“শোনো ডাকে ওই একাদশ শহীদেরা...."
_________________________________
শুধুমাত্র একুশে ফেব্রুয়ারি ই নয়, নিজের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য ভারতের এই আসামের বুকেই প্রাণ দিয়েছিলেন এগারো জন তরতাজা প্রাণ। একুশে ফেব্রুয়ারী কথা সারা পৃথিবী জানে। কিন্তু আমাদের বরাক উপত্যকার এই রক্তাক্ত ইতিহাস এখনোও সেভাবে পৃথিবীর কানে পৌছায়নি! শুধু পৃথিবী কেন, আমাদের দেশের অনেক মানুষও এই ইতিহাস জানেন না।
আজ তাই অহংকার আর শ্রদ্ধা বুকে নিয়ে আমাদের সেই বীর বোন আর ভাইদের কথা বলবো। বলবো বরাকের বাঙালীদের নিজের মাতৃভাষা রক্ষায় রক্তাক্ত হওয়ার ইতিহাস।
১৯৬০ সালের এপ্রিল মাস, অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এই ঘোষনার ফলস্বরূ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় উত্তেজিত অসমীয়া জনতা বাঙালীদের আক্রমন শুরু করে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর অব্দি হিংসা চুড়ান্ত রূপ নেয়। কামরূপ জেলা সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয়। প্রায় ২৫টি গ্রামের ৪,০১৯টি কুঁড়েঘর এবং ৫৮টি বাড়ি ধ্বংস ও আক্রমণ করা হয় ; নয়জন বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং একশ'র বেশি আহত হয়।
১০ অক্টোবর, ১৯৬০, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা অসমীয়াকে আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এবং ২৪ অক্টোবর প্রস্তাবটি বিধানসভায় গৃহীত হয়।
প্রতিবাদের ঝড় উঠে বাঙালী অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায়। আসামের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী বাঙালীদের উপর এইভাবে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ায় প্রতিবাদে পথে নামে তাঁরা। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় 'কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ'। আসাম সরকারের এহেন অন্যায়ের প্রতিবাদে ১৪ এপ্রিল শিলচর, করিমগঞ্জ আর হাইলাকান্দির বাঙালীরা সংকল্প দিবস পালন করেন। বরাক উপত্যকার জনগণের মধ্যে সজাগতা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে সংগঠনটি ২৪ এপ্রিল দীর্ঘ একটি পদযাত্রা শুরু করে। প্রায় ২oo মাইল হেঁটে পদযাত্রাটি শেষ হয় ২ মে'। তাঁরা সরকারকে সময় বেঁধে দেন ১৩ মে অব্দি। তাঁরা বলেন যদি এই সময়ের ভিতর বাংলাকে সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা না হয়, ১৯ মে তে তাঁরা হরতাল করবেন।
যথারীতি সরকার এই প্রস্তাবে সম্মত হয় না। ১৮ মে' তে অসম পুলিশ আন্দোলনের তিনজন নেতা নলিনীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভুষণ চৌধুরী কে গ্রেপ্তার করে।
১৯ মে' তে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে হরতাল ও পিকেটিং আরম্ভ হ'ল। করিমগঞ্জে আন্দোলনকারীরা সরকারী কার্যালয়, রেলওয়ে ষ্টেশন, কোর্ট ইত্যাদিতে পিকেটিং করেছিলেন। শিলচরে রেলওয়ে স্টেশনেও চলছিলো পিকেটিং। সেই পিকেটিং এ যোগ দেয় ১৬ বছরের কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য্য। মাত্র আগেরদিন সে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। মা'কে বুঝিয়ে রাজি করে, মেজদিদির রাখা শাড়ীটা পরে পিকেটিং এ হাজির হয় কমলা। সাথে ছোট বোন মঙ্গলা, ছোট ভাই বকুল ও বড়দির ছেলে বাপ্পা। দুপুরবেলা মা দুশ্চিন্তা করতে করতে নিজেই গিয়ে উপস্থিত হন রেল স্টেশনে। মাকে দেখতে পেয়েই ছুটে আসেন কমলা। মায়ের সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করে মাকে অনেক বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।
সকালের দিকে রেল অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে হলেও দুপুরের পর থেকেই আসাম রাইফেলস-এর জওয়ানরা জায়গাটাকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। বেলা ২:৩৫ মিনিট নাগাদ বিনা প্ররোচনায় তারা অবস্থানকারী ছাত্রছাত্রীদের নির্মমভাবে লাঠি ও বন্দুকের বাট দিয়ে পেটাতে থাকে। এলোপাথারি লাঠিচার্জে অবস্থানকারী জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কমলার ছোটবোন মঙ্গলা পুলিশের লাঠির আঘাতে মাটিতে পড়ে যায় এবং সাহায্যের জন্য কমলার উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে থাকে। কমলা তাকে তোলার জন্যে যখন ছুটে যাচ্ছে, ঠিক তখনই একটা বুলেট তাঁর চোখ ভেদ করে মাথায় গিয়ে লাগে। অন্যান্য আহত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থানকারীদের সাথে কমলাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। নিজের মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায়ে প্রাণ দেয় বিশ্বের প্রথম একটি বালিকা। মঙ্গলাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাস বাদে তার জ্ঞান ফিরলেও বাকি জীবনটা সে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়।
মায়ের ভাষা বাংলার স্বীকৃতির দাবীতে কমলা সহ ১১জন ভাষাসৈনিক শহীদ হন এবং আহত হন অর্ধশতাধিক। প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। ১১ জন নারী-পুরুষের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় শিলচর রেলওয়ে স্টেশন ও আশেপাশের এলাকা। শোকে স্তব্ধ ও হতবাক হয়ে উঠে সমগ্র বরাক উপত্যকা। কী এমন দাবী করেছিলো বাঙালীরা? বাংলা ভাষায় কথা বলার দাবী করতে গিয়ে কী এমন অপরাধ করেছিলো তারা? মাতৃভাষায় কথা বলতে চাওয়া অন্যায়? দেশদ্রোহীতা?
২০ মে শোকার্ত আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে গিয়ে ১১ জন শহীদ সন্তানের ( কানাইলাল নিয়োগী ,চন্ডীচরণ সূত্রধর,হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর , সুকমল পুরকায়স্থ এবং কমলা ভট্টাচার্য ) লাশ নিয়ে বৃহত্তম শোকমিছিল বের করে।
শেষ পর্য্যন্ত আসাম সরকার দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়। বাংলাকেও আসামের সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষনা করা হয়।
কিন্তু আমাদের লড়াই এখানেই থেমে থাকেনি। এই এগারো জন বীর শহিদের পর, ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু)। এবং ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই শহীদ হন দুজন ;
জগন্ময় দেব (জগন) ও দিব্যেন্দু দাস (যীশু)।
সত্যি করে বলুন তো বরাক উপত্যকার বাঙালীরা, এই শহীদের কথা কি আপনারা মনে রেখেছেন? আমাদের মুখের ভাষার জন্য অকালে হারিয়ে যাওয়া কিশোরী মেয়েটিকে কি আপনারা মনে রেখেছেন? যাঁদের জন্য আজ আপনারা স্কুল, কলেজে বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন, বাংলায় কথা বলছেন, তাদের কথা কি আপনাদের মনে আছে?
না আপনাদের মনে নেই। মনে নেই বলেই আপনারা কোনো প্রতিবাদ করেন না। আমাদের অফিস-আদালত গুলোতে এখনোও বাংলার ব্যবহার হয় না। আমাদের বরাক উপত্যকায় বড় বড় হোর্ডিং এ অসমীয়া ভাষায় সরকারী বিজ্ঞাপন লেখা। আপনারা কোনো প্রতিবাদ করেন না। করিমগঞ্জের শহীদবেদীর পাশে আবর্জনার স্তুপ। সরকারী ক্যালেন্ডারে রবীন্দ্র জয়ন্তী, উনিশে মে'র কোনো ছুটি নেই। বাঙালীদের সাথে অসমীয়ারা দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকের মতো ব্যবহার করে, ব্রহ্মপুত্র এলাকায় চাকরী করতে যাওয়া আমাদের ভাই-বোনদের সাথে তারা সৎমাসূলভ আচরন করে, আপনারা প্রতিবাদ করেন না। বরাক উপত্যকায় বরাকের ছেলে মেয়েদের ব্রাত্য করে ব্রহ্মপুত্র এলাকার ছেলে মেয়েদের চাকরীতে নিয়োগ করা হয়। আপনার একবারো প্রতিবাদ করেন না। ওহ্, প্রতিবাদ করবেন কি করে, আপনারা তো নিজেদের বাঙালী না বলে অসমীয়া বলতে পছন্দ করেন। শুদ্ধ করে বললে - অসমবাসী বাঙালী!! কিন্তু আপনারা কাকের ময়ুরের পালক লাগানোর গল্পটা ভুলে গেছেন।
ছিঃ বরাকের বাঙালী, এ লজ্জা রাখবো কোথায়??
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন