এই ব্লগটি সন্ধান করুন

শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭


১৩ই অক্টোবর, আন্তর্জাতিক #No_Bra_Day ( নো ব্রা দিবস)..
____________________________________________________

শিরোনাম দেখে অনেকেই হয়তো নাক কুঁচকে এড়িয়ে যাবেন। বিরক্ত হয়ে হয়তো বলবেন, এই আবার এসেছে পুরুষদের গালিগালাজ করে চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে!!  আপনাদের আশ্বস্ত করে বলছি এইসব কোনো কিছুই আজকের এই লেখার উদ্দেশ্য নয়!! 

শিরোনাম দেখে গাল দেওয়ার পাশাপাশি অনেকের মনেই হয়তো প্রশ্ন জাগছে, #No_Bra_Day জিনিস টা কি? নো ব্রা ডে মানে কি ব্রা খুলে বুক উন্মুক্ত করে রাস্তায় বেরোনো?? অথবা #নো_ব্রা_ডে কি ব্রা না পরে কাটাতে হবে?? আজ্ঞে না। উপরের কোনোটাই নয়। নো ব্রা ডে'তে ব্রা খুলে প্যারেড করার মতো কোনো ব্যাপার নেই। দয়া করে উল্টো বুঝবেন না।  

অনেকেই #ব্রেস্ট_ক্যান্সার  শব্দটা শুনেছেন। অনেকের মা/দিদি/পরিবারের মহিলা আত্মীয় এই রোগে হয়তো ভুগেছেন। এই ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কিন্তু দিনকে দিন বাড়ছেই। সাধারণত ৫০-৭০ বছর বয়সী মহিলাদের  ব্রেস্ট ক্যান্সার হবার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশী থাকে। অক্টোবর মাস হলো এই #ব্রেস্ট_ক্যান্সার সচেতনার মাস। ১৩ই অক্টোবর হলো #নো_ব্রা_ডে।  উদ্দেশ্য হলো, অন্তত এই একটা দিন  মেয়েরা যাতে নিজেদের ব্রা খুলে স্তন দুটো পরীক্ষা করে। 

প্রত্যেকটা মেয়ে কিশোরীবেলা থেকে যখন স্তনের আকার একটু একটু করে বাড়তে থাকে, তখন সেই বৃদ্ধি হওয়া স্তনকে সুডোল, আটসাট করে তুলতে  ব্রা পরতে শুরু করে। অথচ এই ব্রা থেকেই যে নানাবিধ রোগ হতে পারে সে সম্পর্কে বেশীরভাগ মেয়ের কোনো ধারনাই নেই, সচেতনা ও নেই। শহর এবং গ্রামের প্রায় 95% মেয়ে  জানে না ব্রা'র কি কি ক্ষতিকারক দিক আছে!! 
অথচ প্রত্যেকটা মেয়ের উচিৎ ব্রা’র সঠিক ব্যাবহার জানা। এর ক্ষতিকারক দিক জানা এবং এর ব্যাপারে সতর্ক হওয়া! সারাদিন ব্রা পড়ে থাকা কিংবা রাতের বেলা ব্রা পড়ে থাকা যে অত্যন্ত ক্ষতিকারক, সেটা জানা। আবার অনেকেই এসব অন্তর্বাস প্রতিদিন ধোয় না ! এটা থেকেও যে অনেক রোগ হয়, সেটা জানা! 

অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ই মনে করেন ব্রা ব্যবহারের ফলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়ে। ব্রা ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটা কমবে। এই উদ্দেশ্যেই প্রতিবছর #নো_ব্রা_দিবস    পালন করা হয়। 

এবার অনেক আবালশ্রেণীর মানবতাবাদী সাজা পুরুষ হয়তো এখানে এসে যুক্তি দেবেন , 'এখন যদি পুরুষরা "নো জাঙ্গিয়া দিবস" পালন করে তাহলে কেমন হবে? উত্তর হলো, আন্দোলন/ সচেতনা বৃদ্ধির অভিযান তারাই করে যারা ভিক্টিম হয় । আপনাদের যদি কখনো পেনিসে ক্যান্সার/অথবা অন্য কোনো রোগ হয়, তখন নাহয় নো জাঙ্গিয়া দিবস পালন করবেন!! 

এই ফাঁকে একটা গল্প বলি। কয়েক বছর আগে সুইডেনের নারীরা  মাতৃত্বকালীন বেতন-ভাতা’র দাবী করেছিলো রাষ্ট্রের কাছে। তারা বলেছিলো গর্ভকালীন সময়ে যদি তাদেরকে বেতন-ভাতা না দেয়া হয়, তাহলে তারা আর “মা” হবে না। তারা মুক্তকন্ঠে বলেছিলো, ‘আমরা সন্তান জন্মদান করি শুধুমাত্র আমাদের প্রয়োজনে নয়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনেও সন্তান জন্মদান করি। সুতরাং মাতৃত্বকালীন সময়ে আমাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নিতে হবে।“ রাষ্ট্র  কিন্তু তাদের দাবি মেনে নিয়েছিল। 

এইভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে আন্দোলন, সচেতনা বৃদ্ধির অভিযানগুলোই একদিন আমাদের দেশকে ব্রেস্ট ক্যান্সার মুক্ত করবে। ক্যান্সার প্রতিরোধের লড়াইয়ে জেতার সবচেয়ে ভালো উপায় কি জানেন??  ক্যান্সারের কারণগুলো সম্পর্কে জানা। আর শুধু নিজে জানলেই কিন্তু চলবে না। নিজের জানাগুলো আশেপাশের মানুষদেরও  জানাতে হবে। তাই, নারী-পুরুষ যেই হোন না কেন, চেনাপরিচিত সবার সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলুন। আলোচনা করুন।

অবশ্য যে দেশে এখনো পিরিয়ডকালীন সচেতনাই বৃদ্ধি পায়নি!  পিরিয়ড হওয়াকে এখনো অপবিত্র, পাপ মানা হয় ! যে দেশে স্তন এখনো পুরুষের ফ্যান্টাসির বিষয়, যে দেশে পুরুষের ফ্যান্টাসী পুরনের জন্য নারীকে এখনো সুডোল, সুন্দর, সঠিক সাইজের স্তনের জন্য ব্রা ব্যবহার করতে হয়, সে দেশে স্তন ক্যান্সার, স্তনের নানারকম রোগ নিয়ে ভাবার সুযোগ আছে কি নারী বা পুরুষের?? 







#Me_Too (হ্যাঁ,  আমিও) ...!! 
_________________________

সোস্যাল মিডিয়ার শুরু হওয়া একটি ক্যাম্পেইন #me_too। টুইটার ও ফেসবুকের দেওয়ালে এত সংখ্যক ‘মি টু’-র হ্যাশট্যাগ হয়েছে যা দেখে বোঝা যাচ্ছে যৌন হয়রানি কতোটা ব্যাপক, কতটা বিশাল তার পরিধি, রোজ কত সংখ্যক নারী যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন!! 

আলোড়ন শুরু করেছিলেন  হলিউডের এক অভিনেত্রী। হ্যাঁ আলোড়নই। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে আওয়াজ উঠলো, আমিও, হ্যাঁ আমিও!  #me_too - এই ছোট একটা হ্যাশট্যাগ লক্ষ-কোটি মেয়ের মুখে ভাষা জুগিয়ে দিলো। বুক ফাটছিলো, কিন্তু কিভাবে বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। মাত্র একটা ফুলকি বিস্ফোরণে পরিণত হলো। সমাজ, লোকলজ্জার ভয়ে যে দরজা এতদিন বন্ধ ছিলো, আজ যখন খুললো, তখন বেরিয়ে আসুক সব বিষ, সাফ হয়ে যাক সব জঞ্জাল। 

ঘটনা এক : 

বয়স তখন পাঁচ। প্রথম শ্রেণীতে পড়ি। ছোটো থেকে আমি প্যান্ট আর গেঞ্জিতেই অভ্যস্ত ছিলাম। স্কুলেও যেতাম প্যান্ট আর শার্ট বা গেঞ্জি পরে। আমাদের স্কুল ছিলো ছেলে মেয়ে কোম্বাইন।ক্লাস ফাইভের দাদারা একদিন প্ল্যান করলো আমি ছেলে না মেয়ে সেটা দেখবে! তো দেখার উপায় কি?? আমার প্যান্ট খুলে দেখবে আমি ছেলে না মেয়ে!! টিফিনের সময় চার/পাঁচজন দাদা আমায় মাঠের এককোনে প্যান্ট খোলার জন্য চেপে ধরে। আমি তখন রাগে একজনের হাত কামড়ে দিয়েছি,  ঠিক তখনই ছেলেগুলোর চিৎকার শুনে স্কুলের দারোয়ান দেখতে পায়, এবং আমাকে হেড স্যারের ঘরে নিয়ে আসে। আমি ভয় আর রাগে কাঁপছিলাম। তখন জানতাম না এটা যৌনহেনস্তা কি না!! পাঁচ বছর বয়েসে বোঝা সম্ভব ও ছিলো না কি না!! শুধু বুঝতে পারছিলাম, যেটা ঘটতে যাচ্ছিলো সেটা খারাপ কিছু, যা হওয়া উচিত নয়। ঘরে এসে বাপীকে বললাম সব। বাপী পরদিন স্কুলে এসে খুব রাগারাগী করলেন, ঐ ছেলেগুলোর বাবাদের আনানো হলো স্কুলে। তারপর কি হলো জানি না, ঐ ছেলেগুলো দুর থেকে কমেন্ট পাস করতো, কিন্তু সামনাসামনি আর কিছু করেনি। তার কিছুদিন পর মা'র ট্র্যান্সফার হয়ে যায়, আর আমরা অন্য শহরে চলে আসি। 

ঘটনা দুই : 

ক্লাস সিক্স। স্কুলের ছুটিতে বাসে করে গ্রামের বাড়ী যাচ্ছি। মা আর ছোটোবোন মুন একটা সিটে বসে, আর আমি সিট না পেয়ে মা'র সিটের পাশেই দাড়িয়ে আছি। হঠাৎ খেয়াল করি আমার পিঠে কে হাত বুলোচ্ছে। বুঝতে পারছি এই ছোঁয়াটা স্বাভাবিক নয়।  পেছন ফিরে দেখি বাপীর বয়সী একটা লোক, একহাত আমার পিঠে, একহাত তার প্যান্টের সামনে। আমি সামনের দিকে সরে আসলাম। লোকটা কিছুসময় পর সামনের দিকে সরে আসলো। এবার চেষ্টা করলো আমার বুকে হাত দিতে। আমি যত সরি, লোকটাও তত সরে। সামনের দিকে আরো মানুষ দাড়িয়ে, বেশী সরতে ও পারছি না। কোনোরকম সিঁটিয়ে দাড়িয়ে রইলাম। মাকেও বলতে পারছি না, সঙ্কোচবোধ থেকে। বললেও মা কি করতে পারতেন জানি না। হয়তো মাও লোকলজ্জার ভয়ে লোকটাকে কিছুই বলতেন না!!  যতক্ষণ দাড়িয়েছিলাম আমার একটাই কাজ ছিলো লোকটার হাত ঠেলে সরানো!! কিছুসময় পর মা'র পাশের সিটের মহিলা নেমে যাওয়ায় ঐ সিটে বসি। 

ঘটনা তিন: 

ক্লাস সেভেন। অঙ্ক ক্লাস। অঙ্ক দেখার বাহানায় স্যারের পিঠে হাত বুলানো। কিছু বলতে পারতাম না। সিঁটিয়ে থাকতাম। অঙ্ক ক্লাস ভয় পেতাম। 

ঘটনা চার : 

ক্লাস এইট না নাইন। শীতকাল। আমি কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছি। পিসতুতো এক দাদা এসেছে ঘরে। কিছুসময় পর ঐ দাদাটাও আমার কম্বলের নিচে পা ঢুকিয়ে বসলো। একটু সময় পরে দেখি আমার ঘাড়ে আর পিঠে মৃদু চাপ। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠি। অন্য ঘরে চলে যাই। 
ঘটনা পাঁচ : 

আমরা তখন ভাড়া থাকতাম একটা ঘরে। স্নানঘর ছিলো একটু দুরে। স্নানঘরের দেওয়াল বেয়ে একটা নারকেল গাছ ছিল। গাছ আর দেওয়ালের মাঝবরাবর একটা জায়গা এক ইট ফাঁক ছিলো। একদিন স্নান করার সময় দেখি ঐ ফাঁকা জায়গা দিয়ে ঘর মালিকের ছেলে তাকিয়ে আছে। যখন দেখলো আমি তাকে দেখতে পেয়ে গেছি, তখন চলে গেল। তারপর থেকে আমাকে নানাভাবে উত্যক্ত করার চেষ্টা করতো। কিন্তু ততদিনে ভয় পাওয়া ভীরু মেয়ে থেকে আমি রাগী, সাহসী, মারকুটে বদনাম কুড়িয়েছি। তাই ঐ  ছেলেটার সাহসও আর বাড়েনি।  

ঘটনা ছয়:

একাদশ শ্রেনী। এন সি সি করতাম। মেয়েদের প্যারেড আলাদা হত, ছেলেদের আলাদা। প্যারেড করার সময়  দেখতাম কিছুছেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে অশ্লীল ভাবে কমেন্ট পাস করছে। 

ঘটনা সাত : 
ফেইসবুক। প্রায় রোজদিন কোনো না কোনোভাবে যৌনহেনস্তা চলছে। অশ্লীল মেসেজ, ভিডিও, ছবি। কত ব্লক করবো বলতে পারেন?? 

ঘটনা আরো অনেক আছে, ভীড় রাস্তা , বাস, অটো এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে পুরুষের নোংরা হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে হয় নি!! আমার কিংবা আমাদের একটাই অপরাধ, আমরা মেয়ে। মেয়েদের ভোগ করা যায়  যখন তখন, যেখানে সেখানে তার গায়ে হাত দেওয়া যায়, কমেন্ট পাস করা যায়, হায়েনার মত ধর্ষণ করা যায়, ধর্ষণের পর তার রক্তাক্ত দেহ নর্দমায় ছুড়ে ফেলা যায়, তা খুশী তা করা যায় তার সাথে। পাঁচ বছর বয়স হোক বা পঞ্চাশ বছর - মেয়ে মানেই পুরুষদের কাছে যৌন চাহিদা মেটানোর মেশিন। যৌনতার জন্য একজন পুরুষের একটি যোনী হলেই চলে, জরায়ু হলেই চলে। তার বয়স দেখা লাগে না, সম্পর্ক দেখা লাগে না, ইচ্ছে-অনিচ্ছে দেখা লাগে না, প্রেম দেখা লাগে না, সময় দেখা লাগে না, সমাজ, বিবেক কিছুই লাগে না!! 

যৌনহেনস্তাকারী পুরুষের একমাত্র গন্তব্য মেয়েদের অন্তর্বাস আবৃত স্থানসমূহে। নারী হিজাব পরুক, বোরখা পরুক বা আলখাল্লা, পুরুষের  অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ঠিকই খুঁজে নিবে মেয়েদের গোপনীয় সব অঙ্গ। মেয়েদের হেনস্তা হতে হবে হিজাবের দেশে, মেয়েদের হেনস্তা হতে হবে হিজাব না থাকা দেশে, সর্বত্র। এই পৃথিবীতে কোথাও মেয়েদের কোন নিরাপদ স্থান নেই।স্কুল, কলেজ, অফিস, হাসপাতাল, লিফ্ট, আদালত, এমনকি নিজের ঘরও নিরাপদ আশ্রয় নয়। হঠাৎ জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এসে পড়া কোনো পশুও এতটা অনিরাপদ নয়, যতটা এই পৃথিবীতে মেয়েরা!! 

আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমার পরিচিত প্রত্যেকজন মেয়ে জীবনের কোনো না কোনোসময় যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছেন, ক্ষেত্রবিশেষে  আজও হচ্ছেন। পৃথিবীর সব দেশে, সমাজে, ক্ষমতার সব স্তরে নারীর যন্ত্রণা একই। হ্যাঁ, উন্নত বিশ্বে হয়তো তৃতীয় বিশ্ব থেকে সংখ্যায় কম, কিন্তু আছে। আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিসর, আরব, আমেরিকা, রাশিয়া, ভারত সহ এই উপমহাদেশ, কোথাও জীবনে কখনো যৌন হয়রানির শিকার হননি—এমন নারী খুঁজে পাওয়া ভার। সাড়ে সাত বিলিয়ন মানুষের পৃথিবীতে তিন বিলিয়ন মানুষ যদি যৌন হেনস্তার শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে এটা মানবতার লজ্জা!!

আমাদের সমাজে এখনো যৌন হেনস্তাকে খুব স্বাভাবিক ভাবে দেখা হয়। ছেলেরা ওরম একটু করবেই, মেয়েটা কেন এরম পোষাক পরলো, মেয়ে দেখালে ছেলে দেখবে না, মেয়েমানুষ যেখানে সেখানে গেলে এরকম তো হবেই, ইত্যাদি বলে যৌনহেনস্তাকারীদের আরো সোহাগ দিয়ে মাথার উপর তোলে আমাদের সমাজ, তাদের শাস্তি তো দুরের কথা!! এইভাবে আমাদের সমাজে গড়ে উঠেছে যৌনহয়রানী করার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে ছেলেরা যুবক হয়ে ওঠার অংশ হিসেবে শেখে যৌন হয়রানী। বন্ধুরা বাজি ধরে রাস্তার মেয়েদের উত্যক্ত করে, ফিগার নিয়ে কটুক্তি করে, স্নানরতা মেয়েদের লুকিয়ে বা প্রকাশ্যে দেখে,  শিস দেয়, হিন্দি গানের লাইন গায়, খারাপ কথা বলে। 

অনেকেই হয়তো এখন এই স্লোগান নিয়ে উপস্থিত হবেন, "সব পুরুষ সমান নয়", তাদের বলে রাখি, যৌন হয়রানি যারা করে তারা কোনো আলাদা পৃথিবীর মানুষ নন, তারা আপনাদেরই বন্ধু, ভাই, বাবা, দাদা, কাকা, পিসে, মেসো, দাদু, শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার, সহকর্মী, সহপাঠী। আপনাদেরই স্বজাতি। যৌন হয়রানী অপরাধ। এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক আচরণ নয়। এবং ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার সঙ্গেও এর কোন সম্পর্ক নেই। আপনি নিজে হয়তো হয়রানী করেন না, কিন্তু আপনি যখন চুপ করে থেকে এই সংস্কৃতি কে উস্কে দেন, তখন আপনিও একজন সম্ভাব্য হয়রানীকারক। যৌন হয়রানী করে পুরুষরা, তাই একে বন্ধ করতে হলে পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে, তাদেরকেই সচেতন হতে হবে। 

এখন যারা বলবেন, 'ফেইসবুকে এসব লেখে কি হবে' - তাদের বলি, অনেককিছুই হবে। ফেইসবুকে তো এই সমাজের বাইরের কেউ আসে না !! এই #me_too দেখে যদি পুরুষরা এখন থেকে বদলাতে চায়, বুঝতে শেখে এই পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ ভালো নেই, কষ্টে আছে, যন্ত্রনায় আছে, মানসিক অবসাদে আছে, ভয়-শংকায় সিটিয়ে আছে, সর্বোপরি পুরুষদের ঘৃণা করছে - তাই তাদের বদলাতে হবে, মানুষের পৃথিবীতে জানোয়ার না হয়ে মানুষের মত থাকতে হবে, বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে - এই আহ্বান জানিয়েই এই লেখা। কেমন হয় আজ থেকে যদি পুরুষরা কখনো যৌন হয়রানি করে না?? কেমন হয় যদি নিজের বন্ধু, ভাই, দাদা, ছেলেকে আড়াল না করে যৌনহেনস্তা যে অপরাধ সেটা বোঝালে? আপনারাই চিন্তা করুন বলুন তো!! 


আর মেয়েরা, আর কত লুকিয়ে বাঁচবে?? নিজেদের প্রতি হওয়া অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখ। মুখ ফুটে নিজের প্রতি হওয়া প্রত্যেকটা অন্যায় চিৎকার করে শোনাও সবাইকে। তোমার সেই চিৎকারে প্রত্যেকটা যৌনহেনস্তাকারী পুরুষ যেন লজ্জায় মাটিতে মিশে যায়। তাদেরকে বুঝিয়ে দাও তোমার প্রতি হওয়া যৌনহেনস্তায় তুমি লজ্জিত নও। বরং লজ্জা তাদের পাওয়া উচিৎ যারা তোমার সাথে এরকম করে!! মহাশ্বেতা দেবীর দ্রৌপদীকে মনে আছে?? সেনানায়কের সামনে যে আকাশচেরা,তীক্ষ্ণ গলায় বলেছিলো, "কাপড় কী হবে, কাপড়? লেংটা করতে পারিস, কাপড় পরাবি কেমন করে? মরদ তু?"

#Me_too আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুধু মেয়েরা নয়, পুরুষরাও সচেতন হয়ে ওঠুক। সামাজিকভাবে সোচ্চার হোক। যৌন হেনস্তা পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মুছে যাক। সারা পৃথিবীর মানুষ জানুক এ পৃথিবীতে আর যৌন হেনস্তা হয় না!! 


#I_am_not_a_victim
#i_am_a_survivor
#Me_Too














বৃহস্পতিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৭

প্রসঙ্গ 'নারীবাদ'
_____________

বেশীরভাগ পুরুষের, শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারীও  দেখি, নারীবাদের কথা শুনলে রীতিমতো চমকে ওঠেন। নারীবাদ বলতে তারা ভাবেন এবং বোঝেন, বিয়ে করতে না চাওয়া, ঘর সংসারের কাজে ফাঁকি দিতে চাওয়া, হাফপ্যান্ট পরতে চাওয়া, মদ/সিগারেট খেতে চাওয়া, পুরুষদের ঘৃণা করা  ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি নিজে মদ বা সিগারেট কোনোটাই খাই না, হাফপ্যান্ট পরি না, ঘরের কাজ করতেও আমার কোনো অসুবিধে নেই, তবুও আমি আগাগোড়া একজন নারীবাদী। কারন  অক্সফোর্ড ডিকশনারি 'নারীবাদের' ডেফিনেশন দিয়েছে , "The advocacy of women’s rights on the ground of the equality of the sexes."  আরো সহজ করে বললে, নারী-পুরুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার পক্ষে থাকার নাম নারীবাদ। আরোও সহজ করে বললে,  নারীবাদী সে মানুষটিই, যে নারী এবং পুরুষ দুজনকে সম্পূর্ণ মানুষ বলে মনে করে এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা এবং সমানাধিকারে বিশ্বাস করে।

তবু কেন জানি না, নারীবাদ সম্পর্কে বেশীর ভাগ পুরুষ এবং নারীর মধ্যে  ভয়াবহ রকমের ছুৎমার্গ বা ভয় আছে। এ ভয় শুধু এই উপমহাদেশেই নয়, সারা পৃথিবী জুড়েই বেশীরভাগ মানুষের মধ্যে আছে। অনেকে নারীবাদ নিয়ে খুব নিম্নমানের রসিকতাও করেন। কয়েক বছর আগে আমার এক বন্ধু দীপুর সাথে কথা হচ্ছিলো। কথায় কথায় কথা উঠলো নারী-পুরুষের সমতার প্রসঙ্গে। আমার বন্ধুটি বললো, যতই বল মেয়েরা ছেলেদের সমান, তবুও একটা কিন্তু থেকে যায়। এই যেমন ধর আমি আমার শার্টটা খুলে ফেলতে পারবো সবার সামনে, তুই কি পারবি তোর শার্ট খুলে ফেলতে?? বন্ধুটিকে সেদিন বলেছিলাম, পোষাকের সাথে সমঅধিকারের কি সম্পর্ক বোঝা তো আমায়!!  আরো একটা প্রশ্ন, তোর শার্ট খোলাকে আমি যতটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারবো, তুই কি আমার শার্ট খোলাকে ততটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারবি?? পারবি না। কারন তোর দৃষ্টিভঙ্গী, মানসিকতা তোকে মেয়েদের শরীরকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শেখায় নি। শুধু তোকে নয়, এই সমাজের নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের কাছে মেয়েদের শরীর একটা ট্যাবু। কিন্তু ছেলেদের খোলা বুক খুব বীরত্ব। তাই তো সলমান খানের খোলা বুক বাহবা যোগ্য, কিন্তু কোনো নায়িকার ক্লিভেজ যৌনতার বস্তু। যেদিন তোমরা পুরুষেরা মেয়েদের শরীরকে স্বাভাবিক ভাবে দেখতে শিখবে, সেদিন কথা দিলাম আমিও তোরই মতো শার্ট খুলে রাস্তায় হাটতে রাজি। বন্ধুটি আর কথা বাড়ায়নি। 

এই কদিন আগে ফেসবুকে আমারই এক পোষ্টে আরেকজন পুরুষ বীর বলেছিলেন, " আপনি বলছেন নারী পুরুষ সমান, তাহলে পুরুষরা রাস্তায় দাড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে, মেয়েরা পারে না কেন?" প্রশ্নটা খুবই নিম্ন মানের এবং অদ্ভুত  লেগেছিলো। শারীরিক গঠন অনুযায়ী পুরুষরা দাড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে, মেয়েরা পারে না। এই সাধারন শরীরবিজ্ঞানের মধ্যে নারী-পুরুষ সমান নয় কথাটা কিভাবে প্রযোজ্য আমি বুঝতে পারিনি। শুধু এই দুই ঘটনাই নয়। নারী-পুরুষের সমতার কথা বললে বেশীরভাগ পুরুষ এবং নারীরাও এধরনের অদ্ভুত যুক্তি তুলে ধরেন! 

পুরুষদের কথা নাহয় বাদ ই দিলাম। কিন্তু সেইসব নারী, যারা মনে করো  নারীবাদ মানে সংসার না করা, লিভ টুগেদার করতে চাওয়া, সিগারেট খাওয়া, হাফপ্যান্ট অথবা নগ্ন হয়ে হাঁটার ফন্দি , তোমাদের এখনো অনেক কিছু জানার বাকী। তোমাদের জানার বাকী-  আজকে থেকে এই একশ বছর আগেও নারীর  কোনো ভোটাধিকার ছিলো না। রাষ্ট্রের নাগরিক রূপে গণ্য হত না নারী। ঘরের বাইরে বেরোনোর কোনো অধিকার ছিলো না। লেখাপড়া শেখার অধিকার ছিলো না। একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে যে যে অধিকারগুলো প্রয়োজন তার কোনো কিছুই ছিলো না। আজকে যে তুমি আমি বাইরে বেরোতে পারছি, ছেলেদের সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে লেখাপড়া, চাকরী-নোকরী করতে পারছি, শপিং, সিনেমা, ফেসবুক করতে পারছি,  সেটা একদিনে অর্জন হয়নি। যুগ যুগ ধরে এই পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে নারীবাদীরা তোমাকে আমাকে আজকের এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। 

যে পুরুষদের তালে তাল মিলিয়ে তুমি নারীবাদ নিয়ে কৌতুক করছো বা আতংকিত হচ্ছো, সেই পুরুষদের দ্বারা এখনো তুমি ঘরে ঘরে পারিবারিক হিংসার শিকার। রাস্তায় ইভ টিজিং, এসিড এট্যাক, ধর্ষন, বৈবাহিক ধর্ষনের  শিকার। এই পুরুষের কাছে এখনো তোমার সতীত্বের মাপকাঠি  তোমার যোনী। পুরুষ রচিত ধর্মগ্রন্থগুলো তোমায় পাপ বলে আখ্যা দেয়। প্রতিমাসে তোমার পিরিয়ডের মতো একটি সাধারন শরীরবৃত্তীয় ঘটনাকেও  অপবিত্র বলে আখ্যা দেয়। 

তাই মেয়ে, নারীবাদ মাথায় চেপে বসা কোনো ভূতুড়ে খামখেয়াল নয়, নারীবাদ মানে পুরুষবিদ্ধেষী হয়ে ওঠাও নয়। নারীবাদ একটা নিরন্তর লড়াই, যে লড়াই নারী স্বাধীনতা-প্রত্যাশী। চোখের ছানির মতো পুরুষতান্ত্রিকতাও একপ্রকার সামাজিক ছানি এবং নারীবাদ তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক ওষুধ। সময় থাকতে এই বোধটুকু মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নাও এবং তারপর নারীবাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে তাকে নাহয় ছুড়ে ফেলে দিয়ো। কিন্তু আগামী আরো কয়েক যুগ অব্দি তোমার নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে নারীবাদীদের তোমার প্রয়োজন আছে। 

প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস -  কেমন আছে আজকের  কন্যাশিশুরা?
_______________________________________________________


আজ আন্তর্জাতিক #কন্যা_শিশু দিবস। সারা পৃথিবীজুড়ে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, মেয়েদের বিরুদ্ধে হিংসা ও বলপূর্বক বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে এ দিবসের সূচনা করা হয়।

আমাদের দেশে দিবসটি এমন একসময় উদযাপিত হচ্ছে যখন যখন কন্যা ভ্রুণ হত্যা, কন্যাশিশুদের যৌন নিপীড়ন, ধর্ষন, কন্যা শিশুদের প্রতি বৈষম্য, দেশের আনাচে কানাচে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। সমীক্ষা ও ন্যাশনাল ক্রাইম রের্কড ব্যুরো'র রিপোর্ট বলছে- শিশু যৌন নির্যাতন,বাল্যবিবাহের এর হারে আমাদের দেশ পৃথিবীর মধ্যে চতুর্থ। কন্যা ভ্রুণ হত্যায় সম্ভবত ভারত পৃথিবীর মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে।

শুধু ভ্রুণ হত্যাই নয়, বর্তমানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী ভাবাচ্ছে, এবং  মারাত্বক হারে বাড়ছে, তা হলো কন্যাশিশুদের উপর যৌন নির্যাতন, কন্যাশিশুদের ধর্ষন!!  চার বছর/পাঁচ বছর/ সাত বছর/বারো বছর/ এমনকি দুবছরের কন্যা শিশুটি অব্দি আপন বাবা, কাকা, মামা দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার, ধর্ষনের শিকার!! মাকে বললে মা উল্টো বলছে চেপে যেতে। এসব কথা কাউকে না বলতে। বড় হয়েও কন্যাটি এই ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। মানসিকভাবে অসুস্থ, চুপচাপ হয়ে পড়ে। বিয়ের পর স্বামীর সাথে যৌনমিলনেও স্বাভাবিক হতে পারে না। স্বামী সহ সবাই ভাবে মেয়েটি হয়তো মুডি অথবা খেয়ালী অথবা ক্ষেপাটে। কারোর সাথে কথা বলে না ইচ্ছে করে। কিন্তু মেয়েটি মনে মনে জানে সেই ছোটোবেলা থেকে কৈশোর অব্দি নীরবে ঘটে যাওয়া জীবনের পাশবিক ঘটনাগুলি!! 

শুনুন কন্যাশিশুর বাবারা / ভাইরা /কাকারা / মামারা, কন্যাশিশুটি বড় হয়ে যখন বুঝতে শেখে, ভাবতে শেখে, তার বাবা, ভাই, কাকা, মামা ও  অন্যসব যৌনহেনস্থাকারী, ধর্ষক, নির্যাতক, কামুক পুরুষের মতোই একজন পুরুষ, সেদিন তার পৃথিবী উলোটপালট হয়ে যায়। সারাজীবন সে আর কোনো পুরুষকে বিশ্বাস করতে পারে না, ভালোবাসতে পারে না। পুরুষদের দেখলে আতংকিত হয়, মনে মনে ঘেন্না করে! 

সন্তান নিজের শরীরে ধারন করার ক্ষমতা বাবাদের থাকে না, সেটা মায়েদের থাকে। কিন্তু নিজের সন্তান লালন-পালন, তার নিরাপত্তা, তার পর্যাপ্ত বিকাশ নিশ্চিত করা শুধু মায়ের একার দায়িত্ব নয়। দায়িত্বটা বাবার ও। তাই নিজের কন্যাশিশুটিকে ভবিষৎ এ সুখী, প্রানবন্ত, সুস্থ, স্বাভাবিক  দেখতে চাইলে, শিশুটির মা'র সাথে সাথে আপনাকেও এগিয়ে আসতে হবে। কন্যাশিশুটির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করতে হবে, বলতে হবে, প্রতিরোধ তৈরী করতে হবে।

আর কন্যাশিশুর মা'রা, এখন থেকে নিজের কন্যাসন্তানটি যদি পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যের ছোঁয়ায় বা কোলে উঠতে অসম্মতি প্রকাশ করে, অনীহা প্রকাশ করে, ভয় পায়, কাঁদে, দয়া করে সতর্ক হন। কন্যাশিশুটি যদি আপনাকে বলে তার ভয়, অস্বস্তির কথা, দয়া করে চুপ থাকতে বলবেন না। বরং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।  নিজের শিশুটিকে যে কোনো পুরুষ আত্মীয়ের কোলে উঠতে, আদর করতে, খেলা করতে দেওয়ার আগে নিজে যাচাই করবেন। একা রেখে চলে যাবেন না। যতোদিন আপনার কন্যাটি অপ্রাপ্তবয়স্ক, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে মা-বাবা দুজনকে মিলেই।

আজ আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবসে, শুধু মা'রাই নয়, পৃথিবীর সব বাবারাও এগিয়ে আসুন...আওয়াজ তুলুন, প্রতিরোধ করুন! আপনার কন্যা শিশুটিকে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক, স্বপ্নময় পৃথিবী উপহার দিন!! আজ থেকে যেন কোনো কন্যাশিশুকে যৌনহেনস্থার শিকার না হতে হয়, এটাই হোক অঙ্গীকার।





মঙ্গলবার, ১১ জুলাই, ২০১৭

"দাঙ্গা যাদের ধর্ম, তারা আমার পড়শী নয়"
_____________________________________

কদিন ধরেই খবরে দেখছি পশ্চিমবঙ্গে দাঙ্গার কথা! ধূলাগড়, বাদুরিয়া, বসিরহাট ইত্যাদি নানা অঞ্চলে জ্বলছে দাঙ্গার আগুন। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, সারা ভারতবর্ষ জুড়েই চলছে দাঙ্গার আবহ। কোথাও ছোটো আকারে, কোথাও বড় আকারে। কোথাও গরু নিয়ে, কোথাও নবী বা কাবা শরীফ নিয়ে। চারদিকে ফিসফাস, অবিশ্বাসের চাপা আগুন, ঘৃণা। এ কদিন চুপচাপ ঘর আর অফিস করে গেছি। আর ভেবেছি। ভেবেছি আমরা ভেতরে ভেতরে ঠিক কতটা সাম্প্রদায়িকতা, অবিশ্বাস আর ঘৃণা পোষন করি!  যে প্রতিবেশীর সাথে এই সেদিনও ঘুরেছি, আড্ডা দিয়েছি, বাজার গেছি, তাকেই এক লহমায় খুন করার কথা চিন্তা করতে পারি, তার ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে তাকে ভিটেছাড়া করতে পারি!! আমি জানি না এই মুহুর্তে কাকে ঠিক বিশ্বাস করবো!!  আমার প্রতিবেশী, আমার বন্ধু, আমার অফিসের কলিগ, আমার পরিচিত মহলের মানুষের মাঝেও যে এই হিংসা, অবিশ্বাস, ঘৃণা লুকিয়ে নেই তা কি করে বুঝবো আমি!! কাল তাদের হিংসার বলি আমি হবো না তো? আমার পরিবার হবে না তো?

সাম্প্রদায়িকতা আমাদের দেশে নতুন নয়। এই দেশের মানুষের রক্তে রক্তে সাম্প্রদায়িকতা। আমাদের ইতিহাস এর সাক্ষী। ইংরেজরা আমাদের দেশের বুকে ‘সাম্প্রদায়িকতার’ বীজ পুতে গেছে - এটা একদমই ভুল ধারনা! আসলে  দু’শ বছর দেশ শাসন করে ইংরেজরা জেনে গেছিলো, আমাদের দেশের মানুষের দুর্বল স্থান কোথায়! উপযুক্ত স্পর্শকাতর জায়গাটুকু  চিহ্নিত করে ব্যবহার করেছে মাত্র। ইংরেজ সৈন্যরা যতো না ভারতীয়দের মেরেছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ দেশভাগের সময় দাঙ্গায় মারা গিয়েছিলো।  ইংরেজরা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে নি এই দেশের মানুষদের,  বরং আমাদের দেশের মানুষ প্রথম থেকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েই ছিল।  ইংরেজরা মুসলিম লীগ ও বানায়নি আর হিন্দু মহাসভা ও বানায়নি! ইংরেজরা আর এস এস, বজরং দল, হিন্দু সংহতি ইত্যাদি দলগুলো বানিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লেলিয়েও দেয়নি! আর ইংরেজরা জামাত, সিমি, ইত্যাদি দলগুলোও বানায়নি। 

এদেশের প্রচুর সংখ্যক মানুষ ভিতরে ভিতরে তীব্র সাম্প্রদায়িক। তারা অনেকেই অগোচরে হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলে সম্বোধন করে, মুসলমানদের 'যবন', 'নুনুকাটা', 'বাঙ্গাল' বলে সম্বোধন করে! হিন্দুরা মুসলমানের ছোঁয়া অব্দি খায়না অনেক ক্ষেত্রে!! সোস্যাল মিডিয়ায় একদল ছবি বিকৃত করে, আর সাথে সাথে বাকি সবাই লাঠি, রামদা নিয়ে দাঙ্গা করতে বেরিয়ে পড়ে। সামান্য ছবি বিকৃত করলে বা ধর্ম, নবী, দেবতা সম্পর্কে কেউ কিছু বললেই, তাদের দেবতা, নবী, ইশ্বর, আল্লা'র অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। তাই তারা লাঠি, রামদা, ত্রিশুল, চাপাতি হাতে ধর্ম রক্ষায় ঝাপিয়ে পড়ে। আমার নবীকে নিয়ে বলেছিস, তোর ঘর জ্বালাবো শালা! আমার ঠাকুর নিয়ে বলেছিস, তোকে ত্রিশুল দিয়ে খুঁচিয়ে মারবো শালা! তুই মুসলমান, মানে তুই গরুখোর। তোকে ট্রেনে, বাসে, ঘরে, বাইরে কুপিয়ে মারবো শালা! - এইগুলো বর্তমানে আমাদের দেশের ট্রেন্ড। 

শুধু কি ধর্ম ? উঁচু জাত, নীচু জাত, মেথর, হরিজন, মুচি থেকে শুরু করে গায়ের কালো রঙ, হিজড়া, সমকামী নিয়েও আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে প্রচন্ডভাবে সাম্প্রদায়িকতা বা রেসিজম কাজ করে! 

তো বর্তমান ভারতবর্ষের এই মুখে উদার সাজা, ভেতরে প্রচন্ড রকমের সাম্প্রদায়িকতা পোষন করা মানুষের ভিড়ে, আমরা যারা কোনো ধর্মেরই পতাকা বহন করি না, কোনো ধর্মের মানুষকেই জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে, ঘরছাড়া, দেশছাড়া করার ভাবনা মনে মনে পোষন করি না, হিন্দু-মুসলমান-খ্রীষ্টান পরিচয়গুলোকে স্রেফ ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট হিসেবেই ভাবি, এর জন্য আলাদা করে কোনও গর্ব বা ঘেন্না অনুভব করি না, যারা গোরুকে মা মনে করেন এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদ, হিন্দু জাতীয়তাবাদকে প্রোজেক্ট  করার নিরন্তর চেষ্টা করেন, আর যারা শুওরের মাংসকে “হারাম” বলে মনে করেন আর ইসলাম বাদে বাকি ধর্মকে মনে প্রানে ঘৃণা করেন, অস্বীকার করতে চান – দুই দলকেই সমান ভাবে অপছন্দ করি, সেই আমরাই এই দেশে হয়ে পড়েছি সংখ্যালঘু। আমরা যারা ঈদের দিনে সেমাই খাই, নতুন কাপড় নেই, রোজা রাখি, নামাজ পড়ি, আবার মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও পূজার মণ্ডপে, রথের মেলায়, কীর্তনের আসরে উৎসাহ নিয়ে অংশ নেই, কিংবা যারা হিন্দু হয়ে পূজা করা সত্ত্বেও মুসলমান বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার খাই, ঈদে মুসলিম বন্ধুদের বাড়ী গিয়ে সেমাই খাই, গলায় গলা মিলিয়ে চলি, সেই আমরাই এই ভারতবর্ষে সংখ্যালঘু ।আমরা যারা সাম্প্রদায়িকতার তিলমাত্রও মনে লালন-পালন করি না সেই আমরাই সংখ্যালঘু। আমরা যারা রমেশ আর রহিম কে একই রকম মানুষ মনে করি সেই আমরাই সংখ্যালঘু। 

আমরা সংখ্যালঘু, কারন আমরা নিজেদের হিন্দু বা মুসলমান না ভেবে মানুষ ভাবি। আমরা সংখ্যালঘু, কারন আমরা আমাদের দেশে আর কোনো ধর্মীয় উগ্রতা দেখতে চাই না, আমরা আমাদের দেশে একটিবারের জন্যও আর কোনো দাঙ্গা দেখতে চাই না। আমরা সংখ্যালঘু, কারন আমরা আমাদের দেশকে হিন্দু বা মুসলমানের বাপের সম্পত্তি বলে ভাবি না। আমরা সংখ্যালঘু, কারন আমরা প্রতিবেশী বা বন্ধুর সাথে ঝগড়া হলে তাকে পাকিস্তান চলে যেতে বলি না। বরং আমরা বিশ্বাস করি দেশটা হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রীষ্টান-ধনী-গরীব-পুরুষ-নারী-হিজরা-সমকামী সবার। যেদিন আমাদের মতো মানুষেরা এই দেশে সংখ্যাগুরু হয়ে উঠবে, হয়তো সেদিন আমাদের দেশ সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠবে। জানি না সেদিন কখনো দেখে যেতে পারবো কি না!! সত্যি বলতে কি ইদানীং ভয় গ্রাস করছে আমাকে। এই দাঙ্গাবাজ মানুষের ভীড়ে বড় ভয়ে ভয়ে বেঁচে আছি!!

বৃহস্পতিবার, ২৯ জুন, ২০১৭

জুনাইদ'দের বাড়ী ফেরা হয় না..!  
_______________________________

পনেরো বছরের জুনাইদ বড় ভাইয়ের সাথে ঈদের বাজার করে ট্রেনে বাড়ি ফিরছিলো। সারাদিন রোজা ছিলো সে এবং কথা ছিলো কেনাকাটা সেরে বিকেলে মায়ের সাথে ইফতার করবে সবাই মিলে।  কিন্তু তার আর বাড়ী ফেরা হয়নি। কেন জানেন?? তার অপরাধ সে মুসলমান।সংখ্যালঘু।আর যেহেতু সংখ্যাগুরুর দেশে সংখ্যালঘু মানেই গরুখেকো, পাকিস্থানের চর, দেশদ্রোহী। কোনো প্রমাণ, সাক্ষী লাগে না একথা প্রমাণ করতে। সংখ্যাগুরুরা এগুলোকে বেদবাক্য হিসেবে মেনে চলেন। তো এই অপরাধে সেদিন চলন্ত ট্রেনে সহযাত্রীরা প্রথমে গো-হত্যা ও গোমাংস খাওয়ার জন্য তাদের গালাগালি করে।তারপর গণপিটুনি। শেষে ছুরি দিয়ে কোপানো হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মৃত্যু হয় জুনেইদের। তার সঙ্গী মইন ও মহসিন এবং বড়ভাই শাকির গুরুতর আহত হয়ে এখন হাসপাতালে। পুলিশ ও তার প্রাথমিক তদন্ত থেকে বলেছে ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকেই এই হামলা হয়েছে। 

জুনেইদের সঙ্গী মহসিন এনডিটিভি কে বলেছে, তারা ট্রেনের চেন টেনেছিল, কিন্তু ট্রেন থামেনি। তারা রেল পুলিশের সাহায্য চেয়েছিল, কিন্তু তারা কর্ণপাত করেনি।

এই ঘটনায় এ পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রমেশ নামক ওই অভিযুক্ত বলেছে , সে নাকি  মদ্যপ ছিলো। তার বন্ধুরা বলেছিল, ওরা গরুর মাংস খায়। 

গ্রামের মানুষের অভিযোগ, ট্রেনে-বাসে যাতায়াতের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজনকে প্রায়ই হেনস্তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এইসব খবর যখনই দেখি আমার প্রচন্ড ভয় হয়! গরুর মাংস খাওয়ার কারণে কী ভাবে একজন মানুষকে মেরে ফেলা যেতে পারে!!  একটি প্রাণী, যাকে কিনা কিছু মানুষ নিজেদের “মা” মনে করে – তার প্রাণ কীভাবে একজন মানুষের প্রাণের থেকে মূল্যবান হয়ে যেতে পারে? আমার মৌলিক অধিকার কি করে কারুর ব্যক্তিগত মানসিকতা কিংবা ধর্মীয় অনুভূতির লক্ষ্য হতে পারে ??  আমি কী খাবো সেটা কি করে  অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারে??  যারা গরুকে দেবতুল্য সম্মান দেয়, তাদের ধর্মীয় অনুভুতির প্রতি যেরকম সম্মান প্রদর্শন করা  উচিত, ঠিক সেইভাবে অন্য ধর্মের মানুষ, যারা গরুকে দেবতা মনে করেন না, তাদের প্রতিও সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে সংবিধানে । তাহলে কোন ভিত্তিতে দেশের সাধারন নিরীহ  নাগরিকদের একের পর এক খুন হতে হচ্ছে?? গরু রক্ষার নামে রাষ্ট্রের নাগরিকদের খুন হতে হবে, এটা কোন ধরনের ধর্ম রক্ষা?? এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র??

ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটার মানে কী?  রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেবে না। কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাবে না। অথবা কাউকে আলাদা করে বিরোধিতা করবে না। নাগরিকদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পর্যায়ে বিশেষ বিশেষ ধর্মাচরণের অধিকার থাকবে, কিন্তু তা কখনই অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে না।এটাই তো?? তাহলে প্রশ্ন জাগে  ভারতীয় রাষ্ট্র কি এই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ?

এপ্রিল-জুন, এই কমাসে প্রায় বারোজন মুসলিম মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়েছে গোমাংস খাওয়ার গুজব রটিয়ে। কি নৃশংশ!! শুধুমাত্র মুসলিম হলেই পিটিয়ে মারা যায়? দলিত হলেই পিটিয়ে মারা যায়? এর আগেও বিজেপিশাসিত রাজস্থানের আলওয়ারে গো-রক্ষকদের গণপিটুনিতে মুহাম্মদ পহেলু খান নিহত হন। একই ভাবে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মুহাম্মদ আখলাককে গণপিটুনিতে হত্যা করে উগ্র ধর্মান্ধরা। সম্প্রতি ঝাড়খন্ডে ও গোমাংস গুজবে এক পরিবারের উপর হামলা চালানো হয়।  এবারেও এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল একেবারে দেশের রাজধানী দিল্লির নাকের ডগায়। অথচ কেন্দ্র অথবা হরিয়ানার বিজেপি সরকারের কোনো হেলদোল নেই!! নিরীহ মানুষ খুন হচ্ছে আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পাত্তাই দিচ্ছেন না!! এই নীরবতা কি  জাতি-হত্যাকে প্রশ্রয় জোগাচ্ছে না?? মুখে ডিজিট্যাল ইন্ডিয়া আর ভেতরে ভেতরে দেশজুড়ে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোই কি তাঁর দলের গোপন এজেন্ডা?? 

সারা দেশ জুড়ে এক শ্রেণির বিকৃত উন্মাদ, মানুষ নামধারী কিছু জানোয়ার, মানুষ নিধন যজ্ঞে মেতেছে বিভিন্ন রুপে, বিভিন্ন চেহারায়।কোথাও গোরক্ষার নামে,কোথাও হিন্দুত্ব রক্ষার নামে। আমার ধর্ম তোমার ধর্ম থেকে ভালো। আমার ধর্ম সংখ্যাগুরুদের ধর্ম। অতএব তুমি সংখ্যালঘুকে আমার ধর্ম মেনে চলতে হবে। তোমাকে 'জয় শ্রী রাম' বলতে হবে, তোমাকেও গরুকে দেবতা জ্ঞানে পূজো করতে হবে।  আমার ধর্মটাই মেনে চলতে হবে, আমার চিন্তাধারাই সাবস্ক্রাইব করতে হবে, নইলে শালা তোমায় ক্যালাবো, প্রকাশ্যে হিউমিলিয়েট করব, তোমাকে খুন করব, তোমার বাড়িতে ছেলে ঢুকিয়ে মেয়েদের রেপ করাবো। এই হলো দেশের একশ্রেণীর মানুষের ধারনা। আর তাদের পরোক্ষে, অনেকক্ষেত্রে প্রকাশ্যে মদত দিচ্ছে খোদ রাষ্ট্র। দলিত, সংখ্যালঘু, সেক্যুলার, মানবতাবাদীরা, সরকার, রাষ্ট্রের সমালোচনাকারীরা আক্রান্ত, অত্যাচারিত,পরাধীন,বিপন্ন। সারা দেশ জুড়ে তীব্র অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে। তাই দেশের এহেন পরিস্থিতিতে রাস্তা একটাই, ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ,রাস্তায় নেমে বুলেটের মুখে, ঝলকানো ছোরার সামনে।

#Not_In_My_Name

রবিবার, ২৫ জুন, ২০১৭

নারীর যৌনতা যে সমাজে ট্যাবু
___________________________

সুস্থ যৌনতা বলতে যেটা বোঝায়, সেটা আমাদের সমাজে ট্যাবু। ইদানীং আমাদের দেশের কিছু তথাকথিত গোষ্ঠীও এ ট্যাবুটাকে আরো বেশী করে  বাক্সবন্দী করতে ব্যস্ত। তাই বারবার সুস্থ যৌনতাকে বিকৃত করে উপস্থাপনা করা হচ্ছে (প্রচার করা হচ্ছে ময়ুর সেক্স করে না, ছেলে মুয়ুয়ের চোখের জল খেয়ে প্রেগন্যান্ট হয় মেয়ে ময়ূর!)। যৌনতাকে যে সমাজ ট্যাবু করে রেখেছে, সেখানে আরো একধাপ এগিয়ে নারীর যৌনতার অধিকার নিয়ে সওয়াল করলে সমাজের স্বঘোষিত কর্তারা যে ছি ছি করে তেড়ে আসবেন, আর সেই তেড়ে আসাতে কিছু পতাকাবাহী তাবেদার শ্রেণীর নারীও যে হাততালি দেবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। সেই ছি ছি কে উপেক্ষা করেই বাকি লেখাটা লিখছি। 

আমাদের প্রচলিত কোনো ধর্মগ্রন্থই নারীকে যৌনতা উপভোগের কোনো বিধান দেয়নি। কোনো ধর্মগ্রন্থের কোথাও বলা হয়নি  স্ত্রী যদি যৌনতায় সন্তুষ্টি লাভ না করে তবে স্বামীর পাপ হবে। বরং বিধান দিয়েছে নারীর একমাত্র কাজ স্বামীর যৌনতার আনন্দটুকু নিশ্চিত করা। স্বামী অক্ষম হলেও তাকে ছেড়ে যাওয়ার অধিকার নারীকে দেওয়া হয়নি। যে সমাজে যৌনতা শব্দটাই নিষিদ্ধ, সেখানে কোনো নারী যদি যৌনতার কথা বলে তাকে কি নামে ডাকা হয়, সেটা আমাদের কারুরই অজানা নয়। যাইহোক, সমস্ত বিষয়টাকে ধর্মের ছাঁচে ফেলে এমনভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছে যাতে নারীরা নিজেদের জন্য যৌন আনন্দ বলে যে কিছু আছে, সেটার কথা কস্মিনকালেও  না ভাবতে পারে। 

নারী পুরুষের তুলনায় যৌনতায় কখনোই পিছিয়ে ছিলো না। নারী যে পুরুষের চেয়ে যৌনতায় বেশি সক্রিয় এর অসংখ্য প্রমাণও আছে। 'সেক্স ডিফারেন্স ইন সেক্সচুয়াল ফ্যান্টাসি' বইটি তে এলিস স্যামন্স বলেছেন যৌনতার ক্ষেত্রে নারীরা অনেক সময় পুরুষের তুলনায় ৭ গুণ বেশি সক্রিয় থাকে। 

কিন্তু বাস্তবে যৌনতাকে পুরুষ নিজেদের কব্জায় রেখেছে যুগ যুগান্তর থেকে। নারীর ও যে কম বেশী যৌনচাহিদা থাকতে পারে সেটা তারা মেনে নিতে পারে না। বিছানায় যে নারী নিজে এগ্রেসিভ ভুমিকা নেয় বা পুরুষটিকে গাইড করতে চায়, তার সেই ডমিনেশন পুরুষটি মেনে নিতে চায় না, অথবা ভাবে নারীটির নিশ্চয় সেক্সের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। অতএব কর্তার ইচ্ছাই কর্ম। এবং যৌনতার ক্ষেত্রে পুরুষ তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। বেশীরভাগ পুরুষ নিজের তৃপ্তিটুকুই চায়, সঙ্গিনীও তৃপ্ত  কিনা, সে বিষয়ে ফিরেও দেখে না। যা প্রচন্ড রকমের স্বার্থপরতা। আমাদের সমাজে অনেক নারী ই আছেন যারা বছরের পর বছর অতৃপ্ত থেকেও সংসারধর্ম পালন করে যাচ্ছেন। পতি পরমেশ্বরের যৌন চাহিদা যন্ত্রনাদায়ক, বিরক্তিকর হলেও মুখ বুজে, লোকলজ্জার ভয়ে টু শব্দটি করছেন না। কারন, যুগ যুগ ধরে তাদের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আসা হয়েছে। যৌনতা কি সেটা পরিপূর্ণভাবে জানতে দেওয়া হয়নি। অধিকাংশ নারীই জানে না ‘অরগাজম’ আসলে কি? 

ধর্ম, সমাজ, নারীকে ছোট থেকেই পই পই করে শিখিয়ে দিয়েছে, নারীকে নিজের যৌনচাহিদা দমন করে রাখতে হয়, সেটার কথা মুখে বলা পাপ, সেটা যে নারী বলে সে বেশ্যা। বিধবাদের যৌনচাহিদা না হওয়ার জন্য তাদের আমিষ খাওয়া বারন। যৌন চাহিদা শুধুমাত্র পুরুষের আছে এবং যখন যেভাবে ইচ্ছা তারা সেটা মেটাতেও পারে। তাদের জন্য ঘর ও আছে, বাইরেও আছে। মধ্যযুগে কোন এক জায়গায় নাকি পরিবারের পুরুষেরা বিদেশ বিভুইয়ে যাওয়ার সময় পরিবারের নারী সদস্যের যোনী তালা দিয়ে যেত। কুমারী মেয়েদেরও বিয়ে না হওয়া অব্দি যোনী তালা দেওয়া থাকত। আমাদের দেশে আক্ষরিক অর্থে তালা দেওয়া হয়না বটে, তবে হাজার হাজার অদৃশ্য শেকল আর তালা নারীকে ঘিরে রাখে। নারী জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি শুধু দিয়েই যাবে, তার চাহিদা, ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনো মূল্য নেই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। 

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বলতে আমরা শুধু মারপিট কেই বুঝি। কিন্তু যৌনচাহিদা থেকে বঞ্চিত করাও যে একধরনের ডমেস্টিক ভায়োলেন্স সেটা আমরা বুঝতে চাই না। যৌনচাহিদা দমন করতে করতে একসময় অনেক নারী মানসিক ভাবে অসুস্থ ও হয়ে পড়তে পারে। ঘুম, খাওয়া, পায়খানা প্রসাব করার মতো যৌনচাহিদাও যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব প্রাণীর  একধরনের সাধারণ শরীরবৃত্তীয় ঘটনা, যা আমরা নিয়ন্ত্রন করতে পারি, উপেক্ষা নয়, এটা বুঝতে আমাদের সমাজের এখনো কয়েকশ বছর লেগে যাবে!