এই ব্লগটি সন্ধান করুন

বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭


আমাদের স্বর্গ ! 
_________________





চারদিকের এই উগ্র ধর্মান্ধতার মধ্যে আমার মাঝে মাঝে চৈতালীর কথা মনে পড়ে যায়। আমার ছোটবেলার স্কুলের প্রিয় বান্ধবী চৈতালী। যে নানাভাবে ছিলো ঠিক আমারই মতো। আমারই মতো উশৃঙ্খল, আমারই মতো যার অঙ্ক করতে ভালো লাগত না। ভালো লাগা মন্দ লাগা দুজনেরই একইরকম। একইরকম চুল। একদিন স্কুলের বড় ক্লাসের দিদিদের মুখে জানলাম আমি আর চৈতালী ভীষনরকম আলাদা। আমরা পানি বলি আর চৈতালীরা জল। আমরা মা কে আম্মা বলি, চৈতালিরা মা। আমাদের ঈদ, চৈতালীদের দূর্গাপূজো। আমাদের নামাজ, চৈতালীদের পূজো।আমরা মৃত্যুর পর কবরে যাই, চৈতালীরা কাঠের আগুনে। আমাদের ছোঁয়া চৈতালীদের পাপ। চৈতালীদের ঠাকুরঘরে আমাদের যেতে নেই। আমাদের ঘরের জল চৈতালীদের খেতে নেই। 

সেদিন আমরা দুজনেরই প্রচুর মনখারাপ হয়ে গেছিলো। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি চৈতালীকে। সেই চোখ মুখ নাক, সেই ফিতে বাঁধা চুল, সেই অমলিন হাসি। সেও কি এভাবে দেখেছিলো আমাকে? সেও কি খুঁজতে চেয়েছিলো আমাদের মধ্যের অনুপস্থিত সব অসাদৃশ্য? আমি জানি না। তবু ওই বয়সেই আমরা জেনে গেছিলাম আমরা যাচ্ছি ভিন্ন স্বর্গে, অথবা ভিন্ন নরকে। ধর্ম আমাদের মধ্যে অদৃশ্য একটা দেয়াল তুলে দিয়েছিলো ওই বয়সেই। আমরা ক্রমশই ধার্মিক হয়ে উঠি। আমরা ক্রমশ পাপী হয়ে উঠি একে অন্যের কাছে। 

তবু আমরা ভাবতে চাইতাম আমরা একই রকম। আমাদের কোনো ধর্ম নেই। চৈতালী ওর ঠাকুরের প্রসাদ এনে দিত আমাকে, আমি হাত পেতে নিতাম। ঈদে চৈতালী আমাদের ঘরে এসে সেমাই খেত। আমরা একসাথে ঘুরতে যেতাম আবার। এই অসাদৃশ্য নিয়েই আমরা আবার একজোট হয়ে খেলতে যেতাম। বনে বনে জংলী ফুল খুঁজতে যেতাম। আমাদের চারপাশে তখন স্বর্গ নেমে আসত। জন লেননের স্বর্গ। কবীর সুমনের স্বর্গ। আমার আর চৈতালীর স্বর্গ। 










মঙ্গলবার, ১৬ মে, ২০১৭

হে মহান সাম্যবাদী পুরুষ, 

কদিন আগে একটা পোষ্টে লিখেছিলাম, "প্রত্যেক পুরুষের ভেতরে একেকটা পুরুষতান্ত্রিক  প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র বাস করে"। সেই পোষ্টের সত্যিটাকে তোমরা মেনে নিতে পারোনি। তোমরা ভারী  বিরক্ত হয়েছিলে। রাগ ও করেছিলে। আমার উপর একেবারে পুরুষবিদ্ধেষীর তকমা লাগিয়ে দিলে তোমরা । একজন তো একধাপ এগিয়ে লিখে ফেললো, আমি নাকি পুরুষের আতংক। তা ভাইসব, তোমাদের এই বিরক্তির কারন আমি জানি। 

তোমরা ভাবো, ভাবতে চাও আমার (নারীর) সম্মান আর অধিকার পাইয়ে দেওয়ার একচ্ছত্র মালিকানা  শুধুমাত্র তোমাদেরই। তোমরাই আমার রক্ষক। কিন্তু তোমাদের সেই দয়া নিতে নারাজ আমি  নিজের অধিকার যখন নিজেই চাইতে যাই, তোমরা রাগ কর। তোমাদের লোক দেখানো  মহানতা, উদারতা মানতে নারাজ  আমাকে তোমরা পুরুষবিদ্ধেষী আখ্যা দাও। তোমরা চিৎকার করে বলতে থাক, তোমরা তো সাম্যবাদী, মানবতাবাদে বিশ্বাসী পুরুষ, তাহলে আমি কেন তোমাদের দিকে আঙ্গুল তুলছি? 

তোমরা বলো, 'পুরুষ ভালো, পুরুষতন্ত্র খারাপ'। আমাকেও এই স্লোগান আওড়াতে বলো। আচ্ছা পুরুষতন্ত্র কি হঠাৎ আকাশ থেকে খসে পড়া কোনো বস্তু?? না। পুরুষতন্ত্র একটা সিস্টেম, যেখানে সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় সমস্ত ব্যবস্থা পুরুষদের সপক্ষে। যুগ যুগ ধরে পুরুষরাই এই ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং এর সমস্ত সুফলও  ভোগ করছে তারাই। এটিকে টিকিয়েও রেখেছে তারা নিজেদের স্বার্থে। হ্যাঁ,  মানছি এটাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্যে করছি কিছুসংখ্যক ক্ষেত্রে আমরা নারীরাও। কিন্তু আমাদের মধ্যে এই যে পুরুষতান্ত্রিক ভাবনা, সেটা তো পুরুষরাই শিখিয়েছে যুগ যুগ ধরে। এই ভুল শিক্ষার অন্ধকার থেকে আমরা বেশীরভাগ নারীরা বেরোতে পারিনি, সেটা আমাদের অক্ষমতা। দোষ কিছুতেই নয়।

একটা উদাহরন দেই, একজন লোককে বিষ খাইয়ে মারা হলো। এবারে দোষ কাকে দেওয়া হবে? বিষকে নাকি বিষ প্রয়োগকারীকে? স্বাভাবিক ভাবেই বিষ প্রয়োগকারীকে দোষী বলে সাব্যস্ত করা হবে। একইরকম ভাবে আমাদের সমাজে বিষটি হলো পুরুষতন্ত্র আর বিষ প্রয়োগকারীটি হলো  পুরুষ। 

একটা তন্ত্র বা সিস্টেমের নিজস্ব কোনো বোধ-বুদ্ধি নেই।সিস্টেম নিজে থেকে চলতেও পারে না।তাকে চালায় মানুষ। তাই সিস্টেমের দিকে ইট ছুড়ে কোনো লাভ নেই। এই সিস্টেমকে চালায় যারা, তাদেরকে আঘাত করতে হবে। যদি তন্ত্র চালানেওয়ালেরা সঠিক পথে আসে, তবেই পুরুষতন্ত্র নামক সিস্টেমটির নির্মুল সম্ভব। তোমরা যারা সিস্টেমের উপর ক্ষোভ ঝাড়ো এবং  সিস্টেম চালানেওয়ালা দের সহানুভুতি দেখাও, তারা আসলে ভেতরে ভেতরে ভীষনভাবে চাও পুরুষতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বজায় থাকুক। 

তোমাদের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার আগে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিদিন ধর্ষিত হওয়া, শ্লীলতাহানীর শিকার হওয়া, নির্যাতনের শিকার হওয়া নারী কার দ্বারা এসবের শিকার হয়? ধর্ষন করে ধর্ষনের ভিডিও চড়াদামে বিক্রি করে কারা? আর কারাই বা দেখে ওসব? নারীর পোষাক দেখে যৌনউত্তেজনা কাদের জাগে? রাস্তাঘাটে নারীদের টিজ করা ঐ বখাটেরা কারা? যৌনপল্লীতে প্রতিরাতে কার হাতবদল হয় নারী? ডাস্টবিনে কেঁদে উঠা নবজাতক কার কর্মের ফসল? প্রতিরাতে পাগলীটা কার বিকৃত লালসার শিকার হয়? প্রেমের ফাঁদে ফেলে নারী পাচার করে কারা? আবার প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে এসিড ছুঁড়ে মারে কারা? কাজের মেয়েটিকে কার যৌনলালসার শিকার হতে হয়? শিশুদের যৌন নিপীড়ন করে কারা? প্রাইভেট পড়তে গিয়ে মেয়েটি কার ঘৃণ্য ছোঁয়ার শিকার হয়? ফেইসবুকের প্রত্যেকটা মেয়েকে ইনবক্সে উত্যক্ত করে কারা? ভিনধর্মী যুবকের সাথে প্রেম করার অপরাধে মেয়েটিকে প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানী করে কারা? 

তোমরা বলবে এসব যারা করে তারা মানুষ নয়। তারা তোমরা নও। তোমরা বলবে বর্তমান যুগে বেশীরভাগ পুরুষ সাম্যবাদী, মানবতাবাদী। তারা নারীকে সম্মান করে। তাহলে আরো কিছু উত্তর দাও। সম্পত্তিতে বোনকে সমানভাগ থেকে বঞ্চিত করে কারা? তোমাদের পরিবারের নারী সদস্যদের রক্ষক তোমরা কি নিজেকে ভাবো না? স্ত্রীর অমতে তার সাথে কোনোদিন কী শারীরিক ভাবে মিলিত হও নি? ফুলশয্যার রাতে স্ত্রীর সতিত্বের পরীক্ষা নিতে যাওয়া স্বামীটি কি তোমরা নও?? চাকরীতে স্ত্রী উন্নতি করছে দেখে তার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করোনি ? মেয়েদের নিয়ে রগরগে জোকস শুনে তোমরাও কি তাতে সামিল হওনি? হাসি ঠাট্টাতে মেতে উঠোনি? নারী নয়, পুরুষই পরিবারের গার্জিয়ান - একথা কি তোমরাও মনে মনে  ভাবো না?  সকাল থেকে কাজকর্ম করে তারপর সারাদিন অফিস করে বাড়ী ফেরা স্ত্রীটি যখন আবার রান্নাঘর সামলাতে ব্যস্ত, তখন সোফায় বসে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলানো তুমি কি তাকে এক কাপ চা দিয়ে যাওয়ার অর্ডার করোনি? ছেলে আর মেয়ে আলাদা নয়, বরং সমান মানুষ, নিজের ছেলে-মেয়েকে এই শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রচেষ্টা করেছো কখনো? 

না, উত্তরগুলো আমাকে দিতে হবে না। বরং  নিজেকে দাড়িপাল্লায় তোলো। নিজেই বুঝতে চেষ্টা করো তোমরা কি?  পুরুষ? নাকি পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া 'মানুষ'? 










"আমরা পুরুষ - আমরা ধর্ষণ করি"
_____________________________


#ঘটনা এক : হরিয়ানার রোহতকে ২৩ বছরের এক তরুনীকে সাতজন পুরুষ মিলে গণধর্ষন করে খুন করেছে। যাতে চিহ্নিত না করা যায়, তাই ভারী কিছু দিয়ে ওই তরুণীর মাথা ও মুখ থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। এমনকী দেহের উপর দিয়ে গাড়িও চালানো হয়েছে। যৌনাঙ্গে ধারালো অস্ত্র ঢোকানোরও চিহ্ন পেয়েছে পুলিশ। রাস্তায় পড়ে থাকায় কুকুরে খুবলে খেয়েছে তার দেহ। 

#ঘটনা দুই : হরিয়ানার রোহতকে নিজ আত্মীয় দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে ১০ বছরের এক শিশু। বর্তমানে শিশুটি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্বা। গত কয়েক মাস ধরে নানা অজুহাতে শিশুটিকে ধর্ষন করে ওই আত্মীয়টি। তাকে ভয় দেখিয়ে বলা হয় কাউকে যেন একথা না বলে। শিশুটির অবস্থা বর্তমানে আশঙ্কাজনক।


উপরের দুটো ঘটনায় ই ভিক্টিমের সবচেয়ে বড় ‘অপরাধ’, সে মেয়ে। তাকে ‘ভোগ’ করা যায়, ধর্ষণ করা যায়। হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। ধর্ষনের পর তার খুন হওয়া রক্তাক্ত দেহ ফেলে রাখা যায়! অন্তঃসত্বা বানিয়ে দেওয়া যায়। তেইশ বছর বয়স হোক বা দশ বছর - মেয়ে মানেই পুরুষদের কাছে যৌন চাহিদা মেটানোর মেশিন। যৌনতার জন্য একজন পুরুষের একটি যোনী হলেই চলে, জরায়ু হলেই চলে। তার বয়স দেখা লাগে না, সম্পর্ক দেখা লাগে না, ইচ্ছে-অনিচ্ছে দেখা লাগে না, প্রেম দেখা লাগে না, সময় দেখা লাগে না, সমাজ, বিবেক কিছুই লাগে না। 

ধর্ষনপ্রিয় পুরুষের একমাত্র গন্তব্য মেয়েদের অন্তর্বাস আবৃত স্থানসমূহে। এসব অন্তর্ভেদী দৃষ্টির জন্য নারীকে পড়তে হবে বোরকা, পড়তে হবে হিজাব পড়তে হবে পুরুষ কর্তৃক সুপারিশকৃত সকল পোশাক। তবুও সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ঠিকই খুঁজে নিবে মেয়েটির গোপনীয় সব অঙ্গ।মেয়েদের ধর্ষিত হতে  হবে হিজাবের দেশে, মেয়েদের ধর্ষিত হতে হবে হিজাব না থাকা দেশে, মেয়েদের ধর্ষিত হবে সর্বত্র। 

এই পৃথিবীতে মেয়েদের কোন নিরাপদ স্থান নেই।স্কুল, কলেজ, অফিস, হাসপাতাল, লিফ্ট, আদালত, এমন নিজের ঘরও মেয়েদের  জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়। আকস্মিক লোকালয়ে চলে আসা বনের পশুও কখনো এতোটা অনিরাপদ বোধ করেনা , যতোটা এই সমাজব্যবস্থায় মেয়েরা। 

কুকুর নামক প্রজাতিটিরও ভাদ্র মাস ফুরায় একদিন, ফুরায় না কেবল আমাদের সমাজের পুরুষদের! 

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো যখনই মেয়েদের প্রতি হওয়া ধর্ষন, নির্যাতনের প্রতিবাদ করা হয়, তখন আরেক দল পুরুষ, পুরুষ নির্যাতনের সাইনবোর্ড নিয়ে চলে আসে! অথবা "সবাই সমান নয়" এই স্লোগান গাইতে থাকে দলবদ্ধ ভাবে। অথবা ধর্ষিতার পেশা, পোষাক,চরিত্রের পোষ্টমোর্টেমে লেগে পড়ে। 

ওহে, সাম্যবাদী(!), মানবতাবাদী(!) পুরুষগণ, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ- করে পুরুষরা।তাই এসব বন্ধ করতে হলে নারীদের নয়,  সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পুরুষদেরই।সংশোধিত করতে হবে তোমাদের নিজেদেরকেই। তোমাদের জন্য 'পুরুষ' শব্দটা আজ একটা গালিতে পরিণত হয়েছে। তাই এই গালি থেকে বাঁচতে হলে তোমরা নিজেরা এখন  আন্দোলন কর, ধর্ষনের বিচার চাও, প্রতিবাদ কর। আর তা না করলে প্রকাশ্যেই ঘোষণা করো আজ থেকে: "আমরা পুরুষ, আমরা ধর্ষণ করি" - এবং ধর্ষক হিসেবে  নিজেদের পরিচয়কে আরো পাকাপোক্ত করো!!










মঙ্গলবার, ২ মে, ২০১৭

পুরুষতন্ত্রের হুজুররা, একটু শুনুন!
___________________________



আপনারা পুরুষ মানুষ, মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়া, তাকে প্রকাশ্যে গণশ্লীলতাহানী করে সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া, আপনাদের মৌলিক অধিকার। শুধু মেয়েরা কেন, দেশ, সংবিধান, আইন সবকিছুর গায়ে হাত তুলতে পারেন আপনারা। কখনো ধর্মের নামে, কখনো পরিবারের নামে, কখনো চরিত্রের নামে, কখনো সমাজ সভ্যতার নামে মেয়েদের আপনারা মারতেই আছেন। 

কখনো চড়-থাপ্পড়, কখনো অশ্লীল গালি দিয়ে, কখনো গণধর্ষন করে, কখনো চাপাতি দিয়ে, কখনো ত্রিশুলের আগায় অপরিণত ভ্রুণ দিয়ে, কখনো পাথর মেরে, কখনো গায়ে আগুন লাগিয়ে, কখনো এসিডে ঝলসে দিয়ে, মেয়েদের আপনারা মারতেই আছেন। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান-জৈন-শিখ-ইহুদি, মার খাওয়ার হাত থেকে কোনো মেয়ের রেহাই নেই। 

আপনাদের মেয়েদের মারার ইতিহাস শতাব্দী প্রাচীন। বলা যায় যেদিন থেকে মানব সভ্যতার ইতিহাস শুরু, সেদিন থেকে মেয়েদের মারার ইতিহাস ও শুরু। বাবা হয়ে মারেন, ভাই হয়ে মারেন, স্বামী হয়ে মারেন, প্রেমিক হয়ে মারেন,  ছেলে হয়ে মারেন,  পাড়া-প্রতিবেশী হয়ে মারেন, জেনারেল পাবলিক হয়ে মারেন। বন্ধু হয়ে মারেন, আবার শত্রু হয়েও মারেন। 

আপনারা মুকেশ সিং হয়ে মারেন, আশারাম বাপু হয়ে মারেন, শফি হুজুর হয়ে মারেন। চুলের মুঠি ধরে মারেন, লাঠি দিয়ে মারেন, আবার লিঙ্গ দিয়েও মারেন। পুত্রসন্তান প্রসব না করলেও মারেন, পুত্র সন্তান প্রসব করলেও মারেন।সতী হলেও মারেন, অসতী হলেও মারেন। রাগ হলেও মারেন আবার মিল হলেও মারেন। প্রেমে সায় না দিলেও মারেন, প্রেমে সায় দিলেও মারেন।

ছোটোলোক মেয়েমানুষ আমরা, আমাদের মারা তো আপনাদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। তাই না? আমাদের আবার কোনো মান-ইজ্জত আছে নাকি আপনাদের কাছে? আমরা আবার আপনাদের সমান মানুষ হলাম কবে? আপনাদের দেশে, আপনাদের সমাজে , মেয়েমানুষ শিরদাড়া সোজা করলেও মার খায়, শিরদাড়া ভেঙ্গে ফেললেও মার খায়। ঘরে থাকলেও মার খায়, রাস্তায় বেরোলেও মার খায়। প্রেম করলেও মার খায়, প্রেম না করলেও মার খায়। তরকারীতে লবন বেশী দিলেও মার খায় আবার কম দিলেও মার খায়। জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি আপনাদের মার খাওয়া ই তো আমাদের নিয়তি। 

আপনারা পুরুষ, আপনারা হুজুর মাইবাপ, আপনারা প্রভু। মেয়েমানুষ আপনাদের ক্রীতদাস। আপনারা যখন খুশী মারবেন, যখন খুশী ভালোবাসবেন। যে মেয়েমানুষ আপনাদের বশ মানে না, তাকে তো মারাই উচিৎ! সেজন্য তাকে ভাতে মারেন, হাতে মারেন, যেভাবে সম্ভব সেভাবে মারেন। আপনারা বেশ্যা পাড়ায় নিজের বিকৃত কামইচ্ছা মিটিয়ে এসে, 'বেশ্যা মেয়েমানুষ' বলে গালি দেবেন, তাকে মারবেন, পিটাবেন, সমাজছাড়া করবেন। জন্ম থেকে মনের সুখে আপনারা শুধু মেরেই যাচ্ছেন, আর মেরেই যাচ্ছেন। 

আপনারা পুরুষতন্ত্রের মাইবাপ। পৃথিবীর সকল ধর্ম আপনাদের মেয়েমানুষকে মারার একছত্র অধিকার দিয়েছে। আপনাদের ধর্ম বলেছে, মেয়েমানুষ ডাইনি, মেয়েমানুষ অশুভ, মেয়েমানুষ শয়তানের চেলা, মেয়েমানুষ আপনাদের পাজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি, মেয়েমানুষের কারনে স্বর্গ থেকে পতন হয়ে মর্ত্যে স্থান হয়েছে আপনাদের। তো সেই মেয়েমানুষকে দুইবেলা মারা তো আপনাদের নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্বের সামলাতে আপনাদের অবস্থা বেগতিক। যেখানে মেয়ে দেখছেন শুধু মারছেন, যেরকম মারা যায় সেভাবে মারছেন। আপনারা মারছেন, বাপ সহ চৌদ্দপুরুষ মিলে মারছেন, ভাই-বন্ধু মিলে মারছেন, পাড়া-প্রতিবেশী মিলে মারছেন, রাস্তার লোক মিলে মারছেন, মেরেই যাচ্ছেন। 

কিন্তু হুজুরগণ, এবার যে আপনাদের একটু থামতে হবে! আপনাদের ভাবতে হবে, সব মেয়েরা আপনাদের নিয়ন্ত্রনে আর নেই। আমার মা, তার চৌদ্দপুরুষ, এভাবে পড়ে পড়ে আপনাদের মার খেয়ে গেছেন বলে আমি, আমরাও যে আপনাদের মার মেনে নেব এরকম কিন্তু একেবারেই নয়। আমরা ঘুরে দাড়ানো শিখে গেছি। আমরা জাগছি। একজন একজন করে দিন দিন আমাদের দল কিন্তু ভারী হচ্ছে। আমরা এখন হাজারে আছি, তারপর লক্ষ থেকে কোটিতে ছড়াবো। তাই বলছি কি, আমাদের গায়ে হাত পড়লে আর যে আমরা চুপটি করে থাকবো না। তাই হাতটা এবার গুটোতে শিখুন। না হলে আমরা যেদিন মারতে শুরু করবো সেদিন দৌড়ে পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না। 





শনিবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৭


তোমার রসিকতা এবং আমার রাগ, হে আমার পুরুষবন্ধু
_______________________________________________




শুরুতেই একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। এক নবাবের সভায় সবচেয়ে ধারালো অস্ত্রের প্রতিযোগীতা চলছে। অনেক লোক প্রতিযোগীতায় নাম লিখিয়েছে। কেউ হাতের তলোয়ার দিয়ে লোহা কাটছে, কেউ বর্শা দিয়ে গাছের গুড়ি এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে। তো এরকম এক ওস্তাদ, তার সামনে এক পালোয়ানকে দাড় করিয়ে তরোয়াল ঘোরালেন, পালোয়ানটিকে তখনও দাড়িয়ে থাকতে দেখে ওস্তাদ বললেন, বেয়াদব, সেলাম করো। পালোয়ানটি যেই ঝুকলো ওমনি তার মাথা খসে পড়ে গেল। নবাব বাহবা দিয়ে ওস্তাদকে পুরস্কার দিতে যাবেন এমন সময় এক রোগা হাড় ঝিরঝিরে লোক ছুটে এলো তার পুরো মুখ ঢাকা বউকে নিয়ে। জাঁহাপনা, সব চাইতে ধারালো অস্ত্র দেখে নিন, বলেই বউয়ের মুখের কাপড় খুলে দিল সে। লম্বা জিভ বের করে দিল বউ। ব্যস পুরস্কার নিয়ে গেল রোগা লোকটাই। মেয়েদের জিভের চাইতে ধারাল অস্ত্র হয় নাকি?

আমাদের সমাজের পুরুষদের অধিকাংশ রসিকতাই নারীকেন্দ্রিক। অথবা এভাবেও বলা যায়, আমাদের সমাজ নারীদের নিয়ে রসিকতা করতে খুব পছন্দ করে। নারীদের হেয় করে, তাদের নিয়ে রঙ্গরস করে আলাপ না করলে আমাদের সমাজের পুরুষদের আড্ডা জমে না। শুধু কি আড্ডা! সোস্যাল মিডিয়ায় ও নারীদের নিয়ে নিম্নমানের রসিকতা রীতিমত ট্রোল করা হয়। এবং ওই ট্রোল পেজ গুলোতে হাজার হাজার লাইক কমেন্ট উপচে পড়ে। 

এই ফেসবুকেই বিভিন্ন পোষ্টে প্রায়শই চোখে পড়ে নারীদের নিয়ে চটুল জোকস্। বউরা কান ঝালাপালা করে সর্বক্ষণ, তাদের কথার খোঁচায় পুরুষের মন নাকি সর্বদা জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হয়! অবশ্য অঙ্গার হওয়ার ই তো কথা। নারীর কথায়, প্রতিক্রিয়ায় কান দিতে নারাজ পুরুষদের 'তুমি থামো' বলে ধমক দেওয়াটাই যে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এটাই যে রীতি। 

সেদিন এক পোষ্টে দেখলাম একজন লিখেছে, "যদি দেখেন বিয়ের রাতে বিনা রক্তপাতে যুদ্ধ হয়ে গেছে, তবে ভাববেন দেশ অনেক আগেই স্বাধীন হয়ে গেছে" - হাসি মস্করার সেই পোষ্ট দেখেও অবাক হইনি। কারন আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষদের কাছে বিয়ের আগে সেক্স এডভেঞ্চার আর বিয়ের পর ঘরের নিরামিষ রেখে মাঝেমধ্যে বাইরের পোলাও বিরিয়ানি খাওয়া দোষের কিছু নয়। অথচ একই কাজ তার স্ত্রী করলে, তাকে কুলটা, বেশ্যা উপাধিতে ভুষিত করতে পিছপা হয়না সে। আমাদের সমাজের পুরুষের কাছে বিয়ে মানেই ভার্জিন যোনী। অবাক করা বিষয় হলো, এই পুরুষেরাই বিয়ের আগে সেক্সের  অভিজ্ঞতার জন্য চায় ভার্জিন যোনি, বিয়ের জন্যও খুঁজে ভার্জিন যোনি, বিয়ের পর মাঝে মধ্যে  'বিরিয়ানি' খেতেও খুঁজে ভার্জিন যোনী। তা সে নিজে যতই ভার্জিন না হোক! যৌনতার ক্ষেত্রে পুরুষের ধ্যানজ্ঞান ভার্জিন যোনীময়। হাত চালিয়ে বিশেষ অঙ্গে কড় পড়ে যাওয়া পুরুষ বিয়ের আগে বের হয় 'সতী' নারী খুঁজতে!!  

তো যা বলছিলাম, যেকোনো পাবলিক প্লেস, সে হোক ঘরোয়া আড্ডা, বন্ধুদের আড্ডা, ফেইসবুক, হোয়াটসআপ, ইন্টারনেট, রাস্তা, বাস, প্রতিনিয়ত পুরুষরা নারীদের নিয়ে এরকমই নীচুমানের জোকস্ বলে একধরনের সুতীব্র সুখ অনুভব করে। শুধু যে মজা বা তামাশা করার জন্য এসব বলা হয় তা কিন্তু নয়, এসবের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি বিদ্বেষও ফুটে উঠে। এবং পুরুষের এহেন বিকৃত রসবোধে ক্ষেত্রবিশেষে বিব্রত হতে হয় নারীদের ই। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করি প্রতিবাদ করার পরিবর্তে কিছু সংখ্যক নারীও ওইসব মজায় গা-ভাসান। কারন বুঝি, পুরুষতন্ত্র তাদের মাথায় জন্মের সময় থেকে ঠেসে গুজে দিয়েছে 'ভালো মেয়ের' সংজ্ঞা। 'ভালো মেয়েরা' মুখ বুজে সব সহ্য করে, 'ভালো মেয়েরা' প্রতিবাদ করে না, 'ভালো মেয়েরা' এহেন বিব্রত হওয়াকে খুব সহজে হজম করে ফেলে। অন্যায়কে মেনে নেওয়ার শিল্পটা পুরুষতন্ত্র বেশ ভালো করিয়েই রপ্ত করিয়েছে তাদের।

তাইতো পুরুষের এহেন নোংরা রসবোধের প্রতিবাদে তারা কুন্ঠা বোধ করে। কারন এই সমাজ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে প্রতিবাদী নারী মানে কুলটা, অভদ্র, ঝগড়ুটে। আমাদের সমাজে প্রচলিত ই আছে, "পুরুষ রাগলে হয় বাদশা, আর মেয়েমানুষ রাগলে হয় বেশ্যা"। আর এসব উপাধি থেকে বাঁচার জন্য, নিজেকে তথাকথিত 'ভালো মেয়ে' সাজিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা করে যায় তারা। কিন্তু আর কত?? 

এই যে আমার বোকসোকা, ভালো মেয়েরা, দিদিরা, বোনেরা, বন্ধুরা, তোমাদের ই বলছি... আর কতো?? শোনো, তোমাদের সম্মান রক্ষায় তোমরা যদি ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা প্রতিবাদী হও, তোমরা কিন্তু মোটেই কুলটা, ঝগড়ুটে হয়ে যাবে না! বরং যারা তোমাদের এইগুলো বলতে আসবে, জেনে রেখো তারা তোমাদের সাহস আর শক্তিকে ভয় পাচ্ছে বলেই মরিয়া হয়ে তোমাদের দমানোর শেষ চেষ্টা করছে ওই উপাধিগুলো দিয়ে। তাই নিজের সম্মান রক্ষার্থে প্রতিবাদ করতে শেখো এহেন নোংরা রসিকতার।

আর আমার পুরুষ বন্ধু, প্রেমিক, দাদা, ভাই, বন্ধুদের বলছি, এবার সময় এসেছে সংযত হওয়ার। নিজেদের এহেন রসবোধকে নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করুন। নিজেদের বিকৃত রসবোধ নিয়ে সোস্যাল মিডিয়া, অথবা অন্যান্য জায়গায় নারীকে অস্বস্তিতে ফেলা বন্ধ করুন। আর না হলে, যেদিন আমরা রসিকতায় নামব, সেদিন পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না। তাই সময় থাকতে সংযত হোন!! 


বৃহস্পতিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৭



এবার চলো মুখোমুখি দাঁড়াই
__________________________





প্রিয়তমেষু,
তুমি যখন খুব ব্যস্ত রামনবমীর মিছিল, হনুমান জয়ন্তী, নবীদিবস, ওয়াজ মেহফিল নিয়ে, ঠিক তখন আমি তোমার পাশেই হেঁটে অফিস থেকে ফিরছি, আমাদের শহরের ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে। দেখোনি আমায়? দেখবেই বা কি করে, হাজারের বিপরীতে একা একজন মানুষকে চোখে পড়ার কথা নয়। যেভাবে একদিন তোমার নবী দিবসের উন্মাত্ততা দেখেছিলাম, সেভাবেই তোমার 'জয় শ্রীরাম' ধ্বনিতে অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখলাম, বিহ্বল হয়ে। এবং ঠিক সেই মুহুর্ত থেকেই প্রতিবারের মতো তুমি প্রিয়তমেষু থেকে আমার প্রতিপক্ষ হয়ে উঠলে।

তোমাকেই লিখছি আজ। হয়তো তুমি আমার প্রেমিক, বন্ধু, সহকর্মী, সহপাঠী, পাশের বাড়ীর কেউ। কিন্তু ইদানীং এইগুলো পরিচয় থেকেও বেশী মুখ্য হয়ে উঠেছে তোমার উগ্র ধর্মীয় পরিচয়। আমি যত মানুষ হিসেবে তোমাকে সম্মান করতে চাই, ভালোবাসতে চাই, তুমি ততোবেশী সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মীয় উন্মাদনার চোরাবালিতে আটকে যেতে থাক। যতবার আমি তোমায় সমতার কথা বলি, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলি, ততোবার তুমি উগ্র ধর্মান্ধ স্বরূপ নিয়ে তেড়ে আস আমার দিকে।

আজকে সারাদেশ জুড়ে উচ্চবর্ণ - নিম্নবর্ণ, ধনী-গরীবে, ধর্মে-ধর্মে, এতো বৈষম্য, এত ঘৃণা, এত হিংস্রতা, এত নিপীড়ন, নির্যাতন - আমি যখন এসবের প্রতিবাদ করি, তুমি প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করো।যখন বলি রাষ্ট্রের যেরকম নিজস্ব কোনো ধর্মমত থাকবে না, রাষ্ট্র হবে ধর্ম নিরপেক্ষ, রাষ্ট্রনেতাদের ও কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকবে না; তুমি বিরক্ত হও, রাগ কর। তোমার ঐ উগ্র ধর্মান্ধতার চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করলে তুমি আরো বেশী আক্রমনাত্বক হয়ে উঠো। অশ্লীল বাক্যবানে বিদ্ধ করো আমায়, খুনের হুমকি দাও, ধর্ষনের হুমকি দাও। আমার তখন মায়া হয় তোমার জন্য। সমতা, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তোমার ভয় দেখে, তোমার জন্য করুণা হয় আমার।

উগ্র ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার মিথ্যা প্রচারে তুমি একজন সাধারন মানুষকে তার জীবন জীবিকার আসল সমস্যা থেকে দুরে সরিয়ে দিতে চাও উগ্র হিন্দুত্ব আর উগ্র মুসলমানিত্বের জিগির তুলে। তার কানে কানে তুমি বলে দাও, 'গরব সে কহো হাম হিন্দু হ্যায়', 'জেহাদ করো, বিধর্মী মারো'। সাধারন মানুষ যাতে তার সংবিধান স্বীকৃত অধিকারগুলো না চাইতে পারে তারজন্য প্রতিনিয়ত তাদেরকে তুমি উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির জালে জড়িয়ে ফেলতে চাও। আমি এবং আমাদেরও তুমি ঐ দলে টানতে চাও। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হও, তখন তোমার আস্ফালন আরো বেড়ে যায়। তুমি আমাকে, আমাদেরকে সেকু, মাকু, চীনের দালাল এসব হাস্যকর ছেলেমানুষী তকমায় ভুষিত করে দমিয়ে রাখতে চাও। দেশটাকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি , এবং পাকিস্থানকে নিজেদের দাদুর সম্পত্তি ভেবে, তোমার বিরুদ্ধ মতের লোকদের পাকিস্থান চলে যাওয়ার ফতোয়া দাও। কারন, তুমি আমাকে, আমাদেরকে ভয় পাও। প্রচন্ড ভয় পাও। যদি আমি এবং আমাদের কথায়, একজন সাধারন মানুষও তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে, তবে তো তোমাদের মিথ্যে ধার্মিক সাজার মুখোশ খুলে যাবে। ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্বার্থসিদ্ধির পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

অনেক ছায়াযুদ্ধ হলো তোমার আমার। এবার চলো মুখোমুখি দাঁড়াই। উগ্র ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে যতদিন তুমি মানুষকে পুড়িয়ে দিতে আসবে, মানুষ হয়েই তা প্রতিহত করবো আমি, আমরা। যত বেশী দমন পীড়ন করবে তুমি, ততোবার তোমাকে মানুষের শক্তি দেখাবো আমরা।

তোমার-আমার সম্পর্ক ভাঙবে, ভাঙুক। সব ভেঙ্গে চুরে ধ্বংস হয়ে নতুন করে গড়ে উঠুক সভ্যতা। যেখানে তুমি সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মীয় উন্মাদনার চোরাবালি চিনতে পারবে, মানুষের সভ্যতা গড়তে শিখবে। সেদিন দেখা হবে আবার।

রবিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৭


রামনবমী উদযাপন এবং অস্ত্র মিছিল
_________________________________









ধর্মীয় উৎসব ভারতবর্ষে নতুন কিছু নয়৷ কিন্তু এবারে ভারতীয় ক্যালেন্ডারে এমন এক উৎসব সংযোজন হলো যার উদ্যোগ এবং উদ্দেশ্য যথেষ্ট সন্দেহজনক। বিজেপি সরাসরি না থাকলেও তাদের প্রত্যক্ষ মদতে এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, বজরং দল ও বিশ্ব হিন্দু  পরিষদের উদ্যোগে আসাম সহ সারা দেশ জুড়ে পালিত হলো রামনবমী। না, রামনবমী উৎসব পালন নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। রামের জন্মতিথিতে তাঁর ভক্তরা উৎসব, পূজো করতেই পারেন। সেটা তাদের ধর্মীয় অধিকার। 

"জয় শ্রী রাম" ধ্বনি দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল হলো রামভক্ত মানুষের। এই মিছিল বা শোভাযাত্রা নিয়েও আমার কোনো অসুবিধে নেই। আমার অসুবিধে হলো অন্য জায়গায়। বিভিন্ন স্থানে হাতে ভোজালি, তলোয়ার, হাঁসুয়া, টাঙ্গি, কাটারি এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র নিয়ে হয় মিছিল। বাদ যায়নি শিশুরাও। এবারে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, রামের জন্মতিথির সাথে অস্ত্র মিছিলের কি সম্পর্ক?? ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ও জন্মতিথি পালন হয়, কিন্তু সেখানে তো অস্ত্রমিছিল হয় না! তবে রামচন্দ্রের জন্মদিন পালনে অস্ত্রমিছিল কেন?? দুদিন থেকে অনেক পড়াশুনো করেও এর কোনো সদ্উত্তর পাইনি। কারুর জানা থাকলে বলবেন আমায়?? এহেন ধর্ম বিকৃতি কেন, সেটার ও উত্তর জানা থাকলে বলবেন? 

এই যে এত হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ হাতে অস্ত্র নিয়ে মিছিলে হাটলেন, তাদের মনে এই প্রশ্নটুকুও জাগলো না দেখে অবাক হয়েছি। 

এবার, এই ফেসবুকেই দেখলাম অনেকে বলছেন,  "মহরমের মিছিল যদি হতে পারে, তা হলে রামনবমীর মিছিল হলে আপত্তি কোথায়!" তারা কি মহরম আর রামনবমীকে একসাথে গুলিয়ে ফেলছেন? নাকি রামনবমীকে মহরমের সমান বানাতে চাইছেন? এই দুই উৎসব তো পরস্পর বিরোধী। রামনবমী খুশীর উৎসব, রামচন্দ্রের জন্মতিথি, অপরদিকে মহরম শোকের উৎসব! তারা কি মহরমের ইতিহাস জানেন না? 

মহরম ইসলামিক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র একটি মাস। প্রথা অনুযায়ী অধিকাংশ সিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিম এই মাসে ১০ দিনের উপবাস রাখেন। মহরমের দিন, সিয়া শ্রেনির মুসলিমরা কারবালার যুদ্ধে হুসেনের মৃত্যুর শোকপালন করেন ও একটি  শোকমিছিল আয়োজন করেন।

১৪০০ বছর আগে আরব দেশের কারবালা প্রান্তরে হজরত মহম্মদের নাতি ইমাম হোসেন হঠাৎই এক অসম লড়াইয়ের সম্মুখীন হন। মরুপ্রান্তরে  বন্দি  অবস্থায় তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বেশ কয়েকজন শিশু ও মহিলাসহ সপরিবারে সপার্ষদে তিনি প্রাণ হারান। সেই দিনটি ছিল হিজরি মহরম মাসের ১০ তারিখ। 

মুসলিম সিয়া সম্প্রদায় প্রতি বছর এই তারিখে মহরম পালনের মধ্যে দিয়ে সেদিনের ওই নির্মম ও হৃদয়বিদারক ঘটনাকে স্মরণ করে। অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন ঈদ ও ঈদুজ্জোহা -র মতো মহরম কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। নতুন কাপড় পড়া, খাওয়া-দাওয়া, সমবেত নামাজ পাঠ বা পাড়ায় পাড়ায় বড়দের মালা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে এর সমাপ্তি হয় না। অধিকাংশ  ধর্মপ্রাণ মুসলিম নামাজ, কোরান পাঠ, গরীব অসহায়দের দান দক্ষিণার মধ্যে দিয়ে নীরব শ্রদ্ধা পালন করে থাকেন। কিছু সংখ্যক মুসলিম সিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বানায় তাজিয়া। প্রতি বছর নতুন নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে, নানান বৈচিত্রে,  জারি লোক-গাথা গান গেয়ে মহরম পালন করে তারা। সঙ্গে চলে তলোয়ার, বল্লমের খেলা (যা আখড়া নামেই পরিচিত)। সঙ্গে চলে "হায় হোসেন, হায় হোসেন" ধ্বনি। এটি একটি বহুপ্রচলিত পুরনো কারবালা যুদ্ধের মহড়া, যা প্রতিবছর মহরমের দিন পুনরাবৃত্ত হয়ে থাকে।

তাহলে, কারবালা যুদ্ধের মহড়ার সঙ্গে রামনবমী-র মতো খুশীর উৎসবে অস্ত্র হাতে মিছিলের সম্পর্ক কোথায়?? কিভাবে?? তবে কি ইতিহাস এবং ধর্ম বিকৃত করে মহরমের সাথে রামনবমী-র কোনো কম্পিটিশন চালানো হচ্ছিল , "দ্যাখ, কে কত অস্ত্র দেখাতে পারে"? সবথেকে বড় প্রশ্ন মুসলিমরা কারবালা যুদ্ধের মহড়া দেওয়ার জন্য অস্ত্রমিছিল করে, রামনবমী তে অস্ত্র নিয়ে কিসের মহড়া দেওয়া হলো?? 

আর যারা বলছেন, "আর পাঁচটা ধর্মীয় উৎসবের মতো যদি রামনবমীও হয়, তাহলে ক্ষতি কী!", তাদের বলি, ক্ষতি কিছুই নেই। কিন্তু সমস্যা হলো ধর্ম বিকৃত করে অস্ত্রের মিছিল নিয়ে। সমস্যা হলো শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া নিয়ে!  হ্যাঁ, মহরমেও শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার ঘোর বিরোধী আমি। 

রামনবমীর অনেক মিছিলেরই যাত্রাপথ ছিল মুসলিম-প্রধান এলাকা দিয়ে৷ কাজেই এই উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ কিন্তু থেকেই যায়।