এক পুরুষবিদ্বেষীর জবানবন্দি
________________________
প্রথমেই ডিসক্লেইমার দিয়ে রাখা ভালো, যা দিনকাল চলছে। কে কখন কোথা থেকে কোন তকমা লাগিয়ে দেবে, জানা তো নেই !! পাকিস্থান যাওয়ার হুমকি অনেকবার পেয়ে গেছি, দেশদ্রোহী তো বাই ডিফল্ট হয়েই আছি, 'খ' বর্গীয়, 'ম' বর্গীয় তকমাগুলোও পেয়ে গেছি, ইদানিং শুনছি পুরুষবিদ্বেষী, তাই ডিসক্লেমার দিয়ে রাখা ভালো।
ডিসক্লেইমার : ক) আমি একজন মানুষ। আপনাদের ভাষায় 'মেয়েমানুষ'। জন্মেছিও প্রত্যেকটা মানুষ যে প্রসেসের মধ্যে দিয়ে জন্মায়, সেভাবে। মেয়ে হয়েই জন্মাবো, করিমগঞ্জেই জন্মাবো, মুসলিম ঘরেই জন্মাবো, এরকম কোনো প্ল্যান করে আসিনি। বিষয়টা আমার হাতেও ছিলো না। তাই নারী, পুরুষ, ধর্ম, এগুলোকে ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট হিসেবেই বয়ে চলি, এরজন্যে আলাদা করে কোনো গর্ব বা বিদ্বেষ অনুভব হয় না।
খ) প্রত্যেকটা পুরুষের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারবো না, কারন এই পুরুষেরই কেউ আমার বাবা, কেউ প্রেমিক, কেউ বন্ধু। কিন্তু তা বলে তাদেরকে মাথায় তুলে নাচার, বা পূজো করার মানসিকতা আমার নেই। বাবা'কে ভালোবাসি, আমার আমি হয়ে উঠার মধ্যে তাঁর অবদান অনেক। তা বলে,আমার বাবাও যে সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারনা মুক্ত একজন মানুষ, একথা একশ ভাগ জোর দিয়ে বলতে পারবো না। পরিবারের প্রধান কর্তা শুধু বাবা একথা মানতেও আমার আপত্তি আছে। কারন আমি আমার মা'কেও সমানভাবে পরিবারের কর্ত্রী ভাবি।
গ) অর্থনৈতিক ভাবে আমি বাবা, প্রেমিক বা ভাই কারো উপর নির্ভরশীল নই। কখনোই ছিলাম না। তাদের টাকায় নিজের নেট রিচার্জ টাও করছি না, কোনোদিন করেছি বলেও মনে পড়ছে না। আজন্ম মা'কেই চাকরী করে সংসার চালাতে দেখেছি এবং বাবাকে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণ কর্মী। এবং পড়াশুনা শেষ করে আমরা চার বোন ই রোজগার করে সংসার চালাচ্ছি। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত বলতে পারেন। কিন্তু শুধুমাত্র অর্থনৈতিক মুক্তিই যে স্বাধীনতা এনে দেয়, একথাও একশ ভাগ মানতে আমার আপত্তি আছে।
ঘ) প্রেমিক একজন আছে (লিখতে গিয়ে গাল লাল হয়ে গেল!) । কিন্তু সেই প্রেমিকের টাকায় কোনোদিন ফুর্তি করিনি। কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেও বিলের বোঝা প্রেমিকের ঘাড়ে চাপাইনি। নিজেই মিটিয়েছি। বন্ধুদের সঙ্গে খেতে গেলেও বিল নিজেই মেটাই। প্রেমিক, ছেলে, সেজন্য তারই রিচার্জ করে ফোন করতে হবে, অথবা আমাকে রিচার্জ করিয়ে দিতে হবে, একথা মানতেও আত্মসম্মানে লেগেছে। বরং প্রেমিক ফোন করলে কেটে নিজের ফোন থেকে ফোন করি।
ঙ) বাসে/গাড়িতে সিট সংরক্ষণের ব্যাপারটিও মেনে নিতে পারি না। কারন নিজেকে কানা, খোড়া, বিকলাঙ্গ, বয়স্ক কিছুই মনে হয়না। গাড়ীতে অন্যান্য সহযাত্রীরা যেভাবে যান, সেভাবেই যাই। কখনো অটোর সামনে বসে, কখনো গাড়ীর পেছনের সিটে বসে, মানে বলতে চাইছি যখন যেভাবে সিট পাই, যাই। চাকরী ও নিজ যোগ্যতায় পেয়েছি। আজ অব্দি মেয়ে হওয়ার সুবাদে জীবনের কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি কোনো সুবিধা নিয়েছি বলে মনে করতে পারছি না।
চ) ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা, গালাগালির মধ্যে কারা যেন আমাকে নারীবাদী বলছিলেন। তাদের বলে রাখি, আমাকে কেউ নারীবাদী বললে সেটাকে আমি গালি হিসেবে নেই না। বরং বিনয়ে অবনত হয়ে যাই, কারণ এ আমার কাছে বিরাট সম্মানের ব্যাপার, আর যদ্দূর জানি, সে সম্মানের যোগ্য এখনো পুরোপুরি হয়ে ওঠতে পারিনি । আমি নারীবাদকে এখনো পুরোপুরি পড়ে ওঠতে পারিনি, তাই এ বিষয়ে বেশী কিছু বলতে ও পারবো না। তবে এটুকু জানি, পৃথিবীকে অনেক ভালো জায়গা বানাবার ক্ষমতা রাখে নারীবাদের আদর্শ।
এবারে আসি আসল কথায়। "সব পুরুষ সমান নয়" এই ফ্রেজ টা সত্যি নয়, একথা আমি এই অর্থে বলিনি যে সব পুরুষ ই 'ধর্ষক', 'যৌনহেনস্থাকারী', "খারাপ", "নিপীড়ক" । সব পুরুষ ধর্ষক নয়, এটা আমিও জানি, আপনিও জানেন। আমার বাবা, প্রেমিক, বন্ধু এদেরকেও কখনো ধর্ষন, যৌনহেনস্তা করতে দেখিনি। আসলে এই কথা বলে আমি বোঝাতে চেয়েছি প্রত্যেকজন পুরুষের মধ্যেই একটা প্রতিক্রিয়াশীল পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা, পুরুষতান্ত্রিক অহংবোধ বাস করে। কেউ সেটা দমিয়ে রাখতে পারে না, কেউ চেষ্ঠা করে দমিয়ে রাখার, কিন্তু সবসময় পারে না। এইদিক থেকে দেখলে, প্রত্যেকজন পুরুষ ই সমান। পুরুষতন্ত্রের প্রতি বিতৃষ্ণা আর পুরুষ-বিদ্বেষের মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ। কিন্তু আপনারা অনেকেই দ্বিতীয়টির সাথে আমার কথা গুলিয়ে ফেলছেন! আপনি পুরুষ বলে আপনার সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। আমার বিরোধ আপনার মধ্যে থাকা সেই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটির সাথে।
এখন হয়তো বলবেন "পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা"টি কি?? কিভাবে বুঝা যায়?? এই প্রশ্নের উত্তরে আসতে গেলে প্রথমে দেখতে হবে, পুরুষতন্ত্র কি? পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্র যাই বলা হোক না কেন, সেটার মূল তন্ত্র হলো, পিতা বা পরিবার প্রধান কোন পুরুষের কর্তৃত্ব, ক্ষমতা প্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রন। আরো সহজ করে বললে, পুরুষতন্ত্র হচ্ছে সেই ভাবনাটি, যা বলে পুরুষরা নারীর চাইতে উত্তম। সেটি বুদ্ধিতে হতে পারে, শক্তিতে হতে পারে, অর্থনীতি বা রাজনীতি, বা যে কোন কিছুতেই। আপনারা হয়তো হুট করে বলবেন, কৈ আমরা তো তা ভাবি না!! কিন্তু একটি সমাজ যদি বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী একটি ভাবনার সাথে বড় হয়, অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন অবচেতন মনেই আমরা নিজেরাই অনেক কিছু ভেবে ফেলি, বা অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আমরা বুঝিও না হয়তো, সেটি একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বড় হওয়ার কারণে আমরা এভাবে ভাবছি, বা এই কাজটি করছি।
একটা কথা ভেবে দেখুন, শুধু মাত্র পুরুষেরা লেখাপড়া শিখবে কেন? ভোট দেবে কেন? মেয়েরা দেবে না কেন? এই সমান সুযোগটা নেই কেন?” এই ভাবনাটা বেশীরভাগ মানুষের মনে এসেছিলো বলেই কিন্তু এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, বিপ্লব হয়েছে, এবং তাই নারী-পুরুষ সবার লেখাপড়ার সুযোগ, ভোটাধিকার, এগুলো হয়েছে। এখন আমরা যদি পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের মধ্যেই খুঁজে দেখতে হবে আমরা কি কি ধ্যান ধারনা অসচেতন ভাবে হলেও বহন করে চলেছি! সেগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে, আলোচনা করতে হবে, চিহ্নিত করতে হবে। একটা তন্ত্র বা সিস্টেম তো নিজে থেকে চলতে পারে না, তাকে মানুষই চালায়, তাই শুদ্ধিকরন ও এই মানুষদের ই করতে হবে।
এবারে আসি কিভাবে এই পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারনাগুলো প্রত্যেক পুরুষের মাঝে বিদ্যমান থাকে, সে বিষয়ে। নারীর মধ্যেও থাকে, কিন্তু অনেক সংখ্যক নারীরা কিন্তু এই ধ্যানধারনাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কয়েক দশক ধরে। কিন্তু কোনো পুরুষকেই নিজের ভেতরের এই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বার বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখিনি, তা থেকে বেরিয়ে আসতেও দেখিনি। অশিক্ষিত পুরুষদের ছেড়েই দিলাম। শিক্ষিত, মুক্তমনা, উদার, প্রগতিশীল, সেকুলার পুরুষটির মধ্যেও দেখিনি। সমস্যাটা সে জায়গায়।
চলুন দেখা যাক কিভাবে -
ক) আপনি বিয়ে করলেন। মেয়েটিও আপনাকে বিয়ে করলো। বিয়ের পর মেয়েটি তার টাইটেল বদলালো। আপনি উৎসাহ দিলেন অথবা দিলেন না। কিন্তু আটকালেন না। কেন? কারন আপনার ঐ সত্ত্বাটি বলছে, স্বামীর নামেই মেয়েদের পরিচয়। আপনি হিন্দু হলে, আপনার বউ সিঁদুর দিলো, ইদানিং কেউ কেউ সিঁদুর না দিলেও শাখা পলাটি ঠিকই পরছেন। এবারের ও আপনি বাঁধা দিলেন না। বেশী ভালো হলে, বললেন, "তোমার যা খুশী পরো" কিন্তু বাঁধা দিলেন না। কেন? আপনার ঐ সত্ত্বাটি মনে মনে ঠিকই বলছে, স্বামী অমূল্য ধন, তাঁর আয়ু রক্ষার্থে তোমাকে এসব পরতে হবে বৈকি। ওদিকে স্ত্রীর আয়ু রক্ষার দায় স্বামীর নেই। কারন পুরুষতন্ত্র এটা শেখায়নি। দ্বিতীয়ত, তুমি যে একজনের অধীনে আছ, সেটা তোমাকে পুরো পৃথিবীর সামনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেখাতে হবে।
খ) আপনি বাবা হয়েছেন, আপনার একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে আছে। প্রথমত ধরুন খেলনার কথা। আপনার ছেলেটিকে আপনি বন্দুক, ব্যাটবল কিনে দিচ্ছেন, মেয়েটিকে বার্বি ডল, রান্নাবাটি ইত্যাদি। কেন মেয়েটিকে পুতুল, বন্দুক বা ব্যাটবল কেন নয়? কারন অসচেতন ভাবে হলেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা আপনাকে বলছে, মেয়েদের খেলনা পুতুল, রান্নাবাটি। বড় হয়ে মেয়েটি সংসার করবে, বাচ্চা লালন পালন করবে। এখন থেকেই তাই প্রস্তুতি।
গ) বন্দুক বা ব্যাটবল বা ফুটবল পেয়ে আপনার ছেলেটি বাইরে খেলতে যেতে চাইলে আপনি আটকাবেন না। ঠিক সেভাবে আপনার মেয়েটি যদি, বাইরে মাঠে খেলতে যায়, আপনি কিন্তু তাকে যেতে দেবেন না। কেন যেতে দেবেন না?? এখানেও অসচেতন ভাবে হলেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা আপনাকে বলছে, মেয়েদের মাঠে খেলতে নেই, মাঠে ছেলেরা খেলে। মেয়েদের ঘরের বাইরে যেতে নেই, ঘরের বাইরে ছেলেরা যায়।
ঘ) এবারে আসি পোষাকে। আপনার ছেলেটিকে আপনি প্যান্ট-শার্ট, টি শার্ট কিনে দিচ্ছেন, মেয়েটিকে জামা, চুড়িদার, স্কার্ট ইত্যাদি। এখানে কিন্তু বাচ্চারা নিজে ঠিক করতে পারে তার পোশাক, তাই আপনিই ওর পছন্দটা ঠিক করে দিচ্ছেন। এখন যদি প্রশ্ন করি মেয়েটিকে জামা না দিয়ে প্যান্ট-শার্ট, টিশার্ট, কেন নয়?? এগুলোও তো পোশাক। এখানেও কিন্তু আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা কাজ করছে। আপনি ভেবেই নিচ্ছেন আপনার মেয়ে যেহেতু মেয়ে, তাই ওর পোশাক জামা। প্যান্টশার্ট ছেলেদের পোশাক। এই পছন্দ কিন্তু আপনার শিশুটি করছে না বরং আপনি তার উপর আপনার পছন্দ চাপিয়ে দিচ্ছেন। আপনার ছোটোবেলায় আপনার উপর ও এভাবে চাপানো হয়েছিলো। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এভাবেই যুগ যুগ ধরে ঠিক করে আসছে, একটা ছেলে কি পরবে, একটা মেয়ে কি পরবে, কি আচরণ করবে! এবং আপনি, আমার আপনার বাবা, ভাই কেউই এই বোধের উর্ধে উঠতে পারিনি।
ঙ) সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ার পরে যদি আপনার ছেলে বাড়ি ফিরে, অথবা স্যারের বাড়ী থেকে সন্ধ্যের পর একা ফিরে, আপনার ততোটা টেনশন হয় না, যতটা আপনার মেয়ে সন্ধ্যের পর বাড়ী ফিরলে হয়। ছেলেটিকে সন্ধ্যের পর স্যারের বাড়ী থেকে আনতে না গেলেও, মেয়েটিকে আনতে আপনি, বা আপনার বড়ছেলে, নিদেনপক্ষে মেয়েটির ছোটো ভাইটাকেই পাঠাবেন আনতে। কেন? তার কারন, আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি জানে, মেয়েদের একা বাড়ীর বাইরে চলাফেরা করতে নেই, কারন মেয়েরা দুর্বল, শক্তি কম। দ্বিতীয়ত, আপনি ভাবেন আপনার মেয়ে বাইরে গেলে তাকে শকুনের মতো ছিড়ে খাবে আপনারই স্বজাতিরা, তাই তার নিরাপত্তায় জন্য আপনি একজন পুরুষমানুষকে পাঠাচ্ছেন, যে মেয়েটিকে নিরাপদে বাড়ী নিয়ে আসবে। কারন আপনি ভাবেন পুরুষ শক্তিমান। তাই আরেক পুরুষের সাথে লড়াই করে সেই মেয়েটিকে নিরাপদে আনতে পারবে। এই ক্ষেত্রে আমার একটা প্রশ্ন আছে। আপনি বলছেন সবাই সমান নয়, কিন্তু বাইরের এই খারাপ পুরুষেরাই অন্য আরেকটি ঘরের 'ভালো' পুরুষ , বাবা, দাদা, ভাই নয় কি?
চ) যৌবনের শুরুতে আপনার ছেলে সিগারেট খাওয়া শুরু করলে, সেটা আপনার কাছে তেমন ম্যাটার করে না, ছেলেরা তো ওমন একটু আধটু খাবেই, কিন্তু আপনার মেয়েটি যদি সিগারেট ধরে, তবে তো আপনার পৃথিবী শেষ। মেয়েটিকে বকবেন, মারবেন, বাইরে যাওয়া বন্ধ করবেন। রাস্তায় আপনার বন্ধু আপনার পাশে দাড়িয়ে সিগারেট খেলে সেটাও আপনি ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না, কিন্তু কোনো মেয়ে আপনার সামনে সিগারেট খেলে, মেয়েটির চলাফেরা, চরিত্র, পারিবারিক শিক্ষা সম্পর্কে আপনি সন্দিহান হয়ে উঠবেন! কেন? কারন এখানেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা বলছে, মেয়েদের সিগারেট খেতে নেই, সিগারেট খাওয়া ছেলেদের জন্মগত অধিকার। ছেলেদের দিকে পুরুষতন্ত্র কখনো চোখ পিটপিট করে তাকায় না! আপনি জানেন সেটা। আচ্ছা, সিগারেট খাওয়া যদি খারাপ হয় , তবে তো সেটা ছেলে-মেয়ে দুজনের জন্য খারাপ। শাস্তি হলে দুজনের ই হওয়া উচিত। কিন্তু আপনি সেটা করেন না। এটাও আপনি জানেন। ঠিক একই কথা মদ খাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ছ) আপনি, আপনার স্ত্রী দুজনেই চাকরী করেন। আপনার স্ত্রীকে সকালে উঠে রান্না, চা, জলখাবার সব বানিয়ে বেরোতে হয়। রাতে এসেও সেই একই। কিন্তু আপনি এগিয়ে এসে বলছেন না, "ঠিক আছে সকালে আমি রান্না করবো, রাতে তুমি। কেন বলছেন না?? কারন আবার ও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি কানে কানে বলছে, রান্না করা মেয়েদের কাজ। ঘর সামলানো মেয়েদের কাজ। হ্যাঁ, আপনি হয়তো বলবেন আপনি মাঝে মাঝেই রান্না করেন। কিন্তু রান্না করাটা আপনার শখ না হয়ে দায়িত্ব হচ্ছে না কেন?? আপনি হয়তো এটাও বলতে পারেন, আমার বউ ভালোবেসে এসব কাজ করে। খুশী মনে এসব করে। আচ্ছা ভালোবাসা কি একমুখী?
জ) আপনি ভালো পুরুষ। আধুনিক। নারীর এগিয়ে যাওয়াতে বিশ্বাসী। বন্ধুমহলে, পারিবারিক আড্ডায় আপনি বললেন, "আমি আমার বউকে বিয়ের পরও পড়তে দিয়েছি, অথবা চাকরী করতে দিয়েছি, অথবা অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছি" ইত্যাদি প্রভৃতি। যদি বলি এসব আপনার বউয়ের জন্মগত অধিকার, আপনি দেওয়ার কে? আপনি রেগে নোংরা নারীবাদী বলে তেড়ে আসবেন। কেন জানেন?? কারন আবারো পুরুষতন্ত্র। আপনার মনের গভীরে গাঁথা হয়ে আছে, বিয়ের পর নারীর গার্জিয়ান তো স্বামী ই। সেই ঠিক করবে বউ কি করবে না করবে!!
ঝ) সম্পত্তিতে বোন ও সমান অংশীদার। কিন্তু সম্পত্তি ভাগের সময় বোনকে সমান অংশ দেওয়া হয় না। আপনি শিক্ষিত, আধুনিক, মুক্তমনা। কিন্তু আপনিও দিচ্ছেন না। কেন?? কারন আবার সেই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা কাজ করছে। বোন তো পরের ঘরে যাবে। সেখানে পাবে আরো অর্ধেক। মেয়েরা তো সমান অংশের দাবীদার হতে পারে না। সেকথা মরিয়া হয়ে বোঝাতে আপনি ধর্মের আইন আনবেন, রাষ্ট্রের আইন আনবেন। কিন্তু একবারো এটা বুঝতে চাইবেন না, আইন, নিয়ম তো মানুষের সৃষ্টি। এগুলো বদলানো যায়, এমেন্ড করা যায়। সতীদাহ প্রথা বা বিধবা বিবাহ, এগুলোও কিন্তু বদলানো হয়েছিলো, সামাজিক সমতার প্রয়োজনে।
ঞ) আপনি মেয়ের বাবা। মেয়ের বিয়ে দেবেন। মেয়ে যতই উচ্চশিক্ষিত হোক না কেন, খাট, আলমারি, গয়না, টাকা পয়সা ইত্যাদি দিয়ে মেয়েকে পরের ঘরে পাঠালেন। আবার ছেলের বিয়ের সময় কিন্তু এসব কিছুই বউয়ের ঘরে পাঠালেন না। কেন? এখানেও অসচেতন ভাবে হলেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি কাজ করছে। মেয়ে পিতার বোঝা। তাকে সোনা গয়না এসব দিয়ে পার করাতে হয়। মেয়েদের শিক্ষার কোনো দাম নেই। স্বামীর ঘরে তার দাম বাড়াতে তাই দামী খাট, আসবাব, সোনা। ছেলেরা হীরের আংটি। ছেলের বউ হয়ে আসা সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাই ছেলের বিয়েতে ছেলের বউয়ের বাড়ী এসব কিছুই পাঠাতে হয় না। অসচেতন ভাবে হলেও আপনি মানেন, ছেলেরা বিয়ে করে, আর মেয়েদের বিয়ে হয়!
ট) মেয়ের বাবা আপনি। মেয়ের বিয়ে কোনো অবস্থাতেই বেকার ছেলের সাথে দেবেন না। মেয়েটির প্রেমিক যদি বেকার হয়, এই সম্পর্কে আপনি কখনোই রাজি হবেন না। মেয়েটি যদি চাকরি করে, তাও না। কেন?? এখানেও ঐ পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা। শিক্ষিত, নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাসী আপনিও মনে মনে ভাবেন, মেয়েদের ভরনপোষনের দায়িত্ব ছেলেটির। ছেলেকে আবার মেয়ে চাকরি করে কেন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে!! ছি ছি এ আবার হয় নাকি!!
আরো হাজারো উদাহরন টেনে এনে আপনাকে প্রশ্নের মুখে দাড় করাতে পারি আমি। আপনি ধর্ষন করেন না, যৌনহেনস্তা করেন না, এসিড আক্রমন করেন না, বৌকে মারেন না, কিছুই করেন না। কিন্তু তারমানে এই নয় আপনি মহান। যতদিন অব্দি নিজের ভেতরের সব পুরুষতান্ত্রিক গুণাবলী থেকে মুক্ত হয়ে, পূর্ণাঙ্গ মানুষ রূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারছেন, ততদিন আমি আপনাকে মহান ভাবতে পারবো না। ততদিন অব্দি আমি বলেই যাবো সব পুরুষ সমান তার ভেতরের পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বার জন্য, পুরুষ অহংবোধের জন্য।
এই যে নারীমুক্তি নিয়ে বড় বড় ভাষন হয়, "নারীকে জাগতে হবে", "অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে" ইত্যাদি প্রভৃতি, আসলে নারীমুক্তি তখনই সম্ভব, যখন একজন নারী এগিয়ে যাওয়ার সময় তার পরিবার, সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের সমর্থন পাবে। কারন রোজ রোজ যদি আমার অধিকার নিয়ে ঘরে বাইরে পুরুষদের সাথে ঝগড়া করতে হয়, (কারন অধিকার ছিনিয়ে আনতে গেলে ঝগড়া হবেই) তাহলে একটা সময় আপনারাই তকমা দেবেন "কি মুখরা", 'কি ঝুগড়ুটে', 'কি পুরুষবিদ্ধেষী' এইসব বিশেষণে। আর আমিও একটা সময় ক্লান্ত হয়ে, উপরন্তু যদি মানসিকভাবে দুর্বল হই, এইসব তকমাগুলো থেকে বাঁচতে সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্ঠা করে যাবো।
একজন নারীকে, সে স্ত্রী হোক, বোন হোক, মেয়ে হোক, তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দিতে গেলে, মন থেকে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে লাগে, তাকে মানুষ ভাবার দুঃসাহস থাকতে লাগে। পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্র যাই বলি না কেন, সেটা আপনাদের শ্রেষ্ঠ বানিয়েছে, মাথায় তুলে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু নারীর চলার পথে তাকে সর্ব অবস্থায় সমর্থন করার মতো মানসিক শক্তি দেয়নি।
এবার আসি আমার কথায়। আমি যখন বলি বা লিখি, সংখ্যালঘু/দলিত/আধিবাসী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, দেশজোড়া মোদী ওয়েভের বিরুদ্ধে, তখন কিন্তু মুক্তমনা, আধুনিক, প্রগতিশীল, উদারমনা এই আপনারা কখনোই বলেন না, এভাবে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করবেন না, সংখ্যালঘু/দলিত/আধিবাসীদের জন্য আলাদা করে কোনো আন্দোলনের প্রয়োজন নেই, এভাবে একশ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্ধেষ ছড়ানোর দরকার নেই, আপনার বাবাও পুরুষ, আসুন সব মানুষের কথা বলি, মানবতার কথা বলি, সব মানুষ এক নয়! বরং তখন আপনাদের প্রশংসা, সহযোগীতা, পাশে থাকায় আমি ভেসে যাই।
কিন্তু যখন আমি বলি, পুরুষেরা নারীকে ধর্ষন করে, পুরুষেরা নারীর মুখে এসিড ছুড়ে মারে, পুরুষেরা যৌনহেনস্তা করে, পুরুষেরা ইভটিজিং করে, পুরুষের জন্য নারী অনিরাপদ, পুরুষেরা ধর্ষনের ভিডিও চড়া দামে বিক্রি করে, ঠিক তখনই আপনারা আমায় 'খ' বর্গীয় , 'ম' বর্গীয় গালি দিয়ে বলেন, আপনি তো বড় ইতর, বড় বদ, আপনার বাবা কি পুরুষ নন?, এভাবে নারী-পুরুষ আলাদা করবেন না, এভাবে পুরুষবিদ্ধেষ ছড়াবেন না, এভাবে পুরুষকে গালি দেবেন না, এভাবে নারীর জন্য আলাদা কোনো আন্দোলনের দরকার নেই, তারচেয়ে মানববাদী হোন, সব পুরুষ এক নয়।
স্কুলে সমাজবিজ্ঞানে আমি, আপনি সবাই পড়ে এসেছি, মুখস্ত করে পরীক্ষায় খাতায় বমি করে এসেছি, 'ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক'। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীর মুখে, পুরুষতান্ত্রিক, পুরুষ শব্দগুলো শুনলেই আপনারা আক্রমণাত্বক হয়ে উঠেন। র্যাডিকাল নারীবাদী, অতি নারীবাদ, এইসব তকমা দেন। ভাবেন এই বুঝি আপনাদের সময়ের সাথে উদার, মহান, সেকুলার সাজা সিংহাসন ধরে কেউ টান মেরে দিলো!
ভয়ংকর নারীবিদ্ধেষী সমাজব্যবস্থায় আপনারা যখন আমাকে পুরোষবিদ্ধেষী আখ্যা দেন, আমি হেসে গড়াগড়ি খাই। আমার মধ্যে সেই শিশুটাকে খুঁজে পাই, যে সমবেত প্রশংসাবাক্যের মধ্যে গলা তুলে জিজ্ঞেস করেছিলো, “রাজা, তোর কাপড় কোথায়?”
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন