এই ব্লগটি সন্ধান করুন

রবিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৭


রামনবমী উদযাপন এবং অস্ত্র মিছিল
_________________________________









ধর্মীয় উৎসব ভারতবর্ষে নতুন কিছু নয়৷ কিন্তু এবারে ভারতীয় ক্যালেন্ডারে এমন এক উৎসব সংযোজন হলো যার উদ্যোগ এবং উদ্দেশ্য যথেষ্ট সন্দেহজনক। বিজেপি সরাসরি না থাকলেও তাদের প্রত্যক্ষ মদতে এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, বজরং দল ও বিশ্ব হিন্দু  পরিষদের উদ্যোগে আসাম সহ সারা দেশ জুড়ে পালিত হলো রামনবমী। না, রামনবমী উৎসব পালন নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। রামের জন্মতিথিতে তাঁর ভক্তরা উৎসব, পূজো করতেই পারেন। সেটা তাদের ধর্মীয় অধিকার। 

"জয় শ্রী রাম" ধ্বনি দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল হলো রামভক্ত মানুষের। এই মিছিল বা শোভাযাত্রা নিয়েও আমার কোনো অসুবিধে নেই। আমার অসুবিধে হলো অন্য জায়গায়। বিভিন্ন স্থানে হাতে ভোজালি, তলোয়ার, হাঁসুয়া, টাঙ্গি, কাটারি এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র নিয়ে হয় মিছিল। বাদ যায়নি শিশুরাও। এবারে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, রামের জন্মতিথির সাথে অস্ত্র মিছিলের কি সম্পর্ক?? ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ও জন্মতিথি পালন হয়, কিন্তু সেখানে তো অস্ত্রমিছিল হয় না! তবে রামচন্দ্রের জন্মদিন পালনে অস্ত্রমিছিল কেন?? দুদিন থেকে অনেক পড়াশুনো করেও এর কোনো সদ্উত্তর পাইনি। কারুর জানা থাকলে বলবেন আমায়?? এহেন ধর্ম বিকৃতি কেন, সেটার ও উত্তর জানা থাকলে বলবেন? 

এই যে এত হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ হাতে অস্ত্র নিয়ে মিছিলে হাটলেন, তাদের মনে এই প্রশ্নটুকুও জাগলো না দেখে অবাক হয়েছি। 

এবার, এই ফেসবুকেই দেখলাম অনেকে বলছেন,  "মহরমের মিছিল যদি হতে পারে, তা হলে রামনবমীর মিছিল হলে আপত্তি কোথায়!" তারা কি মহরম আর রামনবমীকে একসাথে গুলিয়ে ফেলছেন? নাকি রামনবমীকে মহরমের সমান বানাতে চাইছেন? এই দুই উৎসব তো পরস্পর বিরোধী। রামনবমী খুশীর উৎসব, রামচন্দ্রের জন্মতিথি, অপরদিকে মহরম শোকের উৎসব! তারা কি মহরমের ইতিহাস জানেন না? 

মহরম ইসলামিক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র একটি মাস। প্রথা অনুযায়ী অধিকাংশ সিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিম এই মাসে ১০ দিনের উপবাস রাখেন। মহরমের দিন, সিয়া শ্রেনির মুসলিমরা কারবালার যুদ্ধে হুসেনের মৃত্যুর শোকপালন করেন ও একটি  শোকমিছিল আয়োজন করেন।

১৪০০ বছর আগে আরব দেশের কারবালা প্রান্তরে হজরত মহম্মদের নাতি ইমাম হোসেন হঠাৎই এক অসম লড়াইয়ের সম্মুখীন হন। মরুপ্রান্তরে  বন্দি  অবস্থায় তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বেশ কয়েকজন শিশু ও মহিলাসহ সপরিবারে সপার্ষদে তিনি প্রাণ হারান। সেই দিনটি ছিল হিজরি মহরম মাসের ১০ তারিখ। 

মুসলিম সিয়া সম্প্রদায় প্রতি বছর এই তারিখে মহরম পালনের মধ্যে দিয়ে সেদিনের ওই নির্মম ও হৃদয়বিদারক ঘটনাকে স্মরণ করে। অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন ঈদ ও ঈদুজ্জোহা -র মতো মহরম কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। নতুন কাপড় পড়া, খাওয়া-দাওয়া, সমবেত নামাজ পাঠ বা পাড়ায় পাড়ায় বড়দের মালা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে এর সমাপ্তি হয় না। অধিকাংশ  ধর্মপ্রাণ মুসলিম নামাজ, কোরান পাঠ, গরীব অসহায়দের দান দক্ষিণার মধ্যে দিয়ে নীরব শ্রদ্ধা পালন করে থাকেন। কিছু সংখ্যক মুসলিম সিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বানায় তাজিয়া। প্রতি বছর নতুন নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে, নানান বৈচিত্রে,  জারি লোক-গাথা গান গেয়ে মহরম পালন করে তারা। সঙ্গে চলে তলোয়ার, বল্লমের খেলা (যা আখড়া নামেই পরিচিত)। সঙ্গে চলে "হায় হোসেন, হায় হোসেন" ধ্বনি। এটি একটি বহুপ্রচলিত পুরনো কারবালা যুদ্ধের মহড়া, যা প্রতিবছর মহরমের দিন পুনরাবৃত্ত হয়ে থাকে।

তাহলে, কারবালা যুদ্ধের মহড়ার সঙ্গে রামনবমী-র মতো খুশীর উৎসবে অস্ত্র হাতে মিছিলের সম্পর্ক কোথায়?? কিভাবে?? তবে কি ইতিহাস এবং ধর্ম বিকৃত করে মহরমের সাথে রামনবমী-র কোনো কম্পিটিশন চালানো হচ্ছিল , "দ্যাখ, কে কত অস্ত্র দেখাতে পারে"? সবথেকে বড় প্রশ্ন মুসলিমরা কারবালা যুদ্ধের মহড়া দেওয়ার জন্য অস্ত্রমিছিল করে, রামনবমী তে অস্ত্র নিয়ে কিসের মহড়া দেওয়া হলো?? 

আর যারা বলছেন, "আর পাঁচটা ধর্মীয় উৎসবের মতো যদি রামনবমীও হয়, তাহলে ক্ষতি কী!", তাদের বলি, ক্ষতি কিছুই নেই। কিন্তু সমস্যা হলো ধর্ম বিকৃত করে অস্ত্রের মিছিল নিয়ে। সমস্যা হলো শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া নিয়ে!  হ্যাঁ, মহরমেও শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার ঘোর বিরোধী আমি। 

রামনবমীর অনেক মিছিলেরই যাত্রাপথ ছিল মুসলিম-প্রধান এলাকা দিয়ে৷ কাজেই এই উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ কিন্তু থেকেই যায়। 















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন