প্রসঙ্গ : মৌলবাদ
বর্তমান সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী হুমকির মুখে দাড় করিয়েছে এই উপমহাদেশকে তা হল মৌলবাদ। এই উপমহাদেশের মেধাবী,মানবতাবাদী , প্রতিবাদী মানুষদের ভাগ্য নির্ধারন করছে মৌলবাদী শক্তিগুলো। মৌলবাদ কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের সমাজকে। গিলে খাচ্ছে যুব প্রজন্মকে। আজকাল অনেক প্রগতিশীলদের বলতে দেখি যে ধর্ম খারাপ কিছু করতে শেখায় না। ধর্ম শ্বাশত, চিরন্তন, জীবনের নীতি নির্ধারক। মৌলবাদ খারাপ। তাই ধর্ম নয় কেবল মৌলবাদকে আঘাত কর। তাদের মতে যেন মৌলবাদ ব্যাপারটি হঠাৎ আকাশ থেকে খসে পড়েছে-কোনো শিকড় ছাড়াই। যারা ধর্মকে শ্বাশত, চিরন্তন এবং নৈতিকতার ধারক বাহক মনে করেন আর দোষ দেন ফারাবী বা বজরং দল কিংবা মৌলবাদ নামক বিষয়টার উপর তারা কি মৌলবাদ শব্দটিকে বিশ্লেষন করেন নি কখনো! ‘মৌল’ শব্দের অর্থ মূল থেকে আগত আর ‘বাদ’ শব্দের অর্থ ‘মত’ বা ‘থিওরী’।তাহলে মৌলবাদ শব্দের অর্থ দাড়াল মূল থেকে আগত মত বা থিওরী। কোন্ মূল থেকে আগত থিওরী? ধর্মগ্রন্থের গোঁড়া মূল নীতিগুলো হতে আগত মত বা থিওরী।
পৃথিবীতে ধর্মের সংখ্যা ১০০৯টি এবং সব ধর্মেরই দাবী হলো-সে ধর্মই একমাত্র সঠিক ধর্ম-শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তার কারণ ও আছে- একটি ধর্ম অন্য একটি ধর্মেকে ঠিক বলে স্বীকার করলে সে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা আর থাকবেনা। তাই নিজ ধর্মে বিশ্বাস রাখা এবং একই সাথে উদার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী হওয়া খুবই কঠিন। কারণ ঈশ্বরে বিশ্বাসী ধর্মানুসারীরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থকে ঈশ্বর প্রদত্ত বাণী রূপে দাবী করেন। তাই এই বাণী তাদের কাছে চুড়ান্ত এবং নির্ভূল। এবং তাকে সংশোধন,পরিবর্তন করার অনুমতি কোন মানুষের নেই। অতএব ধর্মগ্রন্থ ও তার বাহক তথা নবী পয়গম্বরদের আদেশ নির্দেশ -আধুনিকতার মানদণ্ডে তা যতই অসঙ্গতিপূর্ণ হউক না কেন- সে অনুসারে আমাদের রাজনৈতিক- সামাজিক-রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করতে হবে। এ বিশ্বাস বা ধারণাই হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। আরো সহজ করে বললে – ধর্মশাস্ত্রের মূল নীতিগুলোকে চরম সত্য বলে যারা মনে করেন, তারাই শেষ পর্যন্ত মৌলবাদী হন। সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বাসই হলো ধর্মীয় মৌলবাদের মূল কারন। ধর্ম যদি বিষবৃক্ষ হয় তবে মৌলবাদ সেই বৃক্ষের একটি বিষাক্ত শাখা। তাই ধর্মকে বাদ দিয়ে মৌলবাদ দমন করার প্রচেষ্টা অনেকটা পেটের অসুখে জ্বরের ওষুধ খাওয়ার মত ব্যাপার।
চলুন দেখা যাক ধর্মগ্রন্থগুলোতে কিভাবে মৌলবাদের বীজ নিহীত থাকে। প্রথমেই আসি ইসলাম ধর্মে। পবিত্র কোরাণের বেশ অনেকটা জুড়েই রয়েছে অনর্থক উত্তেজক নির্দেশাবলীর ছড়াছড়ি, যেগুলো ‘মৌলবাদের মূল কারন’ বলা যায়। কয়েকটা উদাহরন দেয়া যাক- কোরান শেখাচ্ছে যেখানেই অবিশ্বাসীদের পাওয়া যাবে তাদের হত্যা করতে (২:১৯১, ৯:৫), তাদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হতে, কঠোর ব্যবহার করতে (৯:১২৩), আর যুদ্ধ করে যেতে (৮:৬৫)। কোরাণ শেখাচ্ছে বিধর্মীদের অপদস্ত করতে আর তাদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করতে (৯:২৯)। কোরাণ অন্য সকল ধর্মের অনুসারীদের কাছ থেকে ধর্মীয় স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে সোচ্চারে ঘোষণা করছে যে ইসলামই হচ্ছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম (৩:৮৫)। এটি অবিশ্বাসীদের দোজখে (নরকে) নির্বাসিত করে (৫:১০),এবং ‘অপবিত্র’ বলে সম্বোধন করে (৯:২৮); মুসলিমদের ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আদেশ করে যত ক্ষণ পর্যন্ত না অন্য সকল ধর্মকে সরিয়ে ইসলামী রাজত্ব কায়েম হয় (২:১৯৩)। কোরাণ বলছে যে শুধু ইসলামে অবিশ্বাসের কারণেই একটি মানুষ দোজখের আগুনে পুড়বে আর তাকে সেখানে পান করতে হবে দুর্গন্ধ ময় পূঁজ (১৪:১৭)। এই ‘পবিত্র’ গ্রন্থটি অবিশ্বাসীদের হত্যা করতে অথবা তাদের হাত পা কেটে ফেলতে প্ররোচিত করছে, আর ভয় দেখাচ্ছে এই বলে যে- ‘তাদের জন্য পরকালে অপেক্ষা করছে ভয়ানক শাস্তি’ (৫:৩৪)। আরও বলছে,’যারা অবিশ্বাস করে তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক, তাদের মাথার উপর ফুটন্ত জল ঢেলে দেওয়া হবে যাতে ওদের চামড়া আর পেটে যা আছে তা গলে যায়, আর ওদের পেটানোর জন্য থাকবে লোহার মুগুর’ (২২:১৯)। কোরাণ ইহুদী এবং নাসারাদের সাথে বন্ধুত্বটুকু করতে পর্যন্ত নিষেধ করছে (৫:৫১), এমনকি নিজের পিতা বা ভাই যদি আবিশ্বাসী হয় তাদের সাথে সম্পর্ক না রাখতে উদ্বুদ্ধ করছে (৯:২৩, ৩:২৮)।
কোরাণে পরিস্কার করেই আল্লাহ-র বয়ানে বলা হচ্ছে – আল্লা-রসুলে যাদের বিশ্বাস নেই, তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড (৪৮:১৩)। ইসলামে অবিশ্বাস করে কেউ মারা গেলে কঠোর ভাবে উচ্চারিত হবে – ‘ধর ওকে,গলায় বেড়ি পড়াও এবং নিক্ষেপ কর জাহান্নামে আর তাকে শৃংখলিত কর সত্তর হাত দীর্ঘ এক শৃংখলে’ (৬৯:৩০-৩৩)। নবী সবসময়ই আল্লাহর নামে যুদ্ধ করতে সবাইকে উৎসাহিত করেছেন আর সাফাই গেয়েছেন এই বলে – ‘এটা আমাদের জন্য ভালই, এমনকি যদি আমাদের অপছন্দ হয় তবুও’ (২:২১৬), তারপর উপদেশ দিয়েছেন – ‘কাফেরদের গর্দানে আঘাত কর’ আর তারপর তাদের উপর রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবার নির্দেশের পর বলেছেন অবশিষ্টদের ভালভাবে বেঁধে ফেলতে (৪৭:৪)। পরমকরুনাময় আল্লাহতালা এই বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন -‘কাফেরদের হৃদয়ে আমি গভীর ভীতির সঞ্চার করব’ এবং বিশ্বাসীদের আদেশ করেছেন কাফেরদের কাঁধে আঘাত করতে আর হাতের সমস্ত আংগুলের ডগা ভেঙ্গে দিতে (৮:১২) আল্লাহ জ্বিহাদকে মুসলমানদের জন্য ‘আবশ্যিক’ করেছেন আর সতর্ক করেছেন এই বলে -‘তোমরা যদি সামনে না এগিয়ে আস (জ্বিহাদের জন্য) তবে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে মর্মান্তিক শাস্তি'(৯:৩৯)। আল্লাহ তার প্রিয় নবীকে বলছেন, ‘হে নবী, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কর আর কঠোর হও- কেননা, জাহান্নামের মত নিকৃষ্ট আবাস স্থলই হল তাদের পরিনাম’ (৯:৭৩)। এই হচ্ছে কোরাণ। অনেকেই কোরানকে নির্দ্বিধায় “The book of guidence’ বলেন, আর ইসলামকে মনে করেন ‘শান্তির ধর্ম’।যারা এমনটি ভাবেন, তারা কি কখনও ভেবে দেখেছেন যে উপরের আয়াতগুলো কেউ যদি বিশ্বাস করে আর সমাজে তার বাস্তব প্রয়োগ চায় তবে তারা কি ধরনের শান্তি এ পৃথিবীতে বয়ে আনবে? জ্বিহাদীদের কল্যাণে আজকের বিশ্বে ‘ইসলামী সন্ত্রাসবাদ’ (Islamic Terroism) একটি প্রতিষ্ঠিত শব্দ। প্রতিদিন কাগজের পাতা খুললেই দেখা যায় এই জ্বিহাদী জোশে উদ্বুদ্ধ কিছু লোক বোমা মারছে মানুষ-জন, বাড়ী-ঘর, কারখানা, রাস্তাঘাট, যানবাহন, সিনেমা হল, স্কুলে। হাজার খানেক জ্বিহাদী সংগঠন যেমন – আল্ কায়দা, আইসিস, হামাস, হরকত-উল-জিহাদ, হরকত-উল-মুজাহিদিন, আল-বদর-মুজাহিদিন, জামাতে ইসলামিয়া, হিজাব-এ-ইসলামিয়া আজ সারা পৃথিবী জুড়ে কায়েম করছে এক ত্রাসের রাজত্ব ।
আজ অত্যন্ত পরিস্কারভাবে তাই বলার সময় এসেছে – এই ‘পবিত্র’ ধর্মগ্রন্থগুলো অনেকাংশেই মুসলিমদের ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের মূল উৎস। তবে সেই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি দীর্ঘদিনের বিদ্বেষমূলক পররাষ্ট্রনীতির কথাও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না । মুসলিম সমাজে একটা বিরাট অংশ রয়েছে যারা রীতিমত কোরাণের চর্চা করেন, চোখ-কান বন্ধ করে কোরানের সকল আদেশ- নির্দেশ মেনে চলেন আর কোরাণের আলোকে দেশ ও পৃথিবী গড়তে চান। বিপদটা এদের নিয়েই। কারণ কেউ যদি সামাজিক শিক্ষার বদলে কোরানের সকল আদেশ-নির্দেশ চোখ-কান বন্ধ করে মেনে নেন তাহলে কি হবে ? কোরাণের অমানবিক শিক্ষাই যে শেষ পর্যন্ত মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে ‘কাফিরদের’ বিরুদ্ধে অযথা হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানোতে বহুলাংশে দায়ী, এটি অস্বীকার করার চেষ্টা স্রেফ আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়।
হিন্দু ধর্মকে ইসলাম থেকে কোন অর্থেই ভাল বলবার জো নেই। যে জাতিভেদ প্রথার বিষ-বাষ্প প্রায় তিন হাজার বছর ধরে কুড়ে কুড়ে ভারতকে খাচ্ছে তার প্রধান রূপকার স্বয়ং ঈশ্বর। মনুসংহিতা থেকে আমরা পাই- মানুষের সমৃদ্ধি কামনায় পরমেশ্বর নিজের মুখ থেকে ব্রাক্ষ্মণ, বাহু থকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য, আর পা থেকে শুদ্র সৃষ্টি করেছিলেন (১:৩১)।
বিশ্বাসীরা জোর গলায় বলেন, ঈশ্বরের চোখে নাকি সবাই সমান! অথচ, ব্রাক্ষ্মণদের মাথা থেকে আর শুদ্রদের পা থেকে তৈরী করার পেছনে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যটি কিন্তু বড়-ই মহান! শুদ্র আর দলিত নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের প্রতি তাই ‘ঈশ্বরের মাথা থেকে সৃষ্ট’ উঁচু জাতের ব্রাক্ষ্মণদের দুর্ব্যবহারের কথা সর্বজনবিদিত। সমস্ত বড়লোকের বাসায় এখনও দাস হিসেবে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নিয়োগ দেয়া হয়। মনু বলেছেন- দাসত্বের কাজ নির্বাহ করার জন্যই বিধাতা শুদ্রদের সৃষ্টি করেছিলেন (৮:৪১৩)। এই সমস্ত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বাসার সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে চলে যাওয়ার পর গঙ্গা-জল ছিটিয়ে গৃহকে ‘পবিত্র’ করা হত (ক্ষেত্র বিশেষে এখনও হয়)। আর হবে নাই বা কেন ! তারা আবার মানুষ নাকি? তারা তো অচ্ছুৎ! এমন কি হিন্দু ধর্মের দৃষ্টিতে শুদ্রদের উপার্জিত ধন সম্পত্তি তাদের ভোগের ও অধিকার নেই। সব উপার্জিত ধন দাস-মালিকেরাই গ্রহণ করবে –এই ছিল মনুর বিধান – ‘ন হি তস্যাস্তি কিঞ্চিত স্বং ভর্ত্তৃহার্যধনো হি সঃ’ (৮:৪১৬)।
মনুর এসব বর্ণবাদী নীতির বাস্তব রূপায়ন আমরা দেখতে পাই রামায়ন ও মহাভারতে। বিশেষতঃ ধর্মশাস্ত্রীয় অনুশাসন যে শ্রেনী বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হত এবং শূদ্রদের দমন- নিপীড়নের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ রামায়নে আছে। তপস্যা করার ‘অপরাধে’ রামচন্দ্র খÍগ দিয়ে শম্বুক নামক এক শূদ্র তাপসের শিরোচ্ছেদ করেন তার তথাকথিত রামরাজ্যে । প্রায় একই ধরনের ঘটনা আমরা দেখি মহাভারতে যখন নিষাদরাজ হিরন্যধনুর পুত্র একলব্য দ্রোনাচার্যের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখতে এলে তাকে নীচ জাতি বলে প্রত্যাখ্যান করেন দ্রোণ। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত একলব্যের শর নিক্ষেপের দক্ষতা নষ্ট করে ধনুর্বিদ্যায় দ্রোণের প্রিয় ছাত্র অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুন্ন রক্ষার অভিপ্রায়ে ‘গুরু দক্ষিণা’ হিসেবে একলব্যের বুড়ো আঙ্গুল কেটে নেন তিনি। এ ধরণের অনেক উপকরণ ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন মহাকাব্যগুলোতে । এই সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম আদিম মানুষের সাম্যের সমাজকাঠমোর ভিত উপড়ে ফেলে প্রতিষ্ঠা করেছিল অসাম্যের, শ্রেণীবিভক্ত সমাজের। ধর্মই তৈরী করেছিল মালিক শ্রেনীর কৃত্রিম বিভাজনের, কিংবা হয়ত বলা যায় শোষক শ্রেণীই শ্রেনী বিভক্ত সমাজের ফায়দা পুরোপুরি লুটবার জন্য প্রথম থেকেই কাজে লাগিয়েছিল ধর্মকে; যে ভাবেই দেখি না কেন এর ফলে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সামাজিক আর অর্থনৈতিক শোষণের। এই শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবার জন্যই ব্রাক্ষ্মণেরা প্রচার করেছিল ধর্মগ্রন্থগুলো সয়ং ঈশ্বরের মুখ-নিঃসৃত। মানুষে মানুষে বিভেদ নাকি ঈশ্বর-নির্দেশিত! ইসলামী জ্বিহাদী সৈনিকদের মতই ভারতে ‘সনাতন ধর্ম’ রক্ষায় আজ সচেষ্ট হয়েছে বিজেপি, রাষ্ট্রীয় সয়ং সেবক সংঘ, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, শিব-সেনা, বজরং দলের মত প্রতিক্রিয়াশীল দল গুলো।
ইহুদী এবং খ্রীষ্টানদের পবিত্রগ্রন্থের দিকে তাকালে দেখা যায়, পুরো বাইবেলটিতেই ঈশ্বরের নামে খুন, রাহাজানি, ধর্ষনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কিছু উদাহরণ তো দেওয়া যেতেই পারে। *যুদ্ধজয়ের পর অগনিত যুদ্ধবন্দিকে কব্জা করার পর মুসা নির্দেশ দিয়েছিলেন ঈশ্বরের আদেশ হিসেবে সমস্ত বন্দী পুরুষকে মেরে ফেলতে : এখন তোমরা এই সব ছেলেদের এবং যারা কুমারী নয় এমন সব স্ত্রী লোকদের মেরে ফেল; কিন্তু যারা কুমারী তাদের তোমরা নিজেদের জন্য বাঁচিয়ে রাখ’ (গণনা পুস্তক, ৩১: ১৭-১৮)। একটি হিসেবে দেখা যায়, মুসার নির্দেশে প্রায় ১০০,০০০ জন তরুন এবং প্রায় ৬৮,০০০ অসহায় নারীকে হত্যা করা হয়েছিল । এছাড়াও নিষ্ঠুর, আক্রামনাত্মক এবং অরাজক বিভিন্ন ভার্সসমূহের বিবরণ পাওয়া যায় যিশাইয় (২১: ৯), ১ বংশাবলী (২০:৩), গণনা পুস্তক (২৫: ৩-৪), বিচারকর্তৃগন (৮: ৭), গণনা পুস্তক (১৬: ৩২-৩৫), দ্বিতীয় বিবরণ (১২: ২৯-৩০), ২ বংশাবলী (১৪:৯, ১৪:১২), দ্বিতীয় বিবরণ (১১: ৪-৫), ১ শমূয়েল (৬:১৯), ডয়টারনোমি (১৩:৫-৬, ১৩:৮-৯, ১৩:১৫), ১ শমূয়েল (১৫:২-৩), ২ শমূয়েল (১২:৩১), যিশাইয় (১৩: ১৫-১৬), আদিপুস্তক (৯: ৫-৬) প্রভৃতি নানা জায়গায়। বিশ্বাসী খ্রীষ্টানরা সাধারণতঃ বাইবেলে বর্ণিত এই ধরনের নিষ্ঠুরতা এবং অরাজগতাকে প্রত্যাখান করে বলার চেষ্টা করেন, এগুলো সব বাইবেলের পুরাতন নিয়মের (ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ) অধীন, যীশু খ্রীষ্টের আগমনের সাথে সাথেই আগের সমস্ত অরাজকতা নির্মূল হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এটি সত্য নয়।
বাইবেলের নতুন নিয়মে যীশু খুব পরিস্কার করেই বলেছেন যে তিনি পূর্বতন ধর্মপ্রবর্তকদের নিয়মানুযায়ীই চালিত হবেন – ‘এ কথা মনে কোর না, আমি মূসার আইন-কানুন আর নবীদের লেখা বাতিল করতে এসেছি। আমি সেগুলো বাতিল করতে আসি নি বরং পূর্ণ করতে এসেছি’ (মথি, ৫: ১৭)। খ্রীষ্ট ধর্মের অনুসারীরা যেভাবে যীশুকে শান্তি এবং প্রেমের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন, সত্যিকারের যীশু ঠিক কতটুকু প্রেমময় এ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। যীশু খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন যে : ‘আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে এসেছি এই কথা মনে কোর না। আমি শান্তি দিতে আসি নাই, এসেছি তলোয়ারের আইন প্রতিষ্ঠা করতে। আমি এসেছি মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করাতে; ছেলেকে বাবার বিরুদ্ধে, মেয়েকে মায়ের বিরুদ্ধে, বৌকে শাশুড়ীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে এসেছি’ (মথি, ১০: ৩৪-৩৫)। ব্যভিচার করার জন্য শুধ ব্যভিচারিনী নন, তার শিশুসন্তানদের হত্যা করতেও কার্পন্য বোধ করেন না যীশু: ‘সেইজন্য আমি তাকে বিছানায় ফেলে রাখব, আর যারা তার সঙ্গে ব্যভিচার করে তারা যদি ব্যভিচার থেকে মন না ফিরায় তবে তাদের ভীষণ কষ্টের মধ্যে ফেলব। তার ছেলেমেয়েদেরও আমি মেরে ফেলব ‘(প্রকাশিত বাক্য, ২: ২২-২৩)। ধর্ম নেশায় বুদ করে রাখে মানুষকে।
ধর্মগ্রন্থগুলিতে যা লেখা আছে তা ঈশ্বরের বাণী হিসেবে পালন করা হয় আর উৎসাহের সাথে সমাজে তার প্রয়োগ ঘটান হয়। প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় পড়ছি যে, ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠীর যৌন লালসার, শিকার হচ্ছেন অসহায় নারীরা।। কোরাণের আয়াত উদ্ধৃত করে কাফিরদের বিরুদ্ধে রোজই যুদ্ধের হাঁক দিচ্ছে জঙ্গি গোষ্ঠিরা । গোমাতা রক্ষার জন্য মানুষ খুন হচ্ছেন, গাছের সঙ্গে বেঁধে পেটানো হচ্ছে। গোরক্ষা বাহিনী, হিন্দু যুবা মঞ্চ জায়গায় জায়গায় ত্রাসের সৃষ্টি করছে। ধর্মের ভিত্তিতে মহিলাদের কবর থেকে তুলে রেপ করার ফতোয়া দেওয়া হচ্ছে। তবুও নেশায় বুদ হয়ে ধর্ম আর ধর্মগ্রন্থের মধ্যে ‘শান্তি’, প্রগতি’ আর ‘সহিষ্ণুতা’ খুঁজে চলেছেন মডারেট ধর্মবাদীরা ।
তবে এ কথাও ঠিক যে প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই বেশ কিছু ভাল ভাল কথা আছে ; এ গুলো নিয়েই ধার্মিকেরা গর্ববোধ করেন আর এ কথাগুলোকেই নৈতিকতার চাবিকাঠি বলে মনে করেন তারা। কিন্তু একটু সংশয়বাদী দৃষ্টিকোন থেকে দেখলেই বোঝা যাবে – ভালবাসা প্রেম এবং সহিষ্ণুতার বিভিন্ন উদাহরণ যে ধর্মগ্রন্থ এবং তার প্রচারকদের সাথে লেবেল হিসেবে লাগিয়ে দেওয়া হয় সেগুলো কোনটাই ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের জন্য মৌলিক নয়। যেমন, যীশুখ্রীষ্টের অনেক আগেই লেভিটিকাস (১৯:১৮) বলে গেছেন, ‘নিজেকে যেমন ভালবাস, তেমনি ভালবাসবে তোমার প্রতিবেশীদের।’ বাইবেল এবং কোরানে যে সহনশীলতার কথা বলা আছে, সেগুলোর অনেক আগেই (খ্রীষ্টের জন্মের পাঁচশ বছর আগে) কনফুসিয়াস একইরকমভাবে বলেছিলেন – ‘অন্যের প্রতি সেরকম ব্যবহার কোর না, যা তুমি নিজে পেতে চাও না’। আইসোক্রেটস খ্রীষ্টের জন্মের ৩৭৫ বছর আগে বলে গিয়েছিলেন, ‘অন্যের যে কাজে তুমি রাগান্নিত বোধ কর, তেমন কিছু তুমি অন্যদের প্রতি কোর না’। এমনকি শত্রুদের ভালবাসতে বলার কথা তাওইজমে রয়েছে, কিংবা বুদ্ধের বাণীতে, সেও কিন্তু যীশু বা মুহম্মদের অনেক আগেই। কাজেই নৈতিকতার যে উপকরণগুলোকে ধর্মানুসারীরা তাদের স্ব স্ব ধর্মের ‘পৈত্রিক সম্পত্তি’ বলে ভাবছেন, সেগুলো কোনটাই কিন্তু আসলে ধর্ম থেকে উদ্ভুত হয়নি, বরং বিকশিত হয়েছে সমাজবিবর্তনের অবশ্যাম্ভাবী ফল হিসেবে। সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকে মানুষ কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যকে ‘নৈতিক গুনাবলী’ হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে; কারণ ও ভাবে গ্রহণ না করলে সমাজব্যবস্থা অচীরেই ধ্বসে পড়ত।
সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বাসই হলো ধর্মীয় মৌলবাদের আদি উৎস-ভূমি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে ধর্ম- সাম্প্রদায়িকতারও সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মৌলবাদের মূল উৎস যেহেতু ধর্মীয় গোঁড়ামী এবং এ গোঁড়ামীর উর্বরক্ষেত্র যেহেতু অশিক্ষা- কুশিক্ষা, সেহেতু তাকে রুখতে হলে আমাদের সর্বাগ্রে শিক্ষা, বিশেষভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একই শিক্ষা পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে। ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করতে হবে এবং ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।
তথ্যসূত্রঃ
*সূরা ও আয়াতসমূহ আল-কোরান।
* ‘মহাকাব্য ও মৌলবাদ’- জয়ন্তানুজ বন্দোপাধ্যায়
* তসলিমা নাসরিনের সাক্ষাৎকার।
* ধর্ম ও নৈতিকতা – অভিজিৎ রায়।