এই ব্লগটি সন্ধান করুন

রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

আমার পোষাক নিয়ে তোমার এত মাথাব্যাথা কেন, হে সমাজ!!




সেই ছোটোবেলা থেকে গ্রাজুয়েশন ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা অব্দি আমার চুল একদম ছোটো করে কাটা ছিল, মানে ছেলেদের চুলের মতো। ইদানীং একটু লম্বা হয়েছে। ছোটোবেলা প্রতি রোববার দিন বাপী আমাকে আর আমার ছোটবোন মুনকে সঙ্গে নিয়ে সেলুন থেকে চুল কাটিয়ে আনতেন। বড় হয়ে সেলুনে না গেলেও, পার্লার থেকে ছোট করে চুল কাটিয়ে আসতাম। ছোটোবেলা থেকেই আমি সবসময় প্যান্ট সাথে শার্ট বা টি-শার্ট পরতাম। এমনকি এখন অব্দি তার হেরফের হয়নি। এখন ও পরি। যতদুর মনে পড়ে প্রাইমারী স্কুলেও আমি প্যান্ট আর শার্ট পরে যেতাম। মাধ্যমিকে আমাদের স্কুলে মেয়েদের ড্রেস ছিলো শাড়ি। সমস্ত শাড়ি সেফটিফিন দিয়ে কোনোক্রমে গায়ে ঝুলিয়ে স্কুলে যেতাম।  জামা বা চুড়িদার আমাকে কখনো কিনে দেওয়া হয়নি। এখন ও নেই।  ছোট থেকে এগুলোই আমার পছন্দের পোশাক। মাঝে মধ্যে এখন অবশ্য ইচ্ছে হলে  শাড়ি পরি। তাও সর্বসাকুল্যে দু-তিন বারের বেশী পরিনি।

সে যাই হোক। আমার জীবনের রামকাহিনী লিখতে বসিনি এখানে। যে প্রসঙ্গে এই কথাগুলোর অবতারনা সেটা হলো, সেই ছোটোবেলা থেকে এই সমাজের একটা প্রশ্নে আমি জেরবার হয়ে আছি, সেটা হলো আমি ছেলে না মেয়ে? মেয়ে হলে সালোয়ার কামিজ না পরে প্যান্ট টি-শার্ট পরি কেন?? বয়কাট চুল কেন?? এক অদ্ভুত চোখে তারা দেখতে লাগলো আমায়। একটু বড় হওয়ার পর শুরু হলো ধর্মীয় অনুশাসনের কথা। গ্রামের বাড়ি বছরে যে দুবার যেতাম, গ্রামের চাচী,ফুফু, খালা, চাচাতো বোন, সবার একই কথার সাথে যোগ হলো আল্লার আদেশ উপদেশের কথা। এসব পোষাক পরলে পাপ হয়। নরকে যায় মৃত্যুর পর ইত্যাদি ইত্যাদি। বাপিকে একবার মসজিদের ইমাম বললেন আপনার মেয়েকে এসব পোষাক না পরিয়ে সালোয়ার কামিজ পরতে বলবেন। আমার বাপি বললেন, আমার মেয়ে কি পরবে না পরবে সেটা বলার আপনি কে? আমার মেয়ে তো খালি গায়ে হাঁটছে না! যথেষ্ট ভদ্র পোষাকই পরে আছে। সত্যি কথা বলতে কি বাপি কোনোদিন আমাদের  কোনো ধর্মীয় অনুশাসনে বেঁধে রাখেননি। মুক্তভাবে, মুক্তমনে বড় করেছেন। কৃষকসভা, পার্টির কাজ শেষে যেটুকু সময় পেতেন আমাদের বিভিন্ন ফাংশনে নিয়ে যেতেন, কমিউনিজম সম্পর্কে বোঝাতেন, প্রচুর বই কিনে দিতেন। পরিক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে বই উপহার দিতেন। কোনোদিন ছেলে-মেয়ের তফাৎ শেখান নি। সারাজীবন বাপির এই সাহস যুগানো থেকেই আজকের আমি হয়তো এইরকম হতে পেরেছি। যাইহোক, শুধু গ্রামের আত্মীয়-কুটুম ই নয়, প্রাইভেট টিউশনের বন্ধুরা থেকে শুরু করে পাড়ার বয়স্ক কাকিমা - সবার মুখে একই প্রশ্ন। এখনো। যেন আমার বয়কাট চুল আর প্যান্ট-শার্ট তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে!!

এসব প্রশ্ন আমার বড় অদ্ভুত  লাগে। আচ্ছা আমি ছেলে হই বা মেয়ে তাতে এই সমাজের মানুষের এত মাথাব্যাথা কেন?? তাদের এত সুড়সুড়ি কেন লাগে?? আমি বুঝতে পারি না। আমি তো কাউকে বলি না, তুমি কেন শাড়ী পরেছো? তুমি কেন সালোয়ার কামিজ পরেছো? তুমি কেন হিজাব পরেছো? তাহলে অন্য একজন কি পরলো, গলায় ওড়না দিলো কিনা, জিন্স-টি-শার্ট পরলো কিনা, সেটা নিয়ে তাদের এত মাথাব্যাথা কেন?? পোশাক মানুষ নিজের ইচ্ছেয় পরে। চুল মানুষ নিজের ইচ্ছেতে ছোট করে অথবা লম্বা করে! মানুষের ইচ্ছের উপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার কে এই মানুষগুলোকে দিয়েছে??

আসলে কি জানেন, নারীকে মাংসপিন্ড শুধু পুরুষ ই ভাবে না, ক্ষেত্রবিশেষে নারীরাও ভাবে। পুরুষতন্ত্র তাদের মাথায় পই পই করে ঢুকিয়ে দিয়েছে নারীর সংজ্ঞা। ভালো নারী খারাপ নারীর সংজ্ঞা। ভালো নারী মানে তোমাকে সালোয়ার কামিজ পরতে হবে। ভালো নারী মানে আধহাত ঘোমটা বা হিজাব পরা এক জড়বস্তু। যে বাবুরাম সাপুড়ের সাপের মতো 'করে নাকো ফোঁসফাস, নেই কোনো উৎপাত। একজন নারীর হাত, পায়ের পাতা, গলা, মুখ, সবই এই সমাজে সেক্স অবজেক্ট । তাই তাকে আপাদমস্তক ঢেকে থাকতে হবে। তার চুল কেমন হবে, হাঁটা চলা কেমন হবে হবে সেটাও পূর্বনির্ধারিত করে দেওয়া হবে। এর বাইরে কোনো মেয়ে অন্যরকম কিছু করতে চাইলেই সে খারাপ মেয়ে।

কিন্তু তারা জানে না তাদের এইসব প্রশ্নে আমার রাগ উঠে না, করুণা হয় তাদের প্রতি। করুণা হয় এটা ভেবে, তারা জানে না যারা পোশাকের দোহাই দিয়ে নারীকে বন্দি রাখতে চায়, একজন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায়, কুপুরুষের কুরুচিকে জায়েজ করতে চায়, তাদেরকে আমি মানুষ সারিতেই ফেলি না!!

সোমবার, ৫ জুন, ২০১৭


দেশ দেশ খেলা!






আজ দেশপ্রেম দিবস। কারন আজ ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ। প্রতিবার ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের সময়, আমরা দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে থাকি। 

বন্ধুরা মিলে খেলা দেখার সময়, পাশের মুসলিম বন্ধুটিকে শুনিয়ে, আরো জোরে জোরে বলে উঠবে, 'জিতেগা ভাই জিতেগা, হিন্দুস্তান জিতেগা' । তারা ধরেই নেবে পাশের বন্ধুটি যেহেতু মুসলিম, তাই সে পাকিস্তানের সাপোর্টার। ভারতের প্রতিটি সিক্সে অথবা পাকিস্তানিদের প্রতিটি আউটে বোমা ফাটানো হবে মুসলিম এলাকা দেখে। যেহেতু মুসলিম মানেই পাকিস্তানের সাপোর্টার। আজ মুসলিম প্লেয়াররা খারাপ খেললে তাদের দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অথচ, ইংল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যখন খেলা হয়, তখন কেউ এইরকম দেশপ্রেম দেখাতে আসে না!! 

এই প্রসঙ্গে আমার এক ছাত্রের কথা মনে পড়লো। কদিন আগে কমন রুমে তার সাথে কথা বলছি। ছেলেটির নাম ওয়াহাব। কথা প্রসঙ্গে উঠলো ক্রিকেট ম্যাচের কথা। ছাত্রটি বললো, ম্যাম জানেন আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন তোমার পাকিস্তানকে ভালো লাগে??  ও বললো, না ম্যাম, আমার পাকিস্তানকে ভালো লাগে না, তবু শুধু ক্রিকেট খেলার সময় আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার হয়ে যাই। আমার আরো অবাক হওয়ার পালা! তারপর বললো, ম্যাম, আমি ছোটো থেকেই শচীনের খুব বড়ো ফ্যান। আগে খেলার সময় আমি শচীনের জার্সি পরে খেলা দেখতাম। কিন্তু আমার বন্ধুরা পাকিস্তান হারলে আমাকে ক্ষেপাত, বলতো, দ্যাখ তোর দেশ হেরেছে! পাকিস্তান সিক্স মারলে আমায় বাজে ভাষায় গালি দিত। আমি যত ওদের বলতাম আমি ইন্ডিয়ার সাপোর্টার, ওরা তত ক্ষেপাত আমায়। এরপর আমি ভাবলাম, আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার নই, তবু ওরা আমায় বলে আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার! তাহলে এবার থেকে আমি পাকিস্তানকেই সাপোর্ট করবো ক্রিকেটে। আর এরকম হতে হতে এখন ম্যাম আমি পাকিস্তানকে সাপোর্ট করি ক্রিকেটে!!

আমি ওকে বলেছিলাম একটা কথা সবসময় মনে রেখ, বেশীরভাগ মানুষ তোমার ভিতরে ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে চাইবে। কিন্তু তুমি সেই ফাঁদে পা দিয়ো না। বরং তুমি যেটা বিশ্বাস করো, যেটাকে মন থেকে ভালোবাসো, সেটাই করবে। তুমি মুসলিম, তাই তোমাকে পাকিস্তানের সাপোর্টার হতেই হবে, এইসব কথা যারা বলে তারা তোমার মধ্যে খুব পরিকল্পিত ভাবে ঘৃণা ঢুকিয়ে দিতে চাইছে। তুমি সেটা হতে দিয়ো না। ঘৃণার পরিবর্তে ঘৃণা নয়, ভালোবাসতে শিখো। ভালোবাসা ছড়াও। দেখবে ওরা হেরে যাবে। 

আসলে কি জানেন, ঘৃণা খুব ছোট্ট শব্দ, কিন্তু এর পরিধি বিশাল। টাকার কয়েনের মত ঘৃণারও দুদিক থাকে। একটা ছোটো ছেলে বা মেয়েকে এইরকম ঘৃণার আবহে বড় করে তোলা হচ্ছে। আর তারপর আমরা আশা করছি আমাদের ছেলে মেয়েরা সহিষ্ণু হবে!!? 










যুদ্ধটা আসলে নিজের পেটের সাথে, জাত-ধর্মের সঙ্গে নয় !!







এইমুহুর্তে আমার আপনার, মানে আমরা যুবসমাজের প্রধান সমস্যা কি বলুন তো? বেকারত্ব। আমরা একটা বয়স অব্দি লেখাপড়া করেছি, এক একটা ডিগ্রি নিয়ে রেখেছি, কিন্তু আমাদের হাতে কোনো চাকরী নেই। আমাদের মধ্যে প্রচুর আছে যারা অনেক আর্থিক অসুবিধার মধ্যেও নিজের পড়াশুনো টা চালিয়ে গেছে, শুধুমাত্র একটা ভালো চাকরীর আশায়। স্বপ্ন দেখেছি, এখনো দেখছি, একটা চাকরী পেলেই মা-বাবার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নেব। বিশেষত অনেক ছেলেরা আছে,  চাকরী নেই বলে বিয়ে করতে পারছে না। মেয়েপক্ষ এই সমাজে বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চায় না মেয়ের। 

ভারতবর্ষে এই মুহুর্তে শিক্ষিত বেকারের সমস্যা সবচেয়ে ভয়াবহ। সরকারী যে কোনো চাকরীতে আবেদন পত্র জমা পড়ছে কয়েক হাজার। শুধু এটাই নয়, নিম্নপদের চাকরীর জন্যেও আবেদন করছে অনেক উচ্চ শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা। অনেক ছেলে মেয়েরা লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলেও, মৌখিক পরীক্ষায় রিজেক্ট হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র ঘুষের টাকা যোগাড় করতে না পারায়, অথবা কোনো প্রপার চ্যানেল না থাকায়। যে কিছু সংখ্যক ছেলে মেয়ের টাকা আছে বা মন্ত্রী- বিধায়কদের সাথে চ্যানেল আছে তারাই চাকরী পাচ্ছে। বাদবাকীরা হতাশ হয়ে পায়ের স্যান্ডেল ছিঁড়ছে চাকরীর সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে। 

শুধুমাত্র সরকারী হিসেব মতেই, গত এক বছরে ভারতে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে এক কোটির মতো। অথচ কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র এক লাখ লোকের। গত বছর কেন্দ্রীয় সরকারের সাড়ে ২৪ হাজার শূন্যপদের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল প্রায় দেড় কোটি। চলতি অর্থ-বছরে পদের সংখ্যা ২৫ হাজার বাড়লেও এর বিপরীতে আবেদন ছাড়িয়ে গেছে আড়াই কোটি। এক বছরের মধ্যেই একই সংখ্যক পদের জন্য প্রায় এক কোটি প্রার্থী বেড়ে যাওয়ায় এটা স্পষ্ট, বেসরকারি খাতেও যথেষ্ট চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলছে। 

২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে বছরে এক কোটি ব্যক্তির কর্মসংস্থান করা হবে। এক কোটি  তো দূরে থাক, শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসেবে ২০১৬ সালে মাত্র দেড় লাখ চাকরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির কি হলো?? 

অথচ আমাদের যুবসমাজকে আমি কখনোই দেখি না নিজেদের রোজকার জীবনের এই চাওয়া পাওয়া বা অধিকার দাবী গুলো নিয়ে সরব হতে! সরকারকে প্রশ্ন করতে!  নিজেদের রোজকার জীবনের প্রয়োজনীয় দাবীগুলো ভুলে তারা ব্যস্ত গরু, ধর্ম, আর দেশপ্রেম-দেশদ্রোহীতা নিয়ে। মৌলবাদী শক্তিগুলো তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে ধর্ম আর জাতিবাদের বিষ। এই বিষ দেশ, সমাজকে বিষাক্ত করতে করতে যে তাদেরকেও  গিলে খাবে এটা তারা বুঝতে পারে না। 

তারা বুঝতে পারে না, এইভাবে ধর্ম, জাতি-বর্ণের নামে মিথ্যা প্রচার করে  মৌলবাদী শক্তিগুলো একটা বেকার যুবককে ভুলিয়ে দিচ্ছে, সে বেকার। একজন শ্রমিককে ভুলিয়ে দিচ্ছে, সে একজন শ্রমিক। তার কাছে প্রধান করে তুলছে তার হিন্দুত্বের পরিচয়। মোসলমানিত্বের পরিচয়।তাকে তার রুজি-রোজগারের চিন্তা ভুলিয়ে দিতে তার কানে কানে বলছে – ‘গরব সে কহো হাম হিন্দু হ্যায়’ অথবা  "বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদ করো, পৃথিবীতে ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠা করো।" 

তারা বুঝতে পারে না, এই উগ্র মৌলবাদী শক্তিগুলো গরীব মানুষদের তাদের জীবন-জীবিকার প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে দুরে সরিয়ে দিতে চায় ধর্ম, সম্প্রদায়ের দোহাই তুলে। গরীবী, বেকার সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধি, আর্থিক বৈষম্য, লিঙ্গ সাম্যের অধিকার, সর্বোপরি মানুষ যাতে তার বেসিক মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে কথা বলতে না পারে, তারজন্যে প্রতিনিয়ত খুব সূচারোভাবে তাদের মগজ ধোলাই করছে। মানুষকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে লড়িয়ে দিয়ে এই মৌলবাদী শক্তিগুলো নিজেরা 'রামরাজ্যের' হাওয়া খায়, 'ইসলামিক শাসনের' হাওয়া খায়।

তাই এবারে এই যুবসমাজকেই বুঝতে হবে, কোনটা আমাদের জন্য জরুরী?  ভাবতে হবে 'রামরাজ্যে' বা 'ইসলামিক শরিয়া আইনের দেশে' আমরা  একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো পাবো তো? চাকরী, আর্থিক অবস্থার উন্নতি সব হবে তো?? সাম্য পাবো তো? ভাবতে হবে, আর কতদিন আমরা আমাদের অধিকার গুলো থেকে বঞ্চিত হব? এবং বুঝতে হবে, ধর্ম, রামরাজ্যে, ইসলামী রাষ্ট্রের ফোলানো প্যাকেটে আমাদের পেট ভরবে না। বিধর্মী, নীচুজাত এদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ টা নয়, যুদ্ধটা নিজের পেটের সাথে। যুদ্ধটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের যোগান দিতে পারে না, আর্থিক রোজগারের পথ দেখাতে পারে না। 

তাই অনেক দেরী হয়ে যাওয়ার আগে ভাবো, এবং  নিজেদের মৌলিক দাবীগুলো আদায়ের জন্যে লড়াই করো। 








  








যে দেশপ্রেম নব্বই শতাংশের  ব্যথা-যন্ত্রণা বোঝে না, সেই দেশপ্রেম নিয়ে কী করবেন, হে আমজনতা?? 



" হামে চাহিয়ে আজাদি
মনুবাদ সে আজাদি 
ফ্যাসিবাদ সে আজাদি
পুঁজিবাদ–সামন্তবাদ সে আজাদি
জাতিবাদ সে আজাদি
মেহেঙ্গাই সে আজাদি
হাম লে কে  রহেঙ্গে আজাদি"

জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের তোলা এই স্লোগানে দেশে ঝড় উঠেছিলো কদিন আগে। এবং তার রেশ এখনো চলছে। এই শ্লোগানের নিরিখে দেশ জুড়ে শুরু হল দেশভক্ত আর দেশদ্রোহী খোঁজার পালা।কিছু মনগড়া ধারণা আর কিছু মিডিয়ার খাওয়ানো খবরের ভিত্তিতে শাসকের তাবেদার একশ্রেণীর জনগন তৈরি করলেন তাদের নিজস্ব মতবাদ/দেশপ্রেম,দেশদ্রোহী থিয়োরী। 

'আজাদি' মানে মুক্তি, 'আজাদি' মানে স্বাধীনতা। আর  এই আজাদি, স্বাধীনতা চাওয়াতে দেশের শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের তাবেদার শ্রেণী জনগনের বড় ভয়। শাসক শ্রেণী তো দূর, এই দেশের সাধারন মানুষেরাও ভেবে দেখতে চায়না, কোন পরিস্থিতি দেশের একশ্রেণীর মানুষ আজাদ ভারত থেকে আজাদি চাইছে। তারা ভেবে দেখতে চায়না কেন রোহিত ভেমুলারা শুধুমাত্র দলিত, আধিবাসী পরিচয়ের কারনে লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়? তারা ভেবে দেখতে চায়না কোন পরিস্থিতিতে মনিপুরের মেয়েরা নগ্ন হয়ে বলেন "ইন্ডিয়ান আর্মি রেপ আস"? কেন একজন মানুষকে দশক ধরে অনশন চালিয়ে দাবী জানাতে হয় 'আফস্পা আইন বাতিল করো'? কোন পরিপ্রেক্ষিতে রোহিত ভেমুলার মৃত্যুতে দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকরা প্রতিবাদ করে বলছেন, এটা সাধারন আত্মহত্যা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক খুন ? কোন পরিস্থিতিতে দেশের ভাত  যারা ফলায়, দেশের কনজিউমেবল গুডস গুলো যারা উৎপাদন করে সেই চাষীরা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন? কেন ছত্তিশগড়ের আদিবাসী নারীদের উপর শুধু দল বেঁধে ধর্ষণই নয় বরং তাঁদের স্তন টিপে দেখা হয় যে তাঁরা নকশাল কিনা ? 

ভাবুন হে আমজনতা। ভাবতে শিখুন।তারপর বলুন কারা দেশপ্রেমী? যারা একদিকে "ভারত মাতা কী জয়' স্লোগানে আকাশ বাতাস আন্দোলিত করে, অন্যদিকে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার, এমনকি আকাশ অব্দি তুলে দেয় সস্তায় বিদেশী কোম্পানির হাতে? যারা দেশের কৃষি পণ্যকে মাল্টিন্যাশনেল কোম্পানি গুলোর হাতে তুলে দিয়ে চাষীদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়? যারা বিদেশী কোম্পানির স্বার্থে শ্রম আইন সংস্কার করে এদেশের শ্রমিকদের ন্যুনতম অধিকার কেড়ে নেয়? 

কারা দেশপ্রেমী?? যারা একদিকে দেশের সেনা জওয়ানদের জন্য চোখের জল ফেলে, আবার সেই নিহত সেনার কফিন কেনার বরাদ্দ টাকা থেকে কাটমানি খায়?? জীবনদায়ী ওষুধের উপর থেকে নিয়ন্ত্রন তুলে নিয়ে, সেই ওষুধকে সাধারন মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে পাঠিয়ে দেয়? ডিমনিটাইজেশনের নামে বড় বড় কথা বলে দেশের ঋণের দায়ে জর্জরিত ব্যাঙ্কগুলোর ঝুলি ভরে আপনার আমার জমানো টাকায়, ওদিকে আদানীদের দুইশত কোটি টাকার 'গ্রীণফাইন' মাফ করে দেয়?? 

কারা দেশপ্রেমী? যারা আপনার আমার ট্যাক্সের টাকায় মার্কিন শিল্পপতিদের খুশী করতে ঘনঘন বিদেশ যাত্রা করে?? যারা দেশের মানুষের উপর গণহত্যা চালায় কথিত 'রামরাজ্য' সৃষ্টির লক্ষ্যে? সেই রামরাজ্য, যেখানে সীতাদের বারবার অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়! সেই রামরাজ্য যেখানে শুদ্র হয়ে জ্ঞানচর্চ্চা করার, তথা বেদ পাঠের অপরাধে শম্বুককে মৃত্যদণ্ডে দন্ডিত করা হয়!

কারা দেশপ্রেমী? যারা আমাদের দেশের সম্প্রীতির ঐতিহ্য ও ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করতে চায়? ধ্বংস করতে চায় এদেশের শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসকে? কারা দেশপ্রেমী? যারা তাদের মতের বিরুদ্ধে কথা বললেই মেয়েদের ধর্ষনের হুমকি দেয়? যারা মৃত সৈনিকের মেয়েকেও ধর্ষনের হুমকি দিতে দ্বিধা বোধ করেনি? যারা এই শতাব্দীতে এসেও ভাবে 'মেয়েদের স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই, তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করে রাখতে হয়'? যারা বিজ্ঞান মনস্ক মানুষদের গুপ্তহত্যা করে অপবিজ্ঞান ফেরি করে বেড়ায়? যারা সংখ্যালঘু নারীর পেট চিরে গুজরাটে গর্ভের ভ্রুণ বের করে এনে তলোয়ারের ডগায় নাচায়? কারা দেশপ্রেমী?? যে  উচ্চ বর্ণের পয়সাওয়ালা লোকেরা পায়ের উপর পা তুলে বলবে ওই নীচু জাতের লোকগুলো, ঐ ওদের অধিকার নিয়ে চিৎকার করা ছেলেমেয়েগুলো দেশের শত্রু, জঙ্গী, ওদের মেরে ফেলায় বা ওই মুসলমান মেয়েদের কবর থেকে তুলে একটু ধর্ষণ করলে ক্ষতি নেই?? দলিতদের গাছের সাথে বেঁধে মারলে কোনো দোষ নেই??  যারা মহিলাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় স্যানিটারী ন্যাপকিনের উপর ট্যাক্স বসায় তারাই কি দেশপ্রেমী?? 

যখন রাষ্ট্রনেতারা যুদ্ধে মাতেন আবার কিছুদিন পরে সেই শত্রুদেশের নায়কদের সঙ্গে কোলাকুলি করে চা খান সেগুলো দেশপ্রেম? খুন-ধর্ষণসহ অন্যান্য অভিযোগে অভিযুক্ত প্রার্থীদের বিপুল সংখ্যক ভোট দিয়ে নির্বাচনে জিতিয়ে মন্ত্রী  করার দায়িত্ব নেন যারা,  গর্হিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি জেলে থাকার পরও তাকে বিপুল সংখ্যক ভোট দিয়ে জিতিয়ে আনেন যারা , তারাই কি আমাদের প্রকৃত দেশপ্রেমীকগন ? এর নাম দেশপ্রেম?



আর বলুন কারা দেশদ্রোহী? যারা রাষ্ট্রের কাছে দাবী করে আমাদের দেশের সম্পদের উপর আমাদের দেশের মানুষেরই অধিকার? যারা মনে করে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকজন মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে বাস করার অধিকার আছে? যারা সাহসের সাথে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আকাশে ছুড়ে দিয়ে বলে দেশের প্রতিটি মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজের অধিকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে? যার প্রকৃত অর্থে ভারতবর্ষকে একটা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ গড়ে তুলতে চায়?? যারা ভাবে দেশটা প্রতিটি জাতিসত্বার মিলনে প্রকৃত অর্থে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠুক?? যারা চায় সীমান্তে আমাদের দেশের ছেলেদের এভাবে যেন আর মৃত্যু নাহয়?? যারা বলে যুদ্ধ শুধু ধ্বংস করে, সৃষ্টি নয়? যারা চায়, বর্ণ ব্যবস্থা, জাতি ব্যবস্থা ভেঙ্গে দলিত, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীরাও যেনগর্বের সাথে তাদের আত্মপরিচয় নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে? যারা স্বপ্ন দেখে, সব ধরনের শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন থেকে মুক্ত একটা দেশ?? কারা দেশদ্রোহী? যারা প্রশ্ন তুলে, গণতন্ত্র মানে কি দেশের সবচেয়ে গরিব ৮৩ কোটি মানুষের উপর যুদ্ধ ঘোষণা করা ? গণতন্ত্র মানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়ে ভোটে জেতা ? যারা প্রশ্ন তুলে আদানি, আম্বানি, টাটা, জিন্দল, যোগী, সাধ্বীদের শাসনের উপর?? বিদেশী পূজির পা না চাটে না যারা যারা দেশদ্রোহী?? সাধারণ মানুষের করের পয়সায় পার্লামেন্ট ক্যান্টিনে যে মন্ত্রীরা ১০টাকা ৯০পয়সার মটন কাটলেট চিবিয়ে দেশোদ্ধার  করেন, তাদের উপর যারা প্রশ্ন তুলে,তারা দেশদ্রোহী??  সুপ্রীম কোর্ট ও সংবিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতি প্রশ্ন যারা তুলে , তারা দেশদ্রোহী? যে দেশের শতকরা ষাটভাগ মানুষের ঘরে পানযোগ্য জল নেই, না আছে শিক্ষা না আছে দু মুঠো ভাত, মাথার উপর না আছে চাল,না চিকিৎসার সুযোগ, তাদের অধিকারের কথা যারা বলে, তারা দেশদ্রোহী ? যারা প্রশ্ন তুলে কাশ্মীরিদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তারা দেশদ্রোহী?? পৃথিবীর দিকে তাকান, স্কটল্যান্ড গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে থাকা নিয়ে  গণভোট হয়। কুইবেক প্রদেশ কানাডার মধ্যে থাকবে কিনা সেটা নিয়েও কয়েকবার গণভোট হয়েছে। এটাই গনতন্ত্রের চাহিদা। অথচ ভারতবর্ষে কেউ যদি কাশ্মীরিদের গণভোটের দাবি তোলে, সে হয়  দেশদ্রোহী? 

একদিকে শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন, শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের চাকরী সংস্থান নেই, চারদিকে বেকারত্ব, অন্যদিকে কৃষকরা আত্মহত্যা করছে। এই শ্রমিক, শিক্ষিত, অশিক্ষিত ছেলেমেয়ে, কৃষকরাই ভারতীয় জনগনের নব্বই শতাংশ। যে দেশপ্রেম আপনার আমার, আমরা নব্বই শতাংশের  ব্যথা-যন্ত্রণা বোঝে না, সেই দেশপ্রেম নিয়ে কী করবেন, হে আমজনতা?? ভেবে দেখেছেন কখনো? 














শনিবার, ২০ মে, ২০১৭



প্রসঙ্গ : মৌলবাদ




বর্তমান সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী হুমকির মুখে দাড় করিয়েছে এই উপমহাদেশকে তা হল মৌলবাদ। এই উপমহাদেশের মেধাবী,মানবতাবাদী , প্রতিবাদী মানুষদের ভাগ্য নির্ধারন করছে মৌলবাদী শক্তিগুলো। মৌলবাদ কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের সমাজকে। গিলে খাচ্ছে যুব প্রজন্মকে। আজকাল অনেক প্রগতিশীলদের বলতে দেখি যে ধর্ম খারাপ কিছু করতে শেখায় না। ধর্ম শ্বাশত, চিরন্তন, জীবনের নীতি নির্ধারক। মৌলবাদ খারাপ। তাই ধর্ম নয় কেবল মৌলবাদকে আঘাত কর। তাদের মতে যেন মৌলবাদ ব্যাপারটি হঠাৎ আকাশ থেকে খসে পড়েছে-কোনো শিকড় ছাড়াই। যারা ধর্মকে শ্বাশত, চিরন্তন এবং নৈতিকতার ধারক বাহক মনে করেন আর দোষ দেন ফারাবী বা বজরং দল কিংবা মৌলবাদ নামক বিষয়টার উপর তারা কি মৌলবাদ শব্দটিকে বিশ্লেষন করেন নি কখনো! ‘মৌল’ শব্দের অর্থ মূল থেকে আগত আর ‘বাদ’ শব্দের অর্থ ‘মত’ বা ‘থিওরী’।তাহলে মৌলবাদ শব্দের অর্থ দাড়াল মূল থেকে আগত মত বা থিওরী। কোন্ মূল থেকে আগত থিওরী? ধর্মগ্রন্থের গোঁড়া মূল নীতিগুলো হতে আগত মত বা থিওরী।

পৃথিবীতে ধর্মের সংখ্যা ১০০৯টি এবং সব ধর্মেরই দাবী হলো-সে ধর্মই একমাত্র সঠিক ধর্ম-শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তার কারণ ও আছে- একটি ধর্ম অন্য একটি ধর্মেকে ঠিক বলে স্বীকার করলে সে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা আর থাকবেনা। তাই নিজ ধর্মে বিশ্বাস রাখা এবং একই সাথে উদার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী হওয়া খুবই কঠিন। কারণ ঈশ্বরে বিশ্বাসী ধর্মানুসারীরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থকে ঈশ্বর প্রদত্ত বাণী রূপে দাবী করেন। তাই এই বাণী তাদের কাছে চুড়ান্ত এবং নির্ভূল। এবং তাকে সংশোধন,পরিবর্তন করার অনুমতি কোন মানুষের নেই। অতএব ধর্মগ্রন্থ ও তার বাহক তথা নবী পয়গম্বরদের আদেশ নির্দেশ -আধুনিকতার মানদণ্ডে তা যতই অসঙ্গতিপূর্ণ হউক না কেন- সে অনুসারে আমাদের রাজনৈতিক- সামাজিক-রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করতে হবে। এ বিশ্বাস বা ধারণাই হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। আরো সহজ করে বললে – ধর্মশাস্ত্রের মূল নীতিগুলোকে চরম সত্য বলে যারা মনে করেন, তারাই শেষ পর্যন্ত মৌলবাদী হন। সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বাসই হলো ধর্মীয় মৌলবাদের মূল কারন। ধর্ম যদি বিষবৃক্ষ হয় তবে মৌলবাদ সেই বৃক্ষের একটি বিষাক্ত শাখা। তাই ধর্মকে বাদ দিয়ে মৌলবাদ দমন করার প্রচেষ্টা অনেকটা পেটের অসুখে জ্বরের ওষুধ খাওয়ার মত ব্যাপার।

চলুন দেখা যাক ধর্মগ্রন্থগুলোতে কিভাবে মৌলবাদের বীজ নিহীত থাকে। প্রথমেই আসি ইসলাম ধর্মে। পবিত্র কোরাণের বেশ অনেকটা জুড়েই রয়েছে অনর্থক উত্তেজক নির্দেশাবলীর ছড়াছড়ি, যেগুলো ‘মৌলবাদের মূল কারন’ বলা যায়। কয়েকটা উদাহরন দেয়া যাক- কোরান শেখাচ্ছে যেখানেই অবিশ্বাসীদের পাওয়া যাবে তাদের হত্যা করতে (২:১৯১, ৯:৫), তাদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হতে, কঠোর ব্যবহার করতে (৯:১২৩), আর যুদ্ধ করে যেতে (৮:৬৫)। কোরাণ শেখাচ্ছে বিধর্মীদের অপদস্ত করতে আর তাদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করতে (৯:২৯)। কোরাণ অন্য সকল ধর্মের অনুসারীদের কাছ থেকে ধর্মীয় স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে সোচ্চারে ঘোষণা করছে যে ইসলামই হচ্ছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম (৩:৮৫)। এটি অবিশ্বাসীদের দোজখে (নরকে) নির্বাসিত করে (৫:১০),এবং ‘অপবিত্র’ বলে সম্বোধন করে (৯:২৮); মুসলিমদের ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আদেশ করে যত ক্ষণ পর্যন্ত না অন্য সকল ধর্মকে সরিয়ে ইসলামী রাজত্ব কায়েম হয় (২:১৯৩)। কোরাণ বলছে যে শুধু ইসলামে অবিশ্বাসের কারণেই একটি মানুষ দোজখের আগুনে পুড়বে আর তাকে সেখানে পান করতে হবে দুর্গন্ধ ময় পূঁজ (১৪:১৭)। এই ‘পবিত্র’ গ্রন্থটি অবিশ্বাসীদের হত্যা করতে অথবা তাদের হাত পা কেটে ফেলতে প্ররোচিত করছে, আর ভয় দেখাচ্ছে এই বলে যে- ‘তাদের জন্য পরকালে অপেক্ষা করছে ভয়ানক শাস্তি’ (৫:৩৪)। আরও বলছে,’যারা অবিশ্বাস করে তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক, তাদের মাথার উপর ফুটন্ত জল ঢেলে দেওয়া হবে যাতে ওদের চামড়া আর পেটে যা আছে তা গলে যায়, আর ওদের পেটানোর জন্য থাকবে লোহার মুগুর’ (২২:১৯)। কোরাণ ইহুদী এবং নাসারাদের সাথে বন্ধুত্বটুকু করতে পর্যন্ত নিষেধ করছে (৫:৫১), এমনকি নিজের পিতা বা ভাই যদি আবিশ্বাসী হয় তাদের সাথে সম্পর্ক না রাখতে উদ্বুদ্ধ করছে (৯:২৩, ৩:২৮)।

কোরাণে পরিস্কার করেই আল্লাহ-র বয়ানে বলা হচ্ছে – আল্লা-রসুলে যাদের বিশ্বাস নেই, তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড (৪৮:১৩)। ইসলামে অবিশ্বাস করে কেউ মারা গেলে কঠোর ভাবে উচ্চারিত হবে – ‘ধর ওকে,গলায় বেড়ি পড়াও এবং নিক্ষেপ কর জাহান্নামে আর তাকে শৃংখলিত কর সত্তর হাত দীর্ঘ এক শৃংখলে’ (৬৯:৩০-৩৩)। নবী সবসময়ই আল্লাহর নামে যুদ্ধ করতে সবাইকে উৎসাহিত করেছেন আর সাফাই গেয়েছেন এই বলে – ‘এটা আমাদের জন্য ভালই, এমনকি যদি আমাদের অপছন্দ হয় তবুও’ (২:২১৬), তারপর উপদেশ দিয়েছেন – ‘কাফেরদের গর্দানে আঘাত কর’ আর তারপর তাদের উপর রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবার নির্দেশের পর বলেছেন অবশিষ্টদের ভালভাবে বেঁধে ফেলতে (৪৭:৪)। পরমকরুনাময় আল্লাহতালা এই বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন -‘কাফেরদের হৃদয়ে আমি গভীর ভীতির সঞ্চার করব’ এবং বিশ্বাসীদের আদেশ করেছেন কাফেরদের কাঁধে আঘাত করতে আর হাতের সমস্ত আংগুলের ডগা ভেঙ্গে দিতে (৮:১২) আল্লাহ জ্বিহাদকে মুসলমানদের জন্য ‘আবশ্যিক’ করেছেন আর সতর্ক করেছেন এই বলে -‘তোমরা যদি সামনে না এগিয়ে আস (জ্বিহাদের জন্য) তবে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে মর্মান্তিক শাস্তি'(৯:৩৯)। আল্লাহ তার প্রিয় নবীকে বলছেন, ‘হে নবী, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কর আর কঠোর হও- কেননা, জাহান্নামের মত নিকৃষ্ট আবাস স্থলই হল তাদের পরিনাম’ (৯:৭৩)। এই হচ্ছে কোরাণ। অনেকেই কোরানকে নির্দ্বিধায় “The book of guidence’ বলেন, আর ইসলামকে মনে করেন ‘শান্তির ধর্ম’।যারা এমনটি ভাবেন, তারা কি কখনও ভেবে দেখেছেন যে উপরের আয়াতগুলো কেউ যদি বিশ্বাস করে আর সমাজে তার বাস্তব প্রয়োগ চায় তবে তারা কি ধরনের শান্তি এ পৃথিবীতে বয়ে আনবে? জ্বিহাদীদের কল্যাণে আজকের বিশ্বে ‘ইসলামী সন্ত্রাসবাদ’ (Islamic Terroism) একটি প্রতিষ্ঠিত শব্দ। প্রতিদিন কাগজের পাতা খুললেই দেখা যায় এই জ্বিহাদী জোশে উদ্বুদ্ধ কিছু লোক বোমা মারছে মানুষ-জন, বাড়ী-ঘর, কারখানা, রাস্তাঘাট, যানবাহন, সিনেমা হল, স্কুলে। হাজার খানেক জ্বিহাদী সংগঠন যেমন – আল্ কায়দা, আইসিস, হামাস, হরকত-উল-জিহাদ, হরকত-উল-মুজাহিদিন, আল-বদর-মুজাহিদিন, জামাতে ইসলামিয়া, হিজাব-এ-ইসলামিয়া আজ সারা পৃথিবী জুড়ে কায়েম করছে এক ত্রাসের রাজত্ব ।

আজ অত্যন্ত পরিস্কারভাবে তাই বলার সময় এসেছে – এই ‘পবিত্র’ ধর্মগ্রন্থগুলো অনেকাংশেই মুসলিমদের ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের মূল উৎস। তবে সেই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি দীর্ঘদিনের বিদ্বেষমূলক পররাষ্ট্রনীতির কথাও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না । মুসলিম সমাজে একটা বিরাট অংশ রয়েছে যারা রীতিমত কোরাণের চর্চা করেন, চোখ-কান বন্ধ করে কোরানের সকল আদেশ- নির্দেশ মেনে চলেন আর কোরাণের আলোকে দেশ ও পৃথিবী গড়তে চান। বিপদটা এদের নিয়েই। কারণ কেউ যদি সামাজিক শিক্ষার বদলে কোরানের সকল আদেশ-নির্দেশ চোখ-কান বন্ধ করে মেনে নেন তাহলে কি হবে ? কোরাণের অমানবিক শিক্ষাই যে শেষ পর্যন্ত মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে ‘কাফিরদের’ বিরুদ্ধে অযথা হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানোতে বহুলাংশে দায়ী, এটি অস্বীকার করার চেষ্টা স্রেফ আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়।

হিন্দু ধর্মকে ইসলাম থেকে কোন অর্থেই ভাল বলবার জো নেই। যে জাতিভেদ প্রথার বিষ-বাষ্প প্রায় তিন হাজার বছর ধরে কুড়ে কুড়ে ভারতকে খাচ্ছে তার প্রধান রূপকার স্বয়ং ঈশ্বর। মনুসংহিতা থেকে আমরা পাই- মানুষের সমৃদ্ধি কামনায় পরমেশ্বর নিজের মুখ থেকে ব্রাক্ষ্মণ, বাহু থকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য, আর পা থেকে শুদ্র সৃষ্টি করেছিলেন (১:৩১)।
বিশ্বাসীরা জোর গলায় বলেন, ঈশ্বরের চোখে নাকি সবাই সমান! অথচ, ব্রাক্ষ্মণদের মাথা থেকে আর শুদ্রদের পা থেকে তৈরী করার পেছনে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যটি কিন্তু বড়-ই মহান! শুদ্র আর দলিত নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের প্রতি তাই ‘ঈশ্বরের মাথা থেকে সৃষ্ট’ উঁচু জাতের ব্রাক্ষ্মণদের দুর্ব্যবহারের কথা সর্বজনবিদিত। সমস্ত বড়লোকের বাসায় এখনও দাস হিসেবে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নিয়োগ দেয়া হয়। মনু বলেছেন- দাসত্বের কাজ নির্বাহ করার জন্যই বিধাতা শুদ্রদের সৃষ্টি করেছিলেন (৮:৪১৩)। এই সমস্ত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বাসার সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে চলে যাওয়ার পর গঙ্গা-জল ছিটিয়ে গৃহকে ‘পবিত্র’ করা হত (ক্ষেত্র বিশেষে এখনও হয়)। আর হবে নাই বা কেন ! তারা আবার মানুষ নাকি? তারা তো অচ্ছুৎ! এমন কি হিন্দু ধর্মের দৃষ্টিতে শুদ্রদের উপার্জিত ধন সম্পত্তি তাদের ভোগের ও অধিকার নেই। সব উপার্জিত ধন দাস-মালিকেরাই গ্রহণ করবে –এই ছিল মনুর বিধান – ‘ন হি তস্যাস্তি কিঞ্চিত স্বং ভর্ত্তৃহার্যধনো হি সঃ’ (৮:৪১৬)।

মনুর এসব বর্ণবাদী নীতির বাস্তব রূপায়ন আমরা দেখতে পাই রামায়ন ও মহাভারতে। বিশেষতঃ ধর্মশাস্ত্রীয় অনুশাসন যে শ্রেনী বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হত এবং শূদ্রদের দমন- নিপীড়নের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ রামায়নে আছে। তপস্যা করার ‘অপরাধে’ রামচন্দ্র খÍগ দিয়ে শম্বুক নামক এক শূদ্র তাপসের শিরোচ্ছেদ করেন তার তথাকথিত রামরাজ্যে । প্রায় একই ধরনের ঘটনা আমরা দেখি মহাভারতে যখন নিষাদরাজ হিরন্যধনুর পুত্র একলব্য দ্রোনাচার্যের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখতে এলে তাকে নীচ জাতি বলে প্রত্যাখ্যান করেন দ্রোণ। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত একলব্যের শর নিক্ষেপের দক্ষতা নষ্ট করে ধনুর্বিদ্যায় দ্রোণের প্রিয় ছাত্র অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুন্ন রক্ষার অভিপ্রায়ে ‘গুরু দক্ষিণা’ হিসেবে একলব্যের বুড়ো আঙ্গুল কেটে নেন তিনি। এ ধরণের অনেক উপকরণ ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন মহাকাব্যগুলোতে । এই সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম আদিম মানুষের সাম্যের সমাজকাঠমোর ভিত উপড়ে ফেলে প্রতিষ্ঠা করেছিল অসাম্যের, শ্রেণীবিভক্ত সমাজের। ধর্মই তৈরী করেছিল মালিক শ্রেনীর কৃত্রিম বিভাজনের, কিংবা হয়ত বলা যায় শোষক শ্রেণীই শ্রেনী বিভক্ত সমাজের ফায়দা পুরোপুরি লুটবার জন্য প্রথম থেকেই কাজে লাগিয়েছিল ধর্মকে; যে ভাবেই দেখি না কেন এর ফলে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সামাজিক আর অর্থনৈতিক শোষণের। এই শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবার জন্যই ব্রাক্ষ্মণেরা প্রচার করেছিল ধর্মগ্রন্থগুলো সয়ং ঈশ্বরের মুখ-নিঃসৃত। মানুষে মানুষে বিভেদ নাকি ঈশ্বর-নির্দেশিত! ইসলামী জ্বিহাদী সৈনিকদের মতই ভারতে ‘সনাতন ধর্ম’ রক্ষায় আজ সচেষ্ট হয়েছে বিজেপি, রাষ্ট্রীয় সয়ং সেবক সংঘ, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, শিব-সেনা, বজরং দলের মত প্রতিক্রিয়াশীল দল গুলো।

ইহুদী এবং খ্রীষ্টানদের পবিত্রগ্রন্থের দিকে তাকালে দেখা যায়, পুরো বাইবেলটিতেই ঈশ্বরের নামে খুন, রাহাজানি, ধর্ষনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কিছু উদাহরণ তো দেওয়া যেতেই পারে। *যুদ্ধজয়ের পর অগনিত যুদ্ধবন্দিকে কব্জা করার পর মুসা নির্দেশ দিয়েছিলেন ঈশ্বরের আদেশ হিসেবে সমস্ত বন্দী পুরুষকে মেরে ফেলতে : এখন তোমরা এই সব ছেলেদের এবং যারা কুমারী নয় এমন সব স্ত্রী লোকদের মেরে ফেল; কিন্তু যারা কুমারী তাদের তোমরা নিজেদের জন্য বাঁচিয়ে রাখ’ (গণনা পুস্তক, ৩১: ১৭-১৮)। একটি হিসেবে দেখা যায়, মুসার নির্দেশে প্রায় ১০০,০০০ জন তরুন এবং প্রায় ৬৮,০০০ অসহায় নারীকে হত্যা করা হয়েছিল । এছাড়াও নিষ্ঠুর, আক্রামনাত্মক এবং অরাজক বিভিন্ন ভার্সসমূহের বিবরণ পাওয়া যায় যিশাইয় (২১: ৯), ১ বংশাবলী (২০:৩), গণনা পুস্তক (২৫: ৩-৪), বিচারকর্তৃগন (৮: ৭), গণনা পুস্তক (১৬: ৩২-৩৫), দ্বিতীয় বিবরণ (১২: ২৯-৩০), ২ বংশাবলী (১৪:৯, ১৪:১২), দ্বিতীয় বিবরণ (১১: ৪-৫), ১ শমূয়েল (৬:১৯), ডয়টারনোমি (১৩:৫-৬, ১৩:৮-৯, ১৩:১৫), ১ শমূয়েল (১৫:২-৩), ২ শমূয়েল (১২:৩১), যিশাইয় (১৩: ১৫-১৬), আদিপুস্তক (৯: ৫-৬) প্রভৃতি নানা জায়গায়। বিশ্বাসী খ্রীষ্টানরা সাধারণতঃ বাইবেলে বর্ণিত এই ধরনের নিষ্ঠুরতা এবং অরাজগতাকে প্রত্যাখান করে বলার চেষ্টা করেন, এগুলো সব বাইবেলের পুরাতন নিয়মের (ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ) অধীন, যীশু খ্রীষ্টের আগমনের সাথে সাথেই আগের সমস্ত অরাজকতা নির্মূল হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এটি সত্য নয়।

বাইবেলের নতুন নিয়মে যীশু খুব পরিস্কার করেই বলেছেন যে তিনি পূর্বতন ধর্মপ্রবর্তকদের নিয়মানুযায়ীই চালিত হবেন – ‘এ কথা মনে কোর না, আমি মূসার আইন-কানুন আর নবীদের লেখা বাতিল করতে এসেছি। আমি সেগুলো বাতিল করতে আসি নি বরং পূর্ণ করতে এসেছি’ (মথি, ৫: ১৭)। খ্রীষ্ট ধর্মের অনুসারীরা যেভাবে যীশুকে শান্তি এবং প্রেমের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন, সত্যিকারের যীশু ঠিক কতটুকু প্রেমময় এ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। যীশু খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন যে : ‘আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে এসেছি এই কথা মনে কোর না। আমি শান্তি দিতে আসি নাই, এসেছি তলোয়ারের আইন প্রতিষ্ঠা করতে। আমি এসেছি মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করাতে; ছেলেকে বাবার বিরুদ্ধে, মেয়েকে মায়ের বিরুদ্ধে, বৌকে শাশুড়ীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে এসেছি’ (মথি, ১০: ৩৪-৩৫)। ব্যভিচার করার জন্য শুধ ব্যভিচারিনী নন, তার শিশুসন্তানদের হত্যা করতেও কার্পন্য বোধ করেন না যীশু: ‘সেইজন্য আমি তাকে বিছানায় ফেলে রাখব, আর যারা তার সঙ্গে ব্যভিচার করে তারা যদি ব্যভিচার থেকে মন না ফিরায় তবে তাদের ভীষণ কষ্টের মধ্যে ফেলব। তার ছেলেমেয়েদেরও আমি মেরে ফেলব ‘(প্রকাশিত বাক্য, ২: ২২-২৩)। ধর্ম নেশায় বুদ করে রাখে মানুষকে।


ধর্মগ্রন্থগুলিতে যা লেখা আছে তা ঈশ্বরের বাণী হিসেবে পালন করা হয় আর উৎসাহের সাথে সমাজে তার প্রয়োগ ঘটান হয়। প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় পড়ছি যে, ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠীর যৌন লালসার, শিকার হচ্ছেন অসহায় নারীরা।। কোরাণের আয়াত উদ্ধৃত করে কাফিরদের বিরুদ্ধে রোজই যুদ্ধের হাঁক দিচ্ছে জঙ্গি গোষ্ঠিরা । গোমাতা রক্ষার জন্য মানুষ খুন হচ্ছেন, গাছের সঙ্গে বেঁধে পেটানো হচ্ছে। গোরক্ষা বাহিনী, হিন্দু যুবা মঞ্চ জায়গায় জায়গায় ত্রাসের সৃষ্টি করছে। ধর্মের ভিত্তিতে মহিলাদের কবর থেকে তুলে রেপ করার ফতোয়া দেওয়া হচ্ছে। তবুও নেশায় বুদ হয়ে ধর্ম আর ধর্মগ্রন্থের মধ্যে ‘শান্তি’, প্রগতি’ আর ‘সহিষ্ণুতা’ খুঁজে চলেছেন মডারেট ধর্মবাদীরা ।

তবে এ কথাও ঠিক যে প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই বেশ কিছু ভাল ভাল কথা আছে ; এ গুলো নিয়েই ধার্মিকেরা গর্ববোধ করেন আর এ কথাগুলোকেই নৈতিকতার চাবিকাঠি বলে মনে করেন তারা। কিন্তু একটু সংশয়বাদী দৃষ্টিকোন থেকে দেখলেই বোঝা যাবে – ভালবাসা প্রেম এবং সহিষ্ণুতার বিভিন্ন উদাহরণ যে ধর্মগ্রন্থ এবং তার প্রচারকদের সাথে লেবেল হিসেবে লাগিয়ে দেওয়া হয় সেগুলো কোনটাই ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের জন্য মৌলিক নয়। যেমন, যীশুখ্রীষ্টের অনেক আগেই লেভিটিকাস (১৯:১৮) বলে গেছেন, ‘নিজেকে যেমন ভালবাস, তেমনি ভালবাসবে তোমার প্রতিবেশীদের।’ বাইবেল এবং কোরানে যে সহনশীলতার কথা বলা আছে, সেগুলোর অনেক আগেই (খ্রীষ্টের জন্মের পাঁচশ বছর আগে) কনফুসিয়াস একইরকমভাবে বলেছিলেন – ‘অন্যের প্রতি সেরকম ব্যবহার কোর না, যা তুমি নিজে পেতে চাও না’। আইসোক্রেটস খ্রীষ্টের জন্মের ৩৭৫ বছর আগে বলে গিয়েছিলেন, ‘অন্যের যে কাজে তুমি রাগান্নিত বোধ কর, তেমন কিছু তুমি অন্যদের প্রতি কোর না’। এমনকি শত্রুদের ভালবাসতে বলার কথা তাওইজমে রয়েছে, কিংবা বুদ্ধের বাণীতে, সেও কিন্তু যীশু বা মুহম্মদের অনেক আগেই। কাজেই নৈতিকতার যে উপকরণগুলোকে ধর্মানুসারীরা তাদের স্ব স্ব ধর্মের ‘পৈত্রিক সম্পত্তি’ বলে ভাবছেন, সেগুলো কোনটাই কিন্তু আসলে ধর্ম থেকে উদ্ভুত হয়নি, বরং বিকশিত হয়েছে সমাজবিবর্তনের অবশ্যাম্ভাবী ফল হিসেবে। সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকে মানুষ কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যকে ‘নৈতিক গুনাবলী’ হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে; কারণ ও ভাবে গ্রহণ না করলে সমাজব্যবস্থা অচীরেই ধ্বসে পড়ত।


সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বাসই হলো ধর্মীয় মৌলবাদের আদি উৎস-ভূমি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে ধর্ম- সাম্প্রদায়িকতারও সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মৌলবাদের মূল উৎস যেহেতু ধর্মীয় গোঁড়ামী এবং এ গোঁড়ামীর উর্বরক্ষেত্র যেহেতু অশিক্ষা- কুশিক্ষা, সেহেতু তাকে রুখতে হলে আমাদের সর্বাগ্রে শিক্ষা, বিশেষভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একই শিক্ষা পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে। ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করতে হবে এবং ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।




তথ্যসূত্রঃ
*সূরা ও আয়াতসমূহ আল-কোরান।
* ‘মহাকাব্য ও মৌলবাদ’- জয়ন্তানুজ বন্দোপাধ্যায়
* তসলিমা নাসরিনের সাক্ষাৎকার।
* ধর্ম ও নৈতিকতা – অভিজিৎ রায়।

বৃহস্পতিবার, ১৮ মে, ২০১৭

“শোনো ডাকে ওই একাদশ শহীদেরা...."
_________________________________








শুধুমাত্র একুশে ফেব্রুয়ারি ই নয়,  নিজের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য ভারতের এই আসামের বুকেই প্রাণ দিয়েছিলেন এগারো জন তরতাজা প্রাণ। একুশে ফেব্রুয়ারী কথা সারা পৃথিবী জানে। কিন্তু আমাদের বরাক উপত্যকার এই রক্তাক্ত ইতিহাস এখনোও সেভাবে পৃথিবীর কানে পৌছায়নি! শুধু পৃথিবী কেন, আমাদের দেশের অনেক মানুষও এই ইতিহাস জানেন না। 

আজ তাই অহংকার আর শ্রদ্ধা বুকে নিয়ে আমাদের সেই বীর বোন আর ভাইদের কথা বলবো। বলবো বরাকের বাঙালীদের নিজের মাতৃভাষা রক্ষায় রক্তাক্ত হওয়ার ইতিহাস। 

১৯৬০ সালের এপ্রিল মাস, অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এই ঘোষনার ফলস্বরূ  ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় উত্তেজিত অসমীয়া জনতা বাঙালীদের আক্রমন শুরু করে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর অব্দি হিংসা চুড়ান্ত রূপ নেয়। কামরূপ জেলা সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয়। প্রায়  ২৫টি গ্রামের ৪,০১৯টি কুঁড়েঘর এবং ৫৮টি বাড়ি ধ্বংস ও আক্রমণ করা হয় ; নয়জন বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং একশ'র বেশি আহত হয়।

১০ অক্টোবর, ১৯৬০, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা অসমীয়াকে আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এবং ২৪ অক্টোবর প্রস্তাবটি বিধানসভায় গৃহীত হয়।

প্রতিবাদের ঝড় উঠে বাঙালী অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায়। আসামের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী বাঙালীদের উপর এইভাবে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ায় প্রতিবাদে পথে নামে তাঁরা। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় 'কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ'। আসাম সরকারের এহেন অন্যায়ের প্রতিবাদে ১৪ এপ্রিল শিলচর, করিমগঞ্জ আর হাইলাকান্দির বাঙালীরা  সংকল্প দিবস পালন করেন। বরাক উপত্যকার জনগণের মধ্যে সজাগতা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে সংগঠনটি  ২৪ এপ্রিল দীর্ঘ একটি পদযাত্রা শুরু করে। প্রায় ২oo মাইল হেঁটে পদযাত্রাটি শেষ হয় ২ মে'। তাঁরা সরকারকে সময় বেঁধে দেন ১৩ মে অব্দি। তাঁরা বলেন যদি এই সময়ের ভিতর বাংলাকে সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা না হয়, ১৯ মে তে তাঁরা হরতাল করবেন।

যথারীতি সরকার এই প্রস্তাবে সম্মত হয় না। ১৮ মে' তে অসম পুলিশ আন্দোলনের তিনজন নেতা নলিনীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভুষণ চৌধুরী কে গ্রেপ্তার করে। 

১৯ মে' তে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে হরতাল ও পিকেটিং আরম্ভ হ'ল। করিমগঞ্জে আন্দোলনকারীরা সরকারী কার্যালয়, রেলওয়ে ষ্টেশন, কোর্ট ইত্যাদিতে পিকেটিং করেছিলেন। শিলচরে রেলওয়ে স্টেশনেও চলছিলো পিকেটিং। সেই পিকেটিং এ যোগ দেয় ১৬ বছরের কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য্য। মাত্র আগেরদিন সে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। মা'কে বুঝিয়ে রাজি করে, মেজদিদির রাখা শাড়ীটা পরে পিকেটিং এ  হাজির হয় কমলা। সাথে ছোট বোন মঙ্গলা, ছোট ভাই বকুল ও বড়দির ছেলে বাপ্পা। দুপুরবেলা মা দুশ্চিন্তা করতে করতে নিজেই গিয়ে উপস্থিত হন রেল স্টেশনে। মাকে দেখতে পেয়েই ছুটে আসেন কমলা। মায়ের সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করে মাকে অনেক বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। 

সকালের দিকে রেল অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে হলেও দুপুরের পর থেকেই আসাম রাইফেলস-এর জওয়ানরা জায়গাটাকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। বেলা ২:৩৫ মিনিট নাগাদ বিনা প্ররোচনায় তারা অবস্থানকারী ছাত্রছাত্রীদের নির্মমভাবে লাঠি ও বন্দুকের বাট দিয়ে পেটাতে থাকে। এলোপাথারি লাঠিচার্জে অবস্থানকারী জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কমলার ছোটবোন মঙ্গলা পুলিশের লাঠির আঘাতে মাটিতে পড়ে যায় এবং সাহায্যের জন্য কমলার উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে থাকে। কমলা তাকে তোলার জন্যে যখন ছুটে যাচ্ছে, ঠিক তখনই একটা বুলেট তাঁর চোখ ভেদ করে মাথায় গিয়ে লাগে। অন্যান্য আহত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থানকারীদের সাথে কমলাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। নিজের মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায়ে প্রাণ দেয় বিশ্বের প্রথম একটি বালিকা। মঙ্গলাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাস বাদে তার জ্ঞান ফিরলেও বাকি জীবনটা সে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়।

মায়ের ভাষা বাংলার স্বীকৃতির দাবীতে কমলা সহ ১১জন ভাষাসৈনিক শহীদ হন এবং আহত হন অর্ধশতাধিক। প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে।  ১১ জন নারী-পুরুষের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় শিলচর রেলওয়ে স্টেশন ও আশেপাশের এলাকা। শোকে স্তব্ধ ও হতবাক হয়ে উঠে সমগ্র বরাক উপত্যকা। কী এমন দাবী করেছিলো বাঙালীরা? বাংলা ভাষায় কথা বলার দাবী করতে গিয়ে কী এমন অপরাধ করেছিলো তারা? মাতৃভাষায় কথা বলতে চাওয়া অন্যায়? দেশদ্রোহীতা? 

২০ মে শোকার্ত আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে গিয়ে ১১ জন শহীদ সন্তানের ( কানাইলাল নিয়োগী ,চন্ডীচরণ সূত্রধর,হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর , সুকমল পুরকায়স্থ এবং কমলা ভট্টাচার্য ) লাশ নিয়ে বৃহত্তম শোকমিছিল বের করে। 


শেষ পর্য্যন্ত আসাম সরকার দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়। বাংলাকেও আসামের সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষনা করা হয়। 

কিন্তু আমাদের লড়াই এখানেই থেমে থাকেনি। এই এগারো জন বীর শহিদের পর,  ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু)। এবং ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই শহীদ হন দুজন ; 
জগন্ময় দেব (জগন)  ও দিব্যেন্দু দাস (যীশু)।


সত্যি করে বলুন তো বরাক উপত্যকার বাঙালীরা, এই শহীদের কথা কি আপনারা মনে রেখেছেন? আমাদের মুখের ভাষার জন্য অকালে হারিয়ে যাওয়া কিশোরী মেয়েটিকে কি আপনারা মনে রেখেছেন? যাঁদের জন্য আজ আপনারা স্কুল, কলেজে বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন, বাংলায় কথা বলছেন, তাদের কথা কি আপনাদের মনে আছে?

না আপনাদের মনে নেই। মনে নেই বলেই আপনারা কোনো প্রতিবাদ করেন না। আমাদের অফিস-আদালত গুলোতে এখনোও বাংলার ব্যবহার হয় না। আমাদের বরাক উপত্যকায় বড় বড় হোর্ডিং এ অসমীয়া ভাষায় সরকারী বিজ্ঞাপন লেখা। আপনারা কোনো প্রতিবাদ করেন না। করিমগঞ্জের শহীদবেদীর পাশে আবর্জনার স্তুপ।  সরকারী ক্যালেন্ডারে রবীন্দ্র জয়ন্তী, উনিশে মে'র কোনো ছুটি নেই। বাঙালীদের সাথে অসমীয়ারা দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকের মতো ব্যবহার করে, ব্রহ্মপুত্র এলাকায় চাকরী করতে যাওয়া আমাদের ভাই-বোনদের সাথে তারা সৎমাসূলভ আচরন করে,  আপনারা প্রতিবাদ করেন না। বরাক উপত্যকায় বরাকের ছেলে মেয়েদের ব্রাত্য করে ব্রহ্মপুত্র এলাকার ছেলে মেয়েদের চাকরীতে নিয়োগ করা হয়। আপনার একবারো প্রতিবাদ করেন না। ওহ্, প্রতিবাদ করবেন কি করে, আপনারা তো নিজেদের বাঙালী না বলে অসমীয়া বলতে পছন্দ করেন। শুদ্ধ করে বললে - অসমবাসী বাঙালী!! কিন্তু আপনারা কাকের ময়ুরের পালক লাগানোর গল্পটা ভুলে গেছেন। 

ছিঃ বরাকের বাঙালী, এ লজ্জা রাখবো কোথায়?? 






















বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭

আমাদের ছেলে সন্তানরা "না" শব্দের মানে জানে না! 
_____________________________________________

আমাদের দেশে ধর্ষন একপ্রকার উৎসব। প্রতি মিনিটে একজন নারী এদেশে ধর্ষনের শিকার হচ্ছে। বৈবাহিক ধর্ষনেও আমাদের দেশ প্রথমসারির দিকে। এইসব ধর্ষনের ঘটনার বেশীরভাগের ই কোনো এফ আই আর হয় না। বেশীরভাগের খবরই প্রচারমাধ্যমে আসে না। তারপরও যে ঘটনা গুলো আসে, সেটা নিয়ে কদিন মাতামাতি হয়, মোমবাতি মিছিল হয়, ফেসবুকে ধর্ষকের ফাঁসি নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয়। আরেকপক্ষ ধর্ষনের জন্য মেয়েদের পোষাক, চরিত্র দায়ী বলে আকাশ বাতাস আন্দোলিত করেন।  তারপর ধীরে ধীরে আবার সব শান্ত হয়ে পড়ে। জনগন আবার কোনো নতুন ইস্যু নিয়ে মাতামাতি শুরু করে।

আবার কদিন পর নতুন কোনো পৈচাশিক ধর্ষনের ঘটনা ঘটে। একপক্ষ মোমবাতি নিয়ে হাটেন, আরেকপক্ষ মেয়েদের পোষাক অব্দি যান। ব্যস এই অব্দিই। এদিকে ধর্ষনের সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকে। 

আসলে এভাবে মোমবাতি হাতে হেঁটে, বা পোষাকের দোহাই দিয়ে কোনোদিন ধর্ষন কমানো যাবে না।  ধর্ষককে ফাঁসি দিয়েও ধর্ষন কমানো যাবে না। ধর্ষকের লিঙ্গ থেতলে দিলেও ধর্ষন কমানো যাবে না। কারন আমাদের গোড়ায় গলদ। ছোট থেকেই আমাদের ছেলে সন্তানের মধ্যে ধর্ষনের  মানসিকতা তৈরী করা হয়। এই মানসিকতাটাই মহামারী। স্যুট টাই পরা ভদ্রলোক থেকে শুরু করে অশিক্ষিত রিক্সায়ালার মধ্যেও এই ধর্ষনের মানসিকতা লুকিয়ে থাকে।তাই যতদিন অব্দি না এই মানসিকতার আমূল পরিবর্তন করা হচ্ছে, ততোদিন অব্দি ধর্ষন আর ধর্ষিতার সংখ্যা এভাবেই বেড়ে চলবে।

আমাদের সমাজের মা-বাবা রা মেয়েটি যে কোনো সময় ধর্ষিত হতে পারে এই আশঙ্কা করেন, কিন্তু নিজের ছেলেটাও যে ধর্ষক হয়ে উঠতে পারে, সে ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যাথা নেই। মা - বাবারা মেয়েদের সর্বদা না করতে ব্যস্ত। এটা না, ওটা না, হাফ হাতা পোষাক না, রাতবিরেতে একা যাওয়া না, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তারা এই 'না' শব্দটার শিক্ষা নিজের ছেলেদের দেন না। আমাদের মা -বাবারা মেয়েদের সর্ব অবস্থায় 'না' করে, কিন্তু মেয়েদেরও যে  'না' বলার অধিকার আছে, মেয়েরা 'না' বললে যে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হয়, এই শিক্ষাটা নিজের ছেলে সন্তানকে দেয় না।

তাই সমাজের মা-বাবারা, এবার থেকে মেয়েদের নিয়ে সদা শংকিত না থেকে, নিজের ছেলে সন্তানটিকে নিয়ে ভীত থাকুন। কারন আপনার ছেলে সন্তানটিও কিন্তু যে কোনো সময় ধর্ষকের ভুমিকায় নেমে আসতে পারে।   তাই এখন থেকে নিজের ছেলে সন্তানদের আগলে রাখুন ধর্ষনের চিন্তা থেকে, খারাপ বন্ধুদের থেকে। মেয়েরাও তাদের মতো সমান মর্যাদা সম্পন্ন মানুষ এবং মেয়েদের অনুমতি ব্যতীত তাকে ছোঁয়া সবচেয়ে বড় অপরাধ, সবচেয়ে বড় পাপ, এই শিক্ষা নিজের ছেলে সন্তানকে দিন। সাথে এটাও বলুন, নিরাপদ থাকা মানে শুধু নিজে নিরাপদ হওয়া নয়, অন্যকে বিপদে না ফেলার নামও নিরাপদ থাকা।

"‘No’ means No. So no need to explanation or strong causes or more speech for it." - এই কথাটা নিজের ছেলেটিকে মন্ত্রের মতো শেখান। নিজের ছেলেটিকে শেখান বিকৃত যৌনইচ্ছা সংবরণ করাই 'মানুষের' ধর্ম। একটা মেয়ে যখন 'না' বলবে তখন তাকে থেমে যেতে হবে। 'না' মানে নিজের যৌনইচ্ছা সংবরণ করতে হবে। সেই না'টা গার্লফ্রেন্ড বলুক বা কোনো যৌনকর্মী, অফিসের কলিগ বলুক, সহপাঠী বলুক, বা যে কোনো অপরিচিত মেয়ে কিংবা নিজের বউ, তাকে থেমে যেতে হবে। 'না' মানে না। 'না' মানে তাকে থামতে হবে। 'না' বলার পরও যদি সে অগ্রসর হয়, সেই মুহুর্তেই সে 'মানুষ' থেকে জানোয়ারে পরিণত হবে। 

এই শিক্ষায় ঘরে ঘরে প্রত্যেক মা-বাবারা তার ছেলেকে মানুষ করে তুলুন, দেখবেন 'ধর্ষন' আমাদের সমাজ, দেশ থেকে নির্মূল হয়ে গেছে।