এই ব্লগটি সন্ধান করুন

বৃহস্পতিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৭

এক পুরুষবিদ্বেষীর জবানবন্দি
________________________



প্রথমেই ডিসক্লেইমার দিয়ে রাখা ভালো, যা দিনকাল চলছে। কে কখন কোথা থেকে কোন তকমা লাগিয়ে দেবে, জানা তো নেই !! পাকিস্থান যাওয়ার হুমকি অনেকবার পেয়ে গেছি, দেশদ্রোহী তো বাই ডিফল্ট হয়েই আছি, 'খ' বর্গীয়, 'ম' বর্গীয় তকমাগুলোও পেয়ে গেছি, ইদানিং শুনছি  পুরুষবিদ্বেষী, তাই ডিসক্লেমার দিয়ে রাখা ভালো। 

ডিসক্লেইমার : ক) আমি একজন মানুষ। আপনাদের ভাষায় 'মেয়েমানুষ'। জন্মেছিও প্রত্যেকটা মানুষ যে প্রসেসের মধ্যে দিয়ে জন্মায়, সেভাবে। মেয়ে হয়েই জন্মাবো, করিমগঞ্জেই জন্মাবো, মুসলিম ঘরেই জন্মাবো, এরকম কোনো প্ল্যান করে আসিনি। বিষয়টা  আমার হাতেও ছিলো না। তাই নারী, পুরুষ, ধর্ম,  এগুলোকে  ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট হিসেবেই বয়ে চলি, এরজন্যে আলাদা করে কোনো গর্ব বা বিদ্বেষ অনুভব হয় না। 

খ) প্রত্যেকটা পুরুষের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারবো না, কারন এই পুরুষেরই কেউ আমার বাবা, কেউ প্রেমিক, কেউ বন্ধু। কিন্তু তা বলে তাদেরকে মাথায় তুলে নাচার, বা পূজো করার মানসিকতা আমার নেই। বাবা'কে ভালোবাসি, আমার আমি হয়ে উঠার মধ্যে তাঁর অবদান অনেক। তা বলে,আমার বাবাও যে সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারনা মুক্ত একজন মানুষ, একথা একশ ভাগ জোর দিয়ে বলতে পারবো না। পরিবারের প্রধান কর্তা শুধু বাবা একথা মানতেও আমার আপত্তি আছে। কারন আমি আমার মা'কেও সমানভাবে পরিবারের কর্ত্রী ভাবি। 

গ) অর্থনৈতিক ভাবে আমি বাবা, প্রেমিক বা ভাই কারো উপর নির্ভরশীল নই। কখনোই ছিলাম না। তাদের টাকায় নিজের নেট রিচার্জ টাও করছি না, কোনোদিন করেছি বলেও মনে পড়ছে না। আজন্ম মা'কেই চাকরী করে সংসার চালাতে দেখেছি এবং বাবাকে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণ কর্মী।   এবং পড়াশুনা শেষ করে আমরা চার বোন ই রোজগার করে সংসার চালাচ্ছি। এক্ষেত্রে  অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত বলতে পারেন। কিন্তু শুধুমাত্র অর্থনৈতিক মুক্তিই যে স্বাধীনতা এনে দেয়, একথাও একশ ভাগ মানতে আমার আপত্তি আছে। 

ঘ) প্রেমিক একজন আছে  (লিখতে গিয়ে গাল লাল হয়ে গেল!) । কিন্তু সেই প্রেমিকের টাকায় কোনোদিন ফুর্তি করিনি। কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে গেলেও বিলের বোঝা প্রেমিকের ঘাড়ে চাপাইনি। নিজেই মিটিয়েছি। বন্ধুদের সঙ্গে খেতে গেলেও বিল নিজেই মেটাই।  প্রেমিক, ছেলে, সেজন্য তারই রিচার্জ করে ফোন করতে হবে, অথবা আমাকে রিচার্জ করিয়ে দিতে হবে, একথা মানতেও আত্মসম্মানে লেগেছে। বরং প্রেমিক ফোন করলে কেটে  নিজের ফোন থেকে ফোন করি।

ঙ) বাসে/গাড়িতে সিট সংরক্ষণের ব্যাপারটিও মেনে নিতে পারি না। কারন নিজেকে কানা, খোড়া, বিকলাঙ্গ, বয়স্ক কিছুই মনে হয়না। গাড়ীতে অন্যান্য সহযাত্রীরা যেভাবে যান, সেভাবেই যাই। কখনো অটোর সামনে বসে, কখনো গাড়ীর পেছনের সিটে বসে, মানে বলতে চাইছি যখন যেভাবে সিট পাই, যাই। চাকরী ও নিজ যোগ্যতায় পেয়েছি। আজ অব্দি মেয়ে হওয়ার সুবাদে জীবনের কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি কোনো সুবিধা নিয়েছি বলে মনে করতে পারছি না। 

চ)  ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা,  গালাগালির মধ্যে কারা যেন আমাকে নারীবাদী বলছিলেন। তাদের বলে রাখি, আমাকে কেউ নারীবাদী বললে সেটাকে আমি গালি হিসেবে নেই না। বরং বিনয়ে অবনত হয়ে যাই, কারণ এ আমার কাছে বিরাট সম্মানের ব্যাপার, আর যদ্দূর জানি, সে সম্মানের যোগ্য এখনো পুরোপুরি হয়ে ওঠতে পারিনি । আমি নারীবাদকে এখনো পুরোপুরি পড়ে ওঠতে পারিনি, তাই এ বিষয়ে বেশী কিছু বলতে ও পারবো না। তবে এটুকু জানি, পৃথিবীকে অনেক ভালো জায়গা বানাবার ক্ষমতা রাখে নারীবাদের আদর্শ।

এবারে আসি আসল কথায়। "সব পুরুষ সমান নয়" এই ফ্রেজ টা সত্যি নয়, একথা আমি এই অর্থে বলিনি যে সব পুরুষ ই 'ধর্ষক', 'যৌনহেনস্থাকারী', "খারাপ", "নিপীড়ক" । সব পুরুষ ধর্ষক নয়, এটা আমিও জানি, আপনিও জানেন। আমার বাবা, প্রেমিক, বন্ধু এদেরকেও কখনো ধর্ষন, যৌনহেনস্তা করতে দেখিনি। আসলে এই কথা বলে আমি বোঝাতে চেয়েছি প্রত্যেকজন পুরুষের মধ্যেই একটা প্রতিক্রিয়াশীল পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা, পুরুষতান্ত্রিক অহংবোধ বাস করে। কেউ সেটা দমিয়ে রাখতে পারে না, কেউ চেষ্ঠা করে দমিয়ে রাখার, কিন্তু সবসময় পারে না। এইদিক থেকে দেখলে, প্রত্যেকজন পুরুষ ই সমান। পুরুষতন্ত্রের প্রতি বিতৃষ্ণা আর পুরুষ-বিদ্বেষের মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ। কিন্তু আপনারা অনেকেই দ্বিতীয়টির সাথে আমার কথা গুলিয়ে ফেলছেন! আপনি পুরুষ বলে আপনার সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। আমার বিরোধ আপনার মধ্যে থাকা সেই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটির সাথে। 

এখন হয়তো বলবেন "পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা"টি কি?? কিভাবে বুঝা যায়?? এই প্রশ্নের উত্তরে আসতে গেলে প্রথমে দেখতে হবে, পুরুষতন্ত্র কি?  পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্র যাই বলা হোক না কেন, সেটার মূল তন্ত্র হলো, পিতা বা পরিবার প্রধান কোন পুরুষের কর্তৃত্ব, ক্ষমতা প্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রন। আরো সহজ করে বললে, পুরুষতন্ত্র হচ্ছে সেই ভাবনাটি, যা বলে পুরুষরা নারীর চাইতে উত্তম। সেটি বুদ্ধিতে হতে পারে, শক্তিতে হতে পারে, অর্থনীতি বা রাজনীতি, বা যে কোন কিছুতেই। আপনারা হয়তো হুট করে বলবেন, কৈ আমরা তো তা ভাবি না!! কিন্তু একটি সমাজ যদি বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী  একটি ভাবনার সাথে বড় হয়,  অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন অবচেতন মনেই আমরা নিজেরাই অনেক কিছু ভেবে ফেলি, বা অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আমরা বুঝিও না হয়তো, সেটি একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বড় হওয়ার কারণে আমরা এভাবে ভাবছি, বা এই কাজটি করছি। 

একটা কথা ভেবে দেখুন, শুধু মাত্র পুরুষেরা লেখাপড়া শিখবে কেন? ভোট দেবে কেন? মেয়েরা দেবে না কেন? এই সমান সুযোগটা নেই কেন?” এই ভাবনাটা বেশীরভাগ মানুষের মনে এসেছিলো বলেই কিন্তু এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, বিপ্লব হয়েছে, এবং তাই নারী-পুরুষ  সবার লেখাপড়ার সুযোগ, ভোটাধিকার, এগুলো হয়েছে। এখন আমরা যদি পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের মধ্যেই খুঁজে দেখতে হবে আমরা কি কি ধ্যান ধারনা অসচেতন ভাবে হলেও বহন করে চলেছি! সেগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে, আলোচনা করতে হবে, চিহ্নিত করতে হবে। একটা তন্ত্র বা সিস্টেম তো নিজে থেকে চলতে পারে না, তাকে মানুষই চালায়, তাই শুদ্ধিকরন ও এই মানুষদের ই করতে হবে। 

এবারে আসি কিভাবে এই পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারনাগুলো প্রত্যেক পুরুষের মাঝে বিদ্যমান থাকে, সে বিষয়ে। নারীর মধ্যেও থাকে, কিন্তু অনেক সংখ্যক নারীরা কিন্তু এই ধ্যানধারনাগুলোর  বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কয়েক দশক ধরে। কিন্তু কোনো পুরুষকেই নিজের ভেতরের এই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বার বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখিনি, তা থেকে বেরিয়ে আসতেও দেখিনি। অশিক্ষিত পুরুষদের ছেড়েই দিলাম।  শিক্ষিত, মুক্তমনা, উদার, প্রগতিশীল, সেকুলার পুরুষটির মধ্যেও দেখিনি। সমস্যাটা সে জায়গায়। 

চলুন দেখা যাক কিভাবে - 

ক) আপনি বিয়ে করলেন। মেয়েটিও আপনাকে বিয়ে করলো। বিয়ের পর মেয়েটি তার টাইটেল বদলালো। আপনি উৎসাহ দিলেন অথবা দিলেন না। কিন্তু আটকালেন না। কেন? কারন আপনার ঐ সত্ত্বাটি বলছে, স্বামীর নামেই মেয়েদের পরিচয়। আপনি হিন্দু হলে, আপনার বউ সিঁদুর দিলো, ইদানিং কেউ কেউ সিঁদুর না দিলেও শাখা পলাটি ঠিকই পরছেন। এবারের ও আপনি বাঁধা দিলেন না। বেশী ভালো হলে, বললেন, "তোমার যা খুশী পরো" কিন্তু বাঁধা দিলেন না। কেন? আপনার ঐ সত্ত্বাটি মনে মনে ঠিকই বলছে, স্বামী অমূল্য ধন, তাঁর আয়ু রক্ষার্থে তোমাকে এসব পরতে হবে বৈকি। ওদিকে স্ত্রীর আয়ু রক্ষার দায় স্বামীর নেই। কারন পুরুষতন্ত্র এটা শেখায়নি।  দ্বিতীয়ত, তুমি যে একজনের অধীনে আছ, সেটা তোমাকে পুরো পৃথিবীর সামনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেখাতে হবে। 

খ) আপনি বাবা হয়েছেন, আপনার একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে আছে। প্রথমত ধরুন খেলনার কথা। আপনার ছেলেটিকে আপনি বন্দুক, ব্যাটবল কিনে দিচ্ছেন, মেয়েটিকে বার্বি ডল, রান্নাবাটি ইত্যাদি। কেন মেয়েটিকে পুতুল, বন্দুক বা ব্যাটবল কেন নয়? কারন অসচেতন ভাবে হলেও  আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা আপনাকে বলছে, মেয়েদের খেলনা পুতুল, রান্নাবাটি। বড় হয়ে মেয়েটি সংসার করবে, বাচ্চা লালন পালন করবে। এখন থেকেই তাই প্রস্তুতি।

গ) বন্দুক বা ব্যাটবল বা ফুটবল পেয়ে আপনার ছেলেটি বাইরে খেলতে যেতে চাইলে আপনি আটকাবেন না। ঠিক সেভাবে আপনার মেয়েটি যদি, বাইরে মাঠে খেলতে যায়, আপনি কিন্তু তাকে যেতে দেবেন না। কেন যেতে দেবেন না?? এখানেও অসচেতন ভাবে হলেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা আপনাকে বলছে, মেয়েদের মাঠে খেলতে নেই, মাঠে ছেলেরা খেলে। মেয়েদের ঘরের বাইরে যেতে নেই, ঘরের বাইরে ছেলেরা যায়।

ঘ) এবারে আসি পোষাকে। আপনার ছেলেটিকে আপনি প্যান্ট-শার্ট, টি শার্ট কিনে দিচ্ছেন, মেয়েটিকে জামা, চুড়িদার, স্কার্ট ইত্যাদি। এখানে কিন্তু বাচ্চারা নিজে ঠিক করতে পারে তার পোশাক, তাই আপনিই ওর পছন্দটা ঠিক করে দিচ্ছেন।  এখন যদি প্রশ্ন করি মেয়েটিকে জামা না দিয়ে প্যান্ট-শার্ট, টিশার্ট, কেন নয়?? এগুলোও তো পোশাক।  এখানেও কিন্তু আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা কাজ করছে। আপনি ভেবেই নিচ্ছেন আপনার মেয়ে যেহেতু মেয়ে, তাই ওর পোশাক জামা। প্যান্টশার্ট ছেলেদের পোশাক। এই পছন্দ কিন্তু আপনার  শিশুটি করছে না বরং আপনি তার উপর আপনার পছন্দ চাপিয়ে দিচ্ছেন। আপনার ছোটোবেলায় আপনার উপর ও এভাবে চাপানো হয়েছিলো। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এভাবেই যুগ যুগ ধরে ঠিক করে আসছে, একটা ছেলে কি পরবে, একটা মেয়ে কি পরবে, কি আচরণ করবে! এবং আপনি, আমার আপনার বাবা, ভাই কেউই এই বোধের উর্ধে উঠতে পারিনি। 

ঙ) সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ার পরে যদি আপনার ছেলে বাড়ি ফিরে, অথবা স্যারের বাড়ী থেকে সন্ধ্যের পর একা ফিরে, আপনার ততোটা টেনশন হয় না, যতটা আপনার মেয়ে সন্ধ্যের পর বাড়ী ফিরলে হয়। ছেলেটিকে সন্ধ্যের পর স্যারের বাড়ী থেকে আনতে না গেলেও, মেয়েটিকে আনতে আপনি, বা আপনার বড়ছেলে, নিদেনপক্ষে মেয়েটির ছোটো ভাইটাকেই পাঠাবেন আনতে। কেন? তার কারন,  আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি জানে, মেয়েদের একা বাড়ীর বাইরে চলাফেরা করতে নেই, কারন মেয়েরা দুর্বল, শক্তি কম। দ্বিতীয়ত, আপনি ভাবেন আপনার মেয়ে বাইরে গেলে তাকে শকুনের মতো ছিড়ে খাবে আপনারই স্বজাতিরা, তাই তার নিরাপত্তায় জন্য আপনি একজন পুরুষমানুষকে পাঠাচ্ছেন, যে মেয়েটিকে নিরাপদে বাড়ী নিয়ে আসবে। কারন আপনি ভাবেন পুরুষ শক্তিমান। তাই আরেক পুরুষের সাথে লড়াই করে সেই মেয়েটিকে নিরাপদে আনতে পারবে। এই ক্ষেত্রে আমার একটা প্রশ্ন আছে। আপনি বলছেন সবাই সমান নয়, কিন্তু বাইরের এই খারাপ পুরুষেরাই অন্য আরেকটি ঘরের 'ভালো' পুরুষ , বাবা, দাদা, ভাই নয় কি? 

চ) যৌবনের শুরুতে আপনার ছেলে সিগারেট খাওয়া শুরু করলে, সেটা আপনার কাছে তেমন ম্যাটার করে না, ছেলেরা তো ওমন একটু আধটু খাবেই, কিন্তু আপনার মেয়েটি যদি সিগারেট ধরে, তবে তো আপনার পৃথিবী শেষ। মেয়েটিকে বকবেন, মারবেন, বাইরে যাওয়া বন্ধ করবেন। রাস্তায় আপনার বন্ধু আপনার পাশে দাড়িয়ে সিগারেট খেলে সেটাও আপনি ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না, কিন্তু কোনো মেয়ে আপনার সামনে সিগারেট খেলে, মেয়েটির চলাফেরা, চরিত্র, পারিবারিক শিক্ষা সম্পর্কে আপনি সন্দিহান হয়ে উঠবেন!  কেন?  কারন এখানেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা বলছে, মেয়েদের সিগারেট খেতে নেই, সিগারেট খাওয়া ছেলেদের জন্মগত অধিকার। ছেলেদের দিকে পুরুষতন্ত্র কখনো চোখ পিটপিট করে তাকায় না! আপনি জানেন সেটা। আচ্ছা, সিগারেট খাওয়া যদি খারাপ হয় , তবে তো সেটা ছেলে-মেয়ে দুজনের জন্য খারাপ। শাস্তি হলে দুজনের ই  হওয়া উচিত। কিন্তু আপনি সেটা করেন না। এটাও আপনি জানেন। ঠিক একই কথা মদ খাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

ছ) আপনি, আপনার স্ত্রী দুজনেই চাকরী করেন। আপনার স্ত্রীকে সকালে উঠে রান্না, চা, জলখাবার সব বানিয়ে বেরোতে হয়। রাতে এসেও সেই একই। কিন্তু আপনি এগিয়ে এসে বলছেন না, "ঠিক আছে সকালে আমি রান্না করবো, রাতে তুমি। কেন বলছেন না?? কারন আবার ও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি কানে কানে বলছে, রান্না করা মেয়েদের কাজ। ঘর সামলানো মেয়েদের কাজ। হ্যাঁ, আপনি হয়তো বলবেন আপনি মাঝে মাঝেই রান্না করেন। কিন্তু রান্না করাটা আপনার শখ না হয়ে দায়িত্ব হচ্ছে না কেন??  আপনি হয়তো এটাও বলতে পারেন, আমার বউ ভালোবেসে এসব কাজ করে। খুশী মনে এসব করে। আচ্ছা ভালোবাসা কি একমুখী?  

জ) আপনি ভালো পুরুষ। আধুনিক। নারীর এগিয়ে যাওয়াতে বিশ্বাসী। বন্ধুমহলে, পারিবারিক আড্ডায় আপনি বললেন, "আমি আমার বউকে বিয়ের পরও পড়তে দিয়েছি, অথবা চাকরী করতে দিয়েছি, অথবা অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছি" ইত্যাদি প্রভৃতি। যদি বলি এসব আপনার বউয়ের জন্মগত অধিকার, আপনি দেওয়ার কে? আপনি রেগে নোংরা নারীবাদী বলে তেড়ে আসবেন। কেন জানেন?? কারন আবারো পুরুষতন্ত্র।  আপনার মনের গভীরে গাঁথা হয়ে আছে, বিয়ের পর নারীর গার্জিয়ান তো স্বামী ই। সেই ঠিক করবে বউ কি করবে না করবে!!

ঝ) সম্পত্তিতে বোন ও সমান অংশীদার। কিন্তু সম্পত্তি ভাগের সময় বোনকে সমান অংশ দেওয়া হয় না। আপনি শিক্ষিত, আধুনিক, মুক্তমনা। কিন্তু আপনিও দিচ্ছেন না। কেন?? কারন আবার সেই পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা কাজ করছে। বোন তো পরের ঘরে যাবে। সেখানে পাবে আরো অর্ধেক। মেয়েরা তো সমান অংশের দাবীদার হতে পারে না। সেকথা মরিয়া হয়ে  বোঝাতে আপনি ধর্মের আইন আনবেন, রাষ্ট্রের আইন আনবেন। কিন্তু একবারো এটা বুঝতে চাইবেন না, আইন, নিয়ম তো মানুষের সৃষ্টি। এগুলো বদলানো যায়, এমেন্ড করা যায়। সতীদাহ প্রথা বা বিধবা বিবাহ, এগুলোও কিন্তু বদলানো হয়েছিলো, সামাজিক সমতার প্রয়োজনে। 

ঞ) আপনি মেয়ের বাবা। মেয়ের বিয়ে দেবেন। মেয়ে যতই উচ্চশিক্ষিত হোক না কেন, খাট, আলমারি, গয়না, টাকা পয়সা ইত্যাদি দিয়ে মেয়েকে পরের ঘরে পাঠালেন। আবার ছেলের বিয়ের সময় কিন্তু এসব কিছুই বউয়ের ঘরে পাঠালেন না। কেন? এখানেও অসচেতন ভাবে হলেও আপনার পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বাটি কাজ করছে। মেয়ে পিতার বোঝা। তাকে সোনা গয়না এসব দিয়ে পার করাতে হয়। মেয়েদের শিক্ষার কোনো দাম নেই। স্বামীর ঘরে তার দাম বাড়াতে তাই দামী খাট, আসবাব, সোনা। ছেলেরা হীরের আংটি। ছেলের বউ হয়ে আসা সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাই ছেলের বিয়েতে ছেলের বউয়ের বাড়ী এসব কিছুই পাঠাতে হয় না। অসচেতন ভাবে হলেও আপনি মানেন, ছেলেরা বিয়ে করে, আর  মেয়েদের বিয়ে হয়! 

ট) মেয়ের বাবা আপনি। মেয়ের বিয়ে কোনো অবস্থাতেই বেকার ছেলের সাথে দেবেন না। মেয়েটির প্রেমিক যদি বেকার হয়, এই সম্পর্কে আপনি কখনোই রাজি হবেন না। মেয়েটি যদি চাকরি করে, তাও না।  কেন?? এখানেও ঐ পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বা। শিক্ষিত, নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাসী আপনিও মনে মনে ভাবেন, মেয়েদের ভরনপোষনের দায়িত্ব ছেলেটির। ছেলেকে আবার মেয়ে চাকরি করে কেন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে!! ছি ছি এ আবার হয় নাকি!!


আরো হাজারো উদাহরন  টেনে এনে আপনাকে প্রশ্নের মুখে দাড় করাতে পারি আমি। আপনি ধর্ষন করেন না, যৌনহেনস্তা করেন না, এসিড আক্রমন করেন না, বৌকে মারেন না, কিছুই করেন না। কিন্তু তারমানে এই নয় আপনি মহান। যতদিন অব্দি নিজের ভেতরের সব পুরুষতান্ত্রিক গুণাবলী থেকে মুক্ত হয়ে, পূর্ণাঙ্গ মানুষ রূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারছেন, ততদিন আমি আপনাকে মহান ভাবতে পারবো না। ততদিন অব্দি আমি বলেই যাবো সব পুরুষ সমান তার ভেতরের পুরুষতান্ত্রিক সত্ত্বার জন্য, পুরুষ অহংবোধের জন্য। 

এই যে নারীমুক্তি নিয়ে বড় বড় ভাষন হয়, "নারীকে জাগতে হবে", "অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে" ইত্যাদি প্রভৃতি, আসলে নারীমুক্তি তখনই সম্ভব, যখন একজন নারী এগিয়ে যাওয়ার সময় তার পরিবার, সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের সমর্থন পাবে। কারন রোজ রোজ যদি আমার অধিকার নিয়ে ঘরে বাইরে পুরুষদের সাথে ঝগড়া করতে হয়, (কারন অধিকার ছিনিয়ে আনতে গেলে ঝগড়া হবেই) তাহলে একটা সময় আপনারাই তকমা দেবেন "কি মুখরা", 'কি ঝুগড়ুটে', 'কি পুরুষবিদ্ধেষী' এইসব বিশেষণে। আর আমিও একটা সময় ক্লান্ত হয়ে, উপরন্তু যদি মানসিকভাবে দুর্বল হই,  এইসব তকমাগুলো থেকে বাঁচতে সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্ঠা করে যাবো। 

একজন নারীকে, সে  স্ত্রী হোক, বোন হোক, মেয়ে হোক, তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দিতে গেলে, মন থেকে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে লাগে, তাকে মানুষ ভাবার দুঃসাহস থাকতে লাগে। পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্র যাই বলি না কেন, সেটা আপনাদের শ্রেষ্ঠ বানিয়েছে, মাথায় তুলে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু নারীর চলার পথে তাকে সর্ব অবস্থায় সমর্থন করার মতো মানসিক শক্তি দেয়নি। 

এবার আসি আমার কথায়। আমি যখন বলি বা লিখি, সংখ্যালঘু/দলিত/আধিবাসী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, দেশজোড়া মোদী ওয়েভের বিরুদ্ধে, তখন কিন্তু মুক্তমনা, আধুনিক, প্রগতিশীল, উদারমনা এই আপনারা কখনোই বলেন না, এভাবে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করবেন না, সংখ্যালঘু/দলিত/আধিবাসীদের জন্য আলাদা করে কোনো আন্দোলনের প্রয়োজন নেই,  এভাবে একশ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্ধেষ ছড়ানোর দরকার নেই, আপনার বাবাও পুরুষ, আসুন সব মানুষের কথা বলি, মানবতার কথা বলি, সব মানুষ এক নয়! বরং তখন আপনাদের প্রশংসা, সহযোগীতা, পাশে থাকায় আমি ভেসে যাই। 

কিন্তু যখন আমি বলি, পুরুষেরা নারীকে ধর্ষন করে, পুরুষেরা নারীর মুখে এসিড ছুড়ে মারে, পুরুষেরা যৌনহেনস্তা করে, পুরুষেরা ইভটিজিং করে, পুরুষের জন্য নারী অনিরাপদ, পুরুষেরা ধর্ষনের ভিডিও চড়া দামে বিক্রি করে, ঠিক তখনই আপনারা আমায় 'খ' বর্গীয় , 'ম' বর্গীয় গালি দিয়ে বলেন, আপনি তো বড় ইতর, বড় বদ, আপনার বাবা কি পুরুষ নন?, এভাবে নারী-পুরুষ আলাদা করবেন না, এভাবে পুরুষবিদ্ধেষ ছড়াবেন না, এভাবে পুরুষকে গালি দেবেন না, এভাবে নারীর জন্য আলাদা কোনো আন্দোলনের দরকার নেই, তারচেয়ে মানববাদী হোন, সব পুরুষ এক নয়।

স্কুলে সমাজবিজ্ঞানে আমি, আপনি সবাই পড়ে এসেছি, মুখস্ত করে পরীক্ষায় খাতায় বমি করে এসেছি, 'ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক'। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীর মুখে, পুরুষতান্ত্রিক, পুরুষ শব্দগুলো শুনলেই আপনারা আক্রমণাত্বক হয়ে উঠেন। র্যাডিকাল নারীবাদী, অতি নারীবাদ, এইসব তকমা দেন। ভাবেন এই বুঝি আপনাদের সময়ের সাথে উদার, মহান, সেকুলার সাজা সিংহাসন ধরে কেউ টান মেরে দিলো! 

ভয়ংকর নারীবিদ্ধেষী সমাজব্যবস্থায় আপনারা যখন আমাকে পুরোষবিদ্ধেষী আখ্যা দেন, আমি হেসে গড়াগড়ি খাই। আমার মধ্যে সেই শিশুটাকে খুঁজে পাই, যে সমবেত প্রশংসাবাক্যের মধ্যে গলা তুলে জিজ্ঞেস করেছিলো, “রাজা, তোর কাপড় কোথায়?”

রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭

বেঁচে থাকার গল্পগুলো... 
________________________

কর্মসুত্রে রোজ অনেক মানুষের সাথে দেখা হয়। তারা কেউ আমার সহযাত্রী, কেউ কলিগ, কেউ ছাত্রছাত্রী, কেউ বা সম্পূর্ণ অচেনা কেউ। তারা সবাই আলাদা আলাদা হলেও, তাদের সবার একটা জায়গায় আমি খুব মিল পাই!! নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বললে তারা রীতিমত আঁতকে উঠেন! তারা মনে করেন নারী পুরুষের সমকক্ষ তো নয়ই, নারী পুরুষের তুলনা টানাও হাস্যকর। এ চিন্তা যে শুধু পুরুষেরা করেন তা কিন্তু নয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি বেশীরভাগ নারীও এই চিন্তাকে ধারন ও লালন করেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা শুধু যে পুরুষদের নিজেকে মহান ভাবতে শিখিয়েছে, তা কিন্তু নয়, সাথে নারীকেও নিজেকে হীন ভাবতে শিখিয়েছে। আজকের যুগেও বেশীরভাগ নারী নিজেকে পুরুষের তুলনায় দুর্বল, অসহায় ভাবেন। নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়, নির্যাতন, হেনস্থাকে নিজের নিয়তি বলে ভাবেন। 

রোজকার জীবনে আমার সঙ্গে দেখা হওয়া প্রত্যেকজন নারীকে আমি এইসব ধারনা থেকে বের করে আনতে চাই। তাদের সাথে কথা বলি, বোঝাই। তাতে অনেকে বুঝে। তাদের জীবনের গল্পগুলো বলে, পরামর্শ চায়। অনেকে তাদের জীবনের লড়াইয়ের গল্প বলে, যে গল্পগুলো শুনে নতুন করে উজ্জীবিত হই। অনেকে তাদের জীবনের হতাশার গল্প বলে। তাদেরকে আমি আশার গল্প শোনাই। এই আশা নিরাশার গল্পগুলোই এবার থেকে একটু গুছিয়ে বলার চেষ্ঠা করবো। 

এক : 

একজন দিদির গল্প দিয়ে শুরু করি। সদ্য একটা স্কুলে চাকরী পেয়েছি। সকাল সাড়ে সাতটায় ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে একঘন্টার জার্নি, তারপর স্কুল। গাড়ি বলতে ছোটো গাড়ি, যার মাঝখানের সিট মুখোমুখি। দুদিকে চারজন করে মোট আটজন বসতে পারে। সামনের সিটে তিনজন। পেছনের সিটে চারজন। সকালের গাড়িতে আমরা বেশীরভাগ মেয়েরাই যাই। প্রায় সবাই ই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। কেউ বিবাহিত, কেউ অবিবাহিত। কদিন আগে  এভাবেই একসকালে গাড়িতে করে যাচ্ছি। পাশে দুজন দিদি বসেছেন। একজনের বয়স বত্রিশ বা তেত্রিশ হবে, বিবাহিত। অন্যজনেরও তাই। প্রথমজন খুব রোগা, সারামুখে ক্লান্তি আর দুর্বলতার ছাপ। তার তুলনায় দ্বিতীয়জনের স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালো। দুজনেই সংসারের গল্প করছেন। যেটুকু কথা কানে আসলো, তাতে বুঝলাম দুজনেরই দুটো করে সন্তান আছে। একজনের দুই ছেলে। একজনের এক ছেলে, আর দেড় বছরের মেয়ে আছে একটা।  প্রথম দিদির নাম ধরুন 'ক' এবং দ্বিতীয়জনের নাম 'খ'। 'ক' দিদি  খ' দিদিকে বলছেন তার ননদের কথা। যার কিনা বিয়ে হয়েছিলো এবং এখন বর্তমানে স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ী চলে এসেছে। স্বামী রাগী স্বভাবের এবং মাঝে মাঝে ননদটিকে মারত, বকাঝকা করত। এদিকে ননদটিও নাকি রাগী। তো তাই নিয়ে ক'দিদির দুঃখের শেষ নেই। খ'কে বলছেন - " যতই বলো দিদি, মেয়েমানুষের এত রাগ ভালো না, স্বামী দুকথা বলতেই পারে, কারন সে স্বামী, মেয়েদের তাই বলে স্বামীর মুখে মুখে তর্ক করতে নেই। মারুক , বকুক যাই করুক, ঐ স্বামীর ভিটেতেই মেয়েদের আসল ঘর, বাপের ঘর তো দুদিনের।" শুনে খ দিদি বললেন - "ঠিক বলেছো দিদি। মেয়েমানুষের সবদিক দেখে শুনে চলতে হয়। মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হয়।আমরা কি মানিয়ে গুছিয়ে চলছি না!" এতটুকু অব্দি শুনে একটু ঘুমোবো ঘুমোবো করছি। এমনসময় শুনি 'ক' দিদি বলছে 'খ' দিদিকে, "আসলে আমার ননদের স্বভাব ভালো নয়, সবেতেই শুধু রাগ করে, খুব মুখরা। এত মুখরা মেয়েকে কি কোনো স্বামী রাখতে  চায়? মেয়েদের হতে হয় মাটির মত। নারী রাগলে তার দু-কূল যায়!"

এতক্ষণ ধৈর্য্য ধরে চুপ থাকলেও, তারপর আর থাকতে পারলাম না। ক' দিদিকে জিঞ্জেস করলাম, মেয়েদের রাগ করতে নেই, রাগ শুধু ছেলেদের - এই নিয়ম কে করেছে দিদি?? রাগ একটা ইমোশন। যেরকম আমরা হাসি, কাঁদি, ঠিক সেরকম অনেকসময় রাগ করি। প্রত্যেক মানুষের ইমোশনের লেভেল আলাদা হয়। অনেকের রাগ কম, অনেকের বেশী। তারসাথে ছেলে মেয়ের সম্পর্ক কি?? নাকি মেয়েদের মানুষের পর্যায়ে ফেলতে নেই? কোনটা? আপনি ভেবে বলুন তো?? গাড়ির সবাই ততক্ষণে আমার দিকে ফিরে দেখছে। "ক" দিদি ভাবতে পারেনি আমি এভাবে বলবো। সে একটু আমতা আমতা করে চুপ করে গেলো। আমি না থেমে বললাম, শুনুন দিদি, এই যে আপনি আপনার ননদের কথা বলছেন, সে তো প্রশংসার যোগ্য। কারন সে স্বামীর মার, বকা খেয়ে পড়ে থাকেনি। প্রতিবাদ করেছে। বেরিয়ে এসেছে। এইসময় তো আপনাদের সবার ওর পাশে থাকার কথা ছিলো। অনেক সাহস করে সে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সবাই পারে না। কারন ছোটোবেলা থেকে আমাদের মা-মাসীরাই আমাদের মগজে ঠুসে দেন ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। সেই ঠুসে দেওয়া থেকে আমরা সহজে বেরিয়ে আসতে পারি না। কেউ কেউ যদি বেরিয়ে আসার সাহস দেখায় তবে তার পাশে থাকার চেষ্ঠা করবে, হেয় নয়। তুমি তো চাকরী করছো, পড়াশুনো করেছো। তুমি বলোতো সংসার কি শুধু মেয়ের গুণে সুখী হয়? স্বামীর কোনো গুণ লাগে না?? সংসার তো স্বামী-স্ত্রী দুজনের। তাহলে শুধু স্ত্রীর গুণই ধরা হবে কেন?? স্ত্রীটিকেই সবকিছু সহ্য করে মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হবে কেন?? 

ঘরে ঘরে মায়েরা মেয়েদের শেখাচ্ছেন, "বরের ঘর থেকে চিতায় উঠার সময়ই বেরোবে,তার আগে নয়।" তার আগে বেরোলে লজ্জা। তার আগে বেরোলে অসম্মান। স্বামীর ঘর ছাড়া তোমার আর কোনো ঘর নেই। বেশীরভাগ মেয়েরাও তাই শত অসম্মানে, শত হেনস্থায়, শত নির্যাতনে আটকে আছে  সেখানে। কারন সে কোথায় যাবে? নিজের ঘর বলে তো তার কোনো ঘরই নেই। নিজের মা-বাবা, ভাই-বোনরাই তাকে বোঝা মনে করবে। ঠিক এই তোমার মতোই মেয়েটির সম্পর্কে  কথা বলবে, পাড়ায়, রাস্তায়, গাড়ীতে, সর্বত্র। 

খবরের কাগজ, টিভি এগুলো খুললেই দেখা যায় নারী নির্যাতন, পারিবারিক হিংসা, ধর্ষন, শ্লীলতাহানীর খবরে ভরা। আমাদের মা, মাসীরা হয়তো এত পড়াশুনা করেননি, আর্থিক স্বাবলম্বীতাও ছিলো না। ভুলকে মনে মনে ভুল জানলেও সেটাকে মুখ ফুটে বলতে পারেন নি। কিন্তু আমরা তো পড়াশুনো করছি। চাকরি নোকরি করছি। আমাদের মেয়েদের, আমাদের আগামী প্রজন্মকে আমরা কি শেখাচ্ছি?? তাদেরকেও কি আমাদের মা মাসীর মত সেই একই রেকর্ড শুনিয়ে যাবো? নিজের জীবন দিয়ে যে অভিজ্ঞতা করছি, সেই একই আগুনে নিজের মেয়েদেরও ঠেলে দেব?? একটা কথা জেনে রাখবে যে শিক্ষা, যে আর্থিক মুক্তি আমাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধের জন্ম দেয় না, সেই শিক্ষা আর কুশিক্ষার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই!!  তাই আজ থেকে, নিজের মেয়ে, বোন, ননদ, বন্ধু, আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী প্রত্যেকটা মেয়েকে শেখাতে চেষ্ঠা কর, স্বামী মারলে মেয়েটি কি করবে? স্বামীর পরিবার অত্যাচার করলে মেয়েটি কি করবে? কথায় কথায় গলাধাক্কা, মারধর, গালাগাল করলে মেয়েটি কি করবে?? স্বামী যৌন অত্যাচার করলে মেয়েটি কি করবে?? স্বামী পরনারীতে আসক্ত হলে মেয়েটি কি করবে? মেয়েটিকে শেখাও স্বামীর বাড়িই মেয়েদের একমাত্র ঠিকানা নয়।তার আর একটা বাড়ীও আছে এবং সারাজীবন সেটা তারই থাকবে। বিয়ে মানেই নিজের বাড়ীর উপর থেকে অধিকার চলে যাওয়া নয়! 

অনেকক্ষণ চুপ করে শুনে 'ক' দিদি  আমায় বলল, দিদি তো এখনো বিয়ে করোনি, তাই বুঝবে না সংসারের নিয়ম!! আমি বললাম, দিদি সংসার সেটা নয়, যেখানে আমাকে কারো অধীনে থাকতে হয়, কারো মর্জিমত চলতে হয়! বরং সংসার সেটা, যা দুজন মানুষের পারস্পরিক সহযোগীতায় গড়ে উঠে। সংসার সেটা যেখানে স্বামীটি তার স্ত্রীর মানুষ হিসেবে পাওয়া অধিকারগুলোকে সম্মান দেয়। স্ত্রীকে নিজের দাস না ভেবে, তার অধিকার আদায়ে যে স্বামীটি সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে থাকে, সেটাই সংসার দিদি। মানুষের সংসার। রাজা আর দাসীর সংসার কখনো মানুষের সংসার হতে পারে না। কথাগুলো ভেবে দেখবে। 

গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ায়, খানিকটা রাগের সাথেই এই কথাগুলো বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। স্কুল থেকে ফেরার সময় 'ক' দিদির সাথে আর দেখা হয়নি সেদিন। দেখা হলো তার পরেরদিন। গাড়িতে ওঠার সময় দেখি  'ক' দিদি আমার জন্য সিট রেখেছেন তার পাশে। আমি তার দিকে চেয়ে হাসলাম। 'ক' দিদি বললো,  "দিদি তোমার সেদিনের কথাগুলো আমি ঘরে গিয়ে অনেক ভেবেছি। আমার ননদের সাথেও কথা বলেছি। এই প্রথমবার  আমি আমার ননদকে জিজ্ঞেস করেছি স্বামীর বাড়িতে ঠিক কি কি সমস্যা হয়েছে ওর সাথে। এবং বলেছি আমি ওর পাশে আছি।" আমি হেসে বললাম এইতো একদম ঠিক করেছো দিদি। 

এই কদিনের যাওয়া আসাতে 'ক' দিদি তার নিজের জীবনের হতাশাগুলো একটু একটু করে ভাগ করেছে আমার সাথে। শুধু শুনে গেছি, আর ভেবেছি যুগ যুগ ধরে প্রত্যেকটা মেয়ের জীবনের গল্পগুলো কি নিদারুনভাবে একই। সময় বদলাচ্ছে, যুগ বদলাচ্ছে, আমরা ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি, কিন্তু গল্পগুলো একই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করেছিলো, সে মরেনি, আর আমাদের কাদম্বরীরা রোজ বেঁচে থেকে প্রমাণ করছে তারা বেঁচে নেই!! 

শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭


১৩ই অক্টোবর, আন্তর্জাতিক #No_Bra_Day ( নো ব্রা দিবস)..
____________________________________________________

শিরোনাম দেখে অনেকেই হয়তো নাক কুঁচকে এড়িয়ে যাবেন। বিরক্ত হয়ে হয়তো বলবেন, এই আবার এসেছে পুরুষদের গালিগালাজ করে চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে!!  আপনাদের আশ্বস্ত করে বলছি এইসব কোনো কিছুই আজকের এই লেখার উদ্দেশ্য নয়!! 

শিরোনাম দেখে গাল দেওয়ার পাশাপাশি অনেকের মনেই হয়তো প্রশ্ন জাগছে, #No_Bra_Day জিনিস টা কি? নো ব্রা ডে মানে কি ব্রা খুলে বুক উন্মুক্ত করে রাস্তায় বেরোনো?? অথবা #নো_ব্রা_ডে কি ব্রা না পরে কাটাতে হবে?? আজ্ঞে না। উপরের কোনোটাই নয়। নো ব্রা ডে'তে ব্রা খুলে প্যারেড করার মতো কোনো ব্যাপার নেই। দয়া করে উল্টো বুঝবেন না।  

অনেকেই #ব্রেস্ট_ক্যান্সার  শব্দটা শুনেছেন। অনেকের মা/দিদি/পরিবারের মহিলা আত্মীয় এই রোগে হয়তো ভুগেছেন। এই ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কিন্তু দিনকে দিন বাড়ছেই। সাধারণত ৫০-৭০ বছর বয়সী মহিলাদের  ব্রেস্ট ক্যান্সার হবার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশী থাকে। অক্টোবর মাস হলো এই #ব্রেস্ট_ক্যান্সার সচেতনার মাস। ১৩ই অক্টোবর হলো #নো_ব্রা_ডে।  উদ্দেশ্য হলো, অন্তত এই একটা দিন  মেয়েরা যাতে নিজেদের ব্রা খুলে স্তন দুটো পরীক্ষা করে। 

প্রত্যেকটা মেয়ে কিশোরীবেলা থেকে যখন স্তনের আকার একটু একটু করে বাড়তে থাকে, তখন সেই বৃদ্ধি হওয়া স্তনকে সুডোল, আটসাট করে তুলতে  ব্রা পরতে শুরু করে। অথচ এই ব্রা থেকেই যে নানাবিধ রোগ হতে পারে সে সম্পর্কে বেশীরভাগ মেয়ের কোনো ধারনাই নেই, সচেতনা ও নেই। শহর এবং গ্রামের প্রায় 95% মেয়ে  জানে না ব্রা'র কি কি ক্ষতিকারক দিক আছে!! 
অথচ প্রত্যেকটা মেয়ের উচিৎ ব্রা’র সঠিক ব্যাবহার জানা। এর ক্ষতিকারক দিক জানা এবং এর ব্যাপারে সতর্ক হওয়া! সারাদিন ব্রা পড়ে থাকা কিংবা রাতের বেলা ব্রা পড়ে থাকা যে অত্যন্ত ক্ষতিকারক, সেটা জানা। আবার অনেকেই এসব অন্তর্বাস প্রতিদিন ধোয় না ! এটা থেকেও যে অনেক রোগ হয়, সেটা জানা! 

অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ই মনে করেন ব্রা ব্যবহারের ফলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়ে। ব্রা ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটা কমবে। এই উদ্দেশ্যেই প্রতিবছর #নো_ব্রা_দিবস    পালন করা হয়। 

এবার অনেক আবালশ্রেণীর মানবতাবাদী সাজা পুরুষ হয়তো এখানে এসে যুক্তি দেবেন , 'এখন যদি পুরুষরা "নো জাঙ্গিয়া দিবস" পালন করে তাহলে কেমন হবে? উত্তর হলো, আন্দোলন/ সচেতনা বৃদ্ধির অভিযান তারাই করে যারা ভিক্টিম হয় । আপনাদের যদি কখনো পেনিসে ক্যান্সার/অথবা অন্য কোনো রোগ হয়, তখন নাহয় নো জাঙ্গিয়া দিবস পালন করবেন!! 

এই ফাঁকে একটা গল্প বলি। কয়েক বছর আগে সুইডেনের নারীরা  মাতৃত্বকালীন বেতন-ভাতা’র দাবী করেছিলো রাষ্ট্রের কাছে। তারা বলেছিলো গর্ভকালীন সময়ে যদি তাদেরকে বেতন-ভাতা না দেয়া হয়, তাহলে তারা আর “মা” হবে না। তারা মুক্তকন্ঠে বলেছিলো, ‘আমরা সন্তান জন্মদান করি শুধুমাত্র আমাদের প্রয়োজনে নয়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনেও সন্তান জন্মদান করি। সুতরাং মাতৃত্বকালীন সময়ে আমাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নিতে হবে।“ রাষ্ট্র  কিন্তু তাদের দাবি মেনে নিয়েছিল। 

এইভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে আন্দোলন, সচেতনা বৃদ্ধির অভিযানগুলোই একদিন আমাদের দেশকে ব্রেস্ট ক্যান্সার মুক্ত করবে। ক্যান্সার প্রতিরোধের লড়াইয়ে জেতার সবচেয়ে ভালো উপায় কি জানেন??  ক্যান্সারের কারণগুলো সম্পর্কে জানা। আর শুধু নিজে জানলেই কিন্তু চলবে না। নিজের জানাগুলো আশেপাশের মানুষদেরও  জানাতে হবে। তাই, নারী-পুরুষ যেই হোন না কেন, চেনাপরিচিত সবার সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলুন। আলোচনা করুন।

অবশ্য যে দেশে এখনো পিরিয়ডকালীন সচেতনাই বৃদ্ধি পায়নি!  পিরিয়ড হওয়াকে এখনো অপবিত্র, পাপ মানা হয় ! যে দেশে স্তন এখনো পুরুষের ফ্যান্টাসির বিষয়, যে দেশে পুরুষের ফ্যান্টাসী পুরনের জন্য নারীকে এখনো সুডোল, সুন্দর, সঠিক সাইজের স্তনের জন্য ব্রা ব্যবহার করতে হয়, সে দেশে স্তন ক্যান্সার, স্তনের নানারকম রোগ নিয়ে ভাবার সুযোগ আছে কি নারী বা পুরুষের?? 







#Me_Too (হ্যাঁ,  আমিও) ...!! 
_________________________

সোস্যাল মিডিয়ার শুরু হওয়া একটি ক্যাম্পেইন #me_too। টুইটার ও ফেসবুকের দেওয়ালে এত সংখ্যক ‘মি টু’-র হ্যাশট্যাগ হয়েছে যা দেখে বোঝা যাচ্ছে যৌন হয়রানি কতোটা ব্যাপক, কতটা বিশাল তার পরিধি, রোজ কত সংখ্যক নারী যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন!! 

আলোড়ন শুরু করেছিলেন  হলিউডের এক অভিনেত্রী। হ্যাঁ আলোড়নই। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে আওয়াজ উঠলো, আমিও, হ্যাঁ আমিও!  #me_too - এই ছোট একটা হ্যাশট্যাগ লক্ষ-কোটি মেয়ের মুখে ভাষা জুগিয়ে দিলো। বুক ফাটছিলো, কিন্তু কিভাবে বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। মাত্র একটা ফুলকি বিস্ফোরণে পরিণত হলো। সমাজ, লোকলজ্জার ভয়ে যে দরজা এতদিন বন্ধ ছিলো, আজ যখন খুললো, তখন বেরিয়ে আসুক সব বিষ, সাফ হয়ে যাক সব জঞ্জাল। 

ঘটনা এক : 

বয়স তখন পাঁচ। প্রথম শ্রেণীতে পড়ি। ছোটো থেকে আমি প্যান্ট আর গেঞ্জিতেই অভ্যস্ত ছিলাম। স্কুলেও যেতাম প্যান্ট আর শার্ট বা গেঞ্জি পরে। আমাদের স্কুল ছিলো ছেলে মেয়ে কোম্বাইন।ক্লাস ফাইভের দাদারা একদিন প্ল্যান করলো আমি ছেলে না মেয়ে সেটা দেখবে! তো দেখার উপায় কি?? আমার প্যান্ট খুলে দেখবে আমি ছেলে না মেয়ে!! টিফিনের সময় চার/পাঁচজন দাদা আমায় মাঠের এককোনে প্যান্ট খোলার জন্য চেপে ধরে। আমি তখন রাগে একজনের হাত কামড়ে দিয়েছি,  ঠিক তখনই ছেলেগুলোর চিৎকার শুনে স্কুলের দারোয়ান দেখতে পায়, এবং আমাকে হেড স্যারের ঘরে নিয়ে আসে। আমি ভয় আর রাগে কাঁপছিলাম। তখন জানতাম না এটা যৌনহেনস্তা কি না!! পাঁচ বছর বয়েসে বোঝা সম্ভব ও ছিলো না কি না!! শুধু বুঝতে পারছিলাম, যেটা ঘটতে যাচ্ছিলো সেটা খারাপ কিছু, যা হওয়া উচিত নয়। ঘরে এসে বাপীকে বললাম সব। বাপী পরদিন স্কুলে এসে খুব রাগারাগী করলেন, ঐ ছেলেগুলোর বাবাদের আনানো হলো স্কুলে। তারপর কি হলো জানি না, ঐ ছেলেগুলো দুর থেকে কমেন্ট পাস করতো, কিন্তু সামনাসামনি আর কিছু করেনি। তার কিছুদিন পর মা'র ট্র্যান্সফার হয়ে যায়, আর আমরা অন্য শহরে চলে আসি। 

ঘটনা দুই : 

ক্লাস সিক্স। স্কুলের ছুটিতে বাসে করে গ্রামের বাড়ী যাচ্ছি। মা আর ছোটোবোন মুন একটা সিটে বসে, আর আমি সিট না পেয়ে মা'র সিটের পাশেই দাড়িয়ে আছি। হঠাৎ খেয়াল করি আমার পিঠে কে হাত বুলোচ্ছে। বুঝতে পারছি এই ছোঁয়াটা স্বাভাবিক নয়।  পেছন ফিরে দেখি বাপীর বয়সী একটা লোক, একহাত আমার পিঠে, একহাত তার প্যান্টের সামনে। আমি সামনের দিকে সরে আসলাম। লোকটা কিছুসময় পর সামনের দিকে সরে আসলো। এবার চেষ্টা করলো আমার বুকে হাত দিতে। আমি যত সরি, লোকটাও তত সরে। সামনের দিকে আরো মানুষ দাড়িয়ে, বেশী সরতে ও পারছি না। কোনোরকম সিঁটিয়ে দাড়িয়ে রইলাম। মাকেও বলতে পারছি না, সঙ্কোচবোধ থেকে। বললেও মা কি করতে পারতেন জানি না। হয়তো মাও লোকলজ্জার ভয়ে লোকটাকে কিছুই বলতেন না!!  যতক্ষণ দাড়িয়েছিলাম আমার একটাই কাজ ছিলো লোকটার হাত ঠেলে সরানো!! কিছুসময় পর মা'র পাশের সিটের মহিলা নেমে যাওয়ায় ঐ সিটে বসি। 

ঘটনা তিন: 

ক্লাস সেভেন। অঙ্ক ক্লাস। অঙ্ক দেখার বাহানায় স্যারের পিঠে হাত বুলানো। কিছু বলতে পারতাম না। সিঁটিয়ে থাকতাম। অঙ্ক ক্লাস ভয় পেতাম। 

ঘটনা চার : 

ক্লাস এইট না নাইন। শীতকাল। আমি কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছি। পিসতুতো এক দাদা এসেছে ঘরে। কিছুসময় পর ঐ দাদাটাও আমার কম্বলের নিচে পা ঢুকিয়ে বসলো। একটু সময় পরে দেখি আমার ঘাড়ে আর পিঠে মৃদু চাপ। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠি। অন্য ঘরে চলে যাই। 
ঘটনা পাঁচ : 

আমরা তখন ভাড়া থাকতাম একটা ঘরে। স্নানঘর ছিলো একটু দুরে। স্নানঘরের দেওয়াল বেয়ে একটা নারকেল গাছ ছিল। গাছ আর দেওয়ালের মাঝবরাবর একটা জায়গা এক ইট ফাঁক ছিলো। একদিন স্নান করার সময় দেখি ঐ ফাঁকা জায়গা দিয়ে ঘর মালিকের ছেলে তাকিয়ে আছে। যখন দেখলো আমি তাকে দেখতে পেয়ে গেছি, তখন চলে গেল। তারপর থেকে আমাকে নানাভাবে উত্যক্ত করার চেষ্টা করতো। কিন্তু ততদিনে ভয় পাওয়া ভীরু মেয়ে থেকে আমি রাগী, সাহসী, মারকুটে বদনাম কুড়িয়েছি। তাই ঐ  ছেলেটার সাহসও আর বাড়েনি।  

ঘটনা ছয়:

একাদশ শ্রেনী। এন সি সি করতাম। মেয়েদের প্যারেড আলাদা হত, ছেলেদের আলাদা। প্যারেড করার সময়  দেখতাম কিছুছেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে অশ্লীল ভাবে কমেন্ট পাস করছে। 

ঘটনা সাত : 
ফেইসবুক। প্রায় রোজদিন কোনো না কোনোভাবে যৌনহেনস্তা চলছে। অশ্লীল মেসেজ, ভিডিও, ছবি। কত ব্লক করবো বলতে পারেন?? 

ঘটনা আরো অনেক আছে, ভীড় রাস্তা , বাস, অটো এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে পুরুষের নোংরা হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে হয় নি!! আমার কিংবা আমাদের একটাই অপরাধ, আমরা মেয়ে। মেয়েদের ভোগ করা যায়  যখন তখন, যেখানে সেখানে তার গায়ে হাত দেওয়া যায়, কমেন্ট পাস করা যায়, হায়েনার মত ধর্ষণ করা যায়, ধর্ষণের পর তার রক্তাক্ত দেহ নর্দমায় ছুড়ে ফেলা যায়, তা খুশী তা করা যায় তার সাথে। পাঁচ বছর বয়স হোক বা পঞ্চাশ বছর - মেয়ে মানেই পুরুষদের কাছে যৌন চাহিদা মেটানোর মেশিন। যৌনতার জন্য একজন পুরুষের একটি যোনী হলেই চলে, জরায়ু হলেই চলে। তার বয়স দেখা লাগে না, সম্পর্ক দেখা লাগে না, ইচ্ছে-অনিচ্ছে দেখা লাগে না, প্রেম দেখা লাগে না, সময় দেখা লাগে না, সমাজ, বিবেক কিছুই লাগে না!! 

যৌনহেনস্তাকারী পুরুষের একমাত্র গন্তব্য মেয়েদের অন্তর্বাস আবৃত স্থানসমূহে। নারী হিজাব পরুক, বোরখা পরুক বা আলখাল্লা, পুরুষের  অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ঠিকই খুঁজে নিবে মেয়েদের গোপনীয় সব অঙ্গ। মেয়েদের হেনস্তা হতে হবে হিজাবের দেশে, মেয়েদের হেনস্তা হতে হবে হিজাব না থাকা দেশে, সর্বত্র। এই পৃথিবীতে কোথাও মেয়েদের কোন নিরাপদ স্থান নেই।স্কুল, কলেজ, অফিস, হাসপাতাল, লিফ্ট, আদালত, এমনকি নিজের ঘরও নিরাপদ আশ্রয় নয়। হঠাৎ জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এসে পড়া কোনো পশুও এতটা অনিরাপদ নয়, যতটা এই পৃথিবীতে মেয়েরা!! 

আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমার পরিচিত প্রত্যেকজন মেয়ে জীবনের কোনো না কোনোসময় যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছেন, ক্ষেত্রবিশেষে  আজও হচ্ছেন। পৃথিবীর সব দেশে, সমাজে, ক্ষমতার সব স্তরে নারীর যন্ত্রণা একই। হ্যাঁ, উন্নত বিশ্বে হয়তো তৃতীয় বিশ্ব থেকে সংখ্যায় কম, কিন্তু আছে। আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিসর, আরব, আমেরিকা, রাশিয়া, ভারত সহ এই উপমহাদেশ, কোথাও জীবনে কখনো যৌন হয়রানির শিকার হননি—এমন নারী খুঁজে পাওয়া ভার। সাড়ে সাত বিলিয়ন মানুষের পৃথিবীতে তিন বিলিয়ন মানুষ যদি যৌন হেনস্তার শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে এটা মানবতার লজ্জা!!

আমাদের সমাজে এখনো যৌন হেনস্তাকে খুব স্বাভাবিক ভাবে দেখা হয়। ছেলেরা ওরম একটু করবেই, মেয়েটা কেন এরম পোষাক পরলো, মেয়ে দেখালে ছেলে দেখবে না, মেয়েমানুষ যেখানে সেখানে গেলে এরকম তো হবেই, ইত্যাদি বলে যৌনহেনস্তাকারীদের আরো সোহাগ দিয়ে মাথার উপর তোলে আমাদের সমাজ, তাদের শাস্তি তো দুরের কথা!! এইভাবে আমাদের সমাজে গড়ে উঠেছে যৌনহয়রানী করার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে ছেলেরা যুবক হয়ে ওঠার অংশ হিসেবে শেখে যৌন হয়রানী। বন্ধুরা বাজি ধরে রাস্তার মেয়েদের উত্যক্ত করে, ফিগার নিয়ে কটুক্তি করে, স্নানরতা মেয়েদের লুকিয়ে বা প্রকাশ্যে দেখে,  শিস দেয়, হিন্দি গানের লাইন গায়, খারাপ কথা বলে। 

অনেকেই হয়তো এখন এই স্লোগান নিয়ে উপস্থিত হবেন, "সব পুরুষ সমান নয়", তাদের বলে রাখি, যৌন হয়রানি যারা করে তারা কোনো আলাদা পৃথিবীর মানুষ নন, তারা আপনাদেরই বন্ধু, ভাই, বাবা, দাদা, কাকা, পিসে, মেসো, দাদু, শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার, সহকর্মী, সহপাঠী। আপনাদেরই স্বজাতি। যৌন হয়রানী অপরাধ। এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক আচরণ নয়। এবং ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার সঙ্গেও এর কোন সম্পর্ক নেই। আপনি নিজে হয়তো হয়রানী করেন না, কিন্তু আপনি যখন চুপ করে থেকে এই সংস্কৃতি কে উস্কে দেন, তখন আপনিও একজন সম্ভাব্য হয়রানীকারক। যৌন হয়রানী করে পুরুষরা, তাই একে বন্ধ করতে হলে পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে, তাদেরকেই সচেতন হতে হবে। 

এখন যারা বলবেন, 'ফেইসবুকে এসব লেখে কি হবে' - তাদের বলি, অনেককিছুই হবে। ফেইসবুকে তো এই সমাজের বাইরের কেউ আসে না !! এই #me_too দেখে যদি পুরুষরা এখন থেকে বদলাতে চায়, বুঝতে শেখে এই পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ ভালো নেই, কষ্টে আছে, যন্ত্রনায় আছে, মানসিক অবসাদে আছে, ভয়-শংকায় সিটিয়ে আছে, সর্বোপরি পুরুষদের ঘৃণা করছে - তাই তাদের বদলাতে হবে, মানুষের পৃথিবীতে জানোয়ার না হয়ে মানুষের মত থাকতে হবে, বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে - এই আহ্বান জানিয়েই এই লেখা। কেমন হয় আজ থেকে যদি পুরুষরা কখনো যৌন হয়রানি করে না?? কেমন হয় যদি নিজের বন্ধু, ভাই, দাদা, ছেলেকে আড়াল না করে যৌনহেনস্তা যে অপরাধ সেটা বোঝালে? আপনারাই চিন্তা করুন বলুন তো!! 


আর মেয়েরা, আর কত লুকিয়ে বাঁচবে?? নিজেদের প্রতি হওয়া অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখ। মুখ ফুটে নিজের প্রতি হওয়া প্রত্যেকটা অন্যায় চিৎকার করে শোনাও সবাইকে। তোমার সেই চিৎকারে প্রত্যেকটা যৌনহেনস্তাকারী পুরুষ যেন লজ্জায় মাটিতে মিশে যায়। তাদেরকে বুঝিয়ে দাও তোমার প্রতি হওয়া যৌনহেনস্তায় তুমি লজ্জিত নও। বরং লজ্জা তাদের পাওয়া উচিৎ যারা তোমার সাথে এরকম করে!! মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদীকে মনে আছে?? সেনানায়কের সামনে যে আকাশচেরা,তীক্ষ্ণ গলায় বলেছিলো, "কাপড় কী হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?"

#Me_too আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুধু মেয়েরা নয়, পুরুষরাও সচেতন হয়ে ওঠুক। সামাজিকভাবে সোচ্চার হোক। যৌন হেনস্তা পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মুছে যাক। সারা পৃথিবীর মানুষ জানুক এ পৃথিবীতে আর যৌন হেনস্তা হয় না!! 


#I_am_not_a_victim
#i_am_a_survivor
#Me_Too














বৃহস্পতিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৭

প্রসঙ্গ 'নারীবাদ'
_____________

বেশীরভাগ পুরুষের, শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারীও  দেখি, নারীবাদের কথা শুনলে রীতিমতো চমকে ওঠেন। নারীবাদ বলতে তারা ভাবেন এবং বোঝেন, বিয়ে করতে না চাওয়া, ঘর সংসারের কাজে ফাঁকি দিতে চাওয়া, হাফপ্যান্ট পরতে চাওয়া, মদ/সিগারেট খেতে চাওয়া, পুরুষদের ঘৃণা করা  ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি নিজে মদ বা সিগারেট কোনোটাই খাই না, হাফপ্যান্ট পরি না, ঘরের কাজ করতেও আমার কোনো অসুবিধে নেই, তবুও আমি আগাগোড়া একজন নারীবাদী। কারন  অক্সফোর্ড ডিকশনারি 'নারীবাদের' ডেফিনেশন দিয়েছে , "The advocacy of women’s rights on the ground of the equality of the sexes."  আরো সহজ করে বললে, নারী-পুরুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার পক্ষে থাকার নাম নারীবাদ। আরোও সহজ করে বললে,  নারীবাদী সে মানুষটিই, যে নারী এবং পুরুষ দুজনকে সম্পূর্ণ মানুষ বলে মনে করে এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা এবং সমানাধিকারে বিশ্বাস করে।

তবু কেন জানি না, নারীবাদ সম্পর্কে বেশীর ভাগ পুরুষ এবং নারীর মধ্যে  ভয়াবহ রকমের ছুৎমার্গ বা ভয় আছে। এ ভয় শুধু এই উপমহাদেশেই নয়, সারা পৃথিবী জুড়েই বেশীরভাগ মানুষের মধ্যে আছে। অনেকে নারীবাদ নিয়ে খুব নিম্নমানের রসিকতাও করেন। কয়েক বছর আগে আমার এক বন্ধু দীপুর সাথে কথা হচ্ছিলো। কথায় কথায় কথা উঠলো নারী-পুরুষের সমতার প্রসঙ্গে। আমার বন্ধুটি বললো, যতই বল মেয়েরা ছেলেদের সমান, তবুও একটা কিন্তু থেকে যায়। এই যেমন ধর আমি আমার শার্টটা খুলে ফেলতে পারবো সবার সামনে, তুই কি পারবি তোর শার্ট খুলে ফেলতে?? বন্ধুটিকে সেদিন বলেছিলাম, পোষাকের সাথে সমঅধিকারের কি সম্পর্ক বোঝা তো আমায়!!  আরো একটা প্রশ্ন, তোর শার্ট খোলাকে আমি যতটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারবো, তুই কি আমার শার্ট খোলাকে ততটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারবি?? পারবি না। কারন তোর দৃষ্টিভঙ্গী, মানসিকতা তোকে মেয়েদের শরীরকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শেখায় নি। শুধু তোকে নয়, এই সমাজের নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের কাছে মেয়েদের শরীর একটা ট্যাবু। কিন্তু ছেলেদের খোলা বুক খুব বীরত্ব। তাই তো সলমান খানের খোলা বুক বাহবা যোগ্য, কিন্তু কোনো নায়িকার ক্লিভেজ যৌনতার বস্তু। যেদিন তোমরা পুরুষেরা মেয়েদের শরীরকে স্বাভাবিক ভাবে দেখতে শিখবে, সেদিন কথা দিলাম আমিও তোরই মতো শার্ট খুলে রাস্তায় হাটতে রাজি। বন্ধুটি আর কথা বাড়ায়নি। 

এই কদিন আগে ফেসবুকে আমারই এক পোষ্টে আরেকজন পুরুষ বীর বলেছিলেন, " আপনি বলছেন নারী পুরুষ সমান, তাহলে পুরুষরা রাস্তায় দাড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে, মেয়েরা পারে না কেন?" প্রশ্নটা খুবই নিম্ন মানের এবং অদ্ভুত  লেগেছিলো। শারীরিক গঠন অনুযায়ী পুরুষরা দাড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে, মেয়েরা পারে না। এই সাধারন শরীরবিজ্ঞানের মধ্যে নারী-পুরুষ সমান নয় কথাটা কিভাবে প্রযোজ্য আমি বুঝতে পারিনি। শুধু এই দুই ঘটনাই নয়। নারী-পুরুষের সমতার কথা বললে বেশীরভাগ পুরুষ এবং নারীরাও এধরনের অদ্ভুত যুক্তি তুলে ধরেন! 

পুরুষদের কথা নাহয় বাদ ই দিলাম। কিন্তু সেইসব নারী, যারা মনে করো  নারীবাদ মানে সংসার না করা, লিভ টুগেদার করতে চাওয়া, সিগারেট খাওয়া, হাফপ্যান্ট অথবা নগ্ন হয়ে হাঁটার ফন্দি , তোমাদের এখনো অনেক কিছু জানার বাকী। তোমাদের জানার বাকী-  আজকে থেকে এই একশ বছর আগেও নারীর  কোনো ভোটাধিকার ছিলো না। রাষ্ট্রের নাগরিক রূপে গণ্য হত না নারী। ঘরের বাইরে বেরোনোর কোনো অধিকার ছিলো না। লেখাপড়া শেখার অধিকার ছিলো না। একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে যে যে অধিকারগুলো প্রয়োজন তার কোনো কিছুই ছিলো না। আজকে যে তুমি আমি বাইরে বেরোতে পারছি, ছেলেদের সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে লেখাপড়া, চাকরী-নোকরী করতে পারছি, শপিং, সিনেমা, ফেসবুক করতে পারছি,  সেটা একদিনে অর্জন হয়নি। যুগ যুগ ধরে এই পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে নারীবাদীরা তোমাকে আমাকে আজকের এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। 

যে পুরুষদের তালে তাল মিলিয়ে তুমি নারীবাদ নিয়ে কৌতুক করছো বা আতংকিত হচ্ছো, সেই পুরুষদের দ্বারা এখনো তুমি ঘরে ঘরে পারিবারিক হিংসার শিকার। রাস্তায় ইভ টিজিং, এসিড এট্যাক, ধর্ষন, বৈবাহিক ধর্ষনের  শিকার। এই পুরুষের কাছে এখনো তোমার সতীত্বের মাপকাঠি  তোমার যোনী। পুরুষ রচিত ধর্মগ্রন্থগুলো তোমায় পাপ বলে আখ্যা দেয়। প্রতিমাসে তোমার পিরিয়ডের মতো একটি সাধারন শরীরবৃত্তীয় ঘটনাকেও  অপবিত্র বলে আখ্যা দেয়। 

তাই মেয়ে, নারীবাদ মাথায় চেপে বসা কোনো ভূতুড়ে খামখেয়াল নয়, নারীবাদ মানে পুরুষবিদ্ধেষী হয়ে ওঠাও নয়। নারীবাদ একটা নিরন্তর লড়াই, যে লড়াই নারী স্বাধীনতা-প্রত্যাশী। চোখের ছানির মতো পুরুষতান্ত্রিকতাও একপ্রকার সামাজিক ছানি এবং নারীবাদ তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক ওষুধ। সময় থাকতে এই বোধটুকু মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নাও এবং তারপর নারীবাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে তাকে নাহয় ছুড়ে ফেলে দিয়ো। কিন্তু আগামী আরো কয়েক যুগ অব্দি তোমার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে নারীবাদীদের তোমার প্রয়োজন আছে। 

প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস -  কেমন আছে আজকের  কন্যাশিশুরা?
_______________________________________________________


আজ আন্তর্জাতিক #কন্যা_শিশু দিবস। সারা পৃথিবীজুড়ে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, মেয়েদের বিরুদ্ধে হিংসা ও বলপূর্বক বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে এ দিবসের সূচনা করা হয়।

আমাদের দেশে দিবসটি এমন একসময় উদযাপিত হচ্ছে যখন যখন কন্যা ভ্রুণ হত্যা, কন্যাশিশুদের যৌন নিপীড়ন, ধর্ষন, কন্যা শিশুদের প্রতি বৈষম্য, দেশের আনাচে কানাচে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। সমীক্ষা ও ন্যাশনাল ক্রাইম রের্কড ব্যুরো'র রিপোর্ট বলছে- শিশু যৌন নির্যাতন,বাল্যবিবাহের এর হারে আমাদের দেশ পৃথিবীর মধ্যে চতুর্থ। কন্যা ভ্রুণ হত্যায় সম্ভবত ভারত পৃথিবীর মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে।

শুধু ভ্রুণ হত্যাই নয়, বর্তমানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী ভাবাচ্ছে, এবং  মারাত্বক হারে বাড়ছে, তা হলো কন্যাশিশুদের উপর যৌন নির্যাতন, কন্যাশিশুদের ধর্ষন!!  চার বছর/পাঁচ বছর/ সাত বছর/বারো বছর/ এমনকি দুবছরের কন্যা শিশুটি অব্দি আপন বাবা, কাকা, মামা দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার, ধর্ষনের শিকার!! মাকে বললে মা উল্টো বলছে চেপে যেতে। এসব কথা কাউকে না বলতে। বড় হয়েও কন্যাটি এই ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। মানসিকভাবে অসুস্থ, চুপচাপ হয়ে পড়ে। বিয়ের পর স্বামীর সাথে যৌনমিলনেও স্বাভাবিক হতে পারে না। স্বামী সহ সবাই ভাবে মেয়েটি হয়তো মুডি অথবা খেয়ালী অথবা ক্ষেপাটে। কারোর সাথে কথা বলে না ইচ্ছে করে। কিন্তু মেয়েটি মনে মনে জানে সেই ছোটোবেলা থেকে কৈশোর অব্দি নীরবে ঘটে যাওয়া জীবনের পাশবিক ঘটনাগুলি!! 

শুনুন কন্যাশিশুর বাবারা / ভাইরা /কাকারা / মামারা, কন্যাশিশুটি বড় হয়ে যখন বুঝতে শেখে, ভাবতে শেখে, তার বাবা, ভাই, কাকা, মামা ও  অন্যসব যৌনহেনস্থাকারী, ধর্ষক, নির্যাতক, কামুক পুরুষের মতোই একজন পুরুষ, সেদিন তার পৃথিবী উলোটপালট হয়ে যায়। সারাজীবন সে আর কোনো পুরুষকে বিশ্বাস করতে পারে না, ভালোবাসতে পারে না। পুরুষদের দেখলে আতংকিত হয়, মনে মনে ঘেন্না করে! 

সন্তান নিজের শরীরে ধারন করার ক্ষমতা বাবাদের থাকে না, সেটা মায়েদের থাকে। কিন্তু নিজের সন্তান লালন-পালন, তার নিরাপত্তা, তার পর্যাপ্ত বিকাশ নিশ্চিত করা শুধু মায়ের একার দায়িত্ব নয়। দায়িত্বটা বাবার ও। তাই নিজের কন্যাশিশুটিকে ভবিষৎ এ সুখী, প্রানবন্ত, সুস্থ, স্বাভাবিক  দেখতে চাইলে, শিশুটির মা'র সাথে সাথে আপনাকেও এগিয়ে আসতে হবে। কন্যাশিশুটির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করতে হবে, বলতে হবে, প্রতিরোধ তৈরী করতে হবে।

আর কন্যাশিশুর মা'রা, এখন থেকে নিজের কন্যাসন্তানটি যদি পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যের ছোঁয়ায় বা কোলে উঠতে অসম্মতি প্রকাশ করে, অনীহা প্রকাশ করে, ভয় পায়, কাঁদে, দয়া করে সতর্ক হন। কন্যাশিশুটি যদি আপনাকে বলে তার ভয়, অস্বস্তির কথা, দয়া করে চুপ থাকতে বলবেন না। বরং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।  নিজের শিশুটিকে যে কোনো পুরুষ আত্মীয়ের কোলে উঠতে, আদর করতে, খেলা করতে দেওয়ার আগে নিজে যাচাই করবেন। একা রেখে চলে যাবেন না। যতোদিন আপনার কন্যাটি অপ্রাপ্তবয়স্ক, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে মা-বাবা দুজনকে মিলেই।

আজ আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসে, শুধু মা'রাই নয়, পৃথিবীর সব বাবারাও এগিয়ে আসুন...আওয়াজ তুলুন, প্রতিরোধ করুন! আপনার কন্যা শিশুটিকে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক, স্বপ্নময় পৃথিবী উপহার দিন!! আজ থেকে যেন কোনো কন্যাশিশুকে যৌনহেনস্থার শিকার না হতে হয়, এটাই হোক অঙ্গীকার।