এই ব্লগটি সন্ধান করুন

বৃহস্পতিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৭

এক পুরুষবিদ্বেষীর জবানবন্দি
________________________



প্রথমেই ডিসক্লেইমার দিয়ে রাখা ভালো, যা দিনকাল চলছে। কে কখন কোথা থেকে কোন তকমা লাগিয়ে দেবে, জানা তো নেই !! পাকিস্থান যাওয়ার হুমকি অনেকবার পেয়ে গেছি, দেশদ্রোহী তো বাই ডিফল্ট হয়েই আছি, 'খ' বর্গীয়, 'ম' বর্গীয় তকমাগুলোও পেয়ে গেছি, ইদানিং শুনছি  পুরুষবিদ্বেষী, তাই ডিসক্লেমার দিয়ে রাখা ভালো। 

ডিসক্লেইমার : ক) আমি একজন মানুষ। আপনাদের ভাষায় 'মেয়েমানুষ'। জন্মেছিও প্রত্যেকটা মানুষ যে প্রসেসের মধ্যে দিয়ে জন্মায়, সেভাবে। মেয়ে হয়েই জন্মাবো, করিমগঞ্জেই জন্মাবো, মুসলিম ঘরেই জন্মাবো, এরকম কোনো প্ল্যান করে আসিনি। বিষয়টা  আমার হাতেও ছিলো না। তাই নারী, পুরুষ, ধর্ম,  এগুলোকে  ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট হিসেবেই বয়ে চলি, এরজন্যে আলাদা করে কোনো গর্ব বা বিদ্বেষ অনুভব হয় না। 

খ) প্রত্যেকটা পুরুষের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারবো না, কারন এই পুরুষেরই কেউ আমার বাবা, কেউ প্রেমিক, কেউ বন্ধু। কিন্তু তা বলে তাদেরকে মাথায় তুলে নাচার, বা পূজো করার মানসিকতা আমার নেই। বাবা'কে ভালোবাসি, আমার আমি হয়ে উঠার মধ্যে তাঁর অবদান অনেক। তা বলে,আমার বাবাও যে সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারনা মুক্ত একজন মানুষ, একথা একশ ভাগ জোর দিয়ে বলতে পারবো না। পরিবারের প্রধান কর্তা শুধু বাবা একথা মানতেও আমার আপত্তি আছে। কারন আমি আমার মা'কেও সমানভাবে পরিবারের কর্ত্রী ভাবি। 

গ) অর্থনৈতিক ভাবে আমি বাবা, প্রেমিক বা ভাই কারো উপর নির্ভরশীল নই। কখনোই ছিলাম না। তাদের টাকায় নিজের নেট রিচার্জ টাও করছি না, কোনোদিন করেছি বলেও মনে পড়ছে না। আজন্ম মা'কেই চাকরী করে সংসার চালাতে দেখেছি এবং বাবাকে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণ কর্মী।   এবং পড়াশুনা শেষ করে আমরা চার বোন ই রোজগার করে সংসার চালাচ্ছি। এক্ষেত্রে  অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত বলতে পারেন। কিন্তু শুধুমাত্র অর্থনৈতিক মুক্তিই যে স্বাধীনতা এনে দেয়, একথাও একশ ভাগ মানতে আমার আপত্তি আছে। 

ঘ) প্রেমিক একজন আছে  (লিখতে গিয়ে গাল লাল হয়ে গেল!) । কিন্তু সেই প্রেমিকের টাকায় কোনোদিন ফুর্তি করিনি। কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেও বিলের বোঝা প্রেমিকের ঘাড়ে চাপাইনি। নিজেই মিটিয়েছি। বন্ধুদের সঙ্গে খেতে গেলেও বিল নিজেই মেটাই।  প্রেমিক, ছেলে, সেজন্য তারই রিচার্জ করে ফোন করতে হবে, অথবা আমাকে রিচার্জ করিয়ে দিতে হবে, একথা মানতেও আত্মসম্মানে লেগেছে। বরং প্রেমিক ফোন করলে কেটে  নিজের ফোন থেকে ফোন করি।

ঙ) বাসে/গাড়িতে সিট সংরক্ষণের ব্যাপারটিও মেনে নিতে পারি না। কারন নিজেকে কানা, খোড়া, বিকলাঙ্গ, বয়স্ক কিছুই মনে হয়না। গাড়ীতে অন্যান্য সহযাত্রীরা যেভাবে যান, সেভাবেই যাই। কখনো অটোর সামনে বসে, কখনো গাড়ীর পেছনের সিটে বসে, মানে বলতে চাইছি যখন যেভাবে সিট পাই, যাই। চাকরী ও নিজ যোগ্যতায় পেয়েছি। আজ অব্দি মেয়ে হওয়ার সুবাদে জীবনের কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি কোনো সুবিধা নিয়েছি বলে মনে করতে পারছি না। 

চ)  ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা,  গালাগালির মধ্যে কারা যেন আমাকে নারীবাদী বলছিলেন। তাদের বলে রাখি, আমাকে কেউ নারীবাদী বললে সেটাকে আমি গালি হিসেবে নেই না। বরং বিনয়ে অবনত হয়ে যাই, কারণ এ আমার কাছে বিরাট সম্মানের ব্যাপার, আর যদ্দূর জানি, সে সম্মানের যোগ্য এখনো পুরোপুরি হয়ে ওঠতে পারিনি । আমি নারীবাদকে এখনো পুরোপুরি পড়ে ওঠতে পারিনি, তাই এ বিষয়ে বেশী কিছু বলতে ও পারবো না। তবে এটুকু জানি, পৃথিবীকে অনেক ভালো জায়গা বানাবার ক্ষমতা রাখে নারীবাদের আদর্শ।

এবারে আসি আসল কথায়। "সব পুরুষ সমান নয়" এই ফ্রেজ টা সত্যি নয়, একথা আমি এই অর্থে বলিনি যে সব পুরুষ ই 'ধর্ষক', 'যৌনহেনস্থাকারী', "খারাপ", "নিপীড়ক" । সব পুরুষ ধর্ষক নয়, এটা আমিও জানি, আপনিও জানেন। আমার বাবা, প্রেমিক, বন্ধু এদেরকেও কখনো ধর্ষন, যৌনহেনস্তা করতে দেখিনি। আসলে এই কথা বলে আমি বোঝাতে চেয়েছি প্রত্যেকজন পুরুষের মধ্যেই একটা প্রতিক্রিয়াশীল পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা, পুরুষতান্ত্রিক অহংবোধ বাস করে। কেউ সেটা দমিয়ে রাখতে পারে না, কেউ চেষ্ঠা করে দমিয়ে রাখার, কিন্তু সবসময় পারে না। এইদিক থেকে দেখলে, প্রত্যেকজন পুরুষ ই সমান। পুরুষতন্ত্রের প্রতি বিতৃষ্ণা আর পুরুষ-বিদ্বেষের মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ। কিন্তু আপনারা অনেকেই দ্বিতীয়টির সাথে আমার কথা গুলিয়ে ফেলছেন! আপনি পুরুষ বলে আপনার সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। আমার বিরোধ আপনার মধ্যে থাকা সেই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটির সাথে। 

এখন হয়তো বলবেন "পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা"টি কি?? কিভাবে বুঝা যায়?? এই প্রশ্নের উত্তরে আসতে গেলে প্রথমে দেখতে হবে, পুরুষতন্ত্র কি?  পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্র যাই বলা হোক না কেন, সেটার মূল তন্ত্র হলো, পিতা বা পরিবার প্রধান কোন পুরুষের কর্তৃত্ব, ক্ষমতা প্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রন। আরো সহজ করে বললে, পুরুষতন্ত্র হচ্ছে সেই ভাবনাটি, যা বলে পুরুষরা নারীর চাইতে উত্তম। সেটি বুদ্ধিতে হতে পারে, শক্তিতে হতে পারে, অর্থনীতি বা রাজনীতি, বা যে কোন কিছুতেই। আপনারা হয়তো হুট করে বলবেন, কৈ আমরা তো তা ভাবি না!! কিন্তু একটি সমাজ যদি বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী  একটি ভাবনার সাথে বড় হয়,  অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন অবচেতন মনেই আমরা নিজেরাই অনেক কিছু ভেবে ফেলি, বা অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আমরা বুঝিও না হয়তো, সেটি একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বড় হওয়ার কারণে আমরা এভাবে ভাবছি, বা এই কাজটি করছি। 

একটা কথা ভেবে দেখুন, শুধু মাত্র পুরুষেরা লেখাপড়া শিখবে কেন? ভোট দেবে কেন? মেয়েরা দেবে না কেন? এই সমান সুযোগটা নেই কেন?” এই ভাবনাটা বেশীরভাগ মানুষের মনে এসেছিলো বলেই কিন্তু এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, বিপ্লব হয়েছে, এবং তাই নারী-পুরুষ  সবার লেখাপড়ার সুযোগ, ভোটাধিকার, এগুলো হয়েছে। এখন আমরা যদি পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের মধ্যেই খুঁজে দেখতে হবে আমরা কি কি ধ্যান ধারনা অসচেতন ভাবে হলেও বহন করে চলেছি! সেগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে, আলোচনা করতে হবে, চিহ্নিত করতে হবে। একটা তন্ত্র বা সিস্টেম তো নিজে থেকে চলতে পারে না, তাকে মানুষই চালায়, তাই শুদ্ধিকরন ও এই মানুষদের ই করতে হবে। 

এবারে আসি কিভাবে এই পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারনাগুলো প্রত্যেক পুরুষের মাঝে বিদ্যমান থাকে, সে বিষয়ে। নারীর মধ্যেও থাকে, কিন্তু অনেক সংখ্যক নারীরা কিন্তু এই ধ্যানধারনাগুলোর  বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কয়েক দশক ধরে। কিন্তু কোনো পুরুষকেই নিজের ভেতরের এই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বার বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখিনি, তা থেকে বেরিয়ে আসতেও দেখিনি। অশিক্ষিত পুরুষদের ছেড়েই দিলাম।  শিক্ষিত, মুক্তমনা, উদার, প্রগতিশীল, সেকুলার পুরুষটির মধ্যেও দেখিনি। সমস্যাটা সে জায়গায়। 

চলুন দেখা যাক কিভাবে - 

ক) আপনি বিয়ে করলেন। মেয়েটিও আপনাকে বিয়ে করলো। বিয়ের পর মেয়েটি তার টাইটেল বদলালো। আপনি উৎসাহ দিলেন অথবা দিলেন না। কিন্তু আটকালেন না। কেন? কারন আপনার ঐ সত্ত্বাটি বলছে, স্বামীর নামেই মেয়েদের পরিচয়। আপনি হিন্দু হলে, আপনার বউ সিঁদুর দিলো, ইদানিং কেউ কেউ সিঁদুর না দিলেও শাখা পলাটি ঠিকই পরছেন। এবারের ও আপনি বাঁধা দিলেন না। বেশী ভালো হলে, বললেন, "তোমার যা খুশী পরো" কিন্তু বাঁধা দিলেন না। কেন? আপনার ঐ সত্ত্বাটি মনে মনে ঠিকই বলছে, স্বামী অমূল্য ধন, তাঁর আয়ু রক্ষার্থে তোমাকে এসব পরতে হবে বৈকি। ওদিকে স্ত্রীর আয়ু রক্ষার দায় স্বামীর নেই। কারন পুরুষতন্ত্র এটা শেখায়নি।  দ্বিতীয়ত, তুমি যে একজনের অধীনে আছ, সেটা তোমাকে পুরো পৃথিবীর সামনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেখাতে হবে। 

খ) আপনি বাবা হয়েছেন, আপনার একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে আছে। প্রথমত ধরুন খেলনার কথা। আপনার ছেলেটিকে আপনি বন্দুক, ব্যাটবল কিনে দিচ্ছেন, মেয়েটিকে বার্বি ডল, রান্নাবাটি ইত্যাদি। কেন মেয়েটিকে পুতুল, বন্দুক বা ব্যাটবল কেন নয়? কারন অসচেতন ভাবে হলেও  আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা আপনাকে বলছে, মেয়েদের খেলনা পুতুল, রান্নাবাটি। বড় হয়ে মেয়েটি সংসার করবে, বাচ্চা লালন পালন করবে। এখন থেকেই তাই প্রস্তুতি।

গ) বন্দুক বা ব্যাটবল বা ফুটবল পেয়ে আপনার ছেলেটি বাইরে খেলতে যেতে চাইলে আপনি আটকাবেন না। ঠিক সেভাবে আপনার মেয়েটি যদি, বাইরে মাঠে খেলতে যায়, আপনি কিন্তু তাকে যেতে দেবেন না। কেন যেতে দেবেন না?? এখানেও অসচেতন ভাবে হলেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা আপনাকে বলছে, মেয়েদের মাঠে খেলতে নেই, মাঠে ছেলেরা খেলে। মেয়েদের ঘরের বাইরে যেতে নেই, ঘরের বাইরে ছেলেরা যায়।

ঘ) এবারে আসি পোষাকে। আপনার ছেলেটিকে আপনি প্যান্ট-শার্ট, টি শার্ট কিনে দিচ্ছেন, মেয়েটিকে জামা, চুড়িদার, স্কার্ট ইত্যাদি। এখানে কিন্তু বাচ্চারা নিজে ঠিক করতে পারে তার পোশাক, তাই আপনিই ওর পছন্দটা ঠিক করে দিচ্ছেন।  এখন যদি প্রশ্ন করি মেয়েটিকে জামা না দিয়ে প্যান্ট-শার্ট, টিশার্ট, কেন নয়?? এগুলোও তো পোশাক।  এখানেও কিন্তু আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা কাজ করছে। আপনি ভেবেই নিচ্ছেন আপনার মেয়ে যেহেতু মেয়ে, তাই ওর পোশাক জামা। প্যান্টশার্ট ছেলেদের পোশাক। এই পছন্দ কিন্তু আপনার  শিশুটি করছে না বরং আপনি তার উপর আপনার পছন্দ চাপিয়ে দিচ্ছেন। আপনার ছোটোবেলায় আপনার উপর ও এভাবে চাপানো হয়েছিলো। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এভাবেই যুগ যুগ ধরে ঠিক করে আসছে, একটা ছেলে কি পরবে, একটা মেয়ে কি পরবে, কি আচরণ করবে! এবং আপনি, আমার আপনার বাবা, ভাই কেউই এই বোধের উর্ধে উঠতে পারিনি। 

ঙ) সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ার পরে যদি আপনার ছেলে বাড়ি ফিরে, অথবা স্যারের বাড়ী থেকে সন্ধ্যের পর একা ফিরে, আপনার ততোটা টেনশন হয় না, যতটা আপনার মেয়ে সন্ধ্যের পর বাড়ী ফিরলে হয়। ছেলেটিকে সন্ধ্যের পর স্যারের বাড়ী থেকে আনতে না গেলেও, মেয়েটিকে আনতে আপনি, বা আপনার বড়ছেলে, নিদেনপক্ষে মেয়েটির ছোটো ভাইটাকেই পাঠাবেন আনতে। কেন? তার কারন,  আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি জানে, মেয়েদের একা বাড়ীর বাইরে চলাফেরা করতে নেই, কারন মেয়েরা দুর্বল, শক্তি কম। দ্বিতীয়ত, আপনি ভাবেন আপনার মেয়ে বাইরে গেলে তাকে শকুনের মতো ছিড়ে খাবে আপনারই স্বজাতিরা, তাই তার নিরাপত্তায় জন্য আপনি একজন পুরুষমানুষকে পাঠাচ্ছেন, যে মেয়েটিকে নিরাপদে বাড়ী নিয়ে আসবে। কারন আপনি ভাবেন পুরুষ শক্তিমান। তাই আরেক পুরুষের সাথে লড়াই করে সেই মেয়েটিকে নিরাপদে আনতে পারবে। এই ক্ষেত্রে আমার একটা প্রশ্ন আছে। আপনি বলছেন সবাই সমান নয়, কিন্তু বাইরের এই খারাপ পুরুষেরাই অন্য আরেকটি ঘরের 'ভালো' পুরুষ , বাবা, দাদা, ভাই নয় কি? 

চ) যৌবনের শুরুতে আপনার ছেলে সিগারেট খাওয়া শুরু করলে, সেটা আপনার কাছে তেমন ম্যাটার করে না, ছেলেরা তো ওমন একটু আধটু খাবেই, কিন্তু আপনার মেয়েটি যদি সিগারেট ধরে, তবে তো আপনার পৃথিবী শেষ। মেয়েটিকে বকবেন, মারবেন, বাইরে যাওয়া বন্ধ করবেন। রাস্তায় আপনার বন্ধু আপনার পাশে দাড়িয়ে সিগারেট খেলে সেটাও আপনি ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না, কিন্তু কোনো মেয়ে আপনার সামনে সিগারেট খেলে, মেয়েটির চলাফেরা, চরিত্র, পারিবারিক শিক্ষা সম্পর্কে আপনি সন্দিহান হয়ে উঠবেন!  কেন?  কারন এখানেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা বলছে, মেয়েদের সিগারেট খেতে নেই, সিগারেট খাওয়া ছেলেদের জন্মগত অধিকার। ছেলেদের দিকে পুরুষতন্ত্র কখনো চোখ পিটপিট করে তাকায় না! আপনি জানেন সেটা। আচ্ছা, সিগারেট খাওয়া যদি খারাপ হয় , তবে তো সেটা ছেলে-মেয়ে দুজনের জন্য খারাপ। শাস্তি হলে দুজনের ই  হওয়া উচিত। কিন্তু আপনি সেটা করেন না। এটাও আপনি জানেন। ঠিক একই কথা মদ খাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

ছ) আপনি, আপনার স্ত্রী দুজনেই চাকরী করেন। আপনার স্ত্রীকে সকালে উঠে রান্না, চা, জলখাবার সব বানিয়ে বেরোতে হয়। রাতে এসেও সেই একই। কিন্তু আপনি এগিয়ে এসে বলছেন না, "ঠিক আছে সকালে আমি রান্না করবো, রাতে তুমি। কেন বলছেন না?? কারন আবার ও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি কানে কানে বলছে, রান্না করা মেয়েদের কাজ। ঘর সামলানো মেয়েদের কাজ। হ্যাঁ, আপনি হয়তো বলবেন আপনি মাঝে মাঝেই রান্না করেন। কিন্তু রান্না করাটা আপনার শখ না হয়ে দায়িত্ব হচ্ছে না কেন??  আপনি হয়তো এটাও বলতে পারেন, আমার বউ ভালোবেসে এসব কাজ করে। খুশী মনে এসব করে। আচ্ছা ভালোবাসা কি একমুখী?  

জ) আপনি ভালো পুরুষ। আধুনিক। নারীর এগিয়ে যাওয়াতে বিশ্বাসী। বন্ধুমহলে, পারিবারিক আড্ডায় আপনি বললেন, "আমি আমার বউকে বিয়ের পরও পড়তে দিয়েছি, অথবা চাকরী করতে দিয়েছি, অথবা অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছি" ইত্যাদি প্রভৃতি। যদি বলি এসব আপনার বউয়ের জন্মগত অধিকার, আপনি দেওয়ার কে? আপনি রেগে নোংরা নারীবাদী বলে তেড়ে আসবেন। কেন জানেন?? কারন আবারো পুরুষতন্ত্র।  আপনার মনের গভীরে গাঁথা হয়ে আছে, বিয়ের পর নারীর গার্জিয়ান তো স্বামী ই। সেই ঠিক করবে বউ কি করবে না করবে!!

ঝ) সম্পত্তিতে বোন ও সমান অংশীদার। কিন্তু সম্পত্তি ভাগের সময় বোনকে সমান অংশ দেওয়া হয় না। আপনি শিক্ষিত, আধুনিক, মুক্তমনা। কিন্তু আপনিও দিচ্ছেন না। কেন?? কারন আবার সেই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা কাজ করছে। বোন তো পরের ঘরে যাবে। সেখানে পাবে আরো অর্ধেক। মেয়েরা তো সমান অংশের দাবীদার হতে পারে না। সেকথা মরিয়া হয়ে  বোঝাতে আপনি ধর্মের আইন আনবেন, রাষ্ট্রের আইন আনবেন। কিন্তু একবারো এটা বুঝতে চাইবেন না, আইন, নিয়ম তো মানুষের সৃষ্টি। এগুলো বদলানো যায়, এমেন্ড করা যায়। সতীদাহ প্রথা বা বিধবা বিবাহ, এগুলোও কিন্তু বদলানো হয়েছিলো, সামাজিক সমতার প্রয়োজনে। 

ঞ) আপনি মেয়ের বাবা। মেয়ের বিয়ে দেবেন। মেয়ে যতই উচ্চশিক্ষিত হোক না কেন, খাট, আলমারি, গয়না, টাকা পয়সা ইত্যাদি দিয়ে মেয়েকে পরের ঘরে পাঠালেন। আবার ছেলের বিয়ের সময় কিন্তু এসব কিছুই বউয়ের ঘরে পাঠালেন না। কেন? এখানেও অসচেতন ভাবে হলেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি কাজ করছে। মেয়ে পিতার বোঝা। তাকে সোনা গয়না এসব দিয়ে পার করাতে হয়। মেয়েদের শিক্ষার কোনো দাম নেই। স্বামীর ঘরে তার দাম বাড়াতে তাই দামী খাট, আসবাব, সোনা। ছেলেরা হীরের আংটি। ছেলের বউ হয়ে আসা সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাই ছেলের বিয়েতে ছেলের বউয়ের বাড়ী এসব কিছুই পাঠাতে হয় না। অসচেতন ভাবে হলেও আপনি মানেন, ছেলেরা বিয়ে করে, আর  মেয়েদের বিয়ে হয়! 

ট) মেয়ের বাবা আপনি। মেয়ের বিয়ে কোনো অবস্থাতেই বেকার ছেলের সাথে দেবেন না। মেয়েটির প্রেমিক যদি বেকার হয়, এই সম্পর্কে আপনি কখনোই রাজি হবেন না। মেয়েটি যদি চাকরি করে, তাও না।  কেন?? এখানেও ঐ পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা। শিক্ষিত, নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাসী আপনিও মনে মনে ভাবেন, মেয়েদের ভরনপোষনের দায়িত্ব ছেলেটির। ছেলেকে আবার মেয়ে চাকরি করে কেন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে!! ছি ছি এ আবার হয় নাকি!!


আরো হাজারো উদাহরন  টেনে এনে আপনাকে প্রশ্নের মুখে দাড় করাতে পারি আমি। আপনি ধর্ষন করেন না, যৌনহেনস্তা করেন না, এসিড আক্রমন করেন না, বৌকে মারেন না, কিছুই করেন না। কিন্তু তারমানে এই নয় আপনি মহান। যতদিন অব্দি নিজের ভেতরের সব পুরুষতান্ত্রিক গুণাবলী থেকে মুক্ত হয়ে, পূর্ণাঙ্গ মানুষ রূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারছেন, ততদিন আমি আপনাকে মহান ভাবতে পারবো না। ততদিন অব্দি আমি বলেই যাবো সব পুরুষ সমান তার ভেতরের পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বার জন্য, পুরুষ অহংবোধের জন্য। 

এই যে নারীমুক্তি নিয়ে বড় বড় ভাষন হয়, "নারীকে জাগতে হবে", "অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে" ইত্যাদি প্রভৃতি, আসলে নারীমুক্তি তখনই সম্ভব, যখন একজন নারী এগিয়ে যাওয়ার সময় তার পরিবার, সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের সমর্থন পাবে। কারন রোজ রোজ যদি আমার অধিকার নিয়ে ঘরে বাইরে পুরুষদের সাথে ঝগড়া করতে হয়, (কারন অধিকার ছিনিয়ে আনতে গেলে ঝগড়া হবেই) তাহলে একটা সময় আপনারাই তকমা দেবেন "কি মুখরা", 'কি ঝুগড়ুটে', 'কি পুরুষবিদ্ধেষী' এইসব বিশেষণে। আর আমিও একটা সময় ক্লান্ত হয়ে, উপরন্তু যদি মানসিকভাবে দুর্বল হই,  এইসব তকমাগুলো থেকে বাঁচতে সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্ঠা করে যাবো। 

একজন নারীকে, সে  স্ত্রী হোক, বোন হোক, মেয়ে হোক, তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দিতে গেলে, মন থেকে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে লাগে, তাকে মানুষ ভাবার দুঃসাহস থাকতে লাগে। পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্র যাই বলি না কেন, সেটা আপনাদের শ্রেষ্ঠ বানিয়েছে, মাথায় তুলে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু নারীর চলার পথে তাকে সর্ব অবস্থায় সমর্থন করার মতো মানসিক শক্তি দেয়নি। 

এবার আসি আমার কথায়। আমি যখন বলি বা লিখি, সংখ্যালঘু/দলিত/আধিবাসী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, দেশজোড়া মোদী ওয়েভের বিরুদ্ধে, তখন কিন্তু মুক্তমনা, আধুনিক, প্রগতিশীল, উদারমনা এই আপনারা কখনোই বলেন না, এভাবে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করবেন না, সংখ্যালঘু/দলিত/আধিবাসীদের জন্য আলাদা করে কোনো আন্দোলনের প্রয়োজন নেই,  এভাবে একশ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্ধেষ ছড়ানোর দরকার নেই, আপনার বাবাও পুরুষ, আসুন সব মানুষের কথা বলি, মানবতার কথা বলি, সব মানুষ এক নয়! বরং তখন আপনাদের প্রশংসা, সহযোগীতা, পাশে থাকায় আমি ভেসে যাই। 

কিন্তু যখন আমি বলি, পুরুষেরা নারীকে ধর্ষন করে, পুরুষেরা নারীর মুখে এসিড ছুড়ে মারে, পুরুষেরা যৌনহেনস্তা করে, পুরুষেরা ইভটিজিং করে, পুরুষের জন্য নারী অনিরাপদ, পুরুষেরা ধর্ষনের ভিডিও চড়া দামে বিক্রি করে, ঠিক তখনই আপনারা আমায় 'খ' বর্গীয় , 'ম' বর্গীয় গালি দিয়ে বলেন, আপনি তো বড় ইতর, বড় বদ, আপনার বাবা কি পুরুষ নন?, এভাবে নারী-পুরুষ আলাদা করবেন না, এভাবে পুরুষবিদ্ধেষ ছড়াবেন না, এভাবে পুরুষকে গালি দেবেন না, এভাবে নারীর জন্য আলাদা কোনো আন্দোলনের দরকার নেই, তারচেয়ে মানববাদী হোন, সব পুরুষ এক নয়।

স্কুলে সমাজবিজ্ঞানে আমি, আপনি সবাই পড়ে এসেছি, মুখস্ত করে পরীক্ষায় খাতায় বমি করে এসেছি, 'ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক'। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীর মুখে, পুরুষতান্ত্রিক, পুরুষ শব্দগুলো শুনলেই আপনারা আক্রমণাত্বক হয়ে উঠেন। র্যাডিকাল নারীবাদী, অতি নারীবাদ, এইসব তকমা দেন। ভাবেন এই বুঝি আপনাদের সময়ের সাথে উদার, মহান, সেকুলার সাজা সিংহাসন ধরে কেউ টান মেরে দিলো! 

ভয়ংকর নারীবিদ্ধেষী সমাজব্যবস্থায় আপনারা যখন আমাকে পুরোষবিদ্ধেষী আখ্যা দেন, আমি হেসে গড়াগড়ি খাই। আমার মধ্যে সেই শিশুটাকে খুঁজে পাই, যে সমবেত প্রশংসাবাক্যের মধ্যে গলা তুলে জিজ্ঞেস করেছিলো, “রাজা, তোর কাপড় কোথায়?”

রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

বেঁচে থাকার গল্পগুলো... 
________________________

কর্মসুত্রে রোজ অনেক মানুষের সাথে দেখা হয়। তারা কেউ আমার সহযাত্রী, কেউ কলিগ, কেউ ছাত্রছাত্রী, কেউ বা সম্পূর্ণ অচেনা কেউ। তারা সবাই আলাদা আলাদা হলেও, তাদের সবার একটা জায়গায় আমি খুব মিল পাই!! নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বললে তারা রীতিমত আঁতকে উঠেন! তারা মনে করেন নারী পুরুষের সমকক্ষ তো নয়ই, নারী পুরুষের তুলনা টানাও হাস্যকর। এ চিন্তা যে শুধু পুরুষেরা করেন তা কিন্তু নয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি বেশীরভাগ নারীও এই চিন্তাকে ধারন ও লালন করেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা শুধু যে পুরুষদের নিজেকে মহান ভাবতে শিখিয়েছে, তা কিন্তু নয়, সাথে নারীকেও নিজেকে হীন ভাবতে শিখিয়েছে। আজকের যুগেও বেশীরভাগ নারী নিজেকে পুরুষের তুলনায় দুর্বল, অসহায় ভাবেন। নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়, নির্যাতন, হেনস্থাকে নিজের নিয়তি বলে ভাবেন। 

রোজকার জীবনে আমার সঙ্গে দেখা হওয়া প্রত্যেকজন নারীকে আমি এইসব ধারনা থেকে বের করে আনতে চাই। তাদের সাথে কথা বলি, বোঝাই। তাতে অনেকে বুঝে। তাদের জীবনের গল্পগুলো বলে, পরামর্শ চায়। অনেকে তাদের জীবনের লড়াইয়ের গল্প বলে, যে গল্পগুলো শুনে নতুন করে উজ্জীবিত হই। অনেকে তাদের জীবনের হতাশার গল্প বলে। তাদেরকে আমি আশার গল্প শোনাই। এই আশা নিরাশার গল্পগুলোই এবার থেকে একটু গুছিয়ে বলার চেষ্ঠা করবো। 

এক : 

একজন দিদির গল্প দিয়ে শুরু করি। সদ্য একটা স্কুলে চাকরী পেয়েছি। সকাল সাড়ে সাতটায় ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে একঘন্টার জার্নি, তারপর স্কুল। গাড়ি বলতে ছোটো গাড়ি, যার মাঝখানের সিট মুখোমুখি। দুদিকে চারজন করে মোট আটজন বসতে পারে। সামনের সিটে তিনজন। পেছনের সিটে চারজন। সকালের গাড়িতে আমরা বেশীরভাগ মেয়েরাই যাই। প্রায় সবাই ই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। কেউ বিবাহিত, কেউ অবিবাহিত। কদিন আগে  এভাবেই একসকালে গাড়িতে করে যাচ্ছি। পাশে দুজন দিদি বসেছেন। একজনের বয়স বত্রিশ বা তেত্রিশ হবে, বিবাহিত। অন্যজনেরও তাই। প্রথমজন খুব রোগা, সারামুখে ক্লান্তি আর দুর্বলতার ছাপ। তার তুলনায় দ্বিতীয়জনের স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালো। দুজনেই সংসারের গল্প করছেন। যেটুকু কথা কানে আসলো, তাতে বুঝলাম দুজনেরই দুটো করে সন্তান আছে। একজনের দুই ছেলে। একজনের এক ছেলে, আর দেড় বছরের মেয়ে আছে একটা।  প্রথম দিদির নাম ধরুন 'ক' এবং দ্বিতীয়জনের নাম 'খ'। 'ক' দিদি  খ' দিদিকে বলছেন তার ননদের কথা। যার কিনা বিয়ে হয়েছিলো এবং এখন বর্তমানে স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ী চলে এসেছে। স্বামী রাগী স্বভাবের এবং মাঝে মাঝে ননদটিকে মারত, বকাঝকা করত। এদিকে ননদটিও নাকি রাগী। তো তাই নিয়ে ক'দিদির দুঃখের শেষ নেই। খ'কে বলছেন - " যতই বলো দিদি, মেয়েমানুষের এত রাগ ভালো না, স্বামী দুকথা বলতেই পারে, কারন সে স্বামী, মেয়েদের তাই বলে স্বামীর মুখে মুখে তর্ক করতে নেই। মারুক , বকুক যাই করুক, ঐ স্বামীর ভিটেতেই মেয়েদের আসল ঘর, বাপের ঘর তো দুদিনের।" শুনে খ দিদি বললেন - "ঠিক বলেছো দিদি। মেয়েমানুষের সবদিক দেখে শুনে চলতে হয়। মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হয়।আমরা কি মানিয়ে গুছিয়ে চলছি না!" এতটুকু অব্দি শুনে একটু ঘুমোবো ঘুমোবো করছি। এমনসময় শুনি 'ক' দিদি বলছে 'খ' দিদিকে, "আসলে আমার ননদের স্বভাব ভালো নয়, সবেতেই শুধু রাগ করে, খুব মুখরা। এত মুখরা মেয়েকে কি কোনো স্বামী রাখতে  চায়? মেয়েদের হতে হয় মাটির মত। নারী রাগলে তার দু-কূল যায়!"

এতক্ষণ ধৈর্য্য ধরে চুপ থাকলেও, তারপর আর থাকতে পারলাম না। ক' দিদিকে জিঞ্জেস করলাম, মেয়েদের রাগ করতে নেই, রাগ শুধু ছেলেদের - এই নিয়ম কে করেছে দিদি?? রাগ একটা ইমোশন। যেরকম আমরা হাসি, কাঁদি, ঠিক সেরকম অনেকসময় রাগ করি। প্রত্যেক মানুষের ইমোশনের লেভেল আলাদা হয়। অনেকের রাগ কম, অনেকের বেশী। তারসাথে ছেলে মেয়ের সম্পর্ক কি?? নাকি মেয়েদের মানুষের পর্যায়ে ফেলতে নেই? কোনটা? আপনি ভেবে বলুন তো?? গাড়ির সবাই ততক্ষণে আমার দিকে ফিরে দেখছে। "ক" দিদি ভাবতে পারেনি আমি এভাবে বলবো। সে একটু আমতা আমতা করে চুপ করে গেলো। আমি না থেমে বললাম, শুনুন দিদি, এই যে আপনি আপনার ননদের কথা বলছেন, সে তো প্রশংসার যোগ্য। কারন সে স্বামীর মার, বকা খেয়ে পড়ে থাকেনি। প্রতিবাদ করেছে। বেরিয়ে এসেছে। এইসময় তো আপনাদের সবার ওর পাশে থাকার কথা ছিলো। অনেক সাহস করে সে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সবাই পারে না। কারন ছোটোবেলা থেকে আমাদের মা-মাসীরাই আমাদের মগজে ঠুসে দেন ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। সেই ঠুসে দেওয়া থেকে আমরা সহজে বেরিয়ে আসতে পারি না। কেউ কেউ যদি বেরিয়ে আসার সাহস দেখায় তবে তার পাশে থাকার চেষ্ঠা করবে, হেয় নয়। তুমি তো চাকরী করছো, পড়াশুনো করেছো। তুমি বলোতো সংসার কি শুধু মেয়ের গুণে সুখী হয়? স্বামীর কোনো গুণ লাগে না?? সংসার তো স্বামী-স্ত্রী দুজনের। তাহলে শুধু স্ত্রীর গুণই ধরা হবে কেন?? স্ত্রীটিকেই সবকিছু সহ্য করে মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হবে কেন?? 

ঘরে ঘরে মায়েরা মেয়েদের শেখাচ্ছেন, "বরের ঘর থেকে চিতায় উঠার সময়ই বেরোবে,তার আগে নয়।" তার আগে বেরোলে লজ্জা। তার আগে বেরোলে অসম্মান। স্বামীর ঘর ছাড়া তোমার আর কোনো ঘর নেই। বেশীরভাগ মেয়েরাও তাই শত অসম্মানে, শত হেনস্থায়, শত নির্যাতনে আটকে আছে  সেখানে। কারন সে কোথায় যাবে? নিজের ঘর বলে তো তার কোনো ঘরই নেই। নিজের মা-বাবা, ভাই-বোনরাই তাকে বোঝা মনে করবে। ঠিক এই তোমার মতোই মেয়েটির সম্পর্কে  কথা বলবে, পাড়ায়, রাস্তায়, গাড়ীতে, সর্বত্র। 

খবরের কাগজ, টিভি এগুলো খুললেই দেখা যায় নারী নির্যাতন, পারিবারিক হিংসা, ধর্ষন, শ্লীলতাহানীর খবরে ভরা। আমাদের মা, মাসীরা হয়তো এত পড়াশুনা করেননি, আর্থিক স্বাবলম্বীতাও ছিলো না। ভুলকে মনে মনে ভুল জানলেও সেটাকে মুখ ফুটে বলতে পারেন নি। কিন্তু আমরা তো পড়াশুনো করছি। চাকরি নোকরি করছি। আমাদের মেয়েদের, আমাদের আগামী প্রজন্মকে আমরা কি শেখাচ্ছি?? তাদেরকেও কি আমাদের মা মাসীর মত সেই একই রেকর্ড শুনিয়ে যাবো? নিজের জীবন দিয়ে যে অভিজ্ঞতা করছি, সেই একই আগুনে নিজের মেয়েদেরও ঠেলে দেব?? একটা কথা জেনে রাখবে যে শিক্ষা, যে আর্থিক মুক্তি আমাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধের জন্ম দেয় না, সেই শিক্ষা আর কুশিক্ষার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই!!  তাই আজ থেকে, নিজের মেয়ে, বোন, ননদ, বন্ধু, আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী প্রত্যেকটা মেয়েকে শেখাতে চেষ্ঠা কর, স্বামী মারলে মেয়েটি কি করবে? স্বামীর পরিবার অত্যাচার করলে মেয়েটি কি করবে? কথায় কথায় গলাধাক্কা, মারধর, গালাগাল করলে মেয়েটি কি করবে?? স্বামী যৌন অত্যাচার করলে মেয়েটি কি করবে?? স্বামী পরনারীতে আসক্ত হলে মেয়েটি কি করবে? মেয়েটিকে শেখাও স্বামীর বাড়িই মেয়েদের একমাত্র ঠিকানা নয়।তার আর একটা বাড়ীও আছে এবং সারাজীবন সেটা তারই থাকবে। বিয়ে মানেই নিজের বাড়ীর উপর থেকে অধিকার চলে যাওয়া নয়! 

অনেকক্ষণ চুপ করে শুনে 'ক' দিদি  আমায় বলল, দিদি তো এখনো বিয়ে করোনি, তাই বুঝবে না সংসারের নিয়ম!! আমি বললাম, দিদি সংসার সেটা নয়, যেখানে আমাকে কারো অধীনে থাকতে হয়, কারো মর্জিমত চলতে হয়! বরং সংসার সেটা, যা দুজন মানুষের পারস্পরিক সহযোগীতায় গড়ে উঠে। সংসার সেটা যেখানে স্বামীটি তার স্ত্রীর মানুষ হিসেবে পাওয়া অধিকারগুলোকে সম্মান দেয়। স্ত্রীকে নিজের দাস না ভেবে, তার অধিকার আদায়ে যে স্বামীটি সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে থাকে, সেটাই সংসার দিদি। মানুষের সংসার। রাজা আর দাসীর সংসার কখনো মানুষের সংসার হতে পারে না। কথাগুলো ভেবে দেখবে। 

গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ায়, খানিকটা রাগের সাথেই এই কথাগুলো বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। স্কুল থেকে ফেরার সময় 'ক' দিদির সাথে আর দেখা হয়নি সেদিন। দেখা হলো তার পরেরদিন। গাড়িতে ওঠার সময় দেখি  'ক' দিদি আমার জন্য সিট রেখেছেন তার পাশে। আমি তার দিকে চেয়ে হাসলাম। 'ক' দিদি বললো,  "দিদি তোমার সেদিনের কথাগুলো আমি ঘরে গিয়ে অনেক ভেবেছি। আমার ননদের সাথেও কথা বলেছি। এই প্রথমবার  আমি আমার ননদকে জিজ্ঞেস করেছি স্বামীর বাড়িতে ঠিক কি কি সমস্যা হয়েছে ওর সাথে। এবং বলেছি আমি ওর পাশে আছি।" আমি হেসে বললাম এইতো একদম ঠিক করেছো দিদি। 

এই কদিনের যাওয়া আসাতে 'ক' দিদি তার নিজের জীবনের হতাশাগুলো একটু একটু করে ভাগ করেছে আমার সাথে। শুধু শুনে গেছি, আর ভেবেছি যুগ যুগ ধরে প্রত্যেকটা মেয়ের জীবনের গল্পগুলো কি নিদারুনভাবে একই। সময় বদলাচ্ছে, যুগ বদলাচ্ছে, আমরা ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি, কিন্তু গল্পগুলো একই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করেছিলো, সে মরেনি, আর আমাদের কাদম্বরীরা রোজ বেঁচে থেকে প্রমাণ করছে তারা বেঁচে নেই!! 

শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭


১৩ই অক্টোবর, আন্তর্জাতিক #No_Bra_Day ( নো ব্রা দিবস)..
____________________________________________________

শিরোনাম দেখে অনেকেই হয়তো নাক কুঁচকে এড়িয়ে যাবেন। বিরক্ত হয়ে হয়তো বলবেন, এই আবার এসেছে পুরুষদের গালিগালাজ করে চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে!!  আপনাদের আশ্বস্ত করে বলছি এইসব কোনো কিছুই আজকের এই লেখার উদ্দেশ্য নয়!! 

শিরোনাম দেখে গাল দেওয়ার পাশাপাশি অনেকের মনেই হয়তো প্রশ্ন জাগছে, #No_Bra_Day জিনিস টা কি? নো ব্রা ডে মানে কি ব্রা খুলে বুক উন্মুক্ত করে রাস্তায় বেরোনো?? অথবা #নো_ব্রা_ডে কি ব্রা না পরে কাটাতে হবে?? আজ্ঞে না। উপরের কোনোটাই নয়। নো ব্রা ডে'তে ব্রা খুলে প্যারেড করার মতো কোনো ব্যাপার নেই। দয়া করে উল্টো বুঝবেন না।  

অনেকেই #ব্রেস্ট_ক্যান্সার  শব্দটা শুনেছেন। অনেকের মা/দিদি/পরিবারের মহিলা আত্মীয় এই রোগে হয়তো ভুগেছেন। এই ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কিন্তু দিনকে দিন বাড়ছেই। সাধারণত ৫০-৭০ বছর বয়সী মহিলাদের  ব্রেস্ট ক্যান্সার হবার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশী থাকে। অক্টোবর মাস হলো এই #ব্রেস্ট_ক্যান্সার সচেতনার মাস। ১৩ই অক্টোবর হলো #নো_ব্রা_ডে।  উদ্দেশ্য হলো, অন্তত এই একটা দিন  মেয়েরা যাতে নিজেদের ব্রা খুলে স্তন দুটো পরীক্ষা করে। 

প্রত্যেকটা মেয়ে কিশোরীবেলা থেকে যখন স্তনের আকার একটু একটু করে বাড়তে থাকে, তখন সেই বৃদ্ধি হওয়া স্তনকে সুডোল, আটসাট করে তুলতে  ব্রা পরতে শুরু করে। অথচ এই ব্রা থেকেই যে নানাবিধ রোগ হতে পারে সে সম্পর্কে বেশীরভাগ মেয়ের কোনো ধারনাই নেই, সচেতনা ও নেই। শহর এবং গ্রামের প্রায় 95% মেয়ে  জানে না ব্রা'র কি কি ক্ষতিকারক দিক আছে!! 
অথচ প্রত্যেকটা মেয়ের উচিৎ ব্রা’র সঠিক ব্যাবহার জানা। এর ক্ষতিকারক দিক জানা এবং এর ব্যাপারে সতর্ক হওয়া! সারাদিন ব্রা পড়ে থাকা কিংবা রাতের বেলা ব্রা পড়ে থাকা যে অত্যন্ত ক্ষতিকারক, সেটা জানা। আবার অনেকেই এসব অন্তর্বাস প্রতিদিন ধোয় না ! এটা থেকেও যে অনেক রোগ হয়, সেটা জানা! 

অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ই মনে করেন ব্রা ব্যবহারের ফলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়ে। ব্রা ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটা কমবে। এই উদ্দেশ্যেই প্রতিবছর #নো_ব্রা_দিবস    পালন করা হয়। 

এবার অনেক আবালশ্রেণীর মানবতাবাদী সাজা পুরুষ হয়তো এখানে এসে যুক্তি দেবেন , 'এখন যদি পুরুষরা "নো জাঙ্গিয়া দিবস" পালন করে তাহলে কেমন হবে? উত্তর হলো, আন্দোলন/ সচেতনা বৃদ্ধির অভিযান তারাই করে যারা ভিক্টিম হয় । আপনাদের যদি কখনো পেনিসে ক্যান্সার/অথবা অন্য কোনো রোগ হয়, তখন নাহয় নো জাঙ্গিয়া দিবস পালন করবেন!! 

এই ফাঁকে একটা গল্প বলি। কয়েক বছর আগে সুইডেনের নারীরা  মাতৃত্বকালীন বেতন-ভাতা’র দাবী করেছিলো রাষ্ট্রের কাছে। তারা বলেছিলো গর্ভকালীন সময়ে যদি তাদেরকে বেতন-ভাতা না দেয়া হয়, তাহলে তারা আর “মা” হবে না। তারা মুক্তকন্ঠে বলেছিলো, ‘আমরা সন্তান জন্মদান করি শুধুমাত্র আমাদের প্রয়োজনে নয়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনেও সন্তান জন্মদান করি। সুতরাং মাতৃত্বকালীন সময়ে আমাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নিতে হবে।“ রাষ্ট্র  কিন্তু তাদের দাবি মেনে নিয়েছিল। 

এইভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে আন্দোলন, সচেতনা বৃদ্ধির অভিযানগুলোই একদিন আমাদের দেশকে ব্রেস্ট ক্যান্সার মুক্ত করবে। ক্যান্সার প্রতিরোধের লড়াইয়ে জেতার সবচেয়ে ভালো উপায় কি জানেন??  ক্যান্সারের কারণগুলো সম্পর্কে জানা। আর শুধু নিজে জানলেই কিন্তু চলবে না। নিজের জানাগুলো আশেপাশের মানুষদেরও  জানাতে হবে। তাই, নারী-পুরুষ যেই হোন না কেন, চেনাপরিচিত সবার সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলুন। আলোচনা করুন।

অবশ্য যে দেশে এখনো পিরিয়ডকালীন সচেতনাই বৃদ্ধি পায়নি!  পিরিয়ড হওয়াকে এখনো অপবিত্র, পাপ মানা হয় ! যে দেশে স্তন এখনো পুরুষের ফ্যান্টাসির বিষয়, যে দেশে পুরুষের ফ্যান্টাসী পুরনের জন্য নারীকে এখনো সুডোল, সুন্দর, সঠিক সাইজের স্তনের জন্য ব্রা ব্যবহার করতে হয়, সে দেশে স্তন ক্যান্সার, স্তনের নানারকম রোগ নিয়ে ভাবার সুযোগ আছে কি নারী বা পুরুষের?? 







#Me_Too (হ্যাঁ,  আমিও) ...!! 
_________________________

সোস্যাল মিডিয়ার শুরু হওয়া একটি ক্যাম্পেইন #me_too। টুইটার ও ফেসবুকের দেওয়ালে এত সংখ্যক ‘মি টু’-র হ্যাশট্যাগ হয়েছে যা দেখে বোঝা যাচ্ছে যৌন হয়রানি কতোটা ব্যাপক, কতটা বিশাল তার পরিধি, রোজ কত সংখ্যক নারী যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন!! 

আলোড়ন শুরু করেছিলেন  হলিউডের এক অভিনেত্রী। হ্যাঁ আলোড়নই। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে আওয়াজ উঠলো, আমিও, হ্যাঁ আমিও!  #me_too - এই ছোট একটা হ্যাশট্যাগ লক্ষ-কোটি মেয়ের মুখে ভাষা জুগিয়ে দিলো। বুক ফাটছিলো, কিন্তু কিভাবে বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। মাত্র একটা ফুলকি বিস্ফোরণে পরিণত হলো। সমাজ, লোকলজ্জার ভয়ে যে দরজা এতদিন বন্ধ ছিলো, আজ যখন খুললো, তখন বেরিয়ে আসুক সব বিষ, সাফ হয়ে যাক সব জঞ্জাল। 

ঘটনা এক : 

বয়স তখন পাঁচ। প্রথম শ্রেণীতে পড়ি। ছোটো থেকে আমি প্যান্ট আর গেঞ্জিতেই অভ্যস্ত ছিলাম। স্কুলেও যেতাম প্যান্ট আর শার্ট বা গেঞ্জি পরে। আমাদের স্কুল ছিলো ছেলে মেয়ে কোম্বাইন।ক্লাস ফাইভের দাদারা একদিন প্ল্যান করলো আমি ছেলে না মেয়ে সেটা দেখবে! তো দেখার উপায় কি?? আমার প্যান্ট খুলে দেখবে আমি ছেলে না মেয়ে!! টিফিনের সময় চার/পাঁচজন দাদা আমায় মাঠের এককোনে প্যান্ট খোলার জন্য চেপে ধরে। আমি তখন রাগে একজনের হাত কামড়ে দিয়েছি,  ঠিক তখনই ছেলেগুলোর চিৎকার শুনে স্কুলের দারোয়ান দেখতে পায়, এবং আমাকে হেড স্যারের ঘরে নিয়ে আসে। আমি ভয় আর রাগে কাঁপছিলাম। তখন জানতাম না এটা যৌনহেনস্তা কি না!! পাঁচ বছর বয়েসে বোঝা সম্ভব ও ছিলো না কি না!! শুধু বুঝতে পারছিলাম, যেটা ঘটতে যাচ্ছিলো সেটা খারাপ কিছু, যা হওয়া উচিত নয়। ঘরে এসে বাপীকে বললাম সব। বাপী পরদিন স্কুলে এসে খুব রাগারাগী করলেন, ঐ ছেলেগুলোর বাবাদের আনানো হলো স্কুলে। তারপর কি হলো জানি না, ঐ ছেলেগুলো দুর থেকে কমেন্ট পাস করতো, কিন্তু সামনাসামনি আর কিছু করেনি। তার কিছুদিন পর মা'র ট্র্যান্সফার হয়ে যায়, আর আমরা অন্য শহরে চলে আসি। 

ঘটনা দুই : 

ক্লাস সিক্স। স্কুলের ছুটিতে বাসে করে গ্রামের বাড়ী যাচ্ছি। মা আর ছোটোবোন মুন একটা সিটে বসে, আর আমি সিট না পেয়ে মা'র সিটের পাশেই দাড়িয়ে আছি। হঠাৎ খেয়াল করি আমার পিঠে কে হাত বুলোচ্ছে। বুঝতে পারছি এই ছোঁয়াটা স্বাভাবিক নয়।  পেছন ফিরে দেখি বাপীর বয়সী একটা লোক, একহাত আমার পিঠে, একহাত তার প্যান্টের সামনে। আমি সামনের দিকে সরে আসলাম। লোকটা কিছুসময় পর সামনের দিকে সরে আসলো। এবার চেষ্টা করলো আমার বুকে হাত দিতে। আমি যত সরি, লোকটাও তত সরে। সামনের দিকে আরো মানুষ দাড়িয়ে, বেশী সরতে ও পারছি না। কোনোরকম সিঁটিয়ে দাড়িয়ে রইলাম। মাকেও বলতে পারছি না, সঙ্কোচবোধ থেকে। বললেও মা কি করতে পারতেন জানি না। হয়তো মাও লোকলজ্জার ভয়ে লোকটাকে কিছুই বলতেন না!!  যতক্ষণ দাড়িয়েছিলাম আমার একটাই কাজ ছিলো লোকটার হাত ঠেলে সরানো!! কিছুসময় পর মা'র পাশের সিটের মহিলা নেমে যাওয়ায় ঐ সিটে বসি। 

ঘটনা তিন: 

ক্লাস সেভেন। অঙ্ক ক্লাস। অঙ্ক দেখার বাহানায় স্যারের পিঠে হাত বুলানো। কিছু বলতে পারতাম না। সিঁটিয়ে থাকতাম। অঙ্ক ক্লাস ভয় পেতাম। 

ঘটনা চার : 

ক্লাস এইট না নাইন। শীতকাল। আমি কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছি। পিসতুতো এক দাদা এসেছে ঘরে। কিছুসময় পর ঐ দাদাটাও আমার কম্বলের নিচে পা ঢুকিয়ে বসলো। একটু সময় পরে দেখি আমার ঘাড়ে আর পিঠে মৃদু চাপ। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠি। অন্য ঘরে চলে যাই। 
ঘটনা পাঁচ : 

আমরা তখন ভাড়া থাকতাম একটা ঘরে। স্নানঘর ছিলো একটু দুরে। স্নানঘরের দেওয়াল বেয়ে একটা নারকেল গাছ ছিল। গাছ আর দেওয়ালের মাঝবরাবর একটা জায়গা এক ইট ফাঁক ছিলো। একদিন স্নান করার সময় দেখি ঐ ফাঁকা জায়গা দিয়ে ঘর মালিকের ছেলে তাকিয়ে আছে। যখন দেখলো আমি তাকে দেখতে পেয়ে গেছি, তখন চলে গেল। তারপর থেকে আমাকে নানাভাবে উত্যক্ত করার চেষ্টা করতো। কিন্তু ততদিনে ভয় পাওয়া ভীরু মেয়ে থেকে আমি রাগী, সাহসী, মারকুটে বদনাম কুড়িয়েছি। তাই ঐ  ছেলেটার সাহসও আর বাড়েনি।  

ঘটনা ছয়:

একাদশ শ্রেনী। এন সি সি করতাম। মেয়েদের প্যারেড আলাদা হত, ছেলেদের আলাদা। প্যারেড করার সময়  দেখতাম কিছুছেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে অশ্লীল ভাবে কমেন্ট পাস করছে। 

ঘটনা সাত : 
ফেইসবুক। প্রায় রোজদিন কোনো না কোনোভাবে যৌনহেনস্তা চলছে। অশ্লীল মেসেজ, ভিডিও, ছবি। কত ব্লক করবো বলতে পারেন?? 

ঘটনা আরো অনেক আছে, ভীড় রাস্তা , বাস, অটো এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে পুরুষের নোংরা হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে হয় নি!! আমার কিংবা আমাদের একটাই অপরাধ, আমরা মেয়ে। মেয়েদের ভোগ করা যায়  যখন তখন, যেখানে সেখানে তার গায়ে হাত দেওয়া যায়, কমেন্ট পাস করা যায়, হায়েনার মত ধর্ষণ করা যায়, ধর্ষণের পর তার রক্তাক্ত দেহ নর্দমায় ছুড়ে ফেলা যায়, তা খুশী তা করা যায় তার সাথে। পাঁচ বছর বয়স হোক বা পঞ্চাশ বছর - মেয়ে মানেই পুরুষদের কাছে যৌন চাহিদা মেটানোর মেশিন। যৌনতার জন্য একজন পুরুষের একটি যোনী হলেই চলে, জরায়ু হলেই চলে। তার বয়স দেখা লাগে না, সম্পর্ক দেখা লাগে না, ইচ্ছে-অনিচ্ছে দেখা লাগে না, প্রেম দেখা লাগে না, সময় দেখা লাগে না, সমাজ, বিবেক কিছুই লাগে না!! 

যৌনহেনস্তাকারী পুরুষের একমাত্র গন্তব্য মেয়েদের অন্তর্বাস আবৃত স্থানসমূহে। নারী হিজাব পরুক, বোরখা পরুক বা আলখাল্লা, পুরুষের  অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ঠিকই খুঁজে নিবে মেয়েদের গোপনীয় সব অঙ্গ। মেয়েদের হেনস্তা হতে হবে হিজাবের দেশে, মেয়েদের হেনস্তা হতে হবে হিজাব না থাকা দেশে, সর্বত্র। এই পৃথিবীতে কোথাও মেয়েদের কোন নিরাপদ স্থান নেই।স্কুল, কলেজ, অফিস, হাসপাতাল, লিফ্ট, আদালত, এমনকি নিজের ঘরও নিরাপদ আশ্রয় নয়। হঠাৎ জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এসে পড়া কোনো পশুও এতটা অনিরাপদ নয়, যতটা এই পৃথিবীতে মেয়েরা!! 

আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমার পরিচিত প্রত্যেকজন মেয়ে জীবনের কোনো না কোনোসময় যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছেন, ক্ষেত্রবিশেষে  আজও হচ্ছেন। পৃথিবীর সব দেশে, সমাজে, ক্ষমতার সব স্তরে নারীর যন্ত্রণা একই। হ্যাঁ, উন্নত বিশ্বে হয়তো তৃতীয় বিশ্ব থেকে সংখ্যায় কম, কিন্তু আছে। আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিসর, আরব, আমেরিকা, রাশিয়া, ভারত সহ এই উপমহাদেশ, কোথাও জীবনে কখনো যৌন হয়রানির শিকার হননি—এমন নারী খুঁজে পাওয়া ভার। সাড়ে সাত বিলিয়ন মানুষের পৃথিবীতে তিন বিলিয়ন মানুষ যদি যৌন হেনস্তার শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে এটা মানবতার লজ্জা!!

আমাদের সমাজে এখনো যৌন হেনস্তাকে খুব স্বাভাবিক ভাবে দেখা হয়। ছেলেরা ওরম একটু করবেই, মেয়েটা কেন এরম পোষাক পরলো, মেয়ে দেখালে ছেলে দেখবে না, মেয়েমানুষ যেখানে সেখানে গেলে এরকম তো হবেই, ইত্যাদি বলে যৌনহেনস্তাকারীদের আরো সোহাগ দিয়ে মাথার উপর তোলে আমাদের সমাজ, তাদের শাস্তি তো দুরের কথা!! এইভাবে আমাদের সমাজে গড়ে উঠেছে যৌনহয়রানী করার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে ছেলেরা যুবক হয়ে ওঠার অংশ হিসেবে শেখে যৌন হয়রানী। বন্ধুরা বাজি ধরে রাস্তার মেয়েদের উত্যক্ত করে, ফিগার নিয়ে কটুক্তি করে, স্নানরতা মেয়েদের লুকিয়ে বা প্রকাশ্যে দেখে,  শিস দেয়, হিন্দি গানের লাইন গায়, খারাপ কথা বলে। 

অনেকেই হয়তো এখন এই স্লোগান নিয়ে উপস্থিত হবেন, "সব পুরুষ সমান নয়", তাদের বলে রাখি, যৌন হয়রানি যারা করে তারা কোনো আলাদা পৃথিবীর মানুষ নন, তারা আপনাদেরই বন্ধু, ভাই, বাবা, দাদা, কাকা, পিসে, মেসো, দাদু, শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার, সহকর্মী, সহপাঠী। আপনাদেরই স্বজাতি। যৌন হয়রানী অপরাধ। এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক আচরণ নয়। এবং ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার সঙ্গেও এর কোন সম্পর্ক নেই। আপনি নিজে হয়তো হয়রানী করেন না, কিন্তু আপনি যখন চুপ করে থেকে এই সংস্কৃতি কে উস্কে দেন, তখন আপনিও একজন সম্ভাব্য হয়রানীকারক। যৌন হয়রানী করে পুরুষরা, তাই একে বন্ধ করতে হলে পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে, তাদেরকেই সচেতন হতে হবে। 

এখন যারা বলবেন, 'ফেইসবুকে এসব লেখে কি হবে' - তাদের বলি, অনেককিছুই হবে। ফেইসবুকে তো এই সমাজের বাইরের কেউ আসে না !! এই #me_too দেখে যদি পুরুষরা এখন থেকে বদলাতে চায়, বুঝতে শেখে এই পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ ভালো নেই, কষ্টে আছে, যন্ত্রনায় আছে, মানসিক অবসাদে আছে, ভয়-শংকায় সিটিয়ে আছে, সর্বোপরি পুরুষদের ঘৃণা করছে - তাই তাদের বদলাতে হবে, মানুষের পৃথিবীতে জানোয়ার না হয়ে মানুষের মত থাকতে হবে, বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে - এই আহ্বান জানিয়েই এই লেখা। কেমন হয় আজ থেকে যদি পুরুষরা কখনো যৌন হয়রানি করে না?? কেমন হয় যদি নিজের বন্ধু, ভাই, দাদা, ছেলেকে আড়াল না করে যৌনহেনস্তা যে অপরাধ সেটা বোঝালে? আপনারাই চিন্তা করুন বলুন তো!! 


আর মেয়েরা, আর কত লুকিয়ে বাঁচবে?? নিজেদের প্রতি হওয়া অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখ। মুখ ফুটে নিজের প্রতি হওয়া প্রত্যেকটা অন্যায় চিৎকার করে শোনাও সবাইকে। তোমার সেই চিৎকারে প্রত্যেকটা যৌনহেনস্তাকারী পুরুষ যেন লজ্জায় মাটিতে মিশে যায়। তাদেরকে বুঝিয়ে দাও তোমার প্রতি হওয়া যৌনহেনস্তায় তুমি লজ্জিত নও। বরং লজ্জা তাদের পাওয়া উচিৎ যারা তোমার সাথে এরকম করে!! মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদীকে মনে আছে?? সেনানায়কের সামনে যে আকাশচেরা,তীক্ষ্ণ গলায় বলেছিলো, "কাপড় কী হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?"

#Me_too আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুধু মেয়েরা নয়, পুরুষরাও সচেতন হয়ে ওঠুক। সামাজিকভাবে সোচ্চার হোক। যৌন হেনস্তা পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মুছে যাক। সারা পৃথিবীর মানুষ জানুক এ পৃথিবীতে আর যৌন হেনস্তা হয় না!! 


#I_am_not_a_victim
#i_am_a_survivor
#Me_Too














বৃহস্পতিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৭

প্রসঙ্গ 'নারীবাদ'
_____________

বেশীরভাগ পুরুষের, শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারীও  দেখি, নারীবাদের কথা শুনলে রীতিমতো চমকে ওঠেন। নারীবাদ বলতে তারা ভাবেন এবং বোঝেন, বিয়ে করতে না চাওয়া, ঘর সংসারের কাজে ফাঁকি দিতে চাওয়া, হাফপ্যান্ট পরতে চাওয়া, মদ/সিগারেট খেতে চাওয়া, পুরুষদের ঘৃণা করা  ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি নিজে মদ বা সিগারেট কোনোটাই খাই না, হাফপ্যান্ট পরি না, ঘরের কাজ করতেও আমার কোনো অসুবিধে নেই, তবুও আমি আগাগোড়া একজন নারীবাদী। কারন  অক্সফোর্ড ডিকশনারি 'নারীবাদের' ডেফিনেশন দিয়েছে , "The advocacy of women’s rights on the ground of the equality of the sexes."  আরো সহজ করে বললে, নারী-পুরুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার পক্ষে থাকার নাম নারীবাদ। আরোও সহজ করে বললে,  নারীবাদী সে মানুষটিই, যে নারী এবং পুরুষ দুজনকে সম্পূর্ণ মানুষ বলে মনে করে এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা এবং সমানাধিকারে বিশ্বাস করে।

তবু কেন জানি না, নারীবাদ সম্পর্কে বেশীর ভাগ পুরুষ এবং নারীর মধ্যে  ভয়াবহ রকমের ছুৎমার্গ বা ভয় আছে। এ ভয় শুধু এই উপমহাদেশেই নয়, সারা পৃথিবী জুড়েই বেশীরভাগ মানুষের মধ্যে আছে। অনেকে নারীবাদ নিয়ে খুব নিম্নমানের রসিকতাও করেন। কয়েক বছর আগে আমার এক বন্ধু দীপুর সাথে কথা হচ্ছিলো। কথায় কথায় কথা উঠলো নারী-পুরুষের সমতার প্রসঙ্গে। আমার বন্ধুটি বললো, যতই বল মেয়েরা ছেলেদের সমান, তবুও একটা কিন্তু থেকে যায়। এই যেমন ধর আমি আমার শার্টটা খুলে ফেলতে পারবো সবার সামনে, তুই কি পারবি তোর শার্ট খুলে ফেলতে?? বন্ধুটিকে সেদিন বলেছিলাম, পোষাকের সাথে সমঅধিকারের কি সম্পর্ক বোঝা তো আমায়!!  আরো একটা প্রশ্ন, তোর শার্ট খোলাকে আমি যতটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারবো, তুই কি আমার শার্ট খোলাকে ততটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারবি?? পারবি না। কারন তোর দৃষ্টিভঙ্গী, মানসিকতা তোকে মেয়েদের শরীরকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শেখায় নি। শুধু তোকে নয়, এই সমাজের নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের কাছে মেয়েদের শরীর একটা ট্যাবু। কিন্তু ছেলেদের খোলা বুক খুব বীরত্ব। তাই তো সলমান খানের খোলা বুক বাহবা যোগ্য, কিন্তু কোনো নায়িকার ক্লিভেজ যৌনতার বস্তু। যেদিন তোমরা পুরুষেরা মেয়েদের শরীরকে স্বাভাবিক ভাবে দেখতে শিখবে, সেদিন কথা দিলাম আমিও তোরই মতো শার্ট খুলে রাস্তায় হাটতে রাজি। বন্ধুটি আর কথা বাড়ায়নি। 

এই কদিন আগে ফেসবুকে আমারই এক পোষ্টে আরেকজন পুরুষ বীর বলেছিলেন, " আপনি বলছেন নারী পুরুষ সমান, তাহলে পুরুষরা রাস্তায় দাড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে, মেয়েরা পারে না কেন?" প্রশ্নটা খুবই নিম্ন মানের এবং অদ্ভুত  লেগেছিলো। শারীরিক গঠন অনুযায়ী পুরুষরা দাড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে, মেয়েরা পারে না। এই সাধারন শরীরবিজ্ঞানের মধ্যে নারী-পুরুষ সমান নয় কথাটা কিভাবে প্রযোজ্য আমি বুঝতে পারিনি। শুধু এই দুই ঘটনাই নয়। নারী-পুরুষের সমতার কথা বললে বেশীরভাগ পুরুষ এবং নারীরাও এধরনের অদ্ভুত যুক্তি তুলে ধরেন! 

পুরুষদের কথা নাহয় বাদ ই দিলাম। কিন্তু সেইসব নারী, যারা মনে করো  নারীবাদ মানে সংসার না করা, লিভ টুগেদার করতে চাওয়া, সিগারেট খাওয়া, হাফপ্যান্ট অথবা নগ্ন হয়ে হাঁটার ফন্দি , তোমাদের এখনো অনেক কিছু জানার বাকী। তোমাদের জানার বাকী-  আজকে থেকে এই একশ বছর আগেও নারীর  কোনো ভোটাধিকার ছিলো না। রাষ্ট্রের নাগরিক রূপে গণ্য হত না নারী। ঘরের বাইরে বেরোনোর কোনো অধিকার ছিলো না। লেখাপড়া শেখার অধিকার ছিলো না। একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে যে যে অধিকারগুলো প্রয়োজন তার কোনো কিছুই ছিলো না। আজকে যে তুমি আমি বাইরে বেরোতে পারছি, ছেলেদের সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে লেখাপড়া, চাকরী-নোকরী করতে পারছি, শপিং, সিনেমা, ফেসবুক করতে পারছি,  সেটা একদিনে অর্জন হয়নি। যুগ যুগ ধরে এই পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে নারীবাদীরা তোমাকে আমাকে আজকের এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। 

যে পুরুষদের তালে তাল মিলিয়ে তুমি নারীবাদ নিয়ে কৌতুক করছো বা আতংকিত হচ্ছো, সেই পুরুষদের দ্বারা এখনো তুমি ঘরে ঘরে পারিবারিক হিংসার শিকার। রাস্তায় ইভ টিজিং, এসিড এট্যাক, ধর্ষন, বৈবাহিক ধর্ষনের  শিকার। এই পুরুষের কাছে এখনো তোমার সতীত্বের মাপকাঠি  তোমার যোনী। পুরুষ রচিত ধর্মগ্রন্থগুলো তোমায় পাপ বলে আখ্যা দেয়। প্রতিমাসে তোমার পিরিয়ডের মতো একটি সাধারন শরীরবৃত্তীয় ঘটনাকেও  অপবিত্র বলে আখ্যা দেয়। 

তাই মেয়ে, নারীবাদ মাথায় চেপে বসা কোনো ভূতুড়ে খামখেয়াল নয়, নারীবাদ মানে পুরুষবিদ্ধেষী হয়ে ওঠাও নয়। নারীবাদ একটা নিরন্তর লড়াই, যে লড়াই নারী স্বাধীনতা-প্রত্যাশী। চোখের ছানির মতো পুরুষতান্ত্রিকতাও একপ্রকার সামাজিক ছানি এবং নারীবাদ তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক ওষুধ। সময় থাকতে এই বোধটুকু মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নাও এবং তারপর নারীবাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে তাকে নাহয় ছুড়ে ফেলে দিয়ো। কিন্তু আগামী আরো কয়েক যুগ অব্দি তোমার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে নারীবাদীদের তোমার প্রয়োজন আছে। 

প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস -  কেমন আছে আজকের  কন্যাশিশুরা?
_______________________________________________________


আজ আন্তর্জাতিক #কন্যা_শিশু দিবস। সারা পৃথিবীজুড়ে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, মেয়েদের বিরুদ্ধে হিংসা ও বলপূর্বক বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে এ দিবসের সূচনা করা হয়।

আমাদের দেশে দিবসটি এমন একসময় উদযাপিত হচ্ছে যখন যখন কন্যা ভ্রুণ হত্যা, কন্যাশিশুদের যৌন নিপীড়ন, ধর্ষন, কন্যা শিশুদের প্রতি বৈষম্য, দেশের আনাচে কানাচে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। সমীক্ষা ও ন্যাশনাল ক্রাইম রের্কড ব্যুরো'র রিপোর্ট বলছে- শিশু যৌন নির্যাতন,বাল্যবিবাহের এর হারে আমাদের দেশ পৃথিবীর মধ্যে চতুর্থ। কন্যা ভ্রুণ হত্যায় সম্ভবত ভারত পৃথিবীর মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে।

শুধু ভ্রুণ হত্যাই নয়, বর্তমানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী ভাবাচ্ছে, এবং  মারাত্বক হারে বাড়ছে, তা হলো কন্যাশিশুদের উপর যৌন নির্যাতন, কন্যাশিশুদের ধর্ষন!!  চার বছর/পাঁচ বছর/ সাত বছর/বারো বছর/ এমনকি দুবছরের কন্যা শিশুটি অব্দি আপন বাবা, কাকা, মামা দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার, ধর্ষনের শিকার!! মাকে বললে মা উল্টো বলছে চেপে যেতে। এসব কথা কাউকে না বলতে। বড় হয়েও কন্যাটি এই ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। মানসিকভাবে অসুস্থ, চুপচাপ হয়ে পড়ে। বিয়ের পর স্বামীর সাথে যৌনমিলনেও স্বাভাবিক হতে পারে না। স্বামী সহ সবাই ভাবে মেয়েটি হয়তো মুডি অথবা খেয়ালী অথবা ক্ষেপাটে। কারোর সাথে কথা বলে না ইচ্ছে করে। কিন্তু মেয়েটি মনে মনে জানে সেই ছোটোবেলা থেকে কৈশোর অব্দি নীরবে ঘটে যাওয়া জীবনের পাশবিক ঘটনাগুলি!! 

শুনুন কন্যাশিশুর বাবারা / ভাইরা /কাকারা / মামারা, কন্যাশিশুটি বড় হয়ে যখন বুঝতে শেখে, ভাবতে শেখে, তার বাবা, ভাই, কাকা, মামা ও  অন্যসব যৌনহেনস্থাকারী, ধর্ষক, নির্যাতক, কামুক পুরুষের মতোই একজন পুরুষ, সেদিন তার পৃথিবী উলোটপালট হয়ে যায়। সারাজীবন সে আর কোনো পুরুষকে বিশ্বাস করতে পারে না, ভালোবাসতে পারে না। পুরুষদের দেখলে আতংকিত হয়, মনে মনে ঘেন্না করে! 

সন্তান নিজের শরীরে ধারন করার ক্ষমতা বাবাদের থাকে না, সেটা মায়েদের থাকে। কিন্তু নিজের সন্তান লালন-পালন, তার নিরাপত্তা, তার পর্যাপ্ত বিকাশ নিশ্চিত করা শুধু মায়ের একার দায়িত্ব নয়। দায়িত্বটা বাবার ও। তাই নিজের কন্যাশিশুটিকে ভবিষৎ এ সুখী, প্রানবন্ত, সুস্থ, স্বাভাবিক  দেখতে চাইলে, শিশুটির মা'র সাথে সাথে আপনাকেও এগিয়ে আসতে হবে। কন্যাশিশুটির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করতে হবে, বলতে হবে, প্রতিরোধ তৈরী করতে হবে।

আর কন্যাশিশুর মা'রা, এখন থেকে নিজের কন্যাসন্তানটি যদি পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যের ছোঁয়ায় বা কোলে উঠতে অসম্মতি প্রকাশ করে, অনীহা প্রকাশ করে, ভয় পায়, কাঁদে, দয়া করে সতর্ক হন। কন্যাশিশুটি যদি আপনাকে বলে তার ভয়, অস্বস্তির কথা, দয়া করে চুপ থাকতে বলবেন না। বরং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।  নিজের শিশুটিকে যে কোনো পুরুষ আত্মীয়ের কোলে উঠতে, আদর করতে, খেলা করতে দেওয়ার আগে নিজে যাচাই করবেন। একা রেখে চলে যাবেন না। যতোদিন আপনার কন্যাটি অপ্রাপ্তবয়স্ক, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে মা-বাবা দুজনকে মিলেই।

আজ আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসে, শুধু মা'রাই নয়, পৃথিবীর সব বাবারাও এগিয়ে আসুন...আওয়াজ তুলুন, প্রতিরোধ করুন! আপনার কন্যা শিশুটিকে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক, স্বপ্নময় পৃথিবী উপহার দিন!! আজ থেকে যেন কোনো কন্যাশিশুকে যৌনহেনস্থার শিকার না হতে হয়, এটাই হোক অঙ্গীকার।





মঙ্গলবার, ১১ জুলাই, ২০১৭

"দাঙ্গা যাদের ধর্ম, তারা আমার পড়শী নয়"
_____________________________________

কদিন ধরেই খবরে দেখছি পশ্চিমবঙ্গে দাঙ্গার কথা! ধূলাগড়, বাদুরিয়া, বসিরহাট ইত্যাদি নানা অঞ্চলে জ্বলছে দাঙ্গার আগুন। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, সারা ভারতবর্ষ জুড়েই চলছে দাঙ্গার আবহ। কোথাও ছোটো আকারে, কোথাও বড় আকারে। কোথাও গরু নিয়ে, কোথাও নবী বা কাবা শরীফ নিয়ে। চারদিকে ফিসফাস, অবিশ্বাসের চাপা আগুন, ঘৃণা। এ কদিন চুপচাপ ঘর আর অফিস করে গেছি। আর ভেবেছি। ভেবেছি আমরা ভেতরে ভেতরে ঠিক কতটা সাম্প্রদায়িকতা, অবিশ্বাস আর ঘৃণা পোষন করি!  যে প্রতিবেশীর সাথে এই সেদিনও ঘুরেছি, আড্ডা দিয়েছি, বাজার গেছি, তাকেই এক লহমায় খুন করার কথা চিন্তা করতে পারি, তার ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে তাকে ভিটেছাড়া করতে পারি!! আমি জানি না এই মুহুর্তে কাকে ঠিক বিশ্বাস করবো!!  আমার প্রতিবেশী, আমার বন্ধু, আমার অফিসের কলিগ, আমার পরিচিত মহলের মানুষের মাঝেও যে এই হিংসা, অবিশ্বাস, ঘৃণা লুকিয়ে নেই তা কি করে বুঝবো আমি!! কাল তাদের হিংসার বলি আমি হবো না তো? আমার পরিবার হবে না তো?

সাম্প্রদায়িকতা আমাদের দেশে নতুন নয়। এই দেশের মানুষের রক্তে রক্তে সাম্প্রদায়িকতা। আমাদের ইতিহাস এর সাক্ষী। ইংরেজরা আমাদের দেশের বুকে ‘সাম্প্রদায়িকতার’ বীজ পুতে গেছে - এটা একদমই ভুল ধারনা! আসলে  দু’শ বছর দেশ শাসন করে ইংরেজরা জেনে গেছিলো, আমাদের দেশের মানুষের দুর্বল স্থান কোথায়! উপযুক্ত স্পর্শকাতর জায়গাটুকু  চিহ্নিত করে ব্যবহার করেছে মাত্র। ইংরেজ সৈন্যরা যতো না ভারতীয়দের মেরেছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ দেশভাগের সময় দাঙ্গায় মারা গিয়েছিলো।  ইংরেজরা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে নি এই দেশের মানুষদের,  বরং আমাদের দেশের মানুষ প্রথম থেকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েই ছিল।  ইংরেজরা মুসলিম লীগ ও বানায়নি আর হিন্দু মহাসভা ও বানায়নি! ইংরেজরা আর এস এস, বজরং দল, হিন্দু সংহতি ইত্যাদি দলগুলো বানিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লেলিয়েও দেয়নি! আর ইংরেজরা জামাত, সিমি, ইত্যাদি দলগুলোও বানায়নি। 

এদেশের প্রচুর সংখ্যক মানুষ ভিতরে ভিতরে তীব্র সাম্প্রদায়িক। তারা অনেকেই অগোচরে হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলে সম্বোধন করে, মুসলমানদের 'যবন', 'নুনুকাটা', 'বাঙ্গাল' বলে সম্বোধন করে! হিন্দুরা মুসলমানের ছোঁয়া অব্দি খায়না অনেক ক্ষেত্রে!! সোস্যাল মিডিয়ায় একদল ছবি বিকৃত করে, আর সাথে সাথে বাকি সবাই লাঠি, রামদা নিয়ে দাঙ্গা করতে বেরিয়ে পড়ে। সামান্য ছবি বিকৃত করলে বা ধর্ম, নবী, দেবতা সম্পর্কে কেউ কিছু বললেই, তাদের দেবতা, নবী, ইশ্বর, আল্লা'র অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। তাই তারা লাঠি, রামদা, ত্রিশুল, চাপাতি হাতে ধর্ম রক্ষায় ঝাপিয়ে পড়ে। আমার নবীকে নিয়ে বলেছিস, তোর ঘর জ্বালাবো শালা! আমার ঠাকুর নিয়ে বলেছিস, তোকে ত্রিশুল দিয়ে খুঁচিয়ে মারবো শালা! তুই মুসলমান, মানে তুই গরুখোর। তোকে ট্রেনে, বাসে, ঘরে, বাইরে কুপিয়ে মারবো শালা! - এইগুলো বর্তমানে আমাদের দেশের ট্রেন্ড। 

শুধু কি ধর্ম ? উঁচু জাত, নীচু জাত, মেথর, হরিজন, মুচি থেকে শুরু করে গায়ের কালো রঙ, হিজড়া, সমকামী নিয়েও আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে প্রচন্ডভাবে সাম্প্রদায়িকতা বা রেসিজম কাজ করে! 

তো বর্তমান ভারতবর্ষের এই মুখে উদার সাজা, ভেতরে প্রচন্ড রকমের সাম্প্রদায়িকতা পোষন করা মানুষের ভিড়ে, আমরা যারা কোনো ধর্মেরই পতাকা বহন করি না, কোনো ধর্মের মানুষকেই জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে, ঘরছাড়া, দেশছাড়া করার ভাবনা মনে মনে পোষন করি না, হিন্দু-মুসলমান-খ্রীষ্টান পরিচয়গুলোকে স্রেফ ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট হিসেবেই ভাবি, এর জন্য আলাদা করে কোনও গর্ব বা ঘেন্না অনুভব করি না, যারা গোরুকে মা মনে করেন এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদ, হিন্দু জাতীয়তাবাদকে প্রোজেক্ট  করার নিরন্তর চেষ্টা করেন, আর যারা শুওরের মাংসকে “হারাম” বলে মনে করেন আর ইসলাম বাদে বাকি ধর্মকে মনে প্রানে ঘৃণা করেন, অস্বীকার করতে চান – দুই দলকেই সমান ভাবে অপছন্দ করি, সেই আমরাই এই দেশে হয়ে পড়েছি সংখ্যালঘু। আমরা যারা ঈদের দিনে সেমাই খাই, নতুন কাপড় নেই, রোজা রাখি, নামাজ পড়ি, আবার মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও পূজার মণ্ডপে, রথের মেলায়, কীর্তনের আসরে উৎসাহ নিয়ে অংশ নেই, কিংবা যারা হিন্দু হয়ে পূজা করা সত্ত্বেও মুসলমান বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার খাই, ঈদে মুসলিম বন্ধুদের বাড়ী গিয়ে সেমাই খাই, গলায় গলা মিলিয়ে চলি, সেই আমরাই এই ভারতবর্ষে সংখ্যালঘু ।আমরা যারা সাম্প্রদায়িকতার তিলমাত্রও মনে লালন-পালন করি না সেই আমরাই সংখ্যালঘু। আমরা যারা রমেশ আর রহিম কে একই রকম মানুষ মনে করি সেই আমরাই সংখ্যালঘু। 

আমরা সংখ্যালঘু, কারন আমরা নিজেদের হিন্দু বা মুসলমান না ভেবে মানুষ ভাবি। আমরা সংখ্যালঘু, কারন আমরা আমাদের দেশে আর কোনো ধর্মীয় উগ্রতা দেখতে চাই না, আমরা আমাদের দেশে একটিবারের জন্যও আর কোনো দাঙ্গা দেখতে চাই না। আমরা সংখ্যালঘু, কারন আমরা আমাদের দেশকে হিন্দু বা মুসলমানের বাপের সম্পত্তি বলে ভাবি না। আমরা সংখ্যালঘু, কারন আমরা প্রতিবেশী বা বন্ধুর সাথে ঝগড়া হলে তাকে পাকিস্তান চলে যেতে বলি না। বরং আমরা বিশ্বাস করি দেশটা হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রীষ্টান-ধনী-গরীব-পুরুষ-নারী-হিজরা-সমকামী সবার। যেদিন আমাদের মতো মানুষেরা এই দেশে সংখ্যাগুরু হয়ে উঠবে, হয়তো সেদিন আমাদের দেশ সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠবে। জানি না সেদিন কখনো দেখে যেতে পারবো কি না!! সত্যি বলতে কি ইদানীং ভয় গ্রাস করছে আমাকে। এই দাঙ্গাবাজ মানুষের ভীড়ে বড় ভয়ে ভয়ে বেঁচে আছি!!

বৃহস্পতিবার, ২৯ জুন, ২০১৭

জুনাইদ'দের বাড়ী ফেরা হয় না..!  
_______________________________

পনেরো বছরের জুনাইদ বড় ভাইয়ের সাথে ঈদের বাজার করে ট্রেনে বাড়ি ফিরছিলো। সারাদিন রোজা ছিলো সে এবং কথা ছিলো কেনাকাটা সেরে বিকেলে মায়ের সাথে ইফতার করবে সবাই মিলে।  কিন্তু তার আর বাড়ী ফেরা হয়নি। কেন জানেন?? তার অপরাধ সে মুসলমান।সংখ্যালঘু।আর যেহেতু সংখ্যাগুরুর দেশে সংখ্যালঘু মানেই গরুখেকো, পাকিস্থানের চর, দেশদ্রোহী। কোনো প্রমাণ, সাক্ষী লাগে না একথা প্রমাণ করতে। সংখ্যাগুরুরা এগুলোকে বেদবাক্য হিসেবে মেনে চলেন। তো এই অপরাধে সেদিন চলন্ত ট্রেনে সহযাত্রীরা প্রথমে গো-হত্যা ও গোমাংস খাওয়ার জন্য তাদের গালাগালি করে।তারপর গণপিটুনি। শেষে ছুরি দিয়ে কোপানো হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মৃত্যু হয় জুনেইদের। তার সঙ্গী মইন ও মহসিন এবং বড়ভাই শাকির গুরুতর আহত হয়ে এখন হাসপাতালে। পুলিশ ও তার প্রাথমিক তদন্ত থেকে বলেছে ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকেই এই হামলা হয়েছে। 

জুনেইদের সঙ্গী মহসিন এনডিটিভি কে বলেছে, তারা ট্রেনের চেন টেনেছিল, কিন্তু ট্রেন থামেনি। তারা রেল পুলিশের সাহায্য চেয়েছিল, কিন্তু তারা কর্ণপাত করেনি।

এই ঘটনায় এ পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রমেশ নামক ওই অভিযুক্ত বলেছে , সে নাকি  মদ্যপ ছিলো। তার বন্ধুরা বলেছিল, ওরা গরুর মাংস খায়। 

গ্রামের মানুষের অভিযোগ, ট্রেনে-বাসে যাতায়াতের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজনকে প্রায়ই হেনস্তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এইসব খবর যখনই দেখি আমার প্রচন্ড ভয় হয়! গরুর মাংস খাওয়ার কারণে কী ভাবে একজন মানুষকে মেরে ফেলা যেতে পারে!!  একটি প্রাণী, যাকে কিনা কিছু মানুষ নিজেদের “মা” মনে করে – তার প্রাণ কীভাবে একজন মানুষের প্রাণের থেকে মূল্যবান হয়ে যেতে পারে? আমার মৌলিক অধিকার কি করে কারুর ব্যক্তিগত মানসিকতা কিংবা ধর্মীয় অনুভূতির লক্ষ্য হতে পারে ??  আমি কী খাবো সেটা কি করে  অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারে??  যারা গরুকে দেবতুল্য সম্মান দেয়, তাদের ধর্মীয় অনুভুতির প্রতি যেরকম সম্মান প্রদর্শন করা  উচিত, ঠিক সেইভাবে অন্য ধর্মের মানুষ, যারা গরুকে দেবতা মনে করেন না, তাদের প্রতিও সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে সংবিধানে । তাহলে কোন ভিত্তিতে দেশের সাধারন নিরীহ  নাগরিকদের একের পর এক খুন হতে হচ্ছে?? গরু রক্ষার নামে রাষ্ট্রের নাগরিকদের খুন হতে হবে, এটা কোন ধরনের ধর্ম রক্ষা?? এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র??

ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটার মানে কী?  রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেবে না। কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাবে না। অথবা কাউকে আলাদা করে বিরোধিতা করবে না। নাগরিকদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পর্যায়ে বিশেষ বিশেষ ধর্মাচরণের অধিকার থাকবে, কিন্তু তা কখনই অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে না।এটাই তো?? তাহলে প্রশ্ন জাগে  ভারতীয় রাষ্ট্র কি এই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ?

এপ্রিল-জুন, এই কমাসে প্রায় বারোজন মুসলিম মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়েছে গোমাংস খাওয়ার গুজব রটিয়ে। কি নৃশংশ!! শুধুমাত্র মুসলিম হলেই পিটিয়ে মারা যায়? দলিত হলেই পিটিয়ে মারা যায়? এর আগেও বিজেপিশাসিত রাজস্থানের আলওয়ারে গো-রক্ষকদের গণপিটুনিতে মুহাম্মদ পহেলু খান নিহত হন। একই ভাবে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মুহাম্মদ আখলাককে গণপিটুনিতে হত্যা করে উগ্র ধর্মান্ধরা। সম্প্রতি ঝাড়খন্ডে ও গোমাংস গুজবে এক পরিবারের উপর হামলা চালানো হয়।  এবারেও এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল একেবারে দেশের রাজধানী দিল্লির নাকের ডগায়। অথচ কেন্দ্র অথবা হরিয়ানার বিজেপি সরকারের কোনো হেলদোল নেই!! নিরীহ মানুষ খুন হচ্ছে আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পাত্তাই দিচ্ছেন না!! এই নীরবতা কি  জাতি-হত্যাকে প্রশ্রয় জোগাচ্ছে না?? মুখে ডিজিট্যাল ইন্ডিয়া আর ভেতরে ভেতরে দেশজুড়ে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোই কি তাঁর দলের গোপন এজেন্ডা?? 

সারা দেশ জুড়ে এক শ্রেণির বিকৃত উন্মাদ, মানুষ নামধারী কিছু জানোয়ার, মানুষ নিধন যজ্ঞে মেতেছে বিভিন্ন রুপে, বিভিন্ন চেহারায়।কোথাও গোরক্ষার নামে,কোথাও হিন্দুত্ব রক্ষার নামে। আমার ধর্ম তোমার ধর্ম থেকে ভালো। আমার ধর্ম সংখ্যাগুরুদের ধর্ম। অতএব তুমি সংখ্যালঘুকে আমার ধর্ম মেনে চলতে হবে। তোমাকে 'জয় শ্রী রাম' বলতে হবে, তোমাকেও গরুকে দেবতা জ্ঞানে পূজো করতে হবে।  আমার ধর্মটাই মেনে চলতে হবে, আমার চিন্তাধারাই সাবস্ক্রাইব করতে হবে, নইলে শালা তোমায় ক্যালাবো, প্রকাশ্যে হিউমিলিয়েট করব, তোমাকে খুন করব, তোমার বাড়িতে ছেলে ঢুকিয়ে মেয়েদের রেপ করাবো। এই হলো দেশের একশ্রেণীর মানুষের ধারনা। আর তাদের পরোক্ষে, অনেকক্ষেত্রে প্রকাশ্যে মদত দিচ্ছে খোদ রাষ্ট্র। দলিত, সংখ্যালঘু, সেক্যুলার, মানবতাবাদীরা, সরকার, রাষ্ট্রের সমালোচনাকারীরা আক্রান্ত, অত্যাচারিত,পরাধীন,বিপন্ন। সারা দেশ জুড়ে তীব্র অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে। তাই দেশের এহেন পরিস্থিতিতে রাস্তা একটাই, ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ,রাস্তায় নেমে বুলেটের মুখে, ঝলকানো ছোরার সামনে।

#Not_In_My_Name

রবিবার, ২৫ জুন, ২০১৭

নারীর যৌনতা যে সমাজে ট্যাবু
___________________________

সুস্থ যৌনতা বলতে যেটা বোঝায়, সেটা আমাদের সমাজে ট্যাবু। ইদানীং আমাদের দেশের কিছু তথাকথিত গোষ্ঠীও এ ট্যাবুটাকে আরো বেশী করে  বাক্সবন্দী করতে ব্যস্ত। তাই বারবার সুস্থ যৌনতাকে বিকৃত করে উপস্থাপনা করা হচ্ছে (প্রচার করা হচ্ছে ময়ুর সেক্স করে না, ছেলে মুয়ুয়ের চোখের জল খেয়ে প্রেগন্যান্ট হয় মেয়ে ময়ূর!)। যৌনতাকে যে সমাজ ট্যাবু করে রেখেছে, সেখানে আরো একধাপ এগিয়ে নারীর যৌনতার অধিকার নিয়ে সওয়াল করলে সমাজের স্বঘোষিত কর্তারা যে ছি ছি করে তেড়ে আসবেন, আর সেই তেড়ে আসাতে কিছু পতাকাবাহী তাবেদার শ্রেণীর নারীও যে হাততালি দেবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। সেই ছি ছি কে উপেক্ষা করেই বাকি লেখাটা লিখছি। 

আমাদের প্রচলিত কোনো ধর্মগ্রন্থই নারীকে যৌনতা উপভোগের কোনো বিধান দেয়নি। কোনো ধর্মগ্রন্থের কোথাও বলা হয়নি  স্ত্রী যদি যৌনতায় সন্তুষ্টি লাভ না করে তবে স্বামীর পাপ হবে। বরং বিধান দিয়েছে নারীর একমাত্র কাজ স্বামীর যৌনতার আনন্দটুকু নিশ্চিত করা। স্বামী অক্ষম হলেও তাকে ছেড়ে যাওয়ার অধিকার নারীকে দেওয়া হয়নি। যে সমাজে যৌনতা শব্দটাই নিষিদ্ধ, সেখানে কোনো নারী যদি যৌনতার কথা বলে তাকে কি নামে ডাকা হয়, সেটা আমাদের কারুরই অজানা নয়। যাইহোক, সমস্ত বিষয়টাকে ধর্মের ছাঁচে ফেলে এমনভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছে যাতে নারীরা নিজেদের জন্য যৌন আনন্দ বলে যে কিছু আছে, সেটার কথা কস্মিনকালেও  না ভাবতে পারে। 

নারী পুরুষের তুলনায় যৌনতায় কখনোই পিছিয়ে ছিলো না। নারী যে পুরুষের চেয়ে যৌনতায় বেশি সক্রিয় এর অসংখ্য প্রমাণও আছে। 'সেক্স ডিফারেন্স ইন সেক্সচুয়াল ফ্যান্টাসি' বইটি তে এলিস স্যামন্স বলেছেন যৌনতার ক্ষেত্রে নারীরা অনেক সময় পুরুষের তুলনায় ৭ গুণ বেশি সক্রিয় থাকে। 

কিন্তু বাস্তবে যৌনতাকে পুরুষ নিজেদের কব্জায় রেখেছে যুগ যুগান্তর থেকে। নারীর ও যে কম বেশী যৌনচাহিদা থাকতে পারে সেটা তারা মেনে নিতে পারে না। বিছানায় যে নারী নিজে এগ্রেসিভ ভুমিকা নেয় বা পুরুষটিকে গাইড করতে চায়, তার সেই ডমিনেশন পুরুষটি মেনে নিতে চায় না, অথবা ভাবে নারীটির নিশ্চয় সেক্সের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। অতএব কর্তার ইচ্ছাই কর্ম। এবং যৌনতার ক্ষেত্রে পুরুষ তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। বেশীরভাগ পুরুষ নিজের তৃপ্তিটুকুই চায়, সঙ্গিনীও তৃপ্ত  কিনা, সে বিষয়ে ফিরেও দেখে না। যা প্রচন্ড রকমের স্বার্থপরতা। আমাদের সমাজে অনেক নারী ই আছেন যারা বছরের পর বছর অতৃপ্ত থেকেও সংসারধর্ম পালন করে যাচ্ছেন। পতি পরমেশ্বরের যৌন চাহিদা যন্ত্রনাদায়ক, বিরক্তিকর হলেও মুখ বুজে, লোকলজ্জার ভয়ে টু শব্দটি করছেন না। কারন, যুগ যুগ ধরে তাদের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আসা হয়েছে। যৌনতা কি সেটা পরিপূর্ণভাবে জানতে দেওয়া হয়নি। অধিকাংশ নারীই জানে না ‘অরগাজম’ আসলে কি? 

ধর্ম, সমাজ, নারীকে ছোট থেকেই পই পই করে শিখিয়ে দিয়েছে, নারীকে নিজের যৌনচাহিদা দমন করে রাখতে হয়, সেটার কথা মুখে বলা পাপ, সেটা যে নারী বলে সে বেশ্যা। বিধবাদের যৌনচাহিদা না হওয়ার জন্য তাদের আমিষ খাওয়া বারন। যৌন চাহিদা শুধুমাত্র পুরুষের আছে এবং যখন যেভাবে ইচ্ছা তারা সেটা মেটাতেও পারে। তাদের জন্য ঘর ও আছে, বাইরেও আছে। মধ্যযুগে কোন এক জায়গায় নাকি পরিবারের পুরুষেরা বিদেশ বিভুইয়ে যাওয়ার সময় পরিবারের নারী সদস্যের যোনী তালা দিয়ে যেত। কুমারী মেয়েদেরও বিয়ে না হওয়া অব্দি যোনী তালা দেওয়া থাকত। আমাদের দেশে আক্ষরিক অর্থে তালা দেওয়া হয়না বটে, তবে হাজার হাজার অদৃশ্য শেকল আর তালা নারীকে ঘিরে রাখে। নারী জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি শুধু দিয়েই যাবে, তার চাহিদা, ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনো মূল্য নেই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। 

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বলতে আমরা শুধু মারপিট কেই বুঝি। কিন্তু যৌনচাহিদা থেকে বঞ্চিত করাও যে একধরনের ডমেস্টিক ভায়োলেন্স সেটা আমরা বুঝতে চাই না। যৌনচাহিদা দমন করতে করতে একসময় অনেক নারী মানসিক ভাবে অসুস্থ ও হয়ে পড়তে পারে। ঘুম, খাওয়া, পায়খানা প্রসাব করার মতো যৌনচাহিদাও যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব প্রাণীর  একধরনের সাধারণ শরীরবৃত্তীয় ঘটনা, যা আমরা নিয়ন্ত্রন করতে পারি, উপেক্ষা নয়, এটা বুঝতে আমাদের সমাজের এখনো কয়েকশ বছর লেগে যাবে! 




রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

আমার পোষাক নিয়ে তোমার এত মাথাব্যাথা কেন, হে সমাজ!!




সেই ছোটোবেলা থেকে গ্রাজুয়েশন ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা অব্দি আমার চুল একদম ছোটো করে কাটা ছিল, মানে ছেলেদের চুলের মতো। ইদানীং একটু লম্বা হয়েছে। ছোটোবেলা প্রতি রোববার দিন বাপী আমাকে আর আমার ছোটবোন মুনকে সঙ্গে নিয়ে সেলুন থেকে চুল কাটিয়ে আনতেন। বড় হয়ে সেলুনে না গেলেও, পার্লার থেকে ছোট করে চুল কাটিয়ে আসতাম। ছোটোবেলা থেকেই আমি সবসময় প্যান্ট সাথে শার্ট বা টি-শার্ট পরতাম। এমনকি এখন অব্দি তার হেরফের হয়নি। এখন ও পরি। যতদুর মনে পড়ে প্রাইমারী স্কুলেও আমি প্যান্ট আর শার্ট পরে যেতাম। মাধ্যমিকে আমাদের স্কুলে মেয়েদের ড্রেস ছিলো শাড়ি। সমস্ত শাড়ি সেফটিফিন দিয়ে কোনোক্রমে গায়ে ঝুলিয়ে স্কুলে যেতাম।  জামা বা চুড়িদার আমাকে কখনো কিনে দেওয়া হয়নি। এখন ও নেই।  ছোট থেকে এগুলোই আমার পছন্দের পোশাক। মাঝে মধ্যে এখন অবশ্য ইচ্ছে হলে  শাড়ি পরি। তাও সর্বসাকুল্যে দু-তিন বারের বেশী পরিনি।

সে যাই হোক। আমার জীবনের রামকাহিনী লিখতে বসিনি এখানে। যে প্রসঙ্গে এই কথাগুলোর অবতারনা সেটা হলো, সেই ছোটোবেলা থেকে এই সমাজের একটা প্রশ্নে আমি জেরবার হয়ে আছি, সেটা হলো আমি ছেলে না মেয়ে? মেয়ে হলে সালোয়ার কামিজ না পরে প্যান্ট টি-শার্ট পরি কেন?? বয়কাট চুল কেন?? এক অদ্ভুত চোখে তারা দেখতে লাগলো আমায়। একটু বড় হওয়ার পর শুরু হলো ধর্মীয় অনুশাসনের কথা। গ্রামের বাড়ি বছরে যে দুবার যেতাম, গ্রামের চাচী,ফুফু, খালা, চাচাতো বোন, সবার একই কথার সাথে যোগ হলো আল্লার আদেশ উপদেশের কথা। এসব পোষাক পরলে পাপ হয়। নরকে যায় মৃত্যুর পর ইত্যাদি ইত্যাদি। বাপিকে একবার মসজিদের ইমাম বললেন আপনার মেয়েকে এসব পোষাক না পরিয়ে সালোয়ার কামিজ পরতে বলবেন। আমার বাপি বললেন, আমার মেয়ে কি পরবে না পরবে সেটা বলার আপনি কে? আমার মেয়ে তো খালি গায়ে হাঁটছে না! যথেষ্ট ভদ্র পোষাকই পরে আছে। সত্যি কথা বলতে কি বাপি কোনোদিন আমাদের  কোনো ধর্মীয় অনুশাসনে বেঁধে রাখেননি। মুক্তভাবে, মুক্তমনে বড় করেছেন। কৃষকসভা, পার্টির কাজ শেষে যেটুকু সময় পেতেন আমাদের বিভিন্ন ফাংশনে নিয়ে যেতেন, কমিউনিজম সম্পর্কে বোঝাতেন, প্রচুর বই কিনে দিতেন। পরিক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে বই উপহার দিতেন। কোনোদিন ছেলে-মেয়ের তফাৎ শেখান নি। সারাজীবন বাপির এই সাহস যুগানো থেকেই আজকের আমি হয়তো এইরকম হতে পেরেছি। যাইহোক, শুধু গ্রামের আত্মীয়-কুটুম ই নয়, প্রাইভেট টিউশনের বন্ধুরা থেকে শুরু করে পাড়ার বয়স্ক কাকিমা - সবার মুখে একই প্রশ্ন। এখনো। যেন আমার বয়কাট চুল আর প্যান্ট-শার্ট তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে!!

এসব প্রশ্ন আমার বড় অদ্ভুত  লাগে। আচ্ছা আমি ছেলে হই বা মেয়ে তাতে এই সমাজের মানুষের এত মাথাব্যাথা কেন?? তাদের এত সুড়সুড়ি কেন লাগে?? আমি বুঝতে পারি না। আমি তো কাউকে বলি না, তুমি কেন শাড়ী পরেছো? তুমি কেন সালোয়ার কামিজ পরেছো? তুমি কেন হিজাব পরেছো? তাহলে অন্য একজন কি পরলো, গলায় ওড়না দিলো কিনা, জিন্স-টি-শার্ট পরলো কিনা, সেটা নিয়ে তাদের এত মাথাব্যাথা কেন?? পোশাক মানুষ নিজের ইচ্ছেয় পরে। চুল মানুষ নিজের ইচ্ছেতে ছোট করে অথবা লম্বা করে! মানুষের ইচ্ছের উপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার কে এই মানুষগুলোকে দিয়েছে??

আসলে কি জানেন, নারীকে মাংসপিন্ড শুধু পুরুষ ই ভাবে না, ক্ষেত্রবিশেষে নারীরাও ভাবে। পুরুষতন্ত্র তাদের মাথায় পই পই করে ঢুকিয়ে দিয়েছে নারীর সংজ্ঞা। ভালো নারী খারাপ নারীর সংজ্ঞা। ভালো নারী মানে তোমাকে সালোয়ার কামিজ পরতে হবে। ভালো নারী মানে আধহাত ঘোমটা বা হিজাব পরা এক জড়বস্তু। যে বাবুরাম সাপুড়ের সাপের মতো 'করে নাকো ফোঁসফাস, নেই কোনো উৎপাত। একজন নারীর হাত, পায়ের পাতা, গলা, মুখ, সবই এই সমাজে সেক্স অবজেক্ট । তাই তাকে আপাদমস্তক ঢেকে থাকতে হবে। তার চুল কেমন হবে, হাঁটা চলা কেমন হবে হবে সেটাও পূর্বনির্ধারিত করে দেওয়া হবে। এর বাইরে কোনো মেয়ে অন্যরকম কিছু করতে চাইলেই সে খারাপ মেয়ে।

কিন্তু তারা জানে না তাদের এইসব প্রশ্নে আমার রাগ উঠে না, করুণা হয় তাদের প্রতি। করুণা হয় এটা ভেবে, তারা জানে না যারা পোশাকের দোহাই দিয়ে নারীকে বন্দি রাখতে চায়, একজন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায়, কুপুরুষের কুরুচিকে জায়েজ করতে চায়, তাদেরকে আমি মানুষ সারিতেই ফেলি না!!

সোমবার, ৫ জুন, ২০১৭


দেশ দেশ খেলা!






আজ দেশপ্রেম দিবস। কারন আজ ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ। প্রতিবার ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের সময়, আমরা দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে থাকি। 

বন্ধুরা মিলে খেলা দেখার সময়, পাশের মুসলিম বন্ধুটিকে শুনিয়ে, আরো জোরে জোরে বলে উঠবে, 'জিতেগা ভাই জিতেগা, হিন্দুস্তান জিতেগা' । তারা ধরেই নেবে পাশের বন্ধুটি যেহেতু মুসলিম, তাই সে পাকিস্তানের সাপোর্টার। ভারতের প্রতিটি সিক্সে অথবা পাকিস্তানিদের প্রতিটি আউটে বোমা ফাটানো হবে মুসলিম এলাকা দেখে। যেহেতু মুসলিম মানেই পাকিস্তানের সাপোর্টার। আজ মুসলিম প্লেয়াররা খারাপ খেললে তাদের দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অথচ, ইংল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যখন খেলা হয়, তখন কেউ এইরকম দেশপ্রেম দেখাতে আসে না!! 

এই প্রসঙ্গে আমার এক ছাত্রের কথা মনে পড়লো। কদিন আগে কমন রুমে তার সাথে কথা বলছি। ছেলেটির নাম ওয়াহাব। কথা প্রসঙ্গে উঠলো ক্রিকেট ম্যাচের কথা। ছাত্রটি বললো, ম্যাম জানেন আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন তোমার পাকিস্তানকে ভালো লাগে??  ও বললো, না ম্যাম, আমার পাকিস্তানকে ভালো লাগে না, তবু শুধু ক্রিকেট খেলার সময় আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার হয়ে যাই। আমার আরো অবাক হওয়ার পালা! তারপর বললো, ম্যাম, আমি ছোটো থেকেই শচীনের খুব বড়ো ফ্যান। আগে খেলার সময় আমি শচীনের জার্সি পরে খেলা দেখতাম। কিন্তু আমার বন্ধুরা পাকিস্তান হারলে আমাকে ক্ষেপাত, বলতো, দ্যাখ তোর দেশ হেরেছে! পাকিস্তান সিক্স মারলে আমায় বাজে ভাষায় গালি দিত। আমি যত ওদের বলতাম আমি ইন্ডিয়ার সাপোর্টার, ওরা তত ক্ষেপাত আমায়। এরপর আমি ভাবলাম, আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার নই, তবু ওরা আমায় বলে আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার! তাহলে এবার থেকে আমি পাকিস্তানকেই সাপোর্ট করবো ক্রিকেটে। আর এরকম হতে হতে এখন ম্যাম আমি পাকিস্তানকে সাপোর্ট করি ক্রিকেটে!!

আমি ওকে বলেছিলাম একটা কথা সবসময় মনে রেখ, বেশীরভাগ মানুষ তোমার ভিতরে ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে চাইবে। কিন্তু তুমি সেই ফাঁদে পা দিয়ো না। বরং তুমি যেটা বিশ্বাস করো, যেটাকে মন থেকে ভালোবাসো, সেটাই করবে। তুমি মুসলিম, তাই তোমাকে পাকিস্তানের সাপোর্টার হতেই হবে, এইসব কথা যারা বলে তারা তোমার মধ্যে খুব পরিকল্পিত ভাবে ঘৃণা ঢুকিয়ে দিতে চাইছে। তুমি সেটা হতে দিয়ো না। ঘৃণার পরিবর্তে ঘৃণা নয়, ভালোবাসতে শিখো। ভালোবাসা ছড়াও। দেখবে ওরা হেরে যাবে। 

আসলে কি জানেন, ঘৃণা খুব ছোট্ট শব্দ, কিন্তু এর পরিধি বিশাল। টাকার কয়েনের মত ঘৃণারও দুদিক থাকে। একটা ছোটো ছেলে বা মেয়েকে এইরকম ঘৃণার আবহে বড় করে তোলা হচ্ছে। আর তারপর আমরা আশা করছি আমাদের ছেলে মেয়েরা সহিষ্ণু হবে!!? 










যুদ্ধটা আসলে নিজের পেটের সাথে, জাত-ধর্মের সঙ্গে নয় !!







এইমুহুর্তে আমার আপনার, মানে আমরা যুবসমাজের প্রধান সমস্যা কি বলুন তো? বেকারত্ব। আমরা একটা বয়স অব্দি লেখাপড়া করেছি, এক একটা ডিগ্রি নিয়ে রেখেছি, কিন্তু আমাদের হাতে কোনো চাকরী নেই। আমাদের মধ্যে প্রচুর আছে যারা অনেক আর্থিক অসুবিধার মধ্যেও নিজের পড়াশুনো টা চালিয়ে গেছে, শুধুমাত্র একটা ভালো চাকরীর আশায়। স্বপ্ন দেখেছি, এখনো দেখছি, একটা চাকরী পেলেই মা-বাবার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নেব। বিশেষত অনেক ছেলেরা আছে,  চাকরী নেই বলে বিয়ে করতে পারছে না। মেয়েপক্ষ এই সমাজে বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চায় না মেয়ের। 

ভারতবর্ষে এই মুহুর্তে শিক্ষিত বেকারের সমস্যা সবচেয়ে ভয়াবহ। সরকারী যে কোনো চাকরীতে আবেদন পত্র জমা পড়ছে কয়েক হাজার। শুধু এটাই নয়, নিম্নপদের চাকরীর জন্যেও আবেদন করছে অনেক উচ্চ শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা। অনেক ছেলে মেয়েরা লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলেও, মৌখিক পরীক্ষায় রিজেক্ট হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র ঘুষের টাকা যোগাড় করতে না পারায়, অথবা কোনো প্রপার চ্যানেল না থাকায়। যে কিছু সংখ্যক ছেলে মেয়ের টাকা আছে বা মন্ত্রী- বিধায়কদের সাথে চ্যানেল আছে তারাই চাকরী পাচ্ছে। বাদবাকীরা হতাশ হয়ে পায়ের স্যান্ডেল ছিঁড়ছে চাকরীর সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে। 

শুধুমাত্র সরকারী হিসেব মতেই, গত এক বছরে ভারতে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে এক কোটির মতো। অথচ কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র এক লাখ লোকের। গত বছর কেন্দ্রীয় সরকারের সাড়ে ২৪ হাজার শূন্যপদের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল প্রায় দেড় কোটি। চলতি অর্থ-বছরে পদের সংখ্যা ২৫ হাজার বাড়লেও এর বিপরীতে আবেদন ছাড়িয়ে গেছে আড়াই কোটি। এক বছরের মধ্যেই একই সংখ্যক পদের জন্য প্রায় এক কোটি প্রার্থী বেড়ে যাওয়ায় এটা স্পষ্ট, বেসরকারি খাতেও যথেষ্ট চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলছে। 

২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে বছরে এক কোটি ব্যক্তির কর্মসংস্থান করা হবে। এক কোটি  তো দূরে থাক, শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসেবে ২০১৬ সালে মাত্র দেড় লাখ চাকরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির কি হলো?? 

অথচ আমাদের যুবসমাজকে আমি কখনোই দেখি না নিজেদের রোজকার জীবনের এই চাওয়া পাওয়া বা অধিকার দাবী গুলো নিয়ে সরব হতে! সরকারকে প্রশ্ন করতে!  নিজেদের রোজকার জীবনের প্রয়োজনীয় দাবীগুলো ভুলে তারা ব্যস্ত গরু, ধর্ম, আর দেশপ্রেম-দেশদ্রোহীতা নিয়ে। মৌলবাদী শক্তিগুলো তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে ধর্ম আর জাতিবাদের বিষ। এই বিষ দেশ, সমাজকে বিষাক্ত করতে করতে যে তাদেরকেও  গিলে খাবে এটা তারা বুঝতে পারে না। 

তারা বুঝতে পারে না, এইভাবে ধর্ম, জাতি-বর্ণের নামে মিথ্যা প্রচার করে  মৌলবাদী শক্তিগুলো একটা বেকার যুবককে ভুলিয়ে দিচ্ছে, সে বেকার। একজন শ্রমিককে ভুলিয়ে দিচ্ছে, সে একজন শ্রমিক। তার কাছে প্রধান করে তুলছে তার হিন্দুত্বের পরিচয়। মোসলমানিত্বের পরিচয়।তাকে তার রুজি-রোজগারের চিন্তা ভুলিয়ে দিতে তার কানে কানে বলছে – ‘গরব সে কহো হাম হিন্দু হ্যায়’ অথবা  "বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদ করো, পৃথিবীতে ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠা করো।" 

তারা বুঝতে পারে না, এই উগ্র মৌলবাদী শক্তিগুলো গরীব মানুষদের তাদের জীবন-জীবিকার প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে দুরে সরিয়ে দিতে চায় ধর্ম, সম্প্রদায়ের দোহাই তুলে। গরীবী, বেকার সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধি, আর্থিক বৈষম্য, লিঙ্গ সাম্যের অধিকার, সর্বোপরি মানুষ যাতে তার বেসিক মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে কথা বলতে না পারে, তারজন্যে প্রতিনিয়ত খুব সূচারোভাবে তাদের মগজ ধোলাই করছে। মানুষকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে লড়িয়ে দিয়ে এই মৌলবাদী শক্তিগুলো নিজেরা 'রামরাজ্যের' হাওয়া খায়, 'ইসলামিক শাসনের' হাওয়া খায়।

তাই এবারে এই যুবসমাজকেই বুঝতে হবে, কোনটা আমাদের জন্য জরুরী?  ভাবতে হবে 'রামরাজ্যে' বা 'ইসলামিক শরিয়া আইনের দেশে' আমরা  একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো পাবো তো? চাকরী, আর্থিক অবস্থার উন্নতি সব হবে তো?? সাম্য পাবো তো? ভাবতে হবে, আর কতদিন আমরা আমাদের অধিকার গুলো থেকে বঞ্চিত হব? এবং বুঝতে হবে, ধর্ম, রামরাজ্যে, ইসলামী রাষ্ট্রের ফোলানো প্যাকেটে আমাদের পেট ভরবে না। বিধর্মী, নীচুজাত এদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ টা নয়, যুদ্ধটা নিজের পেটের সাথে। যুদ্ধটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের যোগান দিতে পারে না, আর্থিক রোজগারের পথ দেখাতে পারে না। 

তাই অনেক দেরী হয়ে যাওয়ার আগে ভাবো, এবং  নিজেদের মৌলিক দাবীগুলো আদায়ের জন্যে লড়াই করো। 








  








যে দেশপ্রেম নব্বই শতাংশের  ব্যথা-যন্ত্রণা বোঝে না, সেই দেশপ্রেম নিয়ে কী করবেন, হে আমজনতা?? 



" হামে চাহিয়ে আজাদি
মনুবাদ সে আজাদি 
ফ্যাসিবাদ সে আজাদি
পুঁজিবাদ–সামন্তবাদ সে আজাদি
জাতিবাদ সে আজাদি
মেহেঙ্গাই সে আজাদি
হাম লে কে  রহেঙ্গে আজাদি"

জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের তোলা এই স্লোগানে দেশে ঝড় উঠেছিলো কদিন আগে। এবং তার রেশ এখনো চলছে। এই শ্লোগানের নিরিখে দেশ জুড়ে শুরু হল দেশভক্ত আর দেশদ্রোহী খোঁজার পালা।কিছু মনগড়া ধারণা আর কিছু মিডিয়ার খাওয়ানো খবরের ভিত্তিতে শাসকের তাবেদার একশ্রেণীর জনগন তৈরি করলেন তাদের নিজস্ব মতবাদ/দেশপ্রেম,দেশদ্রোহী থিয়োরী। 

'আজাদি' মানে মুক্তি, 'আজাদি' মানে স্বাধীনতা। আর  এই আজাদি, স্বাধীনতা চাওয়াতে দেশের শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের তাবেদার শ্রেণী জনগনের বড় ভয়। শাসক শ্রেণী তো দূর, এই দেশের সাধারন মানুষেরাও ভেবে দেখতে চায়না, কোন পরিস্থিতি দেশের একশ্রেণীর মানুষ আজাদ ভারত থেকে আজাদি চাইছে। তারা ভেবে দেখতে চায়না কেন রোহিত ভেমুলারা শুধুমাত্র দলিত, আধিবাসী পরিচয়ের কারনে লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়? তারা ভেবে দেখতে চায়না কোন পরিস্থিতিতে মনিপুরের মেয়েরা নগ্ন হয়ে বলেন "ইন্ডিয়ান আর্মি রেপ আস"? কেন একজন মানুষকে দশক ধরে অনশন চালিয়ে দাবী জানাতে হয় 'আফস্পা আইন বাতিল করো'? কোন পরিপ্রেক্ষিতে রোহিত ভেমুলার মৃত্যুতে দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকরা প্রতিবাদ করে বলছেন, এটা সাধারন আত্মহত্যা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক খুন ? কোন পরিস্থিতিতে দেশের ভাত  যারা ফলায়, দেশের কনজিউমেবল গুডস গুলো যারা উৎপাদন করে সেই চাষীরা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন? কেন ছত্তিশগড়ের আদিবাসী নারীদের উপর শুধু দল বেঁধে ধর্ষণই নয় বরং তাঁদের স্তন টিপে দেখা হয় যে তাঁরা নকশাল কিনা ? 

ভাবুন হে আমজনতা। ভাবতে শিখুন।তারপর বলুন কারা দেশপ্রেমী? যারা একদিকে "ভারত মাতা কী জয়' স্লোগানে আকাশ বাতাস আন্দোলিত করে, অন্যদিকে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার, এমনকি আকাশ অব্দি তুলে দেয় সস্তায় বিদেশী কোম্পানির হাতে? যারা দেশের কৃষি পণ্যকে মাল্টিন্যাশনেল কোম্পানি গুলোর হাতে তুলে দিয়ে চাষীদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়? যারা বিদেশী কোম্পানির স্বার্থে শ্রম আইন সংস্কার করে এদেশের শ্রমিকদের ন্যুনতম অধিকার কেড়ে নেয়? 

কারা দেশপ্রেমী?? যারা একদিকে দেশের সেনা জওয়ানদের জন্য চোখের জল ফেলে, আবার সেই নিহত সেনার কফিন কেনার বরাদ্দ টাকা থেকে কাটমানি খায়?? জীবনদায়ী ওষুধের উপর থেকে নিয়ন্ত্রন তুলে নিয়ে, সেই ওষুধকে সাধারন মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে পাঠিয়ে দেয়? ডিমনিটাইজেশনের নামে বড় বড় কথা বলে দেশের ঋণের দায়ে জর্জরিত ব্যাঙ্কগুলোর ঝুলি ভরে আপনার আমার জমানো টাকায়, ওদিকে আদানীদের দুইশত কোটি টাকার 'গ্রীণফাইন' মাফ করে দেয়?? 

কারা দেশপ্রেমী? যারা আপনার আমার ট্যাক্সের টাকায় মার্কিন শিল্পপতিদের খুশী করতে ঘনঘন বিদেশ যাত্রা করে?? যারা দেশের মানুষের উপর গণহত্যা চালায় কথিত 'রামরাজ্য' সৃষ্টির লক্ষ্যে? সেই রামরাজ্য, যেখানে সীতাদের বারবার অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়! সেই রামরাজ্য যেখানে শুদ্র হয়ে জ্ঞানচর্চ্চা করার, তথা বেদ পাঠের অপরাধে শম্বুককে মৃত্যদণ্ডে দন্ডিত করা হয়!

কারা দেশপ্রেমী? যারা আমাদের দেশের সম্প্রীতির ঐতিহ্য ও ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করতে চায়? ধ্বংস করতে চায় এদেশের শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসকে? কারা দেশপ্রেমী? যারা তাদের মতের বিরুদ্ধে কথা বললেই মেয়েদের ধর্ষনের হুমকি দেয়? যারা মৃত সৈনিকের মেয়েকেও ধর্ষনের হুমকি দিতে দ্বিধা বোধ করেনি? যারা এই শতাব্দীতে এসেও ভাবে 'মেয়েদের স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই, তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করে রাখতে হয়'? যারা বিজ্ঞান মনস্ক মানুষদের গুপ্তহত্যা করে অপবিজ্ঞান ফেরি করে বেড়ায়? যারা সংখ্যালঘু নারীর পেট চিরে গুজরাটে গর্ভের ভ্রুণ বের করে এনে তলোয়ারের ডগায় নাচায়? কারা দেশপ্রেমী?? যে  উচ্চ বর্ণের পয়সাওয়ালা লোকেরা পায়ের উপর পা তুলে বলবে ওই নীচু জাতের লোকগুলো, ঐ ওদের অধিকার নিয়ে চিৎকার করা ছেলেমেয়েগুলো দেশের শত্রু, জঙ্গী, ওদের মেরে ফেলায় বা ওই মুসলমান মেয়েদের কবর থেকে তুলে একটু ধর্ষণ করলে ক্ষতি নেই?? দলিতদের গাছের সাথে বেঁধে মারলে কোনো দোষ নেই??  যারা মহিলাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় স্যানিটারী ন্যাপকিনের উপর ট্যাক্স বসায় তারাই কি দেশপ্রেমী?? 

যখন রাষ্ট্রনেতারা যুদ্ধে মাতেন আবার কিছুদিন পরে সেই শত্রুদেশের নায়কদের সঙ্গে কোলাকুলি করে চা খান সেগুলো দেশপ্রেম? খুন-ধর্ষণসহ অন্যান্য অভিযোগে অভিযুক্ত প্রার্থীদের বিপুল সংখ্যক ভোট দিয়ে নির্বাচনে জিতিয়ে মন্ত্রী  করার দায়িত্ব নেন যারা,  গর্হিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি জেলে থাকার পরও তাকে বিপুল সংখ্যক ভোট দিয়ে জিতিয়ে আনেন যারা , তারাই কি আমাদের প্রকৃত দেশপ্রেমীকগন ? এর নাম দেশপ্রেম?



আর বলুন কারা দেশদ্রোহী? যারা রাষ্ট্রের কাছে দাবী করে আমাদের দেশের সম্পদের উপর আমাদের দেশের মানুষেরই অধিকার? যারা মনে করে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকজন মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে বাস করার অধিকার আছে? যারা সাহসের সাথে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আকাশে ছুড়ে দিয়ে বলে দেশের প্রতিটি মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজের অধিকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে? যার প্রকৃত অর্থে ভারতবর্ষকে একটা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ গড়ে তুলতে চায়?? যারা ভাবে দেশটা প্রতিটি জাতিসত্বার মিলনে প্রকৃত অর্থে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠুক?? যারা চায় সীমান্তে আমাদের দেশের ছেলেদের এভাবে যেন আর মৃত্যু নাহয়?? যারা বলে যুদ্ধ শুধু ধ্বংস করে, সৃষ্টি নয়? যারা চায়, বর্ণ ব্যবস্থা, জাতি ব্যবস্থা ভেঙ্গে দলিত, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীরাও যেনগর্বের সাথে তাদের আত্মপরিচয় নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে? যারা স্বপ্ন দেখে, সব ধরনের শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন থেকে মুক্ত একটা দেশ?? কারা দেশদ্রোহী? যারা প্রশ্ন তুলে, গণতন্ত্র মানে কি দেশের সবচেয়ে গরিব ৮৩ কোটি মানুষের উপর যুদ্ধ ঘোষণা করা ? গণতন্ত্র মানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়ে ভোটে জেতা ? যারা প্রশ্ন তুলে আদানি, আম্বানি, টাটা, জিন্দল, যোগী, সাধ্বীদের শাসনের উপর?? বিদেশী পূজির পা না চাটে না যারা যারা দেশদ্রোহী?? সাধারণ মানুষের করের পয়সায় পার্লামেন্ট ক্যান্টিনে যে মন্ত্রীরা ১০টাকা ৯০পয়সার মটন কাটলেট চিবিয়ে দেশোদ্ধার  করেন, তাদের উপর যারা প্রশ্ন তুলে,তারা দেশদ্রোহী??  সুপ্রীম কোর্ট ও সংবিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতি প্রশ্ন যারা তুলে , তারা দেশদ্রোহী? যে দেশের শতকরা ষাটভাগ মানুষের ঘরে পানযোগ্য জল নেই, না আছে শিক্ষা না আছে দু মুঠো ভাত, মাথার উপর না আছে চাল,না চিকিৎসার সুযোগ, তাদের অধিকারের কথা যারা বলে, তারা দেশদ্রোহী ? যারা প্রশ্ন তুলে কাশ্মীরিদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তারা দেশদ্রোহী?? পৃথিবীর দিকে তাকান, স্কটল্যান্ড গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে থাকা নিয়ে  গণভোট হয়। কুইবেক প্রদেশ কানাডার মধ্যে থাকবে কিনা সেটা নিয়েও কয়েকবার গণভোট হয়েছে। এটাই গনতন্ত্রের চাহিদা। অথচ ভারতবর্ষে কেউ যদি কাশ্মীরিদের গণভোটের দাবি তোলে, সে হয়  দেশদ্রোহী? 

একদিকে শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন, শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের চাকরী সংস্থান নেই, চারদিকে বেকারত্ব, অন্যদিকে কৃষকরা আত্মহত্যা করছে। এই শ্রমিক, শিক্ষিত, অশিক্ষিত ছেলেমেয়ে, কৃষকরাই ভারতীয় জনগনের নব্বই শতাংশ। যে দেশপ্রেম আপনার আমার, আমরা নব্বই শতাংশের  ব্যথা-যন্ত্রণা বোঝে না, সেই দেশপ্রেম নিয়ে কী করবেন, হে আমজনতা?? ভেবে দেখেছেন কখনো? 














শনিবার, ২০ মে, ২০১৭



প্রসঙ্গ : মৌলবাদ




বর্তমান সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী হুমকির মুখে দাড় করিয়েছে এই উপমহাদেশকে তা হল মৌলবাদ। এই উপমহাদেশের মেধাবী,মানবতাবাদী , প্রতিবাদী মানুষদের ভাগ্য নির্ধারন করছে মৌলবাদী শক্তিগুলো। মৌলবাদ কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের সমাজকে। গিলে খাচ্ছে যুব প্রজন্মকে। আজকাল অনেক প্রগতিশীলদের বলতে দেখি যে ধর্ম খারাপ কিছু করতে শেখায় না। ধর্ম শ্বাশত, চিরন্তন, জীবনের নীতি নির্ধারক। মৌলবাদ খারাপ। তাই ধর্ম নয় কেবল মৌলবাদকে আঘাত কর। তাদের মতে যেন মৌলবাদ ব্যাপারটি হঠাৎ আকাশ থেকে খসে পড়েছে-কোনো শিকড় ছাড়াই। যারা ধর্মকে শ্বাশত, চিরন্তন এবং নৈতিকতার ধারক বাহক মনে করেন আর দোষ দেন ফারাবী বা বজরং দল কিংবা মৌলবাদ নামক বিষয়টার উপর তারা কি মৌলবাদ শব্দটিকে বিশ্লেষন করেন নি কখনো! ‘মৌল’ শব্দের অর্থ মূল থেকে আগত আর ‘বাদ’ শব্দের অর্থ ‘মত’ বা ‘থিওরী’।তাহলে মৌলবাদ শব্দের অর্থ দাড়াল মূল থেকে আগত মত বা থিওরী। কোন্ মূল থেকে আগত থিওরী? ধর্মগ্রন্থের গোঁড়া মূল নীতিগুলো হতে আগত মত বা থিওরী।

পৃথিবীতে ধর্মের সংখ্যা ১০০৯টি এবং সব ধর্মেরই দাবী হলো-সে ধর্মই একমাত্র সঠিক ধর্ম-শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তার কারণ ও আছে- একটি ধর্ম অন্য একটি ধর্মেকে ঠিক বলে স্বীকার করলে সে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা আর থাকবেনা। তাই নিজ ধর্মে বিশ্বাস রাখা এবং একই সাথে উদার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী হওয়া খুবই কঠিন। কারণ ঈশ্বরে বিশ্বাসী ধর্মানুসারীরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থকে ঈশ্বর প্রদত্ত বাণী রূপে দাবী করেন। তাই এই বাণী তাদের কাছে চুড়ান্ত এবং নির্ভূল। এবং তাকে সংশোধন,পরিবর্তন করার অনুমতি কোন মানুষের নেই। অতএব ধর্মগ্রন্থ ও তার বাহক তথা নবী পয়গম্বরদের আদেশ নির্দেশ -আধুনিকতার মানদণ্ডে তা যতই অসঙ্গতিপূর্ণ হউক না কেন- সে অনুসারে আমাদের রাজনৈতিক- সামাজিক-রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করতে হবে। এ বিশ্বাস বা ধারণাই হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। আরো সহজ করে বললে – ধর্মশাস্ত্রের মূল নীতিগুলোকে চরম সত্য বলে যারা মনে করেন, তারাই শেষ পর্যন্ত মৌলবাদী হন। সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বাসই হলো ধর্মীয় মৌলবাদের মূল কারন। ধর্ম যদি বিষবৃক্ষ হয় তবে মৌলবাদ সেই বৃক্ষের একটি বিষাক্ত শাখা। তাই ধর্মকে বাদ দিয়ে মৌলবাদ দমন করার প্রচেষ্টা অনেকটা পেটের অসুখে জ্বরের ওষুধ খাওয়ার মত ব্যাপার।

চলুন দেখা যাক ধর্মগ্রন্থগুলোতে কিভাবে মৌলবাদের বীজ নিহীত থাকে। প্রথমেই আসি ইসলাম ধর্মে। পবিত্র কোরাণের বেশ অনেকটা জুড়েই রয়েছে অনর্থক উত্তেজক নির্দেশাবলীর ছড়াছড়ি, যেগুলো ‘মৌলবাদের মূল কারন’ বলা যায়। কয়েকটা উদাহরন দেয়া যাক- কোরান শেখাচ্ছে যেখানেই অবিশ্বাসীদের পাওয়া যাবে তাদের হত্যা করতে (২:১৯১, ৯:৫), তাদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হতে, কঠোর ব্যবহার করতে (৯:১২৩), আর যুদ্ধ করে যেতে (৮:৬৫)। কোরাণ শেখাচ্ছে বিধর্মীদের অপদস্ত করতে আর তাদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করতে (৯:২৯)। কোরাণ অন্য সকল ধর্মের অনুসারীদের কাছ থেকে ধর্মীয় স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে সোচ্চারে ঘোষণা করছে যে ইসলামই হচ্ছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম (৩:৮৫)। এটি অবিশ্বাসীদের দোজখে (নরকে) নির্বাসিত করে (৫:১০),এবং ‘অপবিত্র’ বলে সম্বোধন করে (৯:২৮); মুসলিমদের ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আদেশ করে যত ক্ষণ পর্যন্ত না অন্য সকল ধর্মকে সরিয়ে ইসলামী রাজত্ব কায়েম হয় (২:১৯৩)। কোরাণ বলছে যে শুধু ইসলামে অবিশ্বাসের কারণেই একটি মানুষ দোজখের আগুনে পুড়বে আর তাকে সেখানে পান করতে হবে দুর্গন্ধ ময় পূঁজ (১৪:১৭)। এই ‘পবিত্র’ গ্রন্থটি অবিশ্বাসীদের হত্যা করতে অথবা তাদের হাত পা কেটে ফেলতে প্ররোচিত করছে, আর ভয় দেখাচ্ছে এই বলে যে- ‘তাদের জন্য পরকালে অপেক্ষা করছে ভয়ানক শাস্তি’ (৫:৩৪)। আরও বলছে,’যারা অবিশ্বাস করে তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক, তাদের মাথার উপর ফুটন্ত জল ঢেলে দেওয়া হবে যাতে ওদের চামড়া আর পেটে যা আছে তা গলে যায়, আর ওদের পেটানোর জন্য থাকবে লোহার মুগুর’ (২২:১৯)। কোরাণ ইহুদী এবং নাসারাদের সাথে বন্ধুত্বটুকু করতে পর্যন্ত নিষেধ করছে (৫:৫১), এমনকি নিজের পিতা বা ভাই যদি আবিশ্বাসী হয় তাদের সাথে সম্পর্ক না রাখতে উদ্বুদ্ধ করছে (৯:২৩, ৩:২৮)।

কোরাণে পরিস্কার করেই আল্লাহ-র বয়ানে বলা হচ্ছে – আল্লা-রসুলে যাদের বিশ্বাস নেই, তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড (৪৮:১৩)। ইসলামে অবিশ্বাস করে কেউ মারা গেলে কঠোর ভাবে উচ্চারিত হবে – ‘ধর ওকে,গলায় বেড়ি পড়াও এবং নিক্ষেপ কর জাহান্নামে আর তাকে শৃংখলিত কর সত্তর হাত দীর্ঘ এক শৃংখলে’ (৬৯:৩০-৩৩)। নবী সবসময়ই আল্লাহর নামে যুদ্ধ করতে সবাইকে উৎসাহিত করেছেন আর সাফাই গেয়েছেন এই বলে – ‘এটা আমাদের জন্য ভালই, এমনকি যদি আমাদের অপছন্দ হয় তবুও’ (২:২১৬), তারপর উপদেশ দিয়েছেন – ‘কাফেরদের গর্দানে আঘাত কর’ আর তারপর তাদের উপর রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবার নির্দেশের পর বলেছেন অবশিষ্টদের ভালভাবে বেঁধে ফেলতে (৪৭:৪)। পরমকরুনাময় আল্লাহতালা এই বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন -‘কাফেরদের হৃদয়ে আমি গভীর ভীতির সঞ্চার করব’ এবং বিশ্বাসীদের আদেশ করেছেন কাফেরদের কাঁধে আঘাত করতে আর হাতের সমস্ত আংগুলের ডগা ভেঙ্গে দিতে (৮:১২) আল্লাহ জ্বিহাদকে মুসলমানদের জন্য ‘আবশ্যিক’ করেছেন আর সতর্ক করেছেন এই বলে -‘তোমরা যদি সামনে না এগিয়ে আস (জ্বিহাদের জন্য) তবে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে মর্মান্তিক শাস্তি'(৯:৩৯)। আল্লাহ তার প্রিয় নবীকে বলছেন, ‘হে নবী, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কর আর কঠোর হও- কেননা, জাহান্নামের মত নিকৃষ্ট আবাস স্থলই হল তাদের পরিনাম’ (৯:৭৩)। এই হচ্ছে কোরাণ। অনেকেই কোরানকে নির্দ্বিধায় “The book of guidence’ বলেন, আর ইসলামকে মনে করেন ‘শান্তির ধর্ম’।যারা এমনটি ভাবেন, তারা কি কখনও ভেবে দেখেছেন যে উপরের আয়াতগুলো কেউ যদি বিশ্বাস করে আর সমাজে তার বাস্তব প্রয়োগ চায় তবে তারা কি ধরনের শান্তি এ পৃথিবীতে বয়ে আনবে? জ্বিহাদীদের কল্যাণে আজকের বিশ্বে ‘ইসলামী সন্ত্রাসবাদ’ (Islamic Terroism) একটি প্রতিষ্ঠিত শব্দ। প্রতিদিন কাগজের পাতা খুললেই দেখা যায় এই জ্বিহাদী জোশে উদ্বুদ্ধ কিছু লোক বোমা মারছে মানুষ-জন, বাড়ী-ঘর, কারখানা, রাস্তাঘাট, যানবাহন, সিনেমা হল, স্কুলে। হাজার খানেক জ্বিহাদী সংগঠন যেমন – আল্ কায়দা, আইসিস, হামাস, হরকত-উল-জিহাদ, হরকত-উল-মুজাহিদিন, আল-বদর-মুজাহিদিন, জামাতে ইসলামিয়া, হিজাব-এ-ইসলামিয়া আজ সারা পৃথিবী জুড়ে কায়েম করছে এক ত্রাসের রাজত্ব ।

আজ অত্যন্ত পরিস্কারভাবে তাই বলার সময় এসেছে – এই ‘পবিত্র’ ধর্মগ্রন্থগুলো অনেকাংশেই মুসলিমদের ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের মূল উৎস। তবে সেই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি দীর্ঘদিনের বিদ্বেষমূলক পররাষ্ট্রনীতির কথাও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না । মুসলিম সমাজে একটা বিরাট অংশ রয়েছে যারা রীতিমত কোরাণের চর্চা করেন, চোখ-কান বন্ধ করে কোরানের সকল আদেশ- নির্দেশ মেনে চলেন আর কোরাণের আলোকে দেশ ও পৃথিবী গড়তে চান। বিপদটা এদের নিয়েই। কারণ কেউ যদি সামাজিক শিক্ষার বদলে কোরানের সকল আদেশ-নির্দেশ চোখ-কান বন্ধ করে মেনে নেন তাহলে কি হবে ? কোরাণের অমানবিক শিক্ষাই যে শেষ পর্যন্ত মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে ‘কাফিরদের’ বিরুদ্ধে অযথা হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানোতে বহুলাংশে দায়ী, এটি অস্বীকার করার চেষ্টা স্রেফ আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়।

হিন্দু ধর্মকে ইসলাম থেকে কোন অর্থেই ভাল বলবার জো নেই। যে জাতিভেদ প্রথার বিষ-বাষ্প প্রায় তিন হাজার বছর ধরে কুড়ে কুড়ে ভারতকে খাচ্ছে তার প্রধান রূপকার স্বয়ং ঈশ্বর। মনুসংহিতা থেকে আমরা পাই- মানুষের সমৃদ্ধি কামনায় পরমেশ্বর নিজের মুখ থেকে ব্রাক্ষ্মণ, বাহু থকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য, আর পা থেকে শুদ্র সৃষ্টি করেছিলেন (১:৩১)।
বিশ্বাসীরা জোর গলায় বলেন, ঈশ্বরের চোখে নাকি সবাই সমান! অথচ, ব্রাক্ষ্মণদের মাথা থেকে আর শুদ্রদের পা থেকে তৈরী করার পেছনে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যটি কিন্তু বড়-ই মহান! শুদ্র আর দলিত নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের প্রতি তাই ‘ঈশ্বরের মাথা থেকে সৃষ্ট’ উঁচু জাতের ব্রাক্ষ্মণদের দুর্ব্যবহারের কথা সর্বজনবিদিত। সমস্ত বড়লোকের বাসায় এখনও দাস হিসেবে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নিয়োগ দেয়া হয়। মনু বলেছেন- দাসত্বের কাজ নির্বাহ করার জন্যই বিধাতা শুদ্রদের সৃষ্টি করেছিলেন (৮:৪১৩)। এই সমস্ত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বাসার সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে চলে যাওয়ার পর গঙ্গা-জল ছিটিয়ে গৃহকে ‘পবিত্র’ করা হত (ক্ষেত্র বিশেষে এখনও হয়)। আর হবে নাই বা কেন ! তারা আবার মানুষ নাকি? তারা তো অচ্ছুৎ! এমন কি হিন্দু ধর্মের দৃষ্টিতে শুদ্রদের উপার্জিত ধন সম্পত্তি তাদের ভোগের ও অধিকার নেই। সব উপার্জিত ধন দাস-মালিকেরাই গ্রহণ করবে –এই ছিল মনুর বিধান – ‘ন হি তস্যাস্তি কিঞ্চিত স্বং ভর্ত্তৃহার্যধনো হি সঃ’ (৮:৪১৬)।

মনুর এসব বর্ণবাদী নীতির বাস্তব রূপায়ন আমরা দেখতে পাই রামায়ন ও মহাভারতে। বিশেষতঃ ধর্মশাস্ত্রীয় অনুশাসন যে শ্রেনী বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হত এবং শূদ্রদের দমন- নিপীড়নের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ রামায়নে আছে। তপস্যা করার ‘অপরাধে’ রামচন্দ্র খÍগ দিয়ে শম্বুক নামক এক শূদ্র তাপসের শিরোচ্ছেদ করেন তার তথাকথিত রামরাজ্যে । প্রায় একই ধরনের ঘটনা আমরা দেখি মহাভারতে যখন নিষাদরাজ হিরন্যধনুর পুত্র একলব্য দ্রোনাচার্যের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখতে এলে তাকে নীচ জাতি বলে প্রত্যাখ্যান করেন দ্রোণ। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত একলব্যের শর নিক্ষেপের দক্ষতা নষ্ট করে ধনুর্বিদ্যায় দ্রোণের প্রিয় ছাত্র অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুন্ন রক্ষার অভিপ্রায়ে ‘গুরু দক্ষিণা’ হিসেবে একলব্যের বুড়ো আঙ্গুল কেটে নেন তিনি। এ ধরণের অনেক উপকরণ ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন মহাকাব্যগুলোতে । এই সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম আদিম মানুষের সাম্যের সমাজকাঠমোর ভিত উপড়ে ফেলে প্রতিষ্ঠা করেছিল অসাম্যের, শ্রেণীবিভক্ত সমাজের। ধর্মই তৈরী করেছিল মালিক শ্রেনীর কৃত্রিম বিভাজনের, কিংবা হয়ত বলা যায় শোষক শ্রেণীই শ্রেনী বিভক্ত সমাজের ফায়দা পুরোপুরি লুটবার জন্য প্রথম থেকেই কাজে লাগিয়েছিল ধর্মকে; যে ভাবেই দেখি না কেন এর ফলে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সামাজিক আর অর্থনৈতিক শোষণের। এই শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবার জন্যই ব্রাক্ষ্মণেরা প্রচার করেছিল ধর্মগ্রন্থগুলো সয়ং ঈশ্বরের মুখ-নিঃসৃত। মানুষে মানুষে বিভেদ নাকি ঈশ্বর-নির্দেশিত! ইসলামী জ্বিহাদী সৈনিকদের মতই ভারতে ‘সনাতন ধর্ম’ রক্ষায় আজ সচেষ্ট হয়েছে বিজেপি, রাষ্ট্রীয় সয়ং সেবক সংঘ, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, শিব-সেনা, বজরং দলের মত প্রতিক্রিয়াশীল দল গুলো।

ইহুদী এবং খ্রীষ্টানদের পবিত্রগ্রন্থের দিকে তাকালে দেখা যায়, পুরো বাইবেলটিতেই ঈশ্বরের নামে খুন, রাহাজানি, ধর্ষনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কিছু উদাহরণ তো দেওয়া যেতেই পারে। *যুদ্ধজয়ের পর অগনিত যুদ্ধবন্দিকে কব্জা করার পর মুসা নির্দেশ দিয়েছিলেন ঈশ্বরের আদেশ হিসেবে সমস্ত বন্দী পুরুষকে মেরে ফেলতে : এখন তোমরা এই সব ছেলেদের এবং যারা কুমারী নয় এমন সব স্ত্রী লোকদের মেরে ফেল; কিন্তু যারা কুমারী তাদের তোমরা নিজেদের জন্য বাঁচিয়ে রাখ’ (গণনা পুস্তক, ৩১: ১৭-১৮)। একটি হিসেবে দেখা যায়, মুসার নির্দেশে প্রায় ১০০,০০০ জন তরুন এবং প্রায় ৬৮,০০০ অসহায় নারীকে হত্যা করা হয়েছিল । এছাড়াও নিষ্ঠুর, আক্রামনাত্মক এবং অরাজক বিভিন্ন ভার্সসমূহের বিবরণ পাওয়া যায় যিশাইয় (২১: ৯), ১ বংশাবলী (২০:৩), গণনা পুস্তক (২৫: ৩-৪), বিচারকর্তৃগন (৮: ৭), গণনা পুস্তক (১৬: ৩২-৩৫), দ্বিতীয় বিবরণ (১২: ২৯-৩০), ২ বংশাবলী (১৪:৯, ১৪:১২), দ্বিতীয় বিবরণ (১১: ৪-৫), ১ শমূয়েল (৬:১৯), ডয়টারনোমি (১৩:৫-৬, ১৩:৮-৯, ১৩:১৫), ১ শমূয়েল (১৫:২-৩), ২ শমূয়েল (১২:৩১), যিশাইয় (১৩: ১৫-১৬), আদিপুস্তক (৯: ৫-৬) প্রভৃতি নানা জায়গায়। বিশ্বাসী খ্রীষ্টানরা সাধারণতঃ বাইবেলে বর্ণিত এই ধরনের নিষ্ঠুরতা এবং অরাজগতাকে প্রত্যাখান করে বলার চেষ্টা করেন, এগুলো সব বাইবেলের পুরাতন নিয়মের (ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ) অধীন, যীশু খ্রীষ্টের আগমনের সাথে সাথেই আগের সমস্ত অরাজকতা নির্মূল হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এটি সত্য নয়।

বাইবেলের নতুন নিয়মে যীশু খুব পরিস্কার করেই বলেছেন যে তিনি পূর্বতন ধর্মপ্রবর্তকদের নিয়মানুযায়ীই চালিত হবেন – ‘এ কথা মনে কোর না, আমি মূসার আইন-কানুন আর নবীদের লেখা বাতিল করতে এসেছি। আমি সেগুলো বাতিল করতে আসি নি বরং পূর্ণ করতে এসেছি’ (মথি, ৫: ১৭)। খ্রীষ্ট ধর্মের অনুসারীরা যেভাবে যীশুকে শান্তি এবং প্রেমের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন, সত্যিকারের যীশু ঠিক কতটুকু প্রেমময় এ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। যীশু খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন যে : ‘আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে এসেছি এই কথা মনে কোর না। আমি শান্তি দিতে আসি নাই, এসেছি তলোয়ারের আইন প্রতিষ্ঠা করতে। আমি এসেছি মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করাতে; ছেলেকে বাবার বিরুদ্ধে, মেয়েকে মায়ের বিরুদ্ধে, বৌকে শাশুড়ীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে এসেছি’ (মথি, ১০: ৩৪-৩৫)। ব্যভিচার করার জন্য শুধ ব্যভিচারিনী নন, তার শিশুসন্তানদের হত্যা করতেও কার্পন্য বোধ করেন না যীশু: ‘সেইজন্য আমি তাকে বিছানায় ফেলে রাখব, আর যারা তার সঙ্গে ব্যভিচার করে তারা যদি ব্যভিচার থেকে মন না ফিরায় তবে তাদের ভীষণ কষ্টের মধ্যে ফেলব। তার ছেলেমেয়েদেরও আমি মেরে ফেলব ‘(প্রকাশিত বাক্য, ২: ২২-২৩)। ধর্ম নেশায় বুদ করে রাখে মানুষকে।


ধর্মগ্রন্থগুলিতে যা লেখা আছে তা ঈশ্বরের বাণী হিসেবে পালন করা হয় আর উৎসাহের সাথে সমাজে তার প্রয়োগ ঘটান হয়। প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় পড়ছি যে, ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠীর যৌন লালসার, শিকার হচ্ছেন অসহায় নারীরা।। কোরাণের আয়াত উদ্ধৃত করে কাফিরদের বিরুদ্ধে রোজই যুদ্ধের হাঁক দিচ্ছে জঙ্গি গোষ্ঠিরা । গোমাতা রক্ষার জন্য মানুষ খুন হচ্ছেন, গাছের সঙ্গে বেঁধে পেটানো হচ্ছে। গোরক্ষা বাহিনী, হিন্দু যুবা মঞ্চ জায়গায় জায়গায় ত্রাসের সৃষ্টি করছে। ধর্মের ভিত্তিতে মহিলাদের কবর থেকে তুলে রেপ করার ফতোয়া দেওয়া হচ্ছে। তবুও নেশায় বুদ হয়ে ধর্ম আর ধর্মগ্রন্থের মধ্যে ‘শান্তি’, প্রগতি’ আর ‘সহিষ্ণুতা’ খুঁজে চলেছেন মডারেট ধর্মবাদীরা ।

তবে এ কথাও ঠিক যে প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই বেশ কিছু ভাল ভাল কথা আছে ; এ গুলো নিয়েই ধার্মিকেরা গর্ববোধ করেন আর এ কথাগুলোকেই নৈতিকতার চাবিকাঠি বলে মনে করেন তারা। কিন্তু একটু সংশয়বাদী দৃষ্টিকোন থেকে দেখলেই বোঝা যাবে – ভালবাসা প্রেম এবং সহিষ্ণুতার বিভিন্ন উদাহরণ যে ধর্মগ্রন্থ এবং তার প্রচারকদের সাথে লেবেল হিসেবে লাগিয়ে দেওয়া হয় সেগুলো কোনটাই ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের জন্য মৌলিক নয়। যেমন, যীশুখ্রীষ্টের অনেক আগেই লেভিটিকাস (১৯:১৮) বলে গেছেন, ‘নিজেকে যেমন ভালবাস, তেমনি ভালবাসবে তোমার প্রতিবেশীদের।’ বাইবেল এবং কোরানে যে সহনশীলতার কথা বলা আছে, সেগুলোর অনেক আগেই (খ্রীষ্টের জন্মের পাঁচশ বছর আগে) কনফুসিয়াস একইরকমভাবে বলেছিলেন – ‘অন্যের প্রতি সেরকম ব্যবহার কোর না, যা তুমি নিজে পেতে চাও না’। আইসোক্রেটস খ্রীষ্টের জন্মের ৩৭৫ বছর আগে বলে গিয়েছিলেন, ‘অন্যের যে কাজে তুমি রাগান্নিত বোধ কর, তেমন কিছু তুমি অন্যদের প্রতি কোর না’। এমনকি শত্রুদের ভালবাসতে বলার কথা তাওইজমে রয়েছে, কিংবা বুদ্ধের বাণীতে, সেও কিন্তু যীশু বা মুহম্মদের অনেক আগেই। কাজেই নৈতিকতার যে উপকরণগুলোকে ধর্মানুসারীরা তাদের স্ব স্ব ধর্মের ‘পৈত্রিক সম্পত্তি’ বলে ভাবছেন, সেগুলো কোনটাই কিন্তু আসলে ধর্ম থেকে উদ্ভুত হয়নি, বরং বিকশিত হয়েছে সমাজবিবর্তনের অবশ্যাম্ভাবী ফল হিসেবে। সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকে মানুষ কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যকে ‘নৈতিক গুনাবলী’ হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে; কারণ ও ভাবে গ্রহণ না করলে সমাজব্যবস্থা অচীরেই ধ্বসে পড়ত।


সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বাসই হলো ধর্মীয় মৌলবাদের আদি উৎস-ভূমি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে ধর্ম- সাম্প্রদায়িকতারও সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মৌলবাদের মূল উৎস যেহেতু ধর্মীয় গোঁড়ামী এবং এ গোঁড়ামীর উর্বরক্ষেত্র যেহেতু অশিক্ষা- কুশিক্ষা, সেহেতু তাকে রুখতে হলে আমাদের সর্বাগ্রে শিক্ষা, বিশেষভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একই শিক্ষা পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে। ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করতে হবে এবং ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।




তথ্যসূত্রঃ
*সূরা ও আয়াতসমূহ আল-কোরান।
* ‘মহাকাব্য ও মৌলবাদ’- জয়ন্তানুজ বন্দোপাধ্যায়
* তসলিমা নাসরিনের সাক্ষাৎকার।
* ধর্ম ও নৈতিকতা – অভিজিৎ রায়।