গিয়ে ভালো করে ফেলেছে। এবং বিষয়টাকে আমি দেখছি লিঙ্গবৈষম্যের প্রাচীরে একটা সজোরে আঘাত হিসেবে। বিষয়টা এখনো স্বপ্নের মতো আমার কাছে। সংস্কারের গেরোয় আটকে রাখা নারীরা স্টিরিওটাইপ ভেঙে এভাবে বেরিয়ে আসবেন - সেই স্বপ্নই তো খালি চোখে দেখি!!  

সতীদাহ প্রথাও হিন্দু ধর্মের কোথাও লেখা ছিলো না! বরং তৎকালীন সমাজের কিছু ব্রাহ্মন এই প্রথা বানিয়েছিলেন। সময়ের দাবীতে সে প্রথাও এখন বিলুপ্ত।  একশো বছর আগে কোনো ধর্মই মেয়েদের পড়াশুনো, চাকরী নোকরী, খেলাধুলা করার সুযোগ দিত না। সময়ের দাবী মেনে আজকে মেয়েরা সবই করে। ইসলাম ধর্মে টেলিভিশন, গানবাজনা ইত্যাদির চল ছিলো না,  ফোটো তোলা হারাম ছিলো, সময়ের দাবীতে সেটাও বদলে গেছে! হিন্দুধর্মে অনেক মেয়েরা পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করছে...( অধীশাদি ওদের সরস্বতী পুজোর রেফারেন্স), মন্দিরে প্রবেশাধিকার চাইছে। তাহলে ইসলাম ধর্মেও নারীর ইমাম  হওয়াকে সময়ের দাবী ভেবে মেনে নিতে আপত্তি কোথায়?? 

ইতিহাস থেকে বর্তমান যুগ অব্দি তুলনা করলে দেখা যায়, প্রত্যেকটা ধর্ম সমাজ বিবর্তনের হাত ধরে বিকশিত হয়েছে। সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই মানুষ ধর্মীয় অনেক প্রথা রেক্টিফাই করে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে, কারন ওভাবে না করলে হয়তো সময়ের হাতে ধর্মীয় ব্যবস্থা ধ্বসে পড়তো! 

বৃহস্পতিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৭

এক পুরুষবিদ্বেষীর জবানবন্দি
________________________



প্রথমেই ডিসক্লেইমার দিয়ে রাখা ভালো, যা দিনকাল চলছে। কে কখন কোথা থেকে কোন তকমা লাগিয়ে দেবে, জানা তো নেই !! পাকিস্থান যাওয়ার হুমকি অনেকবার পেয়ে গেছি, দেশদ্রোহী তো বাই ডিফল্ট হয়েই আছি, 'খ' বর্গীয়, 'ম' বর্গীয় তকমাগুলোও পেয়ে গেছি, ইদানিং শুনছি  পুরুষবিদ্বেষী, তাই ডিসক্লেমার দিয়ে রাখা ভালো। 

ডিসক্লেইমার : ক) আমি একজন মানুষ। আপনাদের ভাষায় 'মেয়েমানুষ'। জন্মেছিও প্রত্যেকটা মানুষ যে প্রসেসের মধ্যে দিয়ে জন্মায়, সেভাবে। মেয়ে হয়েই জন্মাবো, করিমগঞ্জেই জন্মাবো, মুসলিম ঘরেই জন্মাবো, এরকম কোনো প্ল্যান করে আসিনি। বিষয়টা  আমার হাতেও ছিলো না। তাই নারী, পুরুষ, ধর্ম,  এগুলোকে  ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট হিসেবেই বয়ে চলি, এরজন্যে আলাদা করে কোনো গর্ব বা বিদ্বেষ অনুভব হয় না। 

খ) প্রত্যেকটা পুরুষের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারবো না, কারন এই পুরুষেরই কেউ আমার বাবা, কেউ প্রেমিক, কেউ বন্ধু। কিন্তু তা বলে তাদেরকে মাথায় তুলে নাচার, বা পূজো করার মানসিকতা আমার নেই। বাবা'কে ভালোবাসি, আমার আমি হয়ে উঠার মধ্যে তাঁর অবদান অনেক। তা বলে,আমার বাবাও যে সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারনা মুক্ত একজন মানুষ, একথা একশ ভাগ জোর দিয়ে বলতে পারবো না। পরিবারের প্রধান কর্তা শুধু বাবা একথা মানতেও আমার আপত্তি আছে। কারন আমি আমার মা'কেও সমানভাবে পরিবারের কর্ত্রী ভাবি। 

গ) অর্থনৈতিক ভাবে আমি বাবা, প্রেমিক বা ভাই কারো উপর নির্ভরশীল নই। কখনোই ছিলাম না। তাদের টাকায় নিজের নেট রিচার্জ টাও করছি না, কোনোদিন করেছি বলেও মনে পড়ছে না। আজন্ম মা'কেই চাকরী করে সংসার চালাতে দেখেছি এবং বাবাকে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণ কর্মী।   এবং পড়াশুনা শেষ করে আমরা চার বোন ই রোজগার করে সংসার চালাচ্ছি। এক্ষেত্রে  অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত বলতে পারেন। কিন্তু শুধুমাত্র অর্থনৈতিক মুক্তিই যে স্বাধীনতা এনে দেয়, একথাও একশ ভাগ মানতে আমার আপত্তি আছে। 

ঘ) প্রেমিক একজন আছে  (লিখতে গিয়ে গাল লাল হয়ে গেল!) । কিন্তু সেই প্রেমিকের টাকায় কোনোদিন ফুর্তি করিনি। কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেও বিলের বোঝা প্রেমিকের ঘাড়ে চাপাইনি। নিজেই মিটিয়েছি। বন্ধুদের সঙ্গে খেতে গেলেও বিল নিজেই মেটাই।  প্রেমিক, ছেলে, সেজন্য তারই রিচার্জ করে ফোন করতে হবে, অথবা আমাকে রিচার্জ করিয়ে দিতে হবে, একথা মানতেও আত্মসম্মানে লেগেছে। বরং প্রেমিক ফোন করলে কেটে  নিজের ফোন থেকে ফোন করি।

ঙ) বাসে/গাড়িতে সিট সংরক্ষণের ব্যাপারটিও মেনে নিতে পারি না। কারন নিজেকে কানা, খোড়া, বিকলাঙ্গ, বয়স্ক কিছুই মনে হয়না। গাড়ীতে অন্যান্য সহযাত্রীরা যেভাবে যান, সেভাবেই যাই। কখনো অটোর সামনে বসে, কখনো গাড়ীর পেছনের সিটে বসে, মানে বলতে চাইছি যখন যেভাবে সিট পাই, যাই। চাকরী ও নিজ যোগ্যতায় পেয়েছি। আজ অব্দি মেয়ে হওয়ার সুবাদে জীবনের কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি কোনো সুবিধা নিয়েছি বলে মনে করতে পারছি না। 

চ)  ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা,  গালাগালির মধ্যে কারা যেন আমাকে নারীবাদী বলছিলেন। তাদের বলে রাখি, আমাকে কেউ নারীবাদী বললে সেটাকে আমি গালি হিসেবে নেই না। বরং বিনয়ে অবনত হয়ে যাই, কারণ এ আমার কাছে বিরাট সম্মানের ব্যাপার, আর যদ্দূর জানি, সে সম্মানের যোগ্য এখনো পুরোপুরি হয়ে ওঠতে পারিনি । আমি নারীবাদকে এখনো পুরোপুরি পড়ে ওঠতে পারিনি, তাই এ বিষয়ে বেশী কিছু বলতে ও পারবো না। তবে এটুকু জানি, পৃথিবীকে অনেক ভালো জায়গা বানাবার ক্ষমতা রাখে নারীবাদের আদর্শ।

এবারে আসি আসল কথায়। "সব পুরুষ সমান নয়" এই ফ্রেজ টা সত্যি নয়, একথা আমি এই অর্থে বলিনি যে সব পুরুষ ই 'ধর্ষক', 'যৌনহেনস্থাকারী', "খারাপ", "নিপীড়ক" । সব পুরুষ ধর্ষক নয়, এটা আমিও জানি, আপনিও জানেন। আমার বাবা, প্রেমিক, বন্ধু এদেরকেও কখনো ধর্ষন, যৌনহেনস্তা করতে দেখিনি। আসলে এই কথা বলে আমি বোঝাতে চেয়েছি প্রত্যেকজন পুরুষের মধ্যেই একটা প্রতিক্রিয়াশীল পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা, পুরুষতান্ত্রিক অহংবোধ বাস করে। কেউ সেটা দমিয়ে রাখতে পারে না, কেউ চেষ্ঠা করে দমিয়ে রাখার, কিন্তু সবসময় পারে না। এইদিক থেকে দেখলে, প্রত্যেকজন পুরুষ ই সমান। পুরুষতন্ত্রের প্রতি বিতৃষ্ণা আর পুরুষ-বিদ্বেষের মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ। কিন্তু আপনারা অনেকেই দ্বিতীয়টির সাথে আমার কথা গুলিয়ে ফেলছেন! আপনি পুরুষ বলে আপনার সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। আমার বিরোধ আপনার মধ্যে থাকা সেই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটির সাথে। 

এখন হয়তো বলবেন "পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা"টি কি?? কিভাবে বুঝা যায়?? এই প্রশ্নের উত্তরে আসতে গেলে প্রথমে দেখতে হবে, পুরুষতন্ত্র কি?  পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্র যাই বলা হোক না কেন, সেটার মূল তন্ত্র হলো, পিতা বা পরিবার প্রধান কোন পুরুষের কর্তৃত্ব, ক্ষমতা প্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রন। আরো সহজ করে বললে, পুরুষতন্ত্র হচ্ছে সেই ভাবনাটি, যা বলে পুরুষরা নারীর চাইতে উত্তম। সেটি বুদ্ধিতে হতে পারে, শক্তিতে হতে পারে, অর্থনীতি বা রাজনীতি, বা যে কোন কিছুতেই। আপনারা হয়তো হুট করে বলবেন, কৈ আমরা তো তা ভাবি না!! কিন্তু একটি সমাজ যদি বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী  একটি ভাবনার সাথে বড় হয়,  অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন অবচেতন মনেই আমরা নিজেরাই অনেক কিছু ভেবে ফেলি, বা অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আমরা বুঝিও না হয়তো, সেটি একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বড় হওয়ার কারণে আমরা এভাবে ভাবছি, বা এই কাজটি করছি। 

একটা কথা ভেবে দেখুন, শুধু মাত্র পুরুষেরা লেখাপড়া শিখবে কেন? ভোট দেবে কেন? মেয়েরা দেবে না কেন? এই সমান সুযোগটা নেই কেন?” এই ভাবনাটা বেশীরভাগ মানুষের মনে এসেছিলো বলেই কিন্তু এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, বিপ্লব হয়েছে, এবং তাই নারী-পুরুষ  সবার লেখাপড়ার সুযোগ, ভোটাধিকার, এগুলো হয়েছে। এখন আমরা যদি পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের মধ্যেই খুঁজে দেখতে হবে আমরা কি কি ধ্যান ধারনা অসচেতন ভাবে হলেও বহন করে চলেছি! সেগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে, আলোচনা করতে হবে, চিহ্নিত করতে হবে। একটা তন্ত্র বা সিস্টেম তো নিজে থেকে চলতে পারে না, তাকে মানুষই চালায়, তাই শুদ্ধিকরন ও এই মানুষদের ই করতে হবে। 

এবারে আসি কিভাবে এই পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারনাগুলো প্রত্যেক পুরুষের মাঝে বিদ্যমান থাকে, সে বিষয়ে। নারীর মধ্যেও থাকে, কিন্তু অনেক সংখ্যক নারীরা কিন্তু এই ধ্যানধারনাগুলোর  বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কয়েক দশক ধরে। কিন্তু কোনো পুরুষকেই নিজের ভেতরের এই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বার বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখিনি, তা থেকে বেরিয়ে আসতেও দেখিনি। অশিক্ষিত পুরুষদের ছেড়েই দিলাম।  শিক্ষিত, মুক্তমনা, উদার, প্রগতিশীল, সেকুলার পুরুষটির মধ্যেও দেখিনি। সমস্যাটা সে জায়গায়। 

চলুন দেখা যাক কিভাবে - 

ক) আপনি বিয়ে করলেন। মেয়েটিও আপনাকে বিয়ে করলো। বিয়ের পর মেয়েটি তার টাইটেল বদলালো। আপনি উৎসাহ দিলেন অথবা দিলেন না। কিন্তু আটকালেন না। কেন? কারন আপনার ঐ সত্ত্বাটি বলছে, স্বামীর নামেই মেয়েদের পরিচয়। আপনি হিন্দু হলে, আপনার বউ সিঁদুর দিলো, ইদানিং কেউ কেউ সিঁদুর না দিলেও শাখা পলাটি ঠিকই পরছেন। এবারের ও আপনি বাঁধা দিলেন না। বেশী ভালো হলে, বললেন, "তোমার যা খুশী পরো" কিন্তু বাঁধা দিলেন না। কেন? আপনার ঐ সত্ত্বাটি মনে মনে ঠিকই বলছে, স্বামী অমূল্য ধন, তাঁর আয়ু রক্ষার্থে তোমাকে এসব পরতে হবে বৈকি। ওদিকে স্ত্রীর আয়ু রক্ষার দায় স্বামীর নেই। কারন পুরুষতন্ত্র এটা শেখায়নি।  দ্বিতীয়ত, তুমি যে একজনের অধীনে আছ, সেটা তোমাকে পুরো পৃথিবীর সামনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেখাতে হবে। 

খ) আপনি বাবা হয়েছেন, আপনার একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে আছে। প্রথমত ধরুন খেলনার কথা। আপনার ছেলেটিকে আপনি বন্দুক, ব্যাটবল কিনে দিচ্ছেন, মেয়েটিকে বার্বি ডল, রান্নাবাটি ইত্যাদি। কেন মেয়েটিকে পুতুল, বন্দুক বা ব্যাটবল কেন নয়? কারন অসচেতন ভাবে হলেও  আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা আপনাকে বলছে, মেয়েদের খেলনা পুতুল, রান্নাবাটি। বড় হয়ে মেয়েটি সংসার করবে, বাচ্চা লালন পালন করবে। এখন থেকেই তাই প্রস্তুতি।

গ) বন্দুক বা ব্যাটবল বা ফুটবল পেয়ে আপনার ছেলেটি বাইরে খেলতে যেতে চাইলে আপনি আটকাবেন না। ঠিক সেভাবে আপনার মেয়েটি যদি, বাইরে মাঠে খেলতে যায়, আপনি কিন্তু তাকে যেতে দেবেন না। কেন যেতে দেবেন না?? এখানেও অসচেতন ভাবে হলেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা আপনাকে বলছে, মেয়েদের মাঠে খেলতে নেই, মাঠে ছেলেরা খেলে। মেয়েদের ঘরের বাইরে যেতে নেই, ঘরের বাইরে ছেলেরা যায়।

ঘ) এবারে আসি পোষাকে। আপনার ছেলেটিকে আপনি প্যান্ট-শার্ট, টি শার্ট কিনে দিচ্ছেন, মেয়েটিকে জামা, চুড়িদার, স্কার্ট ইত্যাদি। এখানে কিন্তু বাচ্চারা নিজে ঠিক করতে পারে তার পোশাক, তাই আপনিই ওর পছন্দটা ঠিক করে দিচ্ছেন।  এখন যদি প্রশ্ন করি মেয়েটিকে জামা না দিয়ে প্যান্ট-শার্ট, টিশার্ট, কেন নয়?? এগুলোও তো পোশাক।  এখানেও কিন্তু আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা কাজ করছে। আপনি ভেবেই নিচ্ছেন আপনার মেয়ে যেহেতু মেয়ে, তাই ওর পোশাক জামা। প্যান্টশার্ট ছেলেদের পোশাক। এই পছন্দ কিন্তু আপনার  শিশুটি করছে না বরং আপনি তার উপর আপনার পছন্দ চাপিয়ে দিচ্ছেন। আপনার ছোটোবেলায় আপনার উপর ও এভাবে চাপানো হয়েছিলো। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এভাবেই যুগ যুগ ধরে ঠিক করে আসছে, একটা ছেলে কি পরবে, একটা মেয়ে কি পরবে, কি আচরণ করবে! এবং আপনি, আমার আপনার বাবা, ভাই কেউই এই বোধের উর্ধে উঠতে পারিনি। 

ঙ) সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ার পরে যদি আপনার ছেলে বাড়ি ফিরে, অথবা স্যারের বাড়ী থেকে সন্ধ্যের পর একা ফিরে, আপনার ততোটা টেনশন হয় না, যতটা আপনার মেয়ে সন্ধ্যের পর বাড়ী ফিরলে হয়। ছেলেটিকে সন্ধ্যের পর স্যারের বাড়ী থেকে আনতে না গেলেও, মেয়েটিকে আনতে আপনি, বা আপনার বড়ছেলে, নিদেনপক্ষে মেয়েটির ছোটো ভাইটাকেই পাঠাবেন আনতে। কেন? তার কারন,  আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি জানে, মেয়েদের একা বাড়ীর বাইরে চলাফেরা করতে নেই, কারন মেয়েরা দুর্বল, শক্তি কম। দ্বিতীয়ত, আপনি ভাবেন আপনার মেয়ে বাইরে গেলে তাকে শকুনের মতো ছিড়ে খাবে আপনারই স্বজাতিরা, তাই তার নিরাপত্তায় জন্য আপনি একজন পুরুষমানুষকে পাঠাচ্ছেন, যে মেয়েটিকে নিরাপদে বাড়ী নিয়ে আসবে। কারন আপনি ভাবেন পুরুষ শক্তিমান। তাই আরেক পুরুষের সাথে লড়াই করে সেই মেয়েটিকে নিরাপদে আনতে পারবে। এই ক্ষেত্রে আমার একটা প্রশ্ন আছে। আপনি বলছেন সবাই সমান নয়, কিন্তু বাইরের এই খারাপ পুরুষেরাই অন্য আরেকটি ঘরের 'ভালো' পুরুষ , বাবা, দাদা, ভাই নয় কি? 

চ) যৌবনের শুরুতে আপনার ছেলে সিগারেট খাওয়া শুরু করলে, সেটা আপনার কাছে তেমন ম্যাটার করে না, ছেলেরা তো ওমন একটু আধটু খাবেই, কিন্তু আপনার মেয়েটি যদি সিগারেট ধরে, তবে তো আপনার পৃথিবী শেষ। মেয়েটিকে বকবেন, মারবেন, বাইরে যাওয়া বন্ধ করবেন। রাস্তায় আপনার বন্ধু আপনার পাশে দাড়িয়ে সিগারেট খেলে সেটাও আপনি ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না, কিন্তু কোনো মেয়ে আপনার সামনে সিগারেট খেলে, মেয়েটির চলাফেরা, চরিত্র, পারিবারিক শিক্ষা সম্পর্কে আপনি সন্দিহান হয়ে উঠবেন!  কেন?  কারন এখানেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা বলছে, মেয়েদের সিগারেট খেতে নেই, সিগারেট খাওয়া ছেলেদের জন্মগত অধিকার। ছেলেদের দিকে পুরুষতন্ত্র কখনো চোখ পিটপিট করে তাকায় না! আপনি জানেন সেটা। আচ্ছা, সিগারেট খাওয়া যদি খারাপ হয় , তবে তো সেটা ছেলে-মেয়ে দুজনের জন্য খারাপ। শাস্তি হলে দুজনের ই  হওয়া উচিত। কিন্তু আপনি সেটা করেন না। এটাও আপনি জানেন। ঠিক একই কথা মদ খাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

ছ) আপনি, আপনার স্ত্রী দুজনেই চাকরী করেন। আপনার স্ত্রীকে সকালে উঠে রান্না, চা, জলখাবার সব বানিয়ে বেরোতে হয়। রাতে এসেও সেই একই। কিন্তু আপনি এগিয়ে এসে বলছেন না, "ঠিক আছে সকালে আমি রান্না করবো, রাতে তুমি। কেন বলছেন না?? কারন আবার ও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি কানে কানে বলছে, রান্না করা মেয়েদের কাজ। ঘর সামলানো মেয়েদের কাজ। হ্যাঁ, আপনি হয়তো বলবেন আপনি মাঝে মাঝেই রান্না করেন। কিন্তু রান্না করাটা আপনার শখ না হয়ে দায়িত্ব হচ্ছে না কেন??  আপনি হয়তো এটাও বলতে পারেন, আমার বউ ভালোবেসে এসব কাজ করে। খুশী মনে এসব করে। আচ্ছা ভালোবাসা কি একমুখী?  

জ) আপনি ভালো পুরুষ। আধুনিক। নারীর এগিয়ে যাওয়াতে বিশ্বাসী। বন্ধুমহলে, পারিবারিক আড্ডায় আপনি বললেন, "আমি আমার বউকে বিয়ের পরও পড়তে দিয়েছি, অথবা চাকরী করতে দিয়েছি, অথবা অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছি" ইত্যাদি প্রভৃতি। যদি বলি এসব আপনার বউয়ের জন্মগত অধিকার, আপনি দেওয়ার কে? আপনি রেগে নোংরা নারীবাদী বলে তেড়ে আসবেন। কেন জানেন?? কারন আবারো পুরুষতন্ত্র।  আপনার মনের গভীরে গাঁথা হয়ে আছে, বিয়ের পর নারীর গার্জিয়ান তো স্বামী ই। সেই ঠিক করবে বউ কি করবে না করবে!!

ঝ) সম্পত্তিতে বোন ও সমান অংশীদার। কিন্তু সম্পত্তি ভাগের সময় বোনকে সমান অংশ দেওয়া হয় না। আপনি শিক্ষিত, আধুনিক, মুক্তমনা। কিন্তু আপনিও দিচ্ছেন না। কেন?? কারন আবার সেই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা কাজ করছে। বোন তো পরের ঘরে যাবে। সেখানে পাবে আরো অর্ধেক। মেয়েরা তো সমান অংশের দাবীদার হতে পারে না। সেকথা মরিয়া হয়ে  বোঝাতে আপনি ধর্মের আইন আনবেন, রাষ্ট্রের আইন আনবেন। কিন্তু একবারো এটা বুঝতে চাইবেন না, আইন, নিয়ম তো মানুষের সৃষ্টি। এগুলো বদলানো যায়, এমেন্ড করা যায়। সতীদাহ প্রথা বা বিধবা বিবাহ, এগুলোও কিন্তু বদলানো হয়েছিলো, সামাজিক সমতার প্রয়োজনে। 

ঞ) আপনি মেয়ের বাবা। মেয়ের বিয়ে দেবেন। মেয়ে যতই উচ্চশিক্ষিত হোক না কেন, খাট, আলমারি, গয়না, টাকা পয়সা ইত্যাদি দিয়ে মেয়েকে পরের ঘরে পাঠালেন। আবার ছেলের বিয়ের সময় কিন্তু এসব কিছুই বউয়ের ঘরে পাঠালেন না। কেন? এখানেও অসচেতন ভাবে হলেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি কাজ করছে। মেয়ে পিতার বোঝা। তাকে সোনা গয়না এসব দিয়ে পার করাতে হয়। মেয়েদের শিক্ষার কোনো দাম নেই। স্বামীর ঘরে তার দাম বাড়াতে তাই দামী খাট, আসবাব, সোনা। ছেলেরা হীরের আংটি। ছেলের বউ হয়ে আসা সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাই ছেলের বিয়েতে ছেলের বউয়ের বাড়ী এসব কিছুই পাঠাতে হয় না। অসচেতন ভাবে হলেও আপনি মানেন, ছেলেরা বিয়ে করে, আর  মেয়েদের বিয়ে হয়! 

ট) মেয়ের বাবা আপনি। মেয়ের বিয়ে কোনো অবস্থাতেই বেকার ছেলের সাথে দেবেন না। মেয়েটির প্রেমিক যদি বেকার হয়, এই সম্পর্কে আপনি কখনোই রাজি হবেন না। মেয়েটি যদি চাকরি করে, তাও না।  কেন?? এখানেও ঐ পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা। শিক্ষিত, নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাসী আপনিও মনে মনে ভাবেন, মেয়েদের ভরনপোষনের দায়িত্ব ছেলেটির। ছেলেকে আবার মেয়ে চাকরি করে কেন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে!! ছি ছি এ আবার হয় নাকি!!


আরো হাজারো উদাহরন  টেনে এনে আপনাকে প্রশ্নের মুখে দাড় করাতে পারি আমি। আপনি ধর্ষন করেন না, যৌনহেনস্তা করেন না, এসিড আক্রমন করেন না, বৌকে মারেন না, কিছুই করেন না। কিন্তু তারমানে এই নয় আপনি মহান। যতদিন অব্দি নিজের ভেতরের সব পুরুষতান্ত্রিক গুণাবলী থেকে মুক্ত হয়ে, পূর্ণাঙ্গ মানুষ রূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারছেন, ততদিন আমি আপনাকে মহান ভাবতে পারবো না। ততদিন অব্দি আমি বলেই যাবো সব পুরুষ সমান তার ভেতরের পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বার জন্য, পুরুষ অহংবোধের জন্য। 

এই যে নারীমুক্তি নিয়ে বড় বড় ভাষন হয়, "নারীকে জাগতে হবে", "অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে" ইত্যাদি প্রভৃতি, আসলে নারীমুক্তি তখনই সম্ভব, যখন একজন নারী এগিয়ে যাওয়ার সময় তার পরিবার, সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের সমর্থন পাবে। কারন রোজ রোজ যদি আমার অধিকার নিয়ে ঘরে বাইরে পুরুষদের সাথে ঝগড়া করতে হয়, (কারন অধিকার ছিনিয়ে আনতে গেলে ঝগড়া হবেই) তাহলে একটা সময় আপনারাই তকমা দেবেন "কি মুখরা", 'কি ঝুগড়ুটে', 'কি পুরুষবিদ্ধেষী' এইসব বিশেষণে। আর আমিও একটা সময় ক্লান্ত হয়ে, উপরন্তু যদি মানসিকভাবে দুর্বল হই,  এইসব তকমাগুলো থেকে বাঁচতে সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্ঠা করে যাবো। 

একজন নারীকে, সে  স্ত্রী হোক, বোন হোক, মেয়ে হোক, তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দিতে গেলে, মন থেকে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে লাগে, তাকে মানুষ ভাবার দুঃসাহস থাকতে লাগে। পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্র যাই বলি না কেন, সেটা আপনাদের শ্রেষ্ঠ বানিয়েছে, মাথায় তুলে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু নারীর চলার পথে তাকে সর্ব অবস্থায় সমর্থন করার মতো মানসিক শক্তি দেয়নি। 

এবার আসি আমার কথায়। আমি যখন বলি বা লিখি, সংখ্যালঘু/দলিত/আধিবাসী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, দেশজোড়া মোদী ওয়েভের বিরুদ্ধে, তখন কিন্তু মুক্তমনা, আধুনিক, প্রগতিশীল, উদারমনা এই আপনারা কখনোই বলেন না, এভাবে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করবেন না, সংখ্যালঘু/দলিত/আধিবাসীদের জন্য আলাদা করে কোনো আন্দোলনের প্রয়োজন নেই,  এভাবে একশ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্ধেষ ছড়ানোর দরকার নেই, আপনার বাবাও পুরুষ, আসুন সব মানুষের কথা বলি, মানবতার কথা বলি, সব মানুষ এক নয়! বরং তখন আপনাদের প্রশংসা, সহযোগীতা, পাশে থাকায় আমি ভেসে যাই। 

কিন্তু যখন আমি বলি, পুরুষেরা নারীকে ধর্ষন করে, পুরুষেরা নারীর মুখে এসিড ছুড়ে মারে, পুরুষেরা যৌনহেনস্তা করে, পুরুষেরা ইভটিজিং করে, পুরুষের জন্য নারী অনিরাপদ, পুরুষেরা ধর্ষনের ভিডিও চড়া দামে বিক্রি করে, ঠিক তখনই আপনারা আমায় 'খ' বর্গীয় , 'ম' বর্গীয় গালি দিয়ে বলেন, আপনি তো বড় ইতর, বড় বদ, আপনার বাবা কি পুরুষ নন?, এভাবে নারী-পুরুষ আলাদা করবেন না, এভাবে পুরুষবিদ্ধেষ ছড়াবেন না, এভাবে পুরুষকে গালি দেবেন না, এভাবে নারীর জন্য আলাদা কোনো আন্দোলনের দরকার নেই, তারচেয়ে মানববাদী হোন, সব পুরুষ এক নয়।

স্কুলে সমাজবিজ্ঞানে আমি, আপনি সবাই পড়ে এসেছি, মুখস্ত করে পরীক্ষায় খাতায় বমি করে এসেছি, 'ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক'। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীর মুখে, পুরুষতান্ত্রিক, পুরুষ শব্দগুলো শুনলেই আপনারা আক্রমণাত্বক হয়ে উঠেন। র্যাডিকাল নারীবাদী, অতি নারীবাদ, এইসব তকমা দেন। ভাবেন এই বুঝি আপনাদের সময়ের সাথে উদার, মহান, সেকুলার সাজা সিংহাসন ধরে কেউ টান মেরে দিলো! 

ভয়ংকর নারীবিদ্ধেষী সমাজব্যবস্থায় আপনারা যখন আমাকে পুরোষবিদ্ধেষী আখ্যা দেন, আমি হেসে গড়াগড়ি খাই। আমার মধ্যে সেই শিশুটাকে খুঁজে পাই, যে সমবেত প্রশংসাবাক্যের মধ্যে গলা তুলে জিজ্ঞেস করেছিলো, “রাজা, তোর কাপড় কোথায়?”

রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

বেঁচে থাকার গল্পগুলো... 
________________________

কর্মসুত্রে রোজ অনেক মানুষের সাথে দেখা হয়। তারা কেউ আমার সহযাত্রী, কেউ কলিগ, কেউ ছাত্রছাত্রী, কেউ বা সম্পূর্ণ অচেনা কেউ। তারা সবাই আলাদা আলাদা হলেও, তাদের সবার একটা জায়গায় আমি খুব মিল পাই!! নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বললে তারা রীতিমত আঁতকে উঠেন! তারা মনে করেন নারী পুরুষের সমকক্ষ তো নয়ই, নারী পুরুষের তুলনা টানাও হাস্যকর। এ চিন্তা যে শুধু পুরুষেরা করেন তা কিন্তু নয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি বেশীরভাগ নারীও এই চিন্তাকে ধারন ও লালন করেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা শুধু যে পুরুষদের নিজেকে মহান ভাবতে শিখিয়েছে, তা কিন্তু নয়, সাথে নারীকেও নিজেকে হীন ভাবতে শিখিয়েছে। আজকের যুগেও বেশীরভাগ নারী নিজেকে পুরুষের তুলনায় দুর্বল, অসহায় ভাবেন। নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়, নির্যাতন, হেনস্থাকে নিজের নিয়তি বলে ভাবেন। 

রোজকার জীবনে আমার সঙ্গে দেখা হওয়া প্রত্যেকজন নারীকে আমি এইসব ধারনা থেকে বের করে আনতে চাই। তাদের সাথে কথা বলি, বোঝাই। তাতে অনেকে বুঝে। তাদের জীবনের গল্পগুলো বলে, পরামর্শ চায়। অনেকে তাদের জীবনের লড়াইয়ের গল্প বলে, যে গল্পগুলো শুনে নতুন করে উজ্জীবিত হই। অনেকে তাদের জীবনের হতাশার গল্প বলে। তাদেরকে আমি আশার গল্প শোনাই। এই আশা নিরাশার গল্পগুলোই এবার থেকে একটু গুছিয়ে বলার চেষ্ঠা করবো। 

এক : 

একজন দিদির গল্প দিয়ে শুরু করি। সদ্য একটা স্কুলে চাকরী পেয়েছি। সকাল সাড়ে সাতটায় ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে একঘন্টার জার্নি, তারপর স্কুল। গাড়ি বলতে ছোটো গাড়ি, যার মাঝখানের সিট মুখোমুখি। দুদিকে চারজন করে মোট আটজন বসতে পারে। সামনের সিটে তিনজন। পেছনের সিটে চারজন। সকালের গাড়িতে আমরা বেশীরভাগ মেয়েরাই যাই। প্রায় সবাই ই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। কেউ বিবাহিত, কেউ অবিবাহিত। কদিন আগে  এভাবেই একসকালে গাড়িতে করে যাচ্ছি। পাশে দুজন দিদি বসেছেন। একজনের বয়স বত্রিশ বা তেত্রিশ হবে, বিবাহিত। অন্যজনেরও তাই। প্রথমজন খুব রোগা, সারামুখে ক্লান্তি আর দুর্বলতার ছাপ। তার তুলনায় দ্বিতীয়জনের স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালো। দুজনেই সংসারের গল্প করছেন। যেটুকু কথা কানে আসলো, তাতে বুঝলাম দুজনেরই দুটো করে সন্তান আছে। একজনের দুই ছেলে। একজনের এক ছেলে, আর দেড় বছরের মেয়ে আছে একটা।  প্রথম দিদির নাম ধরুন 'ক' এবং দ্বিতীয়জনের নাম 'খ'। 'ক' দিদি  খ' দিদিকে বলছেন তার ননদের কথা। যার কিনা বিয়ে হয়েছিলো এবং এখন বর্তমানে স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ী চলে এসেছে। স্বামী রাগী স্বভাবের এবং মাঝে মাঝে ননদটিকে মারত, বকাঝকা করত। এদিকে ননদটিও নাকি রাগী। তো তাই নিয়ে ক'দিদির দুঃখের শেষ নেই। খ'কে বলছেন - " যতই বলো দিদি, মেয়েমানুষের এত রাগ ভালো না, স্বামী দুকথা বলতেই পারে, কারন সে স্বামী, মেয়েদের তাই বলে স্বামীর মুখে মুখে তর্ক করতে নেই। মারুক , বকুক যাই করুক, ঐ স্বামীর ভিটেতেই মেয়েদের আসল ঘর, বাপের ঘর তো দুদিনের।" শুনে খ দিদি বললেন - "ঠিক বলেছো দিদি। মেয়েমানুষের সবদিক দেখে শুনে চলতে হয়। মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হয়।আমরা কি মানিয়ে গুছিয়ে চলছি না!" এতটুকু অব্দি শুনে একটু ঘুমোবো ঘুমোবো করছি। এমনসময় শুনি 'ক' দিদি বলছে 'খ' দিদিকে, "আসলে আমার ননদের স্বভাব ভালো নয়, সবেতেই শুধু রাগ করে, খুব মুখরা। এত মুখরা মেয়েকে কি কোনো স্বামী রাখতে  চায়? মেয়েদের হতে হয় মাটির মত। নারী রাগলে তার দু-কূল যায়!"

এতক্ষণ ধৈর্য্য ধরে চুপ থাকলেও, তারপর আর থাকতে পারলাম না। ক' দিদিকে জিঞ্জেস করলাম, মেয়েদের রাগ করতে নেই, রাগ শুধু ছেলেদের - এই নিয়ম কে করেছে দিদি?? রাগ একটা ইমোশন। যেরকম আমরা হাসি, কাঁদি, ঠিক সেরকম অনেকসময় রাগ করি। প্রত্যেক মানুষের ইমোশনের লেভেল আলাদা হয়। অনেকের রাগ কম, অনেকের বেশী। তারসাথে ছেলে মেয়ের সম্পর্ক কি?? নাকি মেয়েদের মানুষের পর্যায়ে ফেলতে নেই? কোনটা? আপনি ভেবে বলুন তো?? গাড়ির সবাই ততক্ষণে আমার দিকে ফিরে দেখছে। "ক" দিদি ভাবতে পারেনি আমি এভাবে বলবো। সে একটু আমতা আমতা করে চুপ করে গেলো। আমি না থেমে বললাম, শুনুন দিদি, এই যে আপনি আপনার ননদের কথা বলছেন, সে তো প্রশংসার যোগ্য। কারন সে স্বামীর মার, বকা খেয়ে পড়ে থাকেনি। প্রতিবাদ করেছে। বেরিয়ে এসেছে। এইসময় তো আপনাদের সবার ওর পাশে থাকার কথা ছিলো। অনেক সাহস করে সে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সবাই পারে না। কারন ছোটোবেলা থেকে আমাদের মা-মাসীরাই আমাদের মগজে ঠুসে দেন ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। সেই ঠুসে দেওয়া থেকে আমরা সহজে বেরিয়ে আসতে পারি না। কেউ কেউ যদি বেরিয়ে আসার সাহস দেখায় তবে তার পাশে থাকার চেষ্ঠা করবে, হেয় নয়। তুমি তো চাকরী করছো, পড়াশুনো করেছো। তুমি বলোতো সংসার কি শুধু মেয়ের গুণে সুখী হয়? স্বামীর কোনো গুণ লাগে না?? সংসার তো স্বামী-স্ত্রী দুজনের। তাহলে শুধু স্ত্রীর গুণই ধরা হবে কেন?? স্ত্রীটিকেই সবকিছু সহ্য করে মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হবে কেন?? 

ঘরে ঘরে মায়েরা মেয়েদের শেখাচ্ছেন, "বরের ঘর থেকে চিতায় উঠার সময়ই বেরোবে,তার আগে নয়।" তার আগে বেরোলে লজ্জা। তার আগে বেরোলে অসম্মান। স্বামীর ঘর ছাড়া তোমার আর কোনো ঘর নেই। বেশীরভাগ মেয়েরাও তাই শত অসম্মানে, শত হেনস্থায়, শত নির্যাতনে আটকে আছে  সেখানে। কারন সে কোথায় যাবে? নিজের ঘর বলে তো তার কোনো ঘরই নেই। নিজের মা-বাবা, ভাই-বোনরাই তাকে বোঝা মনে করবে। ঠিক এই তোমার মতোই মেয়েটির সম্পর্কে  কথা বলবে, পাড়ায়, রাস্তায়, গাড়ীতে, সর্বত্র। 

খবরের কাগজ, টিভি এগুলো খুললেই দেখা যায় নারী নির্যাতন, পারিবারিক হিংসা, ধর্ষন, শ্লীলতাহানীর খবরে ভরা। আমাদের মা, মাসীরা হয়তো এত পড়াশুনা করেননি, আর্থিক স্বাবলম্বীতাও ছিলো না। ভুলকে মনে মনে ভুল জানলেও সেটাকে মুখ ফুটে বলতে পারেন নি। কিন্তু আমরা তো পড়াশুনো করছি। চাকরি নোকরি করছি। আমাদের মেয়েদের, আমাদের আগামী প্রজন্মকে আমরা কি শেখাচ্ছি?? তাদেরকেও কি আমাদের মা মাসীর মত সেই একই রেকর্ড শুনিয়ে যাবো? নিজের জীবন দিয়ে যে অভিজ্ঞতা করছি, সেই একই আগুনে নিজের মেয়েদেরও ঠেলে দেব?? একটা কথা জেনে রাখবে যে শিক্ষা, যে আর্থিক মুক্তি আমাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধের জন্ম দেয় না, সেই শিক্ষা আর কুশিক্ষার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই!!  তাই আজ থেকে, নিজের মেয়ে, বোন, ননদ, বন্ধু, আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী প্রত্যেকটা মেয়েকে শেখাতে চেষ্ঠা কর, স্বামী মারলে মেয়েটি কি করবে? স্বামীর পরিবার অত্যাচার করলে মেয়েটি কি করবে? কথায় কথায় গলাধাক্কা, মারধর, গালাগাল করলে মেয়েটি কি করবে?? স্বামী যৌন অত্যাচার করলে মেয়েটি কি করবে?? স্বামী পরনারীতে আসক্ত হলে মেয়েটি কি করবে? মেয়েটিকে শেখাও স্বামীর বাড়িই মেয়েদের একমাত্র ঠিকানা নয়।তার আর একটা বাড়ীও আছে এবং সারাজীবন সেটা তারই থাকবে। বিয়ে মানেই নিজের বাড়ীর উপর থেকে অধিকার চলে যাওয়া নয়! 

অনেকক্ষণ চুপ করে শুনে 'ক' দিদি  আমায় বলল, দিদি তো এখনো বিয়ে করোনি, তাই বুঝবে না সংসারের নিয়ম!! আমি বললাম, দিদি সংসার সেটা নয়, যেখানে আমাকে কারো অধীনে থাকতে হয়, কারো মর্জিমত চলতে হয়! বরং সংসার সেটা, যা দুজন মানুষের পারস্পরিক সহযোগীতায় গড়ে উঠে। সংসার সেটা যেখানে স্বামীটি তার স্ত্রীর মানুষ হিসেবে পাওয়া অধিকারগুলোকে সম্মান দেয়। স্ত্রীকে নিজের দাস না ভেবে, তার অধিকার আদায়ে যে স্বামীটি সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে থাকে, সেটাই সংসার দিদি। মানুষের সংসার। রাজা আর দাসীর সংসার কখনো মানুষের সংসার হতে পারে না। কথাগুলো ভেবে দেখবে। 

গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ায়, খানিকটা রাগের সাথেই এই কথাগুলো বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। স্কুল থেকে ফেরার সময় 'ক' দিদির সাথে আর দেখা হয়নি সেদিন। দেখা হলো তার পরেরদিন। গাড়িতে ওঠার সময় দেখি  'ক' দিদি আমার জন্য সিট রেখেছেন তার পাশে। আমি তার দিকে চেয়ে হাসলাম। 'ক' দিদি বললো,  "দিদি তোমার সেদিনের কথাগুলো আমি ঘরে গিয়ে অনেক ভেবেছি। আমার ননদের সাথেও কথা বলেছি। এই প্রথমবার  আমি আমার ননদকে জিজ্ঞেস করেছি স্বামীর বাড়িতে ঠিক কি কি সমস্যা হয়েছে ওর সাথে। এবং বলেছি আমি ওর পাশে আছি।" আমি হেসে বললাম এইতো একদম ঠিক করেছো দিদি। 

এই কদিনের যাওয়া আসাতে 'ক' দিদি তার নিজের জীবনের হতাশাগুলো একটু একটু করে ভাগ করেছে আমার সাথে। শুধু শুনে গেছি, আর ভেবেছি যুগ যুগ ধরে প্রত্যেকটা মেয়ের জীবনের গল্পগুলো কি নিদারুনভাবে একই। সময় বদলাচ্ছে, যুগ বদলাচ্ছে, আমরা ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি, কিন্তু গল্পগুলো একই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করেছিলো, সে মরেনি, আর আমাদের কাদম্বরীরা রোজ বেঁচে থেকে প্রমাণ করছে তারা বেঁচে নেই!! 

শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭


১৩ই অক্টোবর, আন্তর্জাতিক #No_Bra_Day ( নো ব্রা দিবস)..
____________________________________________________

শিরোনাম দেখে অনেকেই হয়তো নাক কুঁচকে এড়িয়ে যাবেন। বিরক্ত হয়ে হয়তো বলবেন, এই আবার এসেছে পুরুষদের গালিগালাজ করে চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে!!  আপনাদের আশ্বস্ত করে বলছি এইসব কোনো কিছুই আজকের এই লেখার উদ্দেশ্য নয়!! 

শিরোনাম দেখে গাল দেওয়ার পাশাপাশি অনেকের মনেই হয়তো প্রশ্ন জাগছে, #No_Bra_Day জিনিস টা কি? নো ব্রা ডে মানে কি ব্রা খুলে বুক উন্মুক্ত করে রাস্তায় বেরোনো?? অথবা #নো_ব্রা_ডে কি ব্রা না পরে কাটাতে হবে?? আজ্ঞে না। উপরের কোনোটাই নয়। নো ব্রা ডে'তে ব্রা খুলে প্যারেড করার মতো কোনো ব্যাপার নেই। দয়া করে উল্টো বুঝবেন না।  

অনেকেই #ব্রেস্ট_ক্যান্সার  শব্দটা শুনেছেন। অনেকের মা/দিদি/পরিবারের মহিলা আত্মীয় এই রোগে হয়তো ভুগেছেন। এই ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কিন্তু দিনকে দিন বাড়ছেই। সাধারণত ৫০-৭০ বছর বয়সী মহিলাদের  ব্রেস্ট ক্যান্সার হবার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশী থাকে। অক্টোবর মাস হলো এই #ব্রেস্ট_ক্যান্সার সচেতনার মাস। ১৩ই অক্টোবর হলো #নো_ব্রা_ডে।  উদ্দেশ্য হলো, অন্তত এই একটা দিন  মেয়েরা যাতে নিজেদের ব্রা খুলে স্তন দুটো পরীক্ষা করে। 

প্রত্যেকটা মেয়ে কিশোরীবেলা থেকে যখন স্তনের আকার একটু একটু করে বাড়তে থাকে, তখন সেই বৃদ্ধি হওয়া স্তনকে সুডোল, আটসাট করে তুলতে  ব্রা পরতে শুরু করে। অথচ এই ব্রা থেকেই যে নানাবিধ রোগ হতে পারে সে সম্পর্কে বেশীরভাগ মেয়ের কোনো ধারনাই নেই, সচেতনা ও নেই। শহর এবং গ্রামের প্রায় 95% মেয়ে  জানে না ব্রা'র কি কি ক্ষতিকারক দিক আছে!! 
অথচ প্রত্যেকটা মেয়ের উচিৎ ব্রা’র সঠিক ব্যাবহার জানা। এর ক্ষতিকারক দিক জানা এবং এর ব্যাপারে সতর্ক হওয়া! সারাদিন ব্রা পড়ে থাকা কিংবা রাতের বেলা ব্রা পড়ে থাকা যে অত্যন্ত ক্ষতিকারক, সেটা জানা। আবার অনেকেই এসব অন্তর্বাস প্রতিদিন ধোয় না ! এটা থেকেও যে অনেক রোগ হয়, সেটা জানা! 

অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ই মনে করেন ব্রা ব্যবহারের ফলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়ে। ব্রা ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটা কমবে। এই উদ্দেশ্যেই প্রতিবছর #নো_ব্রা_দিবস    পালন করা হয়। 

এবার অনেক আবালশ্রেণীর মানবতাবাদী সাজা পুরুষ হয়তো এখানে এসে যুক্তি দেবেন , 'এখন যদি পুরুষরা "নো জাঙ্গিয়া দিবস" পালন করে তাহলে কেমন হবে? উত্তর হলো, আন্দোলন/ সচেতনা বৃদ্ধির অভিযান তারাই করে যারা ভিক্টিম হয় । আপনাদের যদি কখনো পেনিসে ক্যান্সার/অথবা অন্য কোনো রোগ হয়, তখন নাহয় নো জাঙ্গিয়া দিবস পালন করবেন!! 

এই ফাঁকে একটা গল্প বলি। কয়েক বছর আগে সুইডেনের নারীরা  মাতৃত্বকালীন বেতন-ভাতা’র দাবী করেছিলো রাষ্ট্রের কাছে। তারা বলেছিলো গর্ভকালীন সময়ে যদি তাদেরকে বেতন-ভাতা না দেয়া হয়, তাহলে তারা আর “মা” হবে না। তারা মুক্তকন্ঠে বলেছিলো, ‘আমরা সন্তান জন্মদান করি শুধুমাত্র আমাদের প্রয়োজনে নয়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনেও সন্তান জন্মদান করি। সুতরাং মাতৃত্বকালীন সময়ে আমাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নিতে হবে।“ রাষ্ট্র  কিন্তু তাদের দাবি মেনে নিয়েছিল। 

এইভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে আন্দোলন, সচেতনা বৃদ্ধির অভিযানগুলোই একদিন আমাদের দেশকে ব্রেস্ট ক্যান্সার মুক্ত করবে। ক্যান্সার প্রতিরোধের লড়াইয়ে জেতার সবচেয়ে ভালো উপায় কি জানেন??  ক্যান্সারের কারণগুলো সম্পর্কে জানা। আর শুধু নিজে জানলেই কিন্তু চলবে না। নিজের জানাগুলো আশেপাশের মানুষদেরও  জানাতে হবে। তাই, নারী-পুরুষ যেই হোন না কেন, চেনাপরিচিত সবার সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলুন। আলোচনা করুন।

অবশ্য যে দেশে এখনো পিরিয়ডকালীন সচেতনাই বৃদ্ধি পায়নি!  পিরিয়ড হওয়াকে এখনো অপবিত্র, পাপ মানা হয় ! যে দেশে স্তন এখনো পুরুষের ফ্যান্টাসির বিষয়, যে দেশে পুরুষের ফ্যান্টাসী পুরনের জন্য নারীকে এখনো সুডোল, সুন্দর, সঠিক সাইজের স্তনের জন্য ব্রা ব্যবহার করতে হয়, সে দেশে স্তন ক্যান্সার, স্তনের নানারকম রোগ নিয়ে ভাবার সুযোগ আছে কি নারী বা পুরুষের?? 







#Me_Too (হ্যাঁ,  আমিও) ...!! 
_________________________

সোস্যাল মিডিয়ার শুরু হওয়া একটি ক্যাম্পেইন #me_too। টুইটার ও ফেসবুকের দেওয়ালে এত সংখ্যক ‘মি টু’-র হ্যাশট্যাগ হয়েছে যা দেখে বোঝা যাচ্ছে যৌন হয়রানি কতোটা ব্যাপক, কতটা বিশাল তার পরিধি, রোজ কত সংখ্যক নারী যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন!! 

আলোড়ন শুরু করেছিলেন  হলিউডের এক অভিনেত্রী। হ্যাঁ আলোড়নই। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে আওয়াজ উঠলো, আমিও, হ্যাঁ আমিও!  #me_too - এই ছোট একটা হ্যাশট্যাগ লক্ষ-কোটি মেয়ের মুখে ভাষা জুগিয়ে দিলো। বুক ফাটছিলো, কিন্তু কিভাবে বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। মাত্র একটা ফুলকি বিস্ফোরণে পরিণত হলো। সমাজ, লোকলজ্জার ভয়ে যে দরজা এতদিন বন্ধ ছিলো, আজ যখন খুললো, তখন বেরিয়ে আসুক সব বিষ, সাফ হয়ে যাক সব জঞ্জাল। 

ঘটনা এক : 

বয়স তখন পাঁচ। প্রথম শ্রেণীতে পড়ি। ছোটো থেকে আমি প্যান্ট আর গেঞ্জিতেই অভ্যস্ত ছিলাম। স্কুলেও যেতাম প্যান্ট আর শার্ট বা গেঞ্জি পরে। আমাদের স্কুল ছিলো ছেলে মেয়ে কোম্বাইন।ক্লাস ফাইভের দাদারা একদিন প্ল্যান করলো আমি ছেলে না মেয়ে সেটা দেখবে! তো দেখার উপায় কি?? আমার প্যান্ট খুলে দেখবে আমি ছেলে না মেয়ে!! টিফিনের সময় চার/পাঁচজন দাদা আমায় মাঠের এককোনে প্যান্ট খোলার জন্য চেপে ধরে। আমি তখন রাগে একজনের হাত কামড়ে দিয়েছি,  ঠিক তখনই ছেলেগুলোর চিৎকার শুনে স্কুলের দারোয়ান দেখতে পায়, এবং আমাকে হেড স্যারের ঘরে নিয়ে আসে। আমি ভয় আর রাগে কাঁপছিলাম। তখন জানতাম না এটা যৌনহেনস্তা কি না!! পাঁচ বছর বয়েসে বোঝা সম্ভব ও ছিলো না কি না!! শুধু বুঝতে পারছিলাম, যেটা ঘটতে যাচ্ছিলো সেটা খারাপ কিছু, যা হওয়া উচিত নয়। ঘরে এসে বাপীকে বললাম সব। বাপী পরদিন স্কুলে এসে খুব রাগারাগী করলেন, ঐ ছেলেগুলোর বাবাদের আনানো হলো স্কুলে। তারপর কি হলো জানি না, ঐ ছেলেগুলো দুর থেকে কমেন্ট পাস করতো, কিন্তু সামনাসামনি আর কিছু করেনি। তার কিছুদিন পর মা'র ট্র্যান্সফার হয়ে যায়, আর আমরা অন্য শহরে চলে আসি। 

ঘটনা দুই : 

ক্লাস সিক্স। স্কুলের ছুটিতে বাসে করে গ্রামের বাড়ী যাচ্ছি। মা আর ছোটোবোন মুন একটা সিটে বসে, আর আমি সিট না পেয়ে মা'র সিটের পাশেই দাড়িয়ে আছি। হঠাৎ খেয়াল করি আমার পিঠে কে হাত বুলোচ্ছে। বুঝতে পারছি এই ছোঁয়াটা স্বাভাবিক নয়।  পেছন ফিরে দেখি বাপীর বয়সী একটা লোক, একহাত আমার পিঠে, একহাত তার প্যান্টের সামনে। আমি সামনের দিকে সরে আসলাম। লোকটা কিছুসময় পর সামনের দিকে সরে আসলো। এবার চেষ্টা করলো আমার বুকে হাত দিতে। আমি যত সরি, লোকটাও তত সরে। সামনের দিকে আরো মানুষ দাড়িয়ে, বেশী সরতে ও পারছি না। কোনোরকম সিঁটিয়ে দাড়িয়ে রইলাম। মাকেও বলতে পারছি না, সঙ্কোচবোধ থেকে। বললেও মা কি করতে পারতেন জানি না। হয়তো মাও লোকলজ্জার ভয়ে লোকটাকে কিছুই বলতেন না!!  যতক্ষণ দাড়িয়েছিলাম আমার একটাই কাজ ছিলো লোকটার হাত ঠেলে সরানো!! কিছুসময় পর মা'র পাশের সিটের মহিলা নেমে যাওয়ায় ঐ সিটে বসি। 

ঘটনা তিন: 

ক্লাস সেভেন। অঙ্ক ক্লাস। অঙ্ক দেখার বাহানায় স্যারের পিঠে হাত বুলানো। কিছু বলতে পারতাম না। সিঁটিয়ে থাকতাম। অঙ্ক ক্লাস ভয় পেতাম। 

ঘটনা চার : 

ক্লাস এইট না নাইন। শীতকাল। আমি কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছি। পিসতুতো এক দাদা এসেছে ঘরে। কিছুসময় পর ঐ দাদাটাও আমার কম্বলের নিচে পা ঢুকিয়ে বসলো। একটু সময় পরে দেখি আমার ঘাড়ে আর পিঠে মৃদু চাপ। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠি। অন্য ঘরে চলে যাই। 
ঘটনা পাঁচ : 

আমরা তখন ভাড়া থাকতাম একটা ঘরে। স্নানঘর ছিলো একটু দুরে। স্নানঘরের দেওয়াল বেয়ে একটা নারকেল গাছ ছিল। গাছ আর দেওয়ালের মাঝবরাবর একটা জায়গা এক ইট ফাঁক ছিলো। একদিন স্নান করার সময় দেখি ঐ ফাঁকা জায়গা দিয়ে ঘর মালিকের ছেলে তাকিয়ে আছে। যখন দেখলো আমি তাকে দেখতে পেয়ে গেছি, তখন চলে গেল। তারপর থেকে আমাকে নানাভাবে উত্যক্ত করার চেষ্টা করতো। কিন্তু ততদিনে ভয় পাওয়া ভীরু মেয়ে থেকে আমি রাগী, সাহসী, মারকুটে বদনাম কুড়িয়েছি। তাই ঐ  ছেলেটার সাহসও আর বাড়েনি।  

ঘটনা ছয়:

একাদশ শ্রেনী। এন সি সি করতাম। মেয়েদের প্যারেড আলাদা হত, ছেলেদের আলাদা। প্যারেড করার সময়  দেখতাম কিছুছেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে অশ্লীল ভাবে কমেন্ট পাস করছে। 

ঘটনা সাত : 
ফেইসবুক। প্রায় রোজদিন কোনো না কোনোভাবে যৌনহেনস্তা চলছে। অশ্লীল মেসেজ, ভিডিও, ছবি। কত ব্লক করবো বলতে পারেন?? 

ঘটনা আরো অনেক আছে, ভীড় রাস্তা , বাস, অটো এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে পুরুষের নোংরা হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে হয় নি!! আমার কিংবা আমাদের একটাই অপরাধ, আমরা মেয়ে। মেয়েদের ভোগ করা যায়  যখন তখন, যেখানে সেখানে তার গায়ে হাত দেওয়া যায়, কমেন্ট পাস করা যায়, হায়েনার মত ধর্ষণ করা যায়, ধর্ষণের পর তার রক্তাক্ত দেহ নর্দমায় ছুড়ে ফেলা যায়, তা খুশী তা করা যায় তার সাথে। পাঁচ বছর বয়স হোক বা পঞ্চাশ বছর - মেয়ে মানেই পুরুষদের কাছে যৌন চাহিদা মেটানোর মেশিন। যৌনতার জন্য একজন পুরুষের একটি যোনী হলেই চলে, জরায়ু হলেই চলে। তার বয়স দেখা লাগে না, সম্পর্ক দেখা লাগে না, ইচ্ছে-অনিচ্ছে দেখা লাগে না, প্রেম দেখা লাগে না, সময় দেখা লাগে না, সমাজ, বিবেক কিছুই লাগে না!! 

যৌনহেনস্তাকারী পুরুষের একমাত্র গন্তব্য মেয়েদের অন্তর্বাস আবৃত স্থানসমূহে। নারী হিজাব পরুক, বোরখা পরুক বা আলখাল্লা, পুরুষের  অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ঠিকই খুঁজে নিবে মেয়েদের গোপনীয় সব অঙ্গ। মেয়েদের হেনস্তা হতে হবে হিজাবের দেশে, মেয়েদের হেনস্তা হতে হবে হিজাব না থাকা দেশে, সর্বত্র। এই পৃথিবীতে কোথাও মেয়েদের কোন নিরাপদ স্থান নেই।স্কুল, কলেজ, অফিস, হাসপাতাল, লিফ্ট, আদালত, এমনকি নিজের ঘরও নিরাপদ আশ্রয় নয়। হঠাৎ জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এসে পড়া কোনো পশুও এতটা অনিরাপদ নয়, যতটা এই পৃথিবীতে মেয়েরা!! 

আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমার পরিচিত প্রত্যেকজন মেয়ে জীবনের কোনো না কোনোসময় যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছেন, ক্ষেত্রবিশেষে  আজও হচ্ছেন। পৃথিবীর সব দেশে, সমাজে, ক্ষমতার সব স্তরে নারীর যন্ত্রণা একই। হ্যাঁ, উন্নত বিশ্বে হয়তো তৃতীয় বিশ্ব থেকে সংখ্যায় কম, কিন্তু আছে। আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিসর, আরব, আমেরিকা, রাশিয়া, ভারত সহ এই উপমহাদেশ, কোথাও জীবনে কখনো যৌন হয়রানির শিকার হননি—এমন নারী খুঁজে পাওয়া ভার। সাড়ে সাত বিলিয়ন মানুষের পৃথিবীতে তিন বিলিয়ন মানুষ যদি যৌন হেনস্তার শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে এটা মানবতার লজ্জা!!

আমাদের সমাজে এখনো যৌন হেনস্তাকে খুব স্বাভাবিক ভাবে দেখা হয়। ছেলেরা ওরম একটু করবেই, মেয়েটা কেন এরম পোষাক পরলো, মেয়ে দেখালে ছেলে দেখবে না, মেয়েমানুষ যেখানে সেখানে গেলে এরকম তো হবেই, ইত্যাদি বলে যৌনহেনস্তাকারীদের আরো সোহাগ দিয়ে মাথার উপর তোলে আমাদের সমাজ, তাদের শাস্তি তো দুরের কথা!! এইভাবে আমাদের সমাজে গড়ে উঠেছে যৌনহয়রানী করার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে ছেলেরা যুবক হয়ে ওঠার অংশ হিসেবে শেখে যৌন হয়রানী। বন্ধুরা বাজি ধরে রাস্তার মেয়েদের উত্যক্ত করে, ফিগার নিয়ে কটুক্তি করে, স্নানরতা মেয়েদের লুকিয়ে বা প্রকাশ্যে দেখে,  শিস দেয়, হিন্দি গানের লাইন গায়, খারাপ কথা বলে। 

অনেকেই হয়তো এখন এই স্লোগান নিয়ে উপস্থিত হবেন, "সব পুরুষ সমান নয়", তাদের বলে রাখি, যৌন হয়রানি যারা করে তারা কোনো আলাদা পৃথিবীর মানুষ নন, তারা আপনাদেরই বন্ধু, ভাই, বাবা, দাদা, কাকা, পিসে, মেসো, দাদু, শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার, সহকর্মী, সহপাঠী। আপনাদেরই স্বজাতি। যৌন হয়রানী অপরাধ। এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক আচরণ নয়। এবং ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার সঙ্গেও এর কোন সম্পর্ক নেই। আপনি নিজে হয়তো হয়রানী করেন না, কিন্তু আপনি যখন চুপ করে থেকে এই সংস্কৃতি কে উস্কে দেন, তখন আপনিও একজন সম্ভাব্য হয়রানীকারক। যৌন হয়রানী করে পুরুষরা, তাই একে বন্ধ করতে হলে পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে, তাদেরকেই সচেতন হতে হবে। 

এখন যারা বলবেন, 'ফেইসবুকে এসব লেখে কি হবে' - তাদের বলি, অনেককিছুই হবে। ফেইসবুকে তো এই সমাজের বাইরের কেউ আসে না !! এই #me_too দেখে যদি পুরুষরা এখন থেকে বদলাতে চায়, বুঝতে শেখে এই পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ ভালো নেই, কষ্টে আছে, যন্ত্রনায় আছে, মানসিক অবসাদে আছে, ভয়-শংকায় সিটিয়ে আছে, সর্বোপরি পুরুষদের ঘৃণা করছে - তাই তাদের বদলাতে হবে, মানুষের পৃথিবীতে জানোয়ার না হয়ে মানুষের মত থাকতে হবে, বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে - এই আহ্বান জানিয়েই এই লেখা। কেমন হয় আজ থেকে যদি পুরুষরা কখনো যৌন হয়রানি করে না?? কেমন হয় যদি নিজের বন্ধু, ভাই, দাদা, ছেলেকে আড়াল না করে যৌনহেনস্তা যে অপরাধ সেটা বোঝালে? আপনারাই চিন্তা করুন বলুন তো!! 


আর মেয়েরা, আর কত লুকিয়ে বাঁচবে?? নিজেদের প্রতি হওয়া অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখ। মুখ ফুটে নিজের প্রতি হওয়া প্রত্যেকটা অন্যায় চিৎকার করে শোনাও সবাইকে। তোমার সেই চিৎকারে প্রত্যেকটা যৌনহেনস্তাকারী পুরুষ যেন লজ্জায় মাটিতে মিশে যায়। তাদেরকে বুঝিয়ে দাও তোমার প্রতি হওয়া যৌনহেনস্তায় তুমি লজ্জিত নও। বরং লজ্জা তাদের পাওয়া উচিৎ যারা তোমার সাথে এরকম করে!! মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদীকে মনে আছে?? সেনানায়কের সামনে যে আকাশচেরা,তীক্ষ্ণ গলায় বলেছিলো, "কাপড় কী হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?"

#Me_too আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুধু মেয়েরা নয়, পুরুষরাও সচেতন হয়ে ওঠুক। সামাজিকভাবে সোচ্চার হোক। যৌন হেনস্তা পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মুছে যাক। সারা পৃথিবীর মানুষ জানুক এ পৃথিবীতে আর যৌন হেনস্তা হয় না!! 


#I_am_not_a_victim
#i_am_a_survivor
#Me_Too