অথঃ নারীর 'ইমাম' হওয়া
________________________
সম্প্রতি খবরে দেখলাম কেরলের মালাপ্পুরমে "কোরান সুন্নত সোসাইটি"র সাধারণ সম্পাদক জামিদা টিচার নামে একজন মহিলা জুম্মাবারে পুরুষ-মহিলা মিলিয়ে প্রায় আশি জনের নামাজের ইমামতি করেছেন। এবং স্বভাবতই এ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। একশ্রেনীর ধর্মবিশ্বাসীদের ধারনা জামিদা ধর্মকে আঘাত করেছেন, ধর্মকে অশুচি করেছেন। এবং স্বভাবতই তাকে নিয়ে কটুক্তি, ধমকি, প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া চলছে..!! কিছু মিডিয়া রিপোর্ট এবং মানুষজন বলছেন জামিদা'র নামাজ পড়ানোর প্রক্রিয়া ভুল এবং এতে গৈরিক রাজনীতির প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে হাত আছে।
এবারে হলো কি খবরটা শুনে আমি খুব উৎসাহ নিয়ে একটু খুঁজাখুঁজি, পড়াশুনা শুরু করলাম। জানতে পারলাম জামিদাই প্রথম নন। এর আগে ২০০৮ সালে আমেরিকায় আমিনা ওয়াদুদ নামের একজন নারী জামাতে নামাজ পড়ানোর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ৪০ জনেরও কম লোকের একটি জামায়াতে নামাজ পড়ান। তারপর ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যে রাহেল রাজা নামের একজন কানাডিয়ান লেখিকাকে জুম্মার নামাজের ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রায় ১০০ লোকের জামাতে ইমামতি করেন। এবং যথারীতি এ নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি!!
ফিদা হুসেন দাদার থেকে জানতে পারলাম হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর সময়কালের উম্মে ওয়াকারা (রা.) বলে একজন নারীর নাম, যার সম্পূর্ণ কোরান শরীফ মুখস্থ এবং ঠোঁটস্ত ছিলো। যিনি পুরুষ-নারীর যৌথ নামাজেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ফিদা দাদা আমায় উইকি'র লিঙ্কও দেন। আমি উইকি খুলে দেখি ঠিকই, লেখা আছে, "Because of the strength of the evidence, the example of Umm Waraqah serves as the basis for the opinion among some Islamic jurists that women are permitted to not only lead other women in prayer, but that they may also lead mixed-sex congregations . This is for instance a minority opinion in the Hanbali (a Islamic Law School) tradition.
উইকি ছাড়া #মার্টিন_লিং এর বইয়েও এই বিষয়ে রেফারেন্স আছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, নবী পরবর্তী কিছু কিছু হাদিস নারীকে শুধু নারীদের নামাজের ইমামতি করার সুযোগ দিলেও পুরুষদের নামাজ পড়ানোর কোনো অধিকার দেয় নি!!
চৌদ্দশো বছর আগের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে পেলাম -
ক) হজরত আয়শা, উম্মে সালমা এবং উম্মে ওয়ারাকা (রা.) নারীদের নিয়ে জামাত করতেন এবং নিজেরা ইমাম হতেন।
খ) উম্মে ওয়াকারার জামাতের জন্য হজরত মোহাম্মদ (সা.) একজন মুয়াজ্জিনও নিযুক্ত করেছিলেন।
গ) মধ্যযুগীয় আরবে খাদিজা বিধবা হয়েও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন।
ঘ) উম্মে সালমা নামের একজন মুসলিম নারী ছিলেন সেই সময়ের যিনি হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছেন উহুদের যুদ্ধের সময়।
ঙ) হজরত আয়েশাও পরবর্তীতেও যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
চ) ইসলামিক আরেকটা ল্ স্কুল 'হানাফি'র কিছু সংখ্যক বিশেষজ্ঞ নারীর ইমামতিকে অপছন্দনীয় বলার প্রতিবাদ করেছেন এবং বৈধ বলেছেন।
এবারে কোরান বা ইসলামে নারীর অবস্থান, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি কেমন সেটা নিয়ে পরে কখনো আলোচনা-সমালোচনা করা যেতেই পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমি কোরানের আলোয় সমস্ত বিষয়টা বিচার করার চেষ্ঠা করবো, কারন যেহেতু কিছু মুসলিম কট্টরপন্থীরা বলছেন ইসলামে নারীর ইমামতি সম্পূর্ণ হারাম!
আমরা জানি, মোহাম্মদের বর্নিত কোরান হলো আল্লাহর বানী। ইসলাম ধর্মে একটাই ধর্মগ্রন্থ এবং মুসলিম হিসেবে প্রত্যেককে সেই ধর্মগ্রন্থ মেনে চলতেই হয়। সমস্ত মুসলিম আইন-কানুনও তৈরী হয় তার থেকে। নারীর নেতৃত্ব এবং ইমাম হওয়াকে যারা হারাম ঘোষণা করেছেন এবং হাদীস কোরান এইসবের ভিত্তিতে অবৈধ ঘোষনা করছেন, ঠিক একইভাবে তাকে বৈধ বলার ব্যাপারেও কুরআন, এবং ঐতিহাসিকভিত্তিক দলীল রয়েছে।
প্রথমত দেখি কোরান শরীফ এ ব্যাপারে কি বলেছে?
কোরান শরীফে স্পষ্ট লেখা আছে, ইসলাম ধর্ম নারী-পুরুষের বৈষম্য সমর্থন করে না। কোরান বলছে, "হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে, তারপর তোমদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে করে তোমরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে বেশি আল্লাহভিরু-মোত্তাকি। (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩)।
কোরান বলছে, "কোনো পুরুষ বা নারী ঈমানের সঙ্গে সৎকাজ করলে অবশ্যই তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তাদের প্রতি বিন্দু পরিমাণও অবিচার করা হবে না।’ (সূরা নিসা, ৪:১২৪; সূরা নাহল, ১৬:৯৭)।
কোরান বলছে, "তারা অর্থাৎ নারীরা তোমাদের পোশাক আর তোমরা তাদের পোশাক।" (সূরা বাকারা, ২:১৮৭)।
কোরান বলছে, "নারীদের জন্য ঠিক তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে যেমন পুরুষদের অধিকার আছে তাদের ওপর। তবে দায়িত্ব-কর্তব্যের দিক থেকে নারীর ওপর পুরুষের একটি মর্যাদা রয়েছে। আর আল্লাহ সর্বময় শক্তিমান মহাপ্রজ্ঞাময়।" (সূরা বাকারা, ২:২২৮)।
অর্থাৎ বুঝানো হচ্ছে আল্লাহ মানবজাতি তথা নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেছেন। এবং আল্লাহ'র হুকুম মেনে চললে একজন পুরুষ যেমন তার প্রতিদান পাবেন, একইরকমভাবে একজন নারীও পাবেন। আবার অবাধ্য হলে একই রকম শাস্তিও দুজনেই পাবেন। একজন পুরুষকে যেরকম কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব প্রদান করা হয়েছে, অনুরুপ ভাবে নারীকেও সুযোগ প্রধান করা হয়েছে। সমস্ত কোরান শরীফের কোথাও লেখা নেই নারী ইমাম হতে না পারার কথা। ইসলামে অন্যান্য অনেক বিষয়ে নারীর প্রতি বৈষম্য থাকলেও , ধর্মীয় আচার-বিচারে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। যেকোনো সাধারন মুসলিমের ও কোরান পড়লে একই ধারনা হবে।
এবারে প্রশ্ন জাগলো, যেখানে কোরান বলছে ধর্মীয় জীবনে নারী-পুরুষ সমান, সেখানে নামাজের ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে নারী কেন ইমামের মতো দায়িত্ব পালন করতে পারবে না?? বরং এরকম হলে তো দেশ বিদেশের মুসলিম সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমবে!! সর্বোপরি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে!
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে হজরত মোহাম্মদের সময়কালে এবং তার পরবর্তী সময়কালে। ইমাম বুখারীসহ অন্যান্য হাদিস সংগ্রহকারীরা কেউই হজরত মোহাম্মদে' (সাঃ) এর মুখ থেকে শুনে হাদিস লিখেননি। হজরত মোহাম্মদের মৃত্যুর প্রায় আড়াইশো/তিনশো বছর পর যখন সেই সময়ের কেউ জীবিতই ছিলেন না, কয়েক প্রজন্ম ধরে লোক মুখে গল্পের মত চালু কাহিনীগুলোকেই হাদিস হিসেবে লিখেছেন। কোরানের অনেক আয়াত, সুরার অন্য মানে করে এইসব হাদিসে উপস্থাপন করা হয়েছে। এবং ধর্মীয় কাজে নারী-পুরুষ বিভেদও সেইসময়কার কিছু মুসলিম পন্ডিতদের সৃষ্টি। অনেকক্ষেত্রে নতুন সংযোজনও করা হয়েছে। মরুভুমির গরম বালির চেয়েও সাংঘাতিক এই হাদিসগুলো। এবং ইমাম বুখারী সহ অন্যান্য হাদিস লিখিয়েরা এই হাদিসগুলোর সত্যতা যাচাই করার কোন সূত্রই রেখে যাননি।
এবারে হাদীসের সমালোচনা করলেই ইসলমাবিদেরা যুক্তি হাজির করেন যে হাদীস ইসলামের আবশ্যকীয় গ্রন্থ নয়। কোরানই একমাত্র অফিশিয়াল গ্রন্থ। কাজেই কিছু হাদীসে ভুল থাকলেও থাকতে পারে। তাহলে সেক্ষেত্রেও তো একটাই কথা থাকে, কোরান শরীফের কোথাও তো নারী ইমাম হতে পারবে না, এরকম কিছুই লেখা নেই!!
এতসব পড়ে আমার মনে হলো, হজরত মোহাম্মদের চরিত্রে যদি সত্যিই কেউ কালি লাগিয়ে থাকে তবে তারা তো নাস্তিক বা বিধর্মীরা নয়, সবচেয়ে বড় কালিমালিপ্ত করার কাজটি করে গেছে এসব হাদীস লিখিয়েরা। কিন্তু এসব হাদিস লিখিয়েদের বিরুদ্ধে তো কোনো কট্টর ইসলামপন্থীদের কখনো দেখলাম না 'কল্লা কাটা' অথবা 'চাপাতি চালানো'র ফতোয়া দিতে ?? বরং হাদিসগুলোকে ইতিহাস এবং কোরান শরীফের ভিত্তিতে কেউ রিসার্চ করতে গেলে তারা হয়ে যায় ইসলামের শত্রু!! এইমূহূর্তে এই লেখা পড়ে অনেকের হয়তো আমার সম্পর্কেও এটা মনে হবে!
যাইহোক, ইসলামে কোরান শরীফ একটি সম্পূর্ণ পূর্ণ কিতাব। কোরানই একমাত্র সত্য। একথা কোরান শরীফে অনেকবার লেখা আছে। যেমন -
সূরা নামল ২৭ আয়াত ৭৫ : "আকাশে ও পৃথিবীতে এমন কোন গোপন ভেদ নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে না আছে।"
সুরা কাহফ ১৮:২৭ : "আপনার প্রতি আপনার পালনকর্তার যে, কিতাব নাজিল করা হয়েছে, তা পাঠ করুন। তাঁর বাক্য পরিবর্তন করার কেউ নাই। তাঁকে ব্যতীত আপনি কখনই কোন আশ্রয় স্থল পাবেন না।"
সূরা আশ-শুরা ৪২:৭ আয়াতঃ "এমনি ভাবে আমি আপনার প্রতি আরবী ভাষায় কোরান নাযিল করেছি, যাতে আপনি মক্কা ও তার আশ-পাশের লোকদের সতর্ক করেন এবং সতর্ক করেন সমাবেশের দিন সম্পর্কে, যাতে কোন সন্দেহ নেই। একদল জান্নাতে এবং একদল জাহান্নামে প্রবেশ করবে।"
সূরা জাসিয়া ৪৫:৬ আয়াতঃ "এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি আপনার কাছে আবৃত্তি করি যথাযথরূপে। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা কোন কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে।"
সূরা জাসিয়া ৪৫:১৮ আয়াতঃ "এরপর আমি আপনাকে রেখেছি ধর্মের এক বিশেষ শরীয়তের উপর। অতএব, আপনি (কোরান) এর অনুসরণ করুন এবং অজ্ঞানদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না।"
সূরা বাকারা ২:৭৯ আয়াতঃ "অতএব তাদের জন্যে আফসোস! যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ-যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে। অতএব তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাতের লেখার জন্য এবং তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের উপার্জনের জন্যে।"
অনেক আলেম ওলামারা বলেন, কোরানে অনেক কিছু নেই তাই হাদিস পড়তে হয়!! অথবা হাদিস ছাড়া কোরানে শরীফের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা সম্ভব নয়! উপরের প্রত্যেকটা আয়াতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কোরান ছাড়া কোন পথ নেই, তাকেই আকড়ে ধরতে বলা হয়েছে বারবার। আগেই বলেছি হাদিস লেখা হয়েছে হজরত মোহাম্মাদ (সাঃ) মারা যাওয়ার প্রায় আড়াইশো থেকে তিনশো বছর পর। হাদিস ছাড়া কোরান যদি অসম্পূর্ণ হতো, তাহলে হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) জীবিত সময়ে হাদিস এলো না কেন??
অনেকে সূরা নিসার-১১৩ নং আয়াত " আল্লাহ দুটো জিনিস নাজিল করেছেন। কিতাব ও হিকমাহ।" - এটা বলে বলেন, কিতাব মানে কোরান এবং হিকমাহ মানে হাদিস। তো আরবি থেকে শুরু করে অন্যান্য অভিধান-টভিধান খুঁজে আমি এই শব্দগুলোর মানে পেয়েছি -
হাদিস= বাণী,উক্তি,ভাষণ
ছুন্নাহ= বিধান,গঠনতন্ত্র
হিকমাহ=জ্ঞান,বিজ্ঞান,ক্ষমতা,বুদ্ধি, কর্তৃত্ব,বিচক্ষণতা
শরিয়ত অনুযায়ী হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর মূখ থেকে নিঃসৃত কথাগুলিকেই হাদিছ বলে। আর আমরা জানি হজরত মোহাম্মদের মুখ নিঃসৃত বাণী কোরানশরীফ। সুতরাং কোরানের অপর নামই হাদিস।
তাহলে এতসব প্রমাণ থাকতে একজন প্রকৃত ইসলাম ধর্মাবলম্বী হিসেবে আমরা কেন হজরত মোহাম্মদের মৃত্যুর আড়াইশো থেকে তিনশো বছর পর বোখারীদের লিখিত কিতাবকে হাদিস নাম দিয়ে দু-নম্বর ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করবো??
এবারে দেখা যাক বিভিন্ন আলেম ওলামার কথায় এবং হাদিসে কোন যুক্তিতে নারীর ইমামতিতে বাধা দেওয়া হয়েছে? -
প্রথমত, "পুরুষদের কাছে ইসলাম প্রচার নারীদের জন্য অনুমোদিত নয়। যখন কোনো নারী পুরুষদের সামনে দাঁড়িয়ে ইমামতি করবে তখন তার এবং পুরুষদের মাঝে পর্দার বিধান লংঘন হবে।"
আমার প্রশ্ন, এটা কোরান শরীফের কোথায়, কোন আয়াত বা সুরায় লেখা আছে? একজন নারী সম্পূর্ণ পর্দা করেও নামাজ পড়াতে পারে! সেক্ষেত্রে পর্দা কিভাবে বাধার সৃষ্টি করছে?
দ্বিতীয়ত, "নারী-পুরুষ উভয়ই সমান হলেও পুরুষের দায়িত্ব বেশি। সন্তান ধারণের জন্য প্রাকৃতিকভাবেই নারীকে পুরুষের চেয়ে কোমল ও দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সম্পদ উপার্জন, সন্তান পরিচালনা এবং নেতৃত্বের জন্য পুরুষকে দৈহিকভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে। আর যেহেতু নারীকে তুলনামূলক কোমল গঠনে সৃষ্টি করা হয়েছে তাই নারীর সার্বিক দায়িত্ব পুরুষদের ওপর দেয়া হয়েছে। এ কারণে নারীর চেয়ে পুরুষের মর্যাদা অর্থাৎ দায়িত্ব এক স্তর ওপরে।"
এবারে আমার মতে : মর্যাদা বেশীর সাথে নামাজ পড়ানোর কোনো সম্পর্ক নেই। আর কোরান শরীফে স্পষ্ট লেখা আছে ধর্মীয় ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের কোনো পার্থক্য নেই। এখানে কোরান শরীফের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। একজন নারী সব দায়িত্ব সামলে যদি চাকরী বা কাজে যেতে পারে, অথবা হজরতের সময়ে তাঁর পাশে থেকে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পেরেছে তবে সে নামাজও পড়াতে পারবে।
তৃতীয়ত : "নামাজে বেশ কিছু শারীরিক পরিশ্রম রয়েছে। যেমন-দাঁড়ানো, রুকু, সেজদা ইত্যাদি। ইমামকে শুক্রবারের খুতবা দিতে হয় মুসল্লিদের দিকে ফিরে, নামাজ পড়াতে হয় মুসল্লিদের দিকে পেছন দিয়ে। যদি একজন নারী নামাজে নেতৃত্ব দেন তবে জামায়াতের পিছনে যে সকল পুরুষ নামাজ পড়বে তারা এবং ইমাম উভয়ের পক্ষে এটি বেশ বিব্রতকর হবে। এবং পুরুষেরা কোন মহিলাকে এই দু স্থানে দেখলে মনে আল্লাহর ভালোবাসা না হোক কিছু একটা টেম্পটেশান হতে পারে।"
এবারে আমার মতে : একথা কোরান শরীফে কোথাও লেখা নেই। এটা এনাদের মনগড়া ব্যাখ্যা। মানে এনারা ভেবে নিয়েছেন। আর ভাবার কারন এখানে খোলসা করে না বললেও আপনার বুঝে নেবেন আশা করি।
চতুর্থত : মেয়েরা কিছুদিন নামাজ পড়েনা, পিরিয়ডের কারণে। এবং গর্ভবতী হলেও সে নামাজ পড়াতে পারবে না।
এবারে আমার মত: পিরিয়ডের সময়ে নামাজ রোজা রাখার নিয়ম বা বিধান সম্পর্কে কোরান শরীফে স্পষ্ট লেখা আছে। আর একটা মেয়ের পিরিয়ড ম্যাক্সিমাম সাতদিন থাকে। এই সাতদিন মেয়ে ইমামকে ছুটি দিয়ে অন্য কোনো ইমাম নামাজ পড়ালেই হয়!! নারীদের মত পুরুষেরাও তো বিভিন্ন কারণে অসুস্থ হয়।তার জন্য তারা নামাজ পড়ানো থেকে বঞ্চিত হয় কি? এখানে উল্লেখ্য যে, হজরত মোহাম্মদ(সাঃ) এর সময় যখন তিনি অসুস্থ হতেন তখন তিনি জামাতের সময় ইমামতি করতেন না।বরং তখন আবূ বকর সিদ্দিক (রাঃ) সর্বদা ইমামতি করতেন।নবম হিজরীতে মুসলিমগণ যে হজ্ সম্পাদন করেছিলেন তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আবূ বকর সিদ্দিক (রাঃ)।তার দ্বারা কিন্তু হজরত মোহাম্মদ(সাঃ) এর নেতৃত্বকে অথবা নামাজ পড়ানোর অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় নি। তাই নারীর প্রকৃতিগত কারণ দেখিয়ে নারী ইমাম হওয়ার প্রতি যে অবৈধতা দেওয়া হয়েছে তা নিতান্ত অযৌক্তিক।
কোরান শরীফে নারী-পুরুষ উভয়কে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, “আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে।" কোথাও নারীর ইমাম হওয়ার উপর কোনো বাধা-নিষেধ অস্পষ্টভাবেও উল্লেখ নেই। নারীর উপর ইসলাম ধর্ম অন্যান্য অনেক বিষয়ে বাধা-নিষেধ হয়তো আরোপ করেছে, কিন্তু ধর্মপালন/ ধর্মচারনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষকে সমান মর্যাদা এবং অধিকার দেওয়া হয়েছে। নারীর ইমামতি অথবা ধর্মচারনের উপর যেটুকু বাধা আসছে, সেটা কোরানের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে কিছু স্বঘোষিত আলেম ওলেমাদের রচিত হাদিসের কারনে। সাধারন মুসলিমদের এভাবেই যুগ যুগ ধরে আল্লাহ নবীর নামে বোকা বানানো হচ্ছে। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে আপনার কোরান শরীফের উপর বিশ্বাস রাখা উচিত। এবং আজকাল বাংলা, হিন্দি সহ বিভিন্ন ভাষায় কোরান শরীফ পাওয়া যায়। পড়ুন। বুঝুন। তারপর বলুন।
এবারে একজন সাধারন যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে বলি। বর্তমান সময়ে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে। পড়াশুনো, খেলাধুলা, চাকরি নোকরি, সহ সব ক্ষেত্রে। তাহলে ধর্মীয়ক্ষেত্রে নারী সুযোগ পাবে না কেন?? কোনো নারীর শিক্ষক , পুলিশ, উকিল, জজ্ হওয়ার ইচ্ছে থাকলে, সে চাইলে তা হতে পারে। কিন্তু মাদ্রাসা পড়ুয়া অথবা এমনিই কোনো ধার্মিক নারী যদি ধর্ম সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান আহরন করে ইমাম হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাহলে তার সেই স্বপ্নপূরণের অধিকার কোন যুক্তিতে খারিজ করা হচ্ছে?? সে ইমাম হতে পারবে না কেন??
আমি জানি না বা জানলেও পুরোপুরি নিশ্চিত নই জামিদার নামাজ পড়ানোর পিছনে কোনো রাজনীতি, গেরুয়াকরন আছে কি না! (কারন কিছু রিপোর্টে পড়লাম অনেকে বলছেন এতে গেরুয়া রাজনীতির হাত আছে।) । থাকলেও আমি বিষয়টাকে এভাবে দেখতে চাইছি না। যদি গেরুয়া রাজনীতি অন্য কোনো উদ্দেশ্য থেকেও এসব করিয়ে থাকে, তবে বলবো, তারা খারাপ করতে গিয়ে ভালো করে ফেলেছে। এবং বিষয়টাকে আমি দেখছি লিঙ্গবৈষম্যের প্রাচীরে একটা সজোরে আঘাত হিসেবে। বিষয়টা এখনো স্বপ্নের মতো আমার কাছে। সংস্কারের গেরোয় আটকে রাখা নারীরা স্টিরিওটাইপ ভেঙে এভাবে বেরিয়ে আসবেন - সেই স্বপ্নই তো খালি চোখে দেখি!!
সতীদাহ প্রথাও হিন্দু ধর্মের কোথাও লেখা ছিলো না! বরং তৎকালীন সমাজের কিছু ব্রাহ্মন এই প্রথা বানিয়েছিলেন। সময়ের দাবীতে সে প্রথাও এখন বিলুপ্ত। একশো বছর আগে কোনো ধর্মই মেয়েদের পড়াশুনো, চাকরী নোকরী, খেলাধুলা করার সুযোগ দিত না। সময়ের দাবী মেনে আজকে মেয়েরা সবই করে। ইসলাম ধর্মে টেলিভিশন, গানবাজনা ইত্যাদির চল ছিলো না, ফোটো তোলা হারাম ছিলো, সময়ের দাবীতে সেটাও বদলে গেছে! হিন্দুধর্মে অনেক মেয়েরা পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করছে...( অধীশাদি ওদের সরস্বতী পুজোর রেফারেন্স), মন্দিরে প্রবেশাধিকার চাইছে। তাহলে ইসলাম ধর্মেও নারীর ইমাম হওয়াকে সময়ের দাবী ভেবে মেনে নিতে আপত্তি কোথায়??
ইতিহাস থেকে বর্তমান যুগ অব্দি তুলনা করলে দেখা যায়, প্রত্যেকটা ধর্ম সমাজ বিবর্তনের হাত ধরে বিকশিত হয়েছে। সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই মানুষ ধর্মীয় অনেক প্রথা রেক্টিফাই করে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে, কারন ওভাবে না করলে হয়তো সময়ের হাতে ধর্মীয় ব্যবস্থা ধ্বসে পড়তো!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন