এই ব্লগটি সন্ধান করুন

রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

বেঁচে থাকার গল্পগুলো... 
________________________

কর্মসুত্রে রোজ অনেক মানুষের সাথে দেখা হয়। তারা কেউ আমার সহযাত্রী, কেউ কলিগ, কেউ ছাত্রছাত্রী, কেউ বা সম্পূর্ণ অচেনা কেউ। তারা সবাই আলাদা আলাদা হলেও, তাদের সবার একটা জায়গায় আমি খুব মিল পাই!! নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বললে তারা রীতিমত আঁতকে উঠেন! তারা মনে করেন নারী পুরুষের সমকক্ষ তো নয়ই, নারী পুরুষের তুলনা টানাও হাস্যকর। এ চিন্তা যে শুধু পুরুষেরা করেন তা কিন্তু নয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি বেশীরভাগ নারীও এই চিন্তাকে ধারন ও লালন করেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা শুধু যে পুরুষদের নিজেকে মহান ভাবতে শিখিয়েছে, তা কিন্তু নয়, সাথে নারীকেও নিজেকে হীন ভাবতে শিখিয়েছে। আজকের যুগেও বেশীরভাগ নারী নিজেকে পুরুষের তুলনায় দুর্বল, অসহায় ভাবেন। নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়, নির্যাতন, হেনস্থাকে নিজের নিয়তি বলে ভাবেন। 

রোজকার জীবনে আমার সঙ্গে দেখা হওয়া প্রত্যেকজন নারীকে আমি এইসব ধারনা থেকে বের করে আনতে চাই। তাদের সাথে কথা বলি, বোঝাই। তাতে অনেকে বুঝে। তাদের জীবনের গল্পগুলো বলে, পরামর্শ চায়। অনেকে তাদের জীবনের লড়াইয়ের গল্প বলে, যে গল্পগুলো শুনে নতুন করে উজ্জীবিত হই। অনেকে তাদের জীবনের হতাশার গল্প বলে। তাদেরকে আমি আশার গল্প শোনাই। এই আশা নিরাশার গল্পগুলোই এবার থেকে একটু গুছিয়ে বলার চেষ্ঠা করবো। 

এক : 

একজন দিদির গল্প দিয়ে শুরু করি। সদ্য একটা স্কুলে চাকরী পেয়েছি। সকাল সাড়ে সাতটায় ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে একঘন্টার জার্নি, তারপর স্কুল। গাড়ি বলতে ছোটো গাড়ি, যার মাঝখানের সিট মুখোমুখি। দুদিকে চারজন করে মোট আটজন বসতে পারে। সামনের সিটে তিনজন। পেছনের সিটে চারজন। সকালের গাড়িতে আমরা বেশীরভাগ মেয়েরাই যাই। প্রায় সবাই ই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। কেউ বিবাহিত, কেউ অবিবাহিত। কদিন আগে  এভাবেই একসকালে গাড়িতে করে যাচ্ছি। পাশে দুজন দিদি বসেছেন। একজনের বয়স বত্রিশ বা তেত্রিশ হবে, বিবাহিত। অন্যজনেরও তাই। প্রথমজন খুব রোগা, সারামুখে ক্লান্তি আর দুর্বলতার ছাপ। তার তুলনায় দ্বিতীয়জনের স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালো। দুজনেই সংসারের গল্প করছেন। যেটুকু কথা কানে আসলো, তাতে বুঝলাম দুজনেরই দুটো করে সন্তান আছে। একজনের দুই ছেলে। একজনের এক ছেলে, আর দেড় বছরের মেয়ে আছে একটা।  প্রথম দিদির নাম ধরুন 'ক' এবং দ্বিতীয়জনের নাম 'খ'। 'ক' দিদি  খ' দিদিকে বলছেন তার ননদের কথা। যার কিনা বিয়ে হয়েছিলো এবং এখন বর্তমানে স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ী চলে এসেছে। স্বামী রাগী স্বভাবের এবং মাঝে মাঝে ননদটিকে মারত, বকাঝকা করত। এদিকে ননদটিও নাকি রাগী। তো তাই নিয়ে ক'দিদির দুঃখের শেষ নেই। খ'কে বলছেন - " যতই বলো দিদি, মেয়েমানুষের এত রাগ ভালো না, স্বামী দুকথা বলতেই পারে, কারন সে স্বামী, মেয়েদের তাই বলে স্বামীর মুখে মুখে তর্ক করতে নেই। মারুক , বকুক যাই করুক, ঐ স্বামীর ভিটেতেই মেয়েদের আসল ঘর, বাপের ঘর তো দুদিনের।" শুনে খ দিদি বললেন - "ঠিক বলেছো দিদি। মেয়েমানুষের সবদিক দেখে শুনে চলতে হয়। মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হয়।আমরা কি মানিয়ে গুছিয়ে চলছি না!" এতটুকু অব্দি শুনে একটু ঘুমোবো ঘুমোবো করছি। এমনসময় শুনি 'ক' দিদি বলছে 'খ' দিদিকে, "আসলে আমার ননদের স্বভাব ভালো নয়, সবেতেই শুধু রাগ করে, খুব মুখরা। এত মুখরা মেয়েকে কি কোনো স্বামী রাখতে  চায়? মেয়েদের হতে হয় মাটির মত। নারী রাগলে তার দু-কূল যায়!"

এতক্ষণ ধৈর্য্য ধরে চুপ থাকলেও, তারপর আর থাকতে পারলাম না। ক' দিদিকে জিঞ্জেস করলাম, মেয়েদের রাগ করতে নেই, রাগ শুধু ছেলেদের - এই নিয়ম কে করেছে দিদি?? রাগ একটা ইমোশন। যেরকম আমরা হাসি, কাঁদি, ঠিক সেরকম অনেকসময় রাগ করি। প্রত্যেক মানুষের ইমোশনের লেভেল আলাদা হয়। অনেকের রাগ কম, অনেকের বেশী। তারসাথে ছেলে মেয়ের সম্পর্ক কি?? নাকি মেয়েদের মানুষের পর্যায়ে ফেলতে নেই? কোনটা? আপনি ভেবে বলুন তো?? গাড়ির সবাই ততক্ষণে আমার দিকে ফিরে দেখছে। "ক" দিদি ভাবতে পারেনি আমি এভাবে বলবো। সে একটু আমতা আমতা করে চুপ করে গেলো। আমি না থেমে বললাম, শুনুন দিদি, এই যে আপনি আপনার ননদের কথা বলছেন, সে তো প্রশংসার যোগ্য। কারন সে স্বামীর মার, বকা খেয়ে পড়ে থাকেনি। প্রতিবাদ করেছে। বেরিয়ে এসেছে। এইসময় তো আপনাদের সবার ওর পাশে থাকার কথা ছিলো। অনেক সাহস করে সে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সবাই পারে না। কারন ছোটোবেলা থেকে আমাদের মা-মাসীরাই আমাদের মগজে ঠুসে দেন ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। সেই ঠুসে দেওয়া থেকে আমরা সহজে বেরিয়ে আসতে পারি না। কেউ কেউ যদি বেরিয়ে আসার সাহস দেখায় তবে তার পাশে থাকার চেষ্ঠা করবে, হেয় নয়। তুমি তো চাকরী করছো, পড়াশুনো করেছো। তুমি বলোতো সংসার কি শুধু মেয়ের গুণে সুখী হয়? স্বামীর কোনো গুণ লাগে না?? সংসার তো স্বামী-স্ত্রী দুজনের। তাহলে শুধু স্ত্রীর গুণই ধরা হবে কেন?? স্ত্রীটিকেই সবকিছু সহ্য করে মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হবে কেন?? 

ঘরে ঘরে মায়েরা মেয়েদের শেখাচ্ছেন, "বরের ঘর থেকে চিতায় উঠার সময়ই বেরোবে,তার আগে নয়।" তার আগে বেরোলে লজ্জা। তার আগে বেরোলে অসম্মান। স্বামীর ঘর ছাড়া তোমার আর কোনো ঘর নেই। বেশীরভাগ মেয়েরাও তাই শত অসম্মানে, শত হেনস্থায়, শত নির্যাতনে আটকে আছে  সেখানে। কারন সে কোথায় যাবে? নিজের ঘর বলে তো তার কোনো ঘরই নেই। নিজের মা-বাবা, ভাই-বোনরাই তাকে বোঝা মনে করবে। ঠিক এই তোমার মতোই মেয়েটির সম্পর্কে  কথা বলবে, পাড়ায়, রাস্তায়, গাড়ীতে, সর্বত্র। 

খবরের কাগজ, টিভি এগুলো খুললেই দেখা যায় নারী নির্যাতন, পারিবারিক হিংসা, ধর্ষন, শ্লীলতাহানীর খবরে ভরা। আমাদের মা, মাসীরা হয়তো এত পড়াশুনা করেননি, আর্থিক স্বাবলম্বীতাও ছিলো না। ভুলকে মনে মনে ভুল জানলেও সেটাকে মুখ ফুটে বলতে পারেন নি। কিন্তু আমরা তো পড়াশুনো করছি। চাকরি নোকরি করছি। আমাদের মেয়েদের, আমাদের আগামী প্রজন্মকে আমরা কি শেখাচ্ছি?? তাদেরকেও কি আমাদের মা মাসীর মত সেই একই রেকর্ড শুনিয়ে যাবো? নিজের জীবন দিয়ে যে অভিজ্ঞতা করছি, সেই একই আগুনে নিজের মেয়েদেরও ঠেলে দেব?? একটা কথা জেনে রাখবে যে শিক্ষা, যে আর্থিক মুক্তি আমাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধের জন্ম দেয় না, সেই শিক্ষা আর কুশিক্ষার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই!!  তাই আজ থেকে, নিজের মেয়ে, বোন, ননদ, বন্ধু, আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী প্রত্যেকটা মেয়েকে শেখাতে চেষ্ঠা কর, স্বামী মারলে মেয়েটি কি করবে? স্বামীর পরিবার অত্যাচার করলে মেয়েটি কি করবে? কথায় কথায় গলাধাক্কা, মারধর, গালাগাল করলে মেয়েটি কি করবে?? স্বামী যৌন অত্যাচার করলে মেয়েটি কি করবে?? স্বামী পরনারীতে আসক্ত হলে মেয়েটি কি করবে? মেয়েটিকে শেখাও স্বামীর বাড়িই মেয়েদের একমাত্র ঠিকানা নয়।তার আর একটা বাড়ীও আছে এবং সারাজীবন সেটা তারই থাকবে। বিয়ে মানেই নিজের বাড়ীর উপর থেকে অধিকার চলে যাওয়া নয়! 

অনেকক্ষণ চুপ করে শুনে 'ক' দিদি  আমায় বলল, দিদি তো এখনো বিয়ে করোনি, তাই বুঝবে না সংসারের নিয়ম!! আমি বললাম, দিদি সংসার সেটা নয়, যেখানে আমাকে কারো অধীনে থাকতে হয়, কারো মর্জিমত চলতে হয়! বরং সংসার সেটা, যা দুজন মানুষের পারস্পরিক সহযোগীতায় গড়ে উঠে। সংসার সেটা যেখানে স্বামীটি তার স্ত্রীর মানুষ হিসেবে পাওয়া অধিকারগুলোকে সম্মান দেয়। স্ত্রীকে নিজের দাস না ভেবে, তার অধিকার আদায়ে যে স্বামীটি সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে থাকে, সেটাই সংসার দিদি। মানুষের সংসার। রাজা আর দাসীর সংসার কখনো মানুষের সংসার হতে পারে না। কথাগুলো ভেবে দেখবে। 

গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ায়, খানিকটা রাগের সাথেই এই কথাগুলো বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। স্কুল থেকে ফেরার সময় 'ক' দিদির সাথে আর দেখা হয়নি সেদিন। দেখা হলো তার পরেরদিন। গাড়িতে ওঠার সময় দেখি  'ক' দিদি আমার জন্য সিট রেখেছেন তার পাশে। আমি তার দিকে চেয়ে হাসলাম। 'ক' দিদি বললো,  "দিদি তোমার সেদিনের কথাগুলো আমি ঘরে গিয়ে অনেক ভেবেছি। আমার ননদের সাথেও কথা বলেছি। এই প্রথমবার  আমি আমার ননদকে জিজ্ঞেস করেছি স্বামীর বাড়িতে ঠিক কি কি সমস্যা হয়েছে ওর সাথে। এবং বলেছি আমি ওর পাশে আছি।" আমি হেসে বললাম এইতো একদম ঠিক করেছো দিদি। 

এই কদিনের যাওয়া আসাতে 'ক' দিদি তার নিজের জীবনের হতাশাগুলো একটু একটু করে ভাগ করেছে আমার সাথে। শুধু শুনে গেছি, আর ভেবেছি যুগ যুগ ধরে প্রত্যেকটা মেয়ের জীবনের গল্পগুলো কি নিদারুনভাবে একই। সময় বদলাচ্ছে, যুগ বদলাচ্ছে, আমরা ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি, কিন্তু গল্পগুলো একই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করেছিলো, সে মরেনি, আর আমাদের কাদম্বরীরা রোজ বেঁচে থেকে প্রমাণ করছে তারা বেঁচে নেই!! 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন