এই ব্লগটি সন্ধান করুন

সোমবার, ৫ জুন, ২০১৭



যুদ্ধটা আসলে নিজের পেটের সাথে, জাত-ধর্মের সঙ্গে নয় !!







এইমুহুর্তে আমার আপনার, মানে আমরা যুবসমাজের প্রধান সমস্যা কি বলুন তো? বেকারত্ব। আমরা একটা বয়স অব্দি লেখাপড়া করেছি, এক একটা ডিগ্রি নিয়ে রেখেছি, কিন্তু আমাদের হাতে কোনো চাকরী নেই। আমাদের মধ্যে প্রচুর আছে যারা অনেক আর্থিক অসুবিধার মধ্যেও নিজের পড়াশুনো টা চালিয়ে গেছে, শুধুমাত্র একটা ভালো চাকরীর আশায়। স্বপ্ন দেখেছি, এখনো দেখছি, একটা চাকরী পেলেই মা-বাবার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নেব। বিশেষত অনেক ছেলেরা আছে,  চাকরী নেই বলে বিয়ে করতে পারছে না। মেয়েপক্ষ এই সমাজে বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চায় না মেয়ের। 

ভারতবর্ষে এই মুহুর্তে শিক্ষিত বেকারের সমস্যা সবচেয়ে ভয়াবহ। সরকারী যে কোনো চাকরীতে আবেদন পত্র জমা পড়ছে কয়েক হাজার। শুধু এটাই নয়, নিম্নপদের চাকরীর জন্যেও আবেদন করছে অনেক উচ্চ শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা। অনেক ছেলে মেয়েরা লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলেও, মৌখিক পরীক্ষায় রিজেক্ট হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র ঘুষের টাকা যোগাড় করতে না পারায়, অথবা কোনো প্রপার চ্যানেল না থাকায়। যে কিছু সংখ্যক ছেলে মেয়ের টাকা আছে বা মন্ত্রী- বিধায়কদের সাথে চ্যানেল আছে তারাই চাকরী পাচ্ছে। বাদবাকীরা হতাশ হয়ে পায়ের স্যান্ডেল ছিঁড়ছে চাকরীর সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে। 

শুধুমাত্র সরকারী হিসেব মতেই, গত এক বছরে ভারতে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে এক কোটির মতো। অথচ কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র এক লাখ লোকের। গত বছর কেন্দ্রীয় সরকারের সাড়ে ২৪ হাজার শূন্যপদের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল প্রায় দেড় কোটি। চলতি অর্থ-বছরে পদের সংখ্যা ২৫ হাজার বাড়লেও এর বিপরীতে আবেদন ছাড়িয়ে গেছে আড়াই কোটি। এক বছরের মধ্যেই একই সংখ্যক পদের জন্য প্রায় এক কোটি প্রার্থী বেড়ে যাওয়ায় এটা স্পষ্ট, বেসরকারি খাতেও যথেষ্ট চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলছে। 

২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে বছরে এক কোটি ব্যক্তির কর্মসংস্থান করা হবে। এক কোটি  তো দূরে থাক, শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসেবে ২০১৬ সালে মাত্র দেড় লাখ চাকরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির কি হলো?? 

অথচ আমাদের যুবসমাজকে আমি কখনোই দেখি না নিজেদের রোজকার জীবনের এই চাওয়া পাওয়া বা অধিকার দাবী গুলো নিয়ে সরব হতে! সরকারকে প্রশ্ন করতে!  নিজেদের রোজকার জীবনের প্রয়োজনীয় দাবীগুলো ভুলে তারা ব্যস্ত গরু, ধর্ম, আর দেশপ্রেম-দেশদ্রোহীতা নিয়ে। মৌলবাদী শক্তিগুলো তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে ধর্ম আর জাতিবাদের বিষ। এই বিষ দেশ, সমাজকে বিষাক্ত করতে করতে যে তাদেরকেও  গিলে খাবে এটা তারা বুঝতে পারে না। 

তারা বুঝতে পারে না, এইভাবে ধর্ম, জাতি-বর্ণের নামে মিথ্যা প্রচার করে  মৌলবাদী শক্তিগুলো একটা বেকার যুবককে ভুলিয়ে দিচ্ছে, সে বেকার। একজন শ্রমিককে ভুলিয়ে দিচ্ছে, সে একজন শ্রমিক। তার কাছে প্রধান করে তুলছে তার হিন্দুত্বের পরিচয়। মোসলমানিত্বের পরিচয়।তাকে তার রুজি-রোজগারের চিন্তা ভুলিয়ে দিতে তার কানে কানে বলছে – ‘গরব সে কহো হাম হিন্দু হ্যায়’ অথবা  "বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদ করো, পৃথিবীতে ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠা করো।" 

তারা বুঝতে পারে না, এই উগ্র মৌলবাদী শক্তিগুলো গরীব মানুষদের তাদের জীবন-জীবিকার প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে দুরে সরিয়ে দিতে চায় ধর্ম, সম্প্রদায়ের দোহাই তুলে। গরীবী, বেকার সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধি, আর্থিক বৈষম্য, লিঙ্গ সাম্যের অধিকার, সর্বোপরি মানুষ যাতে তার বেসিক মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে কথা বলতে না পারে, তারজন্যে প্রতিনিয়ত খুব সূচারোভাবে তাদের মগজ ধোলাই করছে। মানুষকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে লড়িয়ে দিয়ে এই মৌলবাদী শক্তিগুলো নিজেরা 'রামরাজ্যের' হাওয়া খায়, 'ইসলামিক শাসনের' হাওয়া খায়।

তাই এবারে এই যুবসমাজকেই বুঝতে হবে, কোনটা আমাদের জন্য জরুরী?  ভাবতে হবে 'রামরাজ্যে' বা 'ইসলামিক শরিয়া আইনের দেশে' আমরা  একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো পাবো তো? চাকরী, আর্থিক অবস্থার উন্নতি সব হবে তো?? সাম্য পাবো তো? ভাবতে হবে, আর কতদিন আমরা আমাদের অধিকার গুলো থেকে বঞ্চিত হব? এবং বুঝতে হবে, ধর্ম, রামরাজ্যে, ইসলামী রাষ্ট্রের ফোলানো প্যাকেটে আমাদের পেট ভরবে না। বিধর্মী, নীচুজাত এদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ টা নয়, যুদ্ধটা নিজের পেটের সাথে। যুদ্ধটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের যোগান দিতে পারে না, আর্থিক রোজগারের পথ দেখাতে পারে না। 

তাই অনেক দেরী হয়ে যাওয়ার আগে ভাবো, এবং  নিজেদের মৌলিক দাবীগুলো আদায়ের জন্যে লড়াই করো। 








  







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন