এই ব্লগটি সন্ধান করুন

শনিবার, ২০ মে, ২০১৭



প্রসঙ্গ : মৌলবাদ




বর্তমান সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী হুমকির মুখে দাড় করিয়েছে এই উপমহাদেশকে তা হল মৌলবাদ। এই উপমহাদেশের মেধাবী,মানবতাবাদী , প্রতিবাদী মানুষদের ভাগ্য নির্ধারন করছে মৌলবাদী শক্তিগুলো। মৌলবাদ কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের সমাজকে। গিলে খাচ্ছে যুব প্রজন্মকে। আজকাল অনেক প্রগতিশীলদের বলতে দেখি যে ধর্ম খারাপ কিছু করতে শেখায় না। ধর্ম শ্বাশত, চিরন্তন, জীবনের নীতি নির্ধারক। মৌলবাদ খারাপ। তাই ধর্ম নয় কেবল মৌলবাদকে আঘাত কর। তাদের মতে যেন মৌলবাদ ব্যাপারটি হঠাৎ আকাশ থেকে খসে পড়েছে-কোনো শিকড় ছাড়াই। যারা ধর্মকে শ্বাশত, চিরন্তন এবং নৈতিকতার ধারক বাহক মনে করেন আর দোষ দেন ফারাবী বা বজরং দল কিংবা মৌলবাদ নামক বিষয়টার উপর তারা কি মৌলবাদ শব্দটিকে বিশ্লেষন করেন নি কখনো! ‘মৌল’ শব্দের অর্থ মূল থেকে আগত আর ‘বাদ’ শব্দের অর্থ ‘মত’ বা ‘থিওরী’।তাহলে মৌলবাদ শব্দের অর্থ দাড়াল মূল থেকে আগত মত বা থিওরী। কোন্ মূল থেকে আগত থিওরী? ধর্মগ্রন্থের গোঁড়া মূল নীতিগুলো হতে আগত মত বা থিওরী।

পৃথিবীতে ধর্মের সংখ্যা ১০০৯টি এবং সব ধর্মেরই দাবী হলো-সে ধর্মই একমাত্র সঠিক ধর্ম-শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তার কারণ ও আছে- একটি ধর্ম অন্য একটি ধর্মেকে ঠিক বলে স্বীকার করলে সে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা আর থাকবেনা। তাই নিজ ধর্মে বিশ্বাস রাখা এবং একই সাথে উদার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী হওয়া খুবই কঠিন। কারণ ঈশ্বরে বিশ্বাসী ধর্মানুসারীরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থকে ঈশ্বর প্রদত্ত বাণী রূপে দাবী করেন। তাই এই বাণী তাদের কাছে চুড়ান্ত এবং নির্ভূল। এবং তাকে সংশোধন,পরিবর্তন করার অনুমতি কোন মানুষের নেই। অতএব ধর্মগ্রন্থ ও তার বাহক তথা নবী পয়গম্বরদের আদেশ নির্দেশ -আধুনিকতার মানদণ্ডে তা যতই অসঙ্গতিপূর্ণ হউক না কেন- সে অনুসারে আমাদের রাজনৈতিক- সামাজিক-রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করতে হবে। এ বিশ্বাস বা ধারণাই হলো ধর্মীয় মৌলবাদ। আরো সহজ করে বললে – ধর্মশাস্ত্রের মূল নীতিগুলোকে চরম সত্য বলে যারা মনে করেন, তারাই শেষ পর্যন্ত মৌলবাদী হন। সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বাসই হলো ধর্মীয় মৌলবাদের মূল কারন। ধর্ম যদি বিষবৃক্ষ হয় তবে মৌলবাদ সেই বৃক্ষের একটি বিষাক্ত শাখা। তাই ধর্মকে বাদ দিয়ে মৌলবাদ দমন করার প্রচেষ্টা অনেকটা পেটের অসুখে জ্বরের ওষুধ খাওয়ার মত ব্যাপার।

চলুন দেখা যাক ধর্মগ্রন্থগুলোতে কিভাবে মৌলবাদের বীজ নিহীত থাকে। প্রথমেই আসি ইসলাম ধর্মে। পবিত্র কোরাণের বেশ অনেকটা জুড়েই রয়েছে অনর্থক উত্তেজক নির্দেশাবলীর ছড়াছড়ি, যেগুলো ‘মৌলবাদের মূল কারন’ বলা যায়। কয়েকটা উদাহরন দেয়া যাক- কোরান শেখাচ্ছে যেখানেই অবিশ্বাসীদের পাওয়া যাবে তাদের হত্যা করতে (২:১৯১, ৯:৫), তাদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হতে, কঠোর ব্যবহার করতে (৯:১২৩), আর যুদ্ধ করে যেতে (৮:৬৫)। কোরাণ শেখাচ্ছে বিধর্মীদের অপদস্ত করতে আর তাদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করতে (৯:২৯)। কোরাণ অন্য সকল ধর্মের অনুসারীদের কাছ থেকে ধর্মীয় স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে সোচ্চারে ঘোষণা করছে যে ইসলামই হচ্ছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম (৩:৮৫)। এটি অবিশ্বাসীদের দোজখে (নরকে) নির্বাসিত করে (৫:১০),এবং ‘অপবিত্র’ বলে সম্বোধন করে (৯:২৮); মুসলিমদের ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আদেশ করে যত ক্ষণ পর্যন্ত না অন্য সকল ধর্মকে সরিয়ে ইসলামী রাজত্ব কায়েম হয় (২:১৯৩)। কোরাণ বলছে যে শুধু ইসলামে অবিশ্বাসের কারণেই একটি মানুষ দোজখের আগুনে পুড়বে আর তাকে সেখানে পান করতে হবে দুর্গন্ধ ময় পূঁজ (১৪:১৭)। এই ‘পবিত্র’ গ্রন্থটি অবিশ্বাসীদের হত্যা করতে অথবা তাদের হাত পা কেটে ফেলতে প্ররোচিত করছে, আর ভয় দেখাচ্ছে এই বলে যে- ‘তাদের জন্য পরকালে অপেক্ষা করছে ভয়ানক শাস্তি’ (৫:৩৪)। আরও বলছে,’যারা অবিশ্বাস করে তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক, তাদের মাথার উপর ফুটন্ত জল ঢেলে দেওয়া হবে যাতে ওদের চামড়া আর পেটে যা আছে তা গলে যায়, আর ওদের পেটানোর জন্য থাকবে লোহার মুগুর’ (২২:১৯)। কোরাণ ইহুদী এবং নাসারাদের সাথে বন্ধুত্বটুকু করতে পর্যন্ত নিষেধ করছে (৫:৫১), এমনকি নিজের পিতা বা ভাই যদি আবিশ্বাসী হয় তাদের সাথে সম্পর্ক না রাখতে উদ্বুদ্ধ করছে (৯:২৩, ৩:২৮)।

কোরাণে পরিস্কার করেই আল্লাহ-র বয়ানে বলা হচ্ছে – আল্লা-রসুলে যাদের বিশ্বাস নেই, তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড (৪৮:১৩)। ইসলামে অবিশ্বাস করে কেউ মারা গেলে কঠোর ভাবে উচ্চারিত হবে – ‘ধর ওকে,গলায় বেড়ি পড়াও এবং নিক্ষেপ কর জাহান্নামে আর তাকে শৃংখলিত কর সত্তর হাত দীর্ঘ এক শৃংখলে’ (৬৯:৩০-৩৩)। নবী সবসময়ই আল্লাহর নামে যুদ্ধ করতে সবাইকে উৎসাহিত করেছেন আর সাফাই গেয়েছেন এই বলে – ‘এটা আমাদের জন্য ভালই, এমনকি যদি আমাদের অপছন্দ হয় তবুও’ (২:২১৬), তারপর উপদেশ দিয়েছেন – ‘কাফেরদের গর্দানে আঘাত কর’ আর তারপর তাদের উপর রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবার নির্দেশের পর বলেছেন অবশিষ্টদের ভালভাবে বেঁধে ফেলতে (৪৭:৪)। পরমকরুনাময় আল্লাহতালা এই বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন -‘কাফেরদের হৃদয়ে আমি গভীর ভীতির সঞ্চার করব’ এবং বিশ্বাসীদের আদেশ করেছেন কাফেরদের কাঁধে আঘাত করতে আর হাতের সমস্ত আংগুলের ডগা ভেঙ্গে দিতে (৮:১২) আল্লাহ জ্বিহাদকে মুসলমানদের জন্য ‘আবশ্যিক’ করেছেন আর সতর্ক করেছেন এই বলে -‘তোমরা যদি সামনে না এগিয়ে আস (জ্বিহাদের জন্য) তবে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে মর্মান্তিক শাস্তি'(৯:৩৯)। আল্লাহ তার প্রিয় নবীকে বলছেন, ‘হে নবী, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কর আর কঠোর হও- কেননা, জাহান্নামের মত নিকৃষ্ট আবাস স্থলই হল তাদের পরিনাম’ (৯:৭৩)। এই হচ্ছে কোরাণ। অনেকেই কোরানকে নির্দ্বিধায় “The book of guidence’ বলেন, আর ইসলামকে মনে করেন ‘শান্তির ধর্ম’।যারা এমনটি ভাবেন, তারা কি কখনও ভেবে দেখেছেন যে উপরের আয়াতগুলো কেউ যদি বিশ্বাস করে আর সমাজে তার বাস্তব প্রয়োগ চায় তবে তারা কি ধরনের শান্তি এ পৃথিবীতে বয়ে আনবে? জ্বিহাদীদের কল্যাণে আজকের বিশ্বে ‘ইসলামী সন্ত্রাসবাদ’ (Islamic Terroism) একটি প্রতিষ্ঠিত শব্দ। প্রতিদিন কাগজের পাতা খুললেই দেখা যায় এই জ্বিহাদী জোশে উদ্বুদ্ধ কিছু লোক বোমা মারছে মানুষ-জন, বাড়ী-ঘর, কারখানা, রাস্তাঘাট, যানবাহন, সিনেমা হল, স্কুলে। হাজার খানেক জ্বিহাদী সংগঠন যেমন – আল্ কায়দা, আইসিস, হামাস, হরকত-উল-জিহাদ, হরকত-উল-মুজাহিদিন, আল-বদর-মুজাহিদিন, জামাতে ইসলামিয়া, হিজাব-এ-ইসলামিয়া আজ সারা পৃথিবী জুড়ে কায়েম করছে এক ত্রাসের রাজত্ব ।

আজ অত্যন্ত পরিস্কারভাবে তাই বলার সময় এসেছে – এই ‘পবিত্র’ ধর্মগ্রন্থগুলো অনেকাংশেই মুসলিমদের ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের মূল উৎস। তবে সেই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি দীর্ঘদিনের বিদ্বেষমূলক পররাষ্ট্রনীতির কথাও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না । মুসলিম সমাজে একটা বিরাট অংশ রয়েছে যারা রীতিমত কোরাণের চর্চা করেন, চোখ-কান বন্ধ করে কোরানের সকল আদেশ- নির্দেশ মেনে চলেন আর কোরাণের আলোকে দেশ ও পৃথিবী গড়তে চান। বিপদটা এদের নিয়েই। কারণ কেউ যদি সামাজিক শিক্ষার বদলে কোরানের সকল আদেশ-নির্দেশ চোখ-কান বন্ধ করে মেনে নেন তাহলে কি হবে ? কোরাণের অমানবিক শিক্ষাই যে শেষ পর্যন্ত মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে ‘কাফিরদের’ বিরুদ্ধে অযথা হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানোতে বহুলাংশে দায়ী, এটি অস্বীকার করার চেষ্টা স্রেফ আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়।

হিন্দু ধর্মকে ইসলাম থেকে কোন অর্থেই ভাল বলবার জো নেই। যে জাতিভেদ প্রথার বিষ-বাষ্প প্রায় তিন হাজার বছর ধরে কুড়ে কুড়ে ভারতকে খাচ্ছে তার প্রধান রূপকার স্বয়ং ঈশ্বর। মনুসংহিতা থেকে আমরা পাই- মানুষের সমৃদ্ধি কামনায় পরমেশ্বর নিজের মুখ থেকে ব্রাক্ষ্মণ, বাহু থকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য, আর পা থেকে শুদ্র সৃষ্টি করেছিলেন (১:৩১)।
বিশ্বাসীরা জোর গলায় বলেন, ঈশ্বরের চোখে নাকি সবাই সমান! অথচ, ব্রাক্ষ্মণদের মাথা থেকে আর শুদ্রদের পা থেকে তৈরী করার পেছনে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যটি কিন্তু বড়-ই মহান! শুদ্র আর দলিত নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের প্রতি তাই ‘ঈশ্বরের মাথা থেকে সৃষ্ট’ উঁচু জাতের ব্রাক্ষ্মণদের দুর্ব্যবহারের কথা সর্বজনবিদিত। সমস্ত বড়লোকের বাসায় এখনও দাস হিসেবে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নিয়োগ দেয়া হয়। মনু বলেছেন- দাসত্বের কাজ নির্বাহ করার জন্যই বিধাতা শুদ্রদের সৃষ্টি করেছিলেন (৮:৪১৩)। এই সমস্ত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বাসার সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে চলে যাওয়ার পর গঙ্গা-জল ছিটিয়ে গৃহকে ‘পবিত্র’ করা হত (ক্ষেত্র বিশেষে এখনও হয়)। আর হবে নাই বা কেন ! তারা আবার মানুষ নাকি? তারা তো অচ্ছুৎ! এমন কি হিন্দু ধর্মের দৃষ্টিতে শুদ্রদের উপার্জিত ধন সম্পত্তি তাদের ভোগের ও অধিকার নেই। সব উপার্জিত ধন দাস-মালিকেরাই গ্রহণ করবে –এই ছিল মনুর বিধান – ‘ন হি তস্যাস্তি কিঞ্চিত স্বং ভর্ত্তৃহার্যধনো হি সঃ’ (৮:৪১৬)।

মনুর এসব বর্ণবাদী নীতির বাস্তব রূপায়ন আমরা দেখতে পাই রামায়ন ও মহাভারতে। বিশেষতঃ ধর্মশাস্ত্রীয় অনুশাসন যে শ্রেনী বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হত এবং শূদ্রদের দমন- নিপীড়নের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ রামায়নে আছে। তপস্যা করার ‘অপরাধে’ রামচন্দ্র খÍগ দিয়ে শম্বুক নামক এক শূদ্র তাপসের শিরোচ্ছেদ করেন তার তথাকথিত রামরাজ্যে । প্রায় একই ধরনের ঘটনা আমরা দেখি মহাভারতে যখন নিষাদরাজ হিরন্যধনুর পুত্র একলব্য দ্রোনাচার্যের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখতে এলে তাকে নীচ জাতি বলে প্রত্যাখ্যান করেন দ্রোণ। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত একলব্যের শর নিক্ষেপের দক্ষতা নষ্ট করে ধনুর্বিদ্যায় দ্রোণের প্রিয় ছাত্র অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুন্ন রক্ষার অভিপ্রায়ে ‘গুরু দক্ষিণা’ হিসেবে একলব্যের বুড়ো আঙ্গুল কেটে নেন তিনি। এ ধরণের অনেক উপকরণ ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন মহাকাব্যগুলোতে । এই সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম আদিম মানুষের সাম্যের সমাজকাঠমোর ভিত উপড়ে ফেলে প্রতিষ্ঠা করেছিল অসাম্যের, শ্রেণীবিভক্ত সমাজের। ধর্মই তৈরী করেছিল মালিক শ্রেনীর কৃত্রিম বিভাজনের, কিংবা হয়ত বলা যায় শোষক শ্রেণীই শ্রেনী বিভক্ত সমাজের ফায়দা পুরোপুরি লুটবার জন্য প্রথম থেকেই কাজে লাগিয়েছিল ধর্মকে; যে ভাবেই দেখি না কেন এর ফলে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সামাজিক আর অর্থনৈতিক শোষণের। এই শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবার জন্যই ব্রাক্ষ্মণেরা প্রচার করেছিল ধর্মগ্রন্থগুলো সয়ং ঈশ্বরের মুখ-নিঃসৃত। মানুষে মানুষে বিভেদ নাকি ঈশ্বর-নির্দেশিত! ইসলামী জ্বিহাদী সৈনিকদের মতই ভারতে ‘সনাতন ধর্ম’ রক্ষায় আজ সচেষ্ট হয়েছে বিজেপি, রাষ্ট্রীয় সয়ং সেবক সংঘ, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, শিব-সেনা, বজরং দলের মত প্রতিক্রিয়াশীল দল গুলো।

ইহুদী এবং খ্রীষ্টানদের পবিত্রগ্রন্থের দিকে তাকালে দেখা যায়, পুরো বাইবেলটিতেই ঈশ্বরের নামে খুন, রাহাজানি, ধর্ষনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কিছু উদাহরণ তো দেওয়া যেতেই পারে। *যুদ্ধজয়ের পর অগনিত যুদ্ধবন্দিকে কব্জা করার পর মুসা নির্দেশ দিয়েছিলেন ঈশ্বরের আদেশ হিসেবে সমস্ত বন্দী পুরুষকে মেরে ফেলতে : এখন তোমরা এই সব ছেলেদের এবং যারা কুমারী নয় এমন সব স্ত্রী লোকদের মেরে ফেল; কিন্তু যারা কুমারী তাদের তোমরা নিজেদের জন্য বাঁচিয়ে রাখ’ (গণনা পুস্তক, ৩১: ১৭-১৮)। একটি হিসেবে দেখা যায়, মুসার নির্দেশে প্রায় ১০০,০০০ জন তরুন এবং প্রায় ৬৮,০০০ অসহায় নারীকে হত্যা করা হয়েছিল । এছাড়াও নিষ্ঠুর, আক্রামনাত্মক এবং অরাজক বিভিন্ন ভার্সসমূহের বিবরণ পাওয়া যায় যিশাইয় (২১: ৯), ১ বংশাবলী (২০:৩), গণনা পুস্তক (২৫: ৩-৪), বিচারকর্তৃগন (৮: ৭), গণনা পুস্তক (১৬: ৩২-৩৫), দ্বিতীয় বিবরণ (১২: ২৯-৩০), ২ বংশাবলী (১৪:৯, ১৪:১২), দ্বিতীয় বিবরণ (১১: ৪-৫), ১ শমূয়েল (৬:১৯), ডয়টারনোমি (১৩:৫-৬, ১৩:৮-৯, ১৩:১৫), ১ শমূয়েল (১৫:২-৩), ২ শমূয়েল (১২:৩১), যিশাইয় (১৩: ১৫-১৬), আদিপুস্তক (৯: ৫-৬) প্রভৃতি নানা জায়গায়। বিশ্বাসী খ্রীষ্টানরা সাধারণতঃ বাইবেলে বর্ণিত এই ধরনের নিষ্ঠুরতা এবং অরাজগতাকে প্রত্যাখান করে বলার চেষ্টা করেন, এগুলো সব বাইবেলের পুরাতন নিয়মের (ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ) অধীন, যীশু খ্রীষ্টের আগমনের সাথে সাথেই আগের সমস্ত অরাজকতা নির্মূল হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এটি সত্য নয়।

বাইবেলের নতুন নিয়মে যীশু খুব পরিস্কার করেই বলেছেন যে তিনি পূর্বতন ধর্মপ্রবর্তকদের নিয়মানুযায়ীই চালিত হবেন – ‘এ কথা মনে কোর না, আমি মূসার আইন-কানুন আর নবীদের লেখা বাতিল করতে এসেছি। আমি সেগুলো বাতিল করতে আসি নি বরং পূর্ণ করতে এসেছি’ (মথি, ৫: ১৭)। খ্রীষ্ট ধর্মের অনুসারীরা যেভাবে যীশুকে শান্তি এবং প্রেমের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন, সত্যিকারের যীশু ঠিক কতটুকু প্রেমময় এ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। যীশু খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন যে : ‘আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে এসেছি এই কথা মনে কোর না। আমি শান্তি দিতে আসি নাই, এসেছি তলোয়ারের আইন প্রতিষ্ঠা করতে। আমি এসেছি মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করাতে; ছেলেকে বাবার বিরুদ্ধে, মেয়েকে মায়ের বিরুদ্ধে, বৌকে শাশুড়ীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে এসেছি’ (মথি, ১০: ৩৪-৩৫)। ব্যভিচার করার জন্য শুধ ব্যভিচারিনী নন, তার শিশুসন্তানদের হত্যা করতেও কার্পন্য বোধ করেন না যীশু: ‘সেইজন্য আমি তাকে বিছানায় ফেলে রাখব, আর যারা তার সঙ্গে ব্যভিচার করে তারা যদি ব্যভিচার থেকে মন না ফিরায় তবে তাদের ভীষণ কষ্টের মধ্যে ফেলব। তার ছেলেমেয়েদেরও আমি মেরে ফেলব ‘(প্রকাশিত বাক্য, ২: ২২-২৩)। ধর্ম নেশায় বুদ করে রাখে মানুষকে।


ধর্মগ্রন্থগুলিতে যা লেখা আছে তা ঈশ্বরের বাণী হিসেবে পালন করা হয় আর উৎসাহের সাথে সমাজে তার প্রয়োগ ঘটান হয়। প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় পড়ছি যে, ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠীর যৌন লালসার, শিকার হচ্ছেন অসহায় নারীরা।। কোরাণের আয়াত উদ্ধৃত করে কাফিরদের বিরুদ্ধে রোজই যুদ্ধের হাঁক দিচ্ছে জঙ্গি গোষ্ঠিরা । গোমাতা রক্ষার জন্য মানুষ খুন হচ্ছেন, গাছের সঙ্গে বেঁধে পেটানো হচ্ছে। গোরক্ষা বাহিনী, হিন্দু যুবা মঞ্চ জায়গায় জায়গায় ত্রাসের সৃষ্টি করছে। ধর্মের ভিত্তিতে মহিলাদের কবর থেকে তুলে রেপ করার ফতোয়া দেওয়া হচ্ছে। তবুও নেশায় বুদ হয়ে ধর্ম আর ধর্মগ্রন্থের মধ্যে ‘শান্তি’, প্রগতি’ আর ‘সহিষ্ণুতা’ খুঁজে চলেছেন মডারেট ধর্মবাদীরা ।

তবে এ কথাও ঠিক যে প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই বেশ কিছু ভাল ভাল কথা আছে ; এ গুলো নিয়েই ধার্মিকেরা গর্ববোধ করেন আর এ কথাগুলোকেই নৈতিকতার চাবিকাঠি বলে মনে করেন তারা। কিন্তু একটু সংশয়বাদী দৃষ্টিকোন থেকে দেখলেই বোঝা যাবে – ভালবাসা প্রেম এবং সহিষ্ণুতার বিভিন্ন উদাহরণ যে ধর্মগ্রন্থ এবং তার প্রচারকদের সাথে লেবেল হিসেবে লাগিয়ে দেওয়া হয় সেগুলো কোনটাই ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের জন্য মৌলিক নয়। যেমন, যীশুখ্রীষ্টের অনেক আগেই লেভিটিকাস (১৯:১৮) বলে গেছেন, ‘নিজেকে যেমন ভালবাস, তেমনি ভালবাসবে তোমার প্রতিবেশীদের।’ বাইবেল এবং কোরানে যে সহনশীলতার কথা বলা আছে, সেগুলোর অনেক আগেই (খ্রীষ্টের জন্মের পাঁচশ বছর আগে) কনফুসিয়াস একইরকমভাবে বলেছিলেন – ‘অন্যের প্রতি সেরকম ব্যবহার কোর না, যা তুমি নিজে পেতে চাও না’। আইসোক্রেটস খ্রীষ্টের জন্মের ৩৭৫ বছর আগে বলে গিয়েছিলেন, ‘অন্যের যে কাজে তুমি রাগান্নিত বোধ কর, তেমন কিছু তুমি অন্যদের প্রতি কোর না’। এমনকি শত্রুদের ভালবাসতে বলার কথা তাওইজমে রয়েছে, কিংবা বুদ্ধের বাণীতে, সেও কিন্তু যীশু বা মুহম্মদের অনেক আগেই। কাজেই নৈতিকতার যে উপকরণগুলোকে ধর্মানুসারীরা তাদের স্ব স্ব ধর্মের ‘পৈত্রিক সম্পত্তি’ বলে ভাবছেন, সেগুলো কোনটাই কিন্তু আসলে ধর্ম থেকে উদ্ভুত হয়নি, বরং বিকশিত হয়েছে সমাজবিবর্তনের অবশ্যাম্ভাবী ফল হিসেবে। সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকে মানুষ কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যকে ‘নৈতিক গুনাবলী’ হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে; কারণ ও ভাবে গ্রহণ না করলে সমাজব্যবস্থা অচীরেই ধ্বসে পড়ত।


সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বাসই হলো ধর্মীয় মৌলবাদের আদি উৎস-ভূমি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে ধর্ম- সাম্প্রদায়িকতারও সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মৌলবাদের মূল উৎস যেহেতু ধর্মীয় গোঁড়ামী এবং এ গোঁড়ামীর উর্বরক্ষেত্র যেহেতু অশিক্ষা- কুশিক্ষা, সেহেতু তাকে রুখতে হলে আমাদের সর্বাগ্রে শিক্ষা, বিশেষভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একই শিক্ষা পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে। ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করতে হবে এবং ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।




তথ্যসূত্রঃ
*সূরা ও আয়াতসমূহ আল-কোরান।
* ‘মহাকাব্য ও মৌলবাদ’- জয়ন্তানুজ বন্দোপাধ্যায়
* তসলিমা নাসরিনের সাক্ষাৎকার।
* ধর্ম ও নৈতিকতা – অভিজিৎ রায়।

বৃহস্পতিবার, ১৮ মে, ২০১৭

“শোনো ডাকে ওই একাদশ শহীদেরা...."
_________________________________








শুধুমাত্র একুশে ফেব্রুয়ারি ই নয়,  নিজের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য ভারতের এই আসামের বুকেই প্রাণ দিয়েছিলেন এগারো জন তরতাজা প্রাণ। একুশে ফেব্রুয়ারী কথা সারা পৃথিবী জানে। কিন্তু আমাদের বরাক উপত্যকার এই রক্তাক্ত ইতিহাস এখনোও সেভাবে পৃথিবীর কানে পৌছায়নি! শুধু পৃথিবী কেন, আমাদের দেশের অনেক মানুষও এই ইতিহাস জানেন না। 

আজ তাই অহংকার আর শ্রদ্ধা বুকে নিয়ে আমাদের সেই বীর বোন আর ভাইদের কথা বলবো। বলবো বরাকের বাঙালীদের নিজের মাতৃভাষা রক্ষায় রক্তাক্ত হওয়ার ইতিহাস। 

১৯৬০ সালের এপ্রিল মাস, অসমীয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এই ঘোষনার ফলস্বরূ  ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় উত্তেজিত অসমীয়া জনতা বাঙালীদের আক্রমন শুরু করে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর অব্দি হিংসা চুড়ান্ত রূপ নেয়। কামরূপ জেলা সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয়। প্রায়  ২৫টি গ্রামের ৪,০১৯টি কুঁড়েঘর এবং ৫৮টি বাড়ি ধ্বংস ও আক্রমণ করা হয় ; নয়জন বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং একশ'র বেশি আহত হয়।

১০ অক্টোবর, ১৯৬০, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা অসমীয়াকে আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এবং ২৪ অক্টোবর প্রস্তাবটি বিধানসভায় গৃহীত হয়।

প্রতিবাদের ঝড় উঠে বাঙালী অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায়। আসামের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী বাঙালীদের উপর এইভাবে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ায় প্রতিবাদে পথে নামে তাঁরা। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় 'কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ'। আসাম সরকারের এহেন অন্যায়ের প্রতিবাদে ১৪ এপ্রিল শিলচর, করিমগঞ্জ আর হাইলাকান্দির বাঙালীরা  সংকল্প দিবস পালন করেন। বরাক উপত্যকার জনগণের মধ্যে সজাগতা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে সংগঠনটি  ২৪ এপ্রিল দীর্ঘ একটি পদযাত্রা শুরু করে। প্রায় ২oo মাইল হেঁটে পদযাত্রাটি শেষ হয় ২ মে'। তাঁরা সরকারকে সময় বেঁধে দেন ১৩ মে অব্দি। তাঁরা বলেন যদি এই সময়ের ভিতর বাংলাকে সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা না হয়, ১৯ মে তে তাঁরা হরতাল করবেন।

যথারীতি সরকার এই প্রস্তাবে সম্মত হয় না। ১৮ মে' তে অসম পুলিশ আন্দোলনের তিনজন নেতা নলিনীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভুষণ চৌধুরী কে গ্রেপ্তার করে। 

১৯ মে' তে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে হরতাল ও পিকেটিং আরম্ভ হ'ল। করিমগঞ্জে আন্দোলনকারীরা সরকারী কার্যালয়, রেলওয়ে ষ্টেশন, কোর্ট ইত্যাদিতে পিকেটিং করেছিলেন। শিলচরে রেলওয়ে স্টেশনেও চলছিলো পিকেটিং। সেই পিকেটিং এ যোগ দেয় ১৬ বছরের কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য্য। মাত্র আগেরদিন সে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। মা'কে বুঝিয়ে রাজি করে, মেজদিদির রাখা শাড়ীটা পরে পিকেটিং এ  হাজির হয় কমলা। সাথে ছোট বোন মঙ্গলা, ছোট ভাই বকুল ও বড়দির ছেলে বাপ্পা। দুপুরবেলা মা দুশ্চিন্তা করতে করতে নিজেই গিয়ে উপস্থিত হন রেল স্টেশনে। মাকে দেখতে পেয়েই ছুটে আসেন কমলা। মায়ের সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করে মাকে অনেক বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। 

সকালের দিকে রেল অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে হলেও দুপুরের পর থেকেই আসাম রাইফেলস-এর জওয়ানরা জায়গাটাকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। বেলা ২:৩৫ মিনিট নাগাদ বিনা প্ররোচনায় তারা অবস্থানকারী ছাত্রছাত্রীদের নির্মমভাবে লাঠি ও বন্দুকের বাট দিয়ে পেটাতে থাকে। এলোপাথারি লাঠিচার্জে অবস্থানকারী জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কমলার ছোটবোন মঙ্গলা পুলিশের লাঠির আঘাতে মাটিতে পড়ে যায় এবং সাহায্যের জন্য কমলার উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে থাকে। কমলা তাকে তোলার জন্যে যখন ছুটে যাচ্ছে, ঠিক তখনই একটা বুলেট তাঁর চোখ ভেদ করে মাথায় গিয়ে লাগে। অন্যান্য আহত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থানকারীদের সাথে কমলাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। নিজের মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায়ে প্রাণ দেয় বিশ্বের প্রথম একটি বালিকা। মঙ্গলাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাস বাদে তার জ্ঞান ফিরলেও বাকি জীবনটা সে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়।

মায়ের ভাষা বাংলার স্বীকৃতির দাবীতে কমলা সহ ১১জন ভাষাসৈনিক শহীদ হন এবং আহত হন অর্ধশতাধিক। প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে।  ১১ জন নারী-পুরুষের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় শিলচর রেলওয়ে স্টেশন ও আশেপাশের এলাকা। শোকে স্তব্ধ ও হতবাক হয়ে উঠে সমগ্র বরাক উপত্যকা। কী এমন দাবী করেছিলো বাঙালীরা? বাংলা ভাষায় কথা বলার দাবী করতে গিয়ে কী এমন অপরাধ করেছিলো তারা? মাতৃভাষায় কথা বলতে চাওয়া অন্যায়? দেশদ্রোহীতা? 

২০ মে শোকার্ত আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে গিয়ে ১১ জন শহীদ সন্তানের ( কানাইলাল নিয়োগী ,চন্ডীচরণ সূত্রধর,হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর , সুকমল পুরকায়স্থ এবং কমলা ভট্টাচার্য ) লাশ নিয়ে বৃহত্তম শোকমিছিল বের করে। 


শেষ পর্য্যন্ত আসাম সরকার দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়। বাংলাকেও আসামের সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষনা করা হয়। 

কিন্তু আমাদের লড়াই এখানেই থেমে থাকেনি। এই এগারো জন বীর শহিদের পর,  ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য শহীদ হন বিজন চক্রবর্তী (বাচ্চু)। এবং ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই শহীদ হন দুজন ; 
জগন্ময় দেব (জগন)  ও দিব্যেন্দু দাস (যীশু)।


সত্যি করে বলুন তো বরাক উপত্যকার বাঙালীরা, এই শহীদের কথা কি আপনারা মনে রেখেছেন? আমাদের মুখের ভাষার জন্য অকালে হারিয়ে যাওয়া কিশোরী মেয়েটিকে কি আপনারা মনে রেখেছেন? যাঁদের জন্য আজ আপনারা স্কুল, কলেজে বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন, বাংলায় কথা বলছেন, তাদের কথা কি আপনাদের মনে আছে?

না আপনাদের মনে নেই। মনে নেই বলেই আপনারা কোনো প্রতিবাদ করেন না। আমাদের অফিস-আদালত গুলোতে এখনোও বাংলার ব্যবহার হয় না। আমাদের বরাক উপত্যকায় বড় বড় হোর্ডিং এ অসমীয়া ভাষায় সরকারী বিজ্ঞাপন লেখা। আপনারা কোনো প্রতিবাদ করেন না। করিমগঞ্জের শহীদবেদীর পাশে আবর্জনার স্তুপ।  সরকারী ক্যালেন্ডারে রবীন্দ্র জয়ন্তী, উনিশে মে'র কোনো ছুটি নেই। বাঙালীদের সাথে অসমীয়ারা দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকের মতো ব্যবহার করে, ব্রহ্মপুত্র এলাকায় চাকরী করতে যাওয়া আমাদের ভাই-বোনদের সাথে তারা সৎমাসূলভ আচরন করে,  আপনারা প্রতিবাদ করেন না। বরাক উপত্যকায় বরাকের ছেলে মেয়েদের ব্রাত্য করে ব্রহ্মপুত্র এলাকার ছেলে মেয়েদের চাকরীতে নিয়োগ করা হয়। আপনার একবারো প্রতিবাদ করেন না। ওহ্, প্রতিবাদ করবেন কি করে, আপনারা তো নিজেদের বাঙালী না বলে অসমীয়া বলতে পছন্দ করেন। শুদ্ধ করে বললে - অসমবাসী বাঙালী!! কিন্তু আপনারা কাকের ময়ুরের পালক লাগানোর গল্পটা ভুলে গেছেন। 

ছিঃ বরাকের বাঙালী, এ লজ্জা রাখবো কোথায়?? 






















বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭

আমাদের ছেলে সন্তানরা "না" শব্দের মানে জানে না! 
_____________________________________________

আমাদের দেশে ধর্ষন একপ্রকার উৎসব। প্রতি মিনিটে একজন নারী এদেশে ধর্ষনের শিকার হচ্ছে। বৈবাহিক ধর্ষনেও আমাদের দেশ প্রথমসারির দিকে। এইসব ধর্ষনের ঘটনার বেশীরভাগের ই কোনো এফ আই আর হয় না। বেশীরভাগের খবরই প্রচারমাধ্যমে আসে না। তারপরও যে ঘটনা গুলো আসে, সেটা নিয়ে কদিন মাতামাতি হয়, মোমবাতি মিছিল হয়, ফেসবুকে ধর্ষকের ফাঁসি নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয়। আরেকপক্ষ ধর্ষনের জন্য মেয়েদের পোষাক, চরিত্র দায়ী বলে আকাশ বাতাস আন্দোলিত করেন।  তারপর ধীরে ধীরে আবার সব শান্ত হয়ে পড়ে। জনগন আবার কোনো নতুন ইস্যু নিয়ে মাতামাতি শুরু করে।

আবার কদিন পর নতুন কোনো পৈচাশিক ধর্ষনের ঘটনা ঘটে। একপক্ষ মোমবাতি নিয়ে হাটেন, আরেকপক্ষ মেয়েদের পোষাক অব্দি যান। ব্যস এই অব্দিই। এদিকে ধর্ষনের সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকে। 

আসলে এভাবে মোমবাতি হাতে হেঁটে, বা পোষাকের দোহাই দিয়ে কোনোদিন ধর্ষন কমানো যাবে না।  ধর্ষককে ফাঁসি দিয়েও ধর্ষন কমানো যাবে না। ধর্ষকের লিঙ্গ থেতলে দিলেও ধর্ষন কমানো যাবে না। কারন আমাদের গোড়ায় গলদ। ছোট থেকেই আমাদের ছেলে সন্তানের মধ্যে ধর্ষনের  মানসিকতা তৈরী করা হয়। এই মানসিকতাটাই মহামারী। স্যুট টাই পরা ভদ্রলোক থেকে শুরু করে অশিক্ষিত রিক্সায়ালার মধ্যেও এই ধর্ষনের মানসিকতা লুকিয়ে থাকে।তাই যতদিন অব্দি না এই মানসিকতার আমূল পরিবর্তন করা হচ্ছে, ততোদিন অব্দি ধর্ষন আর ধর্ষিতার সংখ্যা এভাবেই বেড়ে চলবে।

আমাদের সমাজের মা-বাবা রা মেয়েটি যে কোনো সময় ধর্ষিত হতে পারে এই আশঙ্কা করেন, কিন্তু নিজের ছেলেটাও যে ধর্ষক হয়ে উঠতে পারে, সে ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যাথা নেই। মা - বাবারা মেয়েদের সর্বদা না করতে ব্যস্ত। এটা না, ওটা না, হাফ হাতা পোষাক না, রাতবিরেতে একা যাওয়া না, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তারা এই 'না' শব্দটার শিক্ষা নিজের ছেলেদের দেন না। আমাদের মা -বাবারা মেয়েদের সর্ব অবস্থায় 'না' করে, কিন্তু মেয়েদেরও যে  'না' বলার অধিকার আছে, মেয়েরা 'না' বললে যে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হয়, এই শিক্ষাটা নিজের ছেলে সন্তানকে দেয় না।

তাই সমাজের মা-বাবারা, এবার থেকে মেয়েদের নিয়ে সদা শংকিত না থেকে, নিজের ছেলে সন্তানটিকে নিয়ে ভীত থাকুন। কারন আপনার ছেলে সন্তানটিও কিন্তু যে কোনো সময় ধর্ষকের ভুমিকায় নেমে আসতে পারে।   তাই এখন থেকে নিজের ছেলে সন্তানদের আগলে রাখুন ধর্ষনের চিন্তা থেকে, খারাপ বন্ধুদের থেকে। মেয়েরাও তাদের মতো সমান মর্যাদা সম্পন্ন মানুষ এবং মেয়েদের অনুমতি ব্যতীত তাকে ছোঁয়া সবচেয়ে বড় অপরাধ, সবচেয়ে বড় পাপ, এই শিক্ষা নিজের ছেলে সন্তানকে দিন। সাথে এটাও বলুন, নিরাপদ থাকা মানে শুধু নিজে নিরাপদ হওয়া নয়, অন্যকে বিপদে না ফেলার নামও নিরাপদ থাকা।

"‘No’ means No. So no need to explanation or strong causes or more speech for it." - এই কথাটা নিজের ছেলেটিকে মন্ত্রের মতো শেখান। নিজের ছেলেটিকে শেখান বিকৃত যৌনইচ্ছা সংবরণ করাই 'মানুষের' ধর্ম। একটা মেয়ে যখন 'না' বলবে তখন তাকে থেমে যেতে হবে। 'না' মানে নিজের যৌনইচ্ছা সংবরণ করতে হবে। সেই না'টা গার্লফ্রেন্ড বলুক বা কোনো যৌনকর্মী, অফিসের কলিগ বলুক, সহপাঠী বলুক, বা যে কোনো অপরিচিত মেয়ে কিংবা নিজের বউ, তাকে থেমে যেতে হবে। 'না' মানে না। 'না' মানে তাকে থামতে হবে। 'না' বলার পরও যদি সে অগ্রসর হয়, সেই মুহুর্তেই সে 'মানুষ' থেকে জানোয়ারে পরিণত হবে। 

এই শিক্ষায় ঘরে ঘরে প্রত্যেক মা-বাবারা তার ছেলেকে মানুষ করে তুলুন, দেখবেন 'ধর্ষন' আমাদের সমাজ, দেশ থেকে নির্মূল হয়ে গেছে। 
















আমাদের স্বর্গ ! 
_________________





চারদিকের এই উগ্র ধর্মান্ধতার মধ্যে আমার মাঝে মাঝে চৈতালীর কথা মনে পড়ে যায়। আমার ছোটবেলার স্কুলের প্রিয় বান্ধবী চৈতালী। যে নানাভাবে ছিলো ঠিক আমারই মতো। আমারই মতো উশৃঙ্খল, আমারই মতো যার অঙ্ক করতে ভালো লাগত না। ভালো লাগা মন্দ লাগা দুজনেরই একইরকম। একইরকম চুল। একদিন স্কুলের বড় ক্লাসের দিদিদের মুখে জানলাম আমি আর চৈতালী ভীষনরকম আলাদা। আমরা পানি বলি আর চৈতালীরা জল। আমরা মা কে আম্মা বলি, চৈতালিরা মা। আমাদের ঈদ, চৈতালীদের দূর্গাপূজো। আমাদের নামাজ, চৈতালীদের পূজো।আমরা মৃত্যুর পর কবরে যাই, চৈতালীরা কাঠের আগুনে। আমাদের ছোঁয়া চৈতালীদের পাপ। চৈতালীদের ঠাকুরঘরে আমাদের যেতে নেই। আমাদের ঘরের জল চৈতালীদের খেতে নেই। 

সেদিন আমরা দুজনেরই প্রচুর মনখারাপ হয়ে গেছিলো। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি চৈতালীকে। সেই চোখ মুখ নাক, সেই ফিতে বাঁধা চুল, সেই অমলিন হাসি। সেও কি এভাবে দেখেছিলো আমাকে? সেও কি খুঁজতে চেয়েছিলো আমাদের মধ্যের অনুপস্থিত সব অসাদৃশ্য? আমি জানি না। তবু ওই বয়সেই আমরা জেনে গেছিলাম আমরা যাচ্ছি ভিন্ন স্বর্গে, অথবা ভিন্ন নরকে। ধর্ম আমাদের মধ্যে অদৃশ্য একটা দেয়াল তুলে দিয়েছিলো ওই বয়সেই। আমরা ক্রমশই ধার্মিক হয়ে উঠি। আমরা ক্রমশ পাপী হয়ে উঠি একে অন্যের কাছে। 

তবু আমরা ভাবতে চাইতাম আমরা একই রকম। আমাদের কোনো ধর্ম নেই। চৈতালী ওর ঠাকুরের প্রসাদ এনে দিত আমাকে, আমি হাত পেতে নিতাম। ঈদে চৈতালী আমাদের ঘরে এসে সেমাই খেত। আমরা একসাথে ঘুরতে যেতাম আবার। এই অসাদৃশ্য নিয়েই আমরা আবার একজোট হয়ে খেলতে যেতাম। বনে বনে জংলী ফুল খুঁজতে যেতাম। আমাদের চারপাশে তখন স্বর্গ নেমে আসত। জন লেননের স্বর্গ। কবীর সুমনের স্বর্গ। আমার আর চৈতালীর স্বর্গ। 










মঙ্গলবার, ১৬ মে, ২০১৭

হে মহান সাম্যবাদী পুরুষ, 

কদিন আগে একটা পোষ্টে লিখেছিলাম, "প্রত্যেক পুরুষের ভেতরে একেকটা পুরুষতান্ত্রিক  প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র বাস করে"। সেই পোষ্টের সত্যিটাকে তোমরা মেনে নিতে পারোনি। তোমরা ভারী  বিরক্ত হয়েছিলে। রাগ ও করেছিলে। আমার উপর একেবারে পুরুষবিদ্ধেষীর তকমা লাগিয়ে দিলে তোমরা । একজন তো একধাপ এগিয়ে লিখে ফেললো, আমি নাকি পুরুষের আতংক। তা ভাইসব, তোমাদের এই বিরক্তির কারন আমি জানি। 

তোমরা ভাবো, ভাবতে চাও আমার (নারীর) সম্মান আর অধিকার পাইয়ে দেওয়ার একচ্ছত্র মালিকানা  শুধুমাত্র তোমাদেরই। তোমরাই আমার রক্ষক। কিন্তু তোমাদের সেই দয়া নিতে নারাজ আমি  নিজের অধিকার যখন নিজেই চাইতে যাই, তোমরা রাগ কর। তোমাদের লোক দেখানো  মহানতা, উদারতা মানতে নারাজ  আমাকে তোমরা পুরুষবিদ্ধেষী আখ্যা দাও। তোমরা চিৎকার করে বলতে থাক, তোমরা তো সাম্যবাদী, মানবতাবাদে বিশ্বাসী পুরুষ, তাহলে আমি কেন তোমাদের দিকে আঙ্গুল তুলছি? 

তোমরা বলো, 'পুরুষ ভালো, পুরুষতন্ত্র খারাপ'। আমাকেও এই স্লোগান আওড়াতে বলো। আচ্ছা পুরুষতন্ত্র কি হঠাৎ আকাশ থেকে খসে পড়া কোনো বস্তু?? না। পুরুষতন্ত্র একটা সিস্টেম, যেখানে সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় সমস্ত ব্যবস্থা পুরুষদের সপক্ষে। যুগ যুগ ধরে পুরুষরাই এই ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং এর সমস্ত সুফলও  ভোগ করছে তারাই। এটিকে টিকিয়েও রেখেছে তারা নিজেদের স্বার্থে। হ্যাঁ,  মানছি এটাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্যে করছি কিছুসংখ্যক ক্ষেত্রে আমরা নারীরাও। কিন্তু আমাদের মধ্যে এই যে পুরুষতান্ত্রিক ভাবনা, সেটা তো পুরুষরাই শিখিয়েছে যুগ যুগ ধরে। এই ভুল শিক্ষার অন্ধকার থেকে আমরা বেশীরভাগ নারীরা বেরোতে পারিনি, সেটা আমাদের অক্ষমতা। দোষ কিছুতেই নয়।

একটা উদাহরন দেই, একজন লোককে বিষ খাইয়ে মারা হলো। এবারে দোষ কাকে দেওয়া হবে? বিষকে নাকি বিষ প্রয়োগকারীকে? স্বাভাবিক ভাবেই বিষ প্রয়োগকারীকে দোষী বলে সাব্যস্ত করা হবে। একইরকম ভাবে আমাদের সমাজে বিষটি হলো পুরুষতন্ত্র আর বিষ প্রয়োগকারীটি হলো  পুরুষ। 

একটা তন্ত্র বা সিস্টেমের নিজস্ব কোনো বোধ-বুদ্ধি নেই।সিস্টেম নিজে থেকে চলতেও পারে না।তাকে চালায় মানুষ। তাই সিস্টেমের দিকে ইট ছুড়ে কোনো লাভ নেই। এই সিস্টেমকে চালায় যারা, তাদেরকে আঘাত করতে হবে। যদি তন্ত্র চালানেওয়ালেরা সঠিক পথে আসে, তবেই পুরুষতন্ত্র নামক সিস্টেমটির নির্মুল সম্ভব। তোমরা যারা সিস্টেমের উপর ক্ষোভ ঝাড়ো এবং  সিস্টেম চালানেওয়ালা দের সহানুভুতি দেখাও, তারা আসলে ভেতরে ভেতরে ভীষনভাবে চাও পুরুষতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বজায় থাকুক। 

তোমাদের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার আগে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিদিন ধর্ষিত হওয়া, শ্লীলতাহানীর শিকার হওয়া, নির্যাতনের শিকার হওয়া নারী কার দ্বারা এসবের শিকার হয়? ধর্ষন করে ধর্ষনের ভিডিও চড়াদামে বিক্রি করে কারা? আর কারাই বা দেখে ওসব? নারীর পোষাক দেখে যৌনউত্তেজনা কাদের জাগে? রাস্তাঘাটে নারীদের টিজ করা ঐ বখাটেরা কারা? যৌনপল্লীতে প্রতিরাতে কার হাতবদল হয় নারী? ডাস্টবিনে কেঁদে উঠা নবজাতক কার কর্মের ফসল? প্রতিরাতে পাগলীটা কার বিকৃত লালসার শিকার হয়? প্রেমের ফাঁদে ফেলে নারী পাচার করে কারা? আবার প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে এসিড ছুঁড়ে মারে কারা? কাজের মেয়েটিকে কার যৌনলালসার শিকার হতে হয়? শিশুদের যৌন নিপীড়ন করে কারা? প্রাইভেট পড়তে গিয়ে মেয়েটি কার ঘৃণ্য ছোঁয়ার শিকার হয়? ফেইসবুকের প্রত্যেকটা মেয়েকে ইনবক্সে উত্যক্ত করে কারা? ভিনধর্মী যুবকের সাথে প্রেম করার অপরাধে মেয়েটিকে প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানী করে কারা? 

তোমরা বলবে এসব যারা করে তারা মানুষ নয়। তারা তোমরা নও। তোমরা বলবে বর্তমান যুগে বেশীরভাগ পুরুষ সাম্যবাদী, মানবতাবাদী। তারা নারীকে সম্মান করে। তাহলে আরো কিছু উত্তর দাও। সম্পত্তিতে বোনকে সমানভাগ থেকে বঞ্চিত করে কারা? তোমাদের পরিবারের নারী সদস্যদের রক্ষক তোমরা কি নিজেকে ভাবো না? স্ত্রীর অমতে তার সাথে কোনোদিন কী শারীরিক ভাবে মিলিত হও নি? ফুলশয্যার রাতে স্ত্রীর সতিত্বের পরীক্ষা নিতে যাওয়া স্বামীটি কি তোমরা নও?? চাকরীতে স্ত্রী উন্নতি করছে দেখে তার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করোনি ? মেয়েদের নিয়ে রগরগে জোকস শুনে তোমরাও কি তাতে সামিল হওনি? হাসি ঠাট্টাতে মেতে উঠোনি? নারী নয়, পুরুষই পরিবারের গার্জিয়ান - একথা কি তোমরাও মনে মনে  ভাবো না?  সকাল থেকে কাজকর্ম করে তারপর সারাদিন অফিস করে বাড়ী ফেরা স্ত্রীটি যখন আবার রান্নাঘর সামলাতে ব্যস্ত, তখন সোফায় বসে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলানো তুমি কি তাকে এক কাপ চা দিয়ে যাওয়ার অর্ডার করোনি? ছেলে আর মেয়ে আলাদা নয়, বরং সমান মানুষ, নিজের ছেলে-মেয়েকে এই শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রচেষ্টা করেছো কখনো? 

না, উত্তরগুলো আমাকে দিতে হবে না। বরং  নিজেকে দাড়িপাল্লায় তোলো। নিজেই বুঝতে চেষ্টা করো তোমরা কি?  পুরুষ? নাকি পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া 'মানুষ'? 










"আমরা পুরুষ - আমরা ধর্ষণ করি"
_____________________________


#ঘটনা এক : হরিয়ানার রোহতকে ২৩ বছরের এক তরুনীকে সাতজন পুরুষ মিলে গণধর্ষন করে খুন করেছে। যাতে চিহ্নিত না করা যায়, তাই ভারী কিছু দিয়ে ওই তরুণীর মাথা ও মুখ থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। এমনকী দেহের উপর দিয়ে গাড়িও চালানো হয়েছে। যৌনাঙ্গে ধারালো অস্ত্র ঢোকানোরও চিহ্ন পেয়েছে পুলিশ। রাস্তায় পড়ে থাকায় কুকুরে খুবলে খেয়েছে তার দেহ। 

#ঘটনা দুই : হরিয়ানার রোহতকে নিজ আত্মীয় দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে ১০ বছরের এক শিশু। বর্তমানে শিশুটি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্বা। গত কয়েক মাস ধরে নানা অজুহাতে শিশুটিকে ধর্ষন করে ওই আত্মীয়টি। তাকে ভয় দেখিয়ে বলা হয় কাউকে যেন একথা না বলে। শিশুটির অবস্থা বর্তমানে আশঙ্কাজনক।


উপরের দুটো ঘটনায় ই ভিক্টিমের সবচেয়ে বড় ‘অপরাধ’, সে মেয়ে। তাকে ‘ভোগ’ করা যায়, ধর্ষণ করা যায়। হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। ধর্ষনের পর তার খুন হওয়া রক্তাক্ত দেহ ফেলে রাখা যায়! অন্তঃসত্বা বানিয়ে দেওয়া যায়। তেইশ বছর বয়স হোক বা দশ বছর - মেয়ে মানেই পুরুষদের কাছে যৌন চাহিদা মেটানোর মেশিন। যৌনতার জন্য একজন পুরুষের একটি যোনী হলেই চলে, জরায়ু হলেই চলে। তার বয়স দেখা লাগে না, সম্পর্ক দেখা লাগে না, ইচ্ছে-অনিচ্ছে দেখা লাগে না, প্রেম দেখা লাগে না, সময় দেখা লাগে না, সমাজ, বিবেক কিছুই লাগে না। 

ধর্ষনপ্রিয় পুরুষের একমাত্র গন্তব্য মেয়েদের অন্তর্বাস আবৃত স্থানসমূহে। এসব অন্তর্ভেদী দৃষ্টির জন্য নারীকে পড়তে হবে বোরকা, পড়তে হবে হিজাব পড়তে হবে পুরুষ কর্তৃক সুপারিশকৃত সকল পোশাক। তবুও সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ঠিকই খুঁজে নিবে মেয়েটির গোপনীয় সব অঙ্গ।মেয়েদের ধর্ষিত হতে  হবে হিজাবের দেশে, মেয়েদের ধর্ষিত হতে হবে হিজাব না থাকা দেশে, মেয়েদের ধর্ষিত হবে সর্বত্র। 

এই পৃথিবীতে মেয়েদের কোন নিরাপদ স্থান নেই।স্কুল, কলেজ, অফিস, হাসপাতাল, লিফ্ট, আদালত, এমন নিজের ঘরও মেয়েদের  জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়। আকস্মিক লোকালয়ে চলে আসা বনের পশুও কখনো এতোটা অনিরাপদ বোধ করেনা , যতোটা এই সমাজব্যবস্থায় মেয়েরা। 

কুকুর নামক প্রজাতিটিরও ভাদ্র মাস ফুরায় একদিন, ফুরায় না কেবল আমাদের সমাজের পুরুষদের! 

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো যখনই মেয়েদের প্রতি হওয়া ধর্ষন, নির্যাতনের প্রতিবাদ করা হয়, তখন আরেক দল পুরুষ, পুরুষ নির্যাতনের সাইনবোর্ড নিয়ে চলে আসে! অথবা "সবাই সমান নয়" এই স্লোগান গাইতে থাকে দলবদ্ধ ভাবে। অথবা ধর্ষিতার পেশা, পোষাক,চরিত্রের পোষ্টমোর্টেমে লেগে পড়ে। 

ওহে, সাম্যবাদী(!), মানবতাবাদী(!) পুরুষগণ, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ- করে পুরুষরা।তাই এসব বন্ধ করতে হলে নারীদের নয়,  সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পুরুষদেরই।সংশোধিত করতে হবে তোমাদের নিজেদেরকেই। তোমাদের জন্য 'পুরুষ' শব্দটা আজ একটা গালিতে পরিণত হয়েছে। তাই এই গালি থেকে বাঁচতে হলে তোমরা নিজেরা এখন  আন্দোলন কর, ধর্ষনের বিচার চাও, প্রতিবাদ কর। আর তা না করলে প্রকাশ্যেই ঘোষণা করো আজ থেকে: "আমরা পুরুষ, আমরা ধর্ষণ করি" - এবং ধর্ষক হিসেবে  নিজেদের পরিচয়কে আরো পাকাপোক্ত করো!!










মঙ্গলবার, ২ মে, ২০১৭

পুরুষতন্ত্রের হুজুররা, একটু শুনুন!
___________________________



আপনারা পুরুষ মানুষ, মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়া, তাকে প্রকাশ্যে গণশ্লীলতাহানী করে সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া, আপনাদের মৌলিক অধিকার। শুধু মেয়েরা কেন, দেশ, সংবিধান, আইন সবকিছুর গায়ে হাত তুলতে পারেন আপনারা। কখনো ধর্মের নামে, কখনো পরিবারের নামে, কখনো চরিত্রের নামে, কখনো সমাজ সভ্যতার নামে মেয়েদের আপনারা মারতেই আছেন। 

কখনো চড়-থাপ্পড়, কখনো অশ্লীল গালি দিয়ে, কখনো গণধর্ষন করে, কখনো চাপাতি দিয়ে, কখনো ত্রিশুলের আগায় অপরিণত ভ্রুণ দিয়ে, কখনো পাথর মেরে, কখনো গায়ে আগুন লাগিয়ে, কখনো এসিডে ঝলসে দিয়ে, মেয়েদের আপনারা মারতেই আছেন। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান-জৈন-শিখ-ইহুদি, মার খাওয়ার হাত থেকে কোনো মেয়ের রেহাই নেই। 

আপনাদের মেয়েদের মারার ইতিহাস শতাব্দী প্রাচীন। বলা যায় যেদিন থেকে মানব সভ্যতার ইতিহাস শুরু, সেদিন থেকে মেয়েদের মারার ইতিহাস ও শুরু। বাবা হয়ে মারেন, ভাই হয়ে মারেন, স্বামী হয়ে মারেন, প্রেমিক হয়ে মারেন,  ছেলে হয়ে মারেন,  পাড়া-প্রতিবেশী হয়ে মারেন, জেনারেল পাবলিক হয়ে মারেন। বন্ধু হয়ে মারেন, আবার শত্রু হয়েও মারেন। 

আপনারা মুকেশ সিং হয়ে মারেন, আশারাম বাপু হয়ে মারেন, শফি হুজুর হয়ে মারেন। চুলের মুঠি ধরে মারেন, লাঠি দিয়ে মারেন, আবার লিঙ্গ দিয়েও মারেন। পুত্রসন্তান প্রসব না করলেও মারেন, পুত্র সন্তান প্রসব করলেও মারেন।সতী হলেও মারেন, অসতী হলেও মারেন। রাগ হলেও মারেন আবার মিল হলেও মারেন। প্রেমে সায় না দিলেও মারেন, প্রেমে সায় দিলেও মারেন।

ছোটোলোক মেয়েমানুষ আমরা, আমাদের মারা তো আপনাদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। তাই না? আমাদের আবার কোনো মান-ইজ্জত আছে নাকি আপনাদের কাছে? আমরা আবার আপনাদের সমান মানুষ হলাম কবে? আপনাদের দেশে, আপনাদের সমাজে , মেয়েমানুষ শিরদাড়া সোজা করলেও মার খায়, শিরদাড়া ভেঙ্গে ফেললেও মার খায়। ঘরে থাকলেও মার খায়, রাস্তায় বেরোলেও মার খায়। প্রেম করলেও মার খায়, প্রেম না করলেও মার খায়। তরকারীতে লবন বেশী দিলেও মার খায় আবার কম দিলেও মার খায়। জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি আপনাদের মার খাওয়া ই তো আমাদের নিয়তি। 

আপনারা পুরুষ, আপনারা হুজুর মাইবাপ, আপনারা প্রভু। মেয়েমানুষ আপনাদের ক্রীতদাস। আপনারা যখন খুশী মারবেন, যখন খুশী ভালোবাসবেন। যে মেয়েমানুষ আপনাদের বশ মানে না, তাকে তো মারাই উচিৎ! সেজন্য তাকে ভাতে মারেন, হাতে মারেন, যেভাবে সম্ভব সেভাবে মারেন। আপনারা বেশ্যা পাড়ায় নিজের বিকৃত কামইচ্ছা মিটিয়ে এসে, 'বেশ্যা মেয়েমানুষ' বলে গালি দেবেন, তাকে মারবেন, পিটাবেন, সমাজছাড়া করবেন। জন্ম থেকে মনের সুখে আপনারা শুধু মেরেই যাচ্ছেন, আর মেরেই যাচ্ছেন। 

আপনারা পুরুষতন্ত্রের মাইবাপ। পৃথিবীর সকল ধর্ম আপনাদের মেয়েমানুষকে মারার একছত্র অধিকার দিয়েছে। আপনাদের ধর্ম বলেছে, মেয়েমানুষ ডাইনি, মেয়েমানুষ অশুভ, মেয়েমানুষ শয়তানের চেলা, মেয়েমানুষ আপনাদের পাজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি, মেয়েমানুষের কারনে স্বর্গ থেকে পতন হয়ে মর্ত্যে স্থান হয়েছে আপনাদের। তো সেই মেয়েমানুষকে দুইবেলা মারা তো আপনাদের নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্বের সামলাতে আপনাদের অবস্থা বেগতিক। যেখানে মেয়ে দেখছেন শুধু মারছেন, যেরকম মারা যায় সেভাবে মারছেন। আপনারা মারছেন, বাপ সহ চৌদ্দপুরুষ মিলে মারছেন, ভাই-বন্ধু মিলে মারছেন, পাড়া-প্রতিবেশী মিলে মারছেন, রাস্তার লোক মিলে মারছেন, মেরেই যাচ্ছেন। 

কিন্তু হুজুরগণ, এবার যে আপনাদের একটু থামতে হবে! আপনাদের ভাবতে হবে, সব মেয়েরা আপনাদের নিয়ন্ত্রনে আর নেই। আমার মা, তার চৌদ্দপুরুষ, এভাবে পড়ে পড়ে আপনাদের মার খেয়ে গেছেন বলে আমি, আমরাও যে আপনাদের মার মেনে নেব এরকম কিন্তু একেবারেই নয়। আমরা ঘুরে দাড়ানো শিখে গেছি। আমরা জাগছি। একজন একজন করে দিন দিন আমাদের দল কিন্তু ভারী হচ্ছে। আমরা এখন হাজারে আছি, তারপর লক্ষ থেকে কোটিতে ছড়াবো। তাই বলছি কি, আমাদের গায়ে হাত পড়লে আর যে আমরা চুপটি করে থাকবো না। তাই হাতটা এবার গুটোতে শিখুন। না হলে আমরা যেদিন মারতে শুরু করবো সেদিন দৌড়ে পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না।