এই ব্লগটি সন্ধান করুন

শনিবার, ২৬ মে, ২০১৮





চেতনায় নজরুল
________________

অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন, ‘আর-সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে/ভাগ হয়নি কো নজরুল’। 

তাই ই তো। নজরুল এমন একজন মানুষ যাকে ধর্ম কিংবা জাত কিংবা মানচিত্র দিয়ে কখনো ভাগ করা যায়নি। আমাদের কাছে নজরুল যেমন স্মরণীয়, বাংলাদেশেও তো তাই। বরং অনেকক্ষেত্রে আমাদের থেকে অনেকটা বেশী তিনি বাংলাদেশে বরণীয়। বলছি কারন আমাদের দেশে রবি ঠাকুরকে নিয়ে যেরকম হইহুল্লোড়, নজরুলের ক্ষেত্রেসেটা যেন  অনেকটাই ম্রিয়মান। 

এদেশের একটা শ্রেণী তাকে খানিকটা অবহেলা করলেও উপেক্ষা করার স্পর্ধা করতে পারেনি। এর কারন নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবতাবোধ। তাঁকে কোনো বিশেষ ধর্মের আওতায় ফেলার চেষ্ঠায় বারবার হেরে যায় তাই এরা। ধর্ম বর্ণের উর্ধ্বে উঠে নজরুল উচ্চারন করেছিলেন -

 "গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, 
নহে কিছু মহীয়ান।"

একদিকে যেমন তিনি ইসলাম নিয়ে প্রচুর লিখেছেন, তেমনি শ্যামা সঙ্গীতও রচনা করেছেন অনেক। ধর্মের উর্ধ্বে উঠে মানুষের "মানুষ" পরিচয়ই প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর কাছে। এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই তাঁর চার সন্তানের নামেও। কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। নিজের আত্মজদের নামের মধ্যে দিয়ে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ ভুলে দুই ধর্মের মানুষের একাকার হয়ে ওঠার সামান্য হলেও বাস্তবায়ন। কোনো এক ভাষনে নজরুল বলেছিলেন -  

"কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি, ও দুটোর কোনোটাই নয়। আমি শুধু হিন্দু মুসলিমকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করছি।"

এহেন এক অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্বকে রাজনৈতিক-ধর্মীয়-বর্ণীয়- ইত্যাদি নোংরা এজেন্ডা দেখিয়ে অবহেলা করে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে ভারতীয় বাঙ্গালী সমাজ, কিন্তু তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার স্পর্ধা তাদের আজকের সময়েও নেই। সারা জীবন তিনি সংগ্রাম করেছেন শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে। নির্ভীকচিত্তে গেয়েছেন মানবতার জয়গান। দারিদ্র্যের চুড়ান্ত কশাঘাত সহ্য করেছেন, ভোগ করেছেন নির্যাতন-নিপীড়ন; কিন্তু ব্যক্তিগত লোভ-লাভ-খ্যাতির মোহের কাছে কখনো আত্ম-বিক্রি করেনি। ধর্মান্ধ মুসলামানরা একদিকে ফতোয়া দিয়েছে কাফের বলে। অন্যদিকে  ধর্মান্ধ হিন্দুরা খেতাব দিয়েছে "পাতি নেড়ে"। তাতেও দমেননি নজরুল; সবার উপর মানুষ সত্য এই মর্মবাণী তাঁর কণ্ঠে ভাস্বর হয়েছে বারবার। তিনি  মানুষকে জাগিয়েছেন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার আন্দোলনে। আর এখানেই তিনি সমকালের দাবি মিটিয়েও চিরকালীন।

নজরুলের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল ঘরের দেয়ালে টাঙানো একটা ছবি দেখে। ঘাড় অব্দি লম্বা চুল নিয়ে একজন মানুষ বিষন্ন চোখে তাকিয়ে আছেন ঈশান কোনের দিকে। মা না বাপী (ঠিক মনে নেই এইমূহূর্তে) কাকে যেন জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন ইনি নজরুল ইসলাম। ক্লাস টু তে উঠে আরেকটু পরিচয় তাঁর সাথে। রঙচঙে একটা বই হাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়ছিলাম - 

"ভোর হলো দোর খোল
খুকুমনি ওঠে রে,
ঐ ডাকে জুঁই-শাখে
ফুল-খুকি ছোট রে।"

তারপর থেকে ক্লাস ফাইভ সিক্স অব্দি কেউ যদি জিজ্ঞেস করতো আমার প্রিয় কবিতা কোনটি, আমি চোখ গোলগোল করে "প্রভাতী" বলেই তৎক্ষণাৎ কবিতাটা বলতে শুরু করে দিতাম। "লিচুচোর" যখন পড়লাম তখন সেটা প্রিয় হয়ে গেল....

"যাবো ফের? কান মলি ভাই
চুরিতে আর যদি যাই,
তবে মোর নামই মিছা।
কুকুরের চামড়া খিঁচা
সে কি ভাই যায়রে ভুলা-
মালীর ওই পিটনী গুলা,
কি বলিস? ফের হপ্তা?
তওবা, নাক খপ্তা।" - লাইনগুলো পড়তে পড়তে আমি তখন সেই ডানপিটে ছেলের শাস্তির বহর শুনে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছি..! তারপর একে একে "খুকি ও কাঠবেড়ালী",  ‘ঘুমপাড়ানী গান’, ‘পুতুলের বিয়ে', 'চড়ুই পাখির ছানা' সহ অসংখ্য কবিতা প্রিয় হয়ে উঠলো। স্কুলে পড়া না শিখে যাওয়ায় দিদিমনির গালি খেয়ে বাড়ী ফিরতে বিড়বিড় করছি নজরুলের লাইন -

 "ঝাঁকড়া চুলো তালগাছ, তুই দাঁড়িয়ে কেন ভাই?
আমার মতন পড়া কি তোর মুখস্থ হয় নাই?"

ক্লাস নাইনে উঠে পড়লাম নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা। 'অগ্নিবীনার' ছোট ফন্টে ছাপানো আট পৃষ্ঠার কবিতা - 

"আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন।
আমি চির-বিদ্রোহী-বীর-
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির!" - লাইনগুলো পড়তে পড়তে রক্তচাপ বেড়ে যেত আমার। বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক জোর আছড়ে পড়তো..! নজরুলের সাথে প্রেমের শুরু তখন থেকেই। স্কুল থেকে ফিরে খেয়েদেয়েই "অগ্নিবীনা" খুলে বসতাম। এবং কদিন পর দেখলাম "অগ্নিবীনার" বেশীরভাগ কবিতাই আমার মুখস্থ। 

'অগ্নিবীনা' পড়ে যত না তাঁর প্রেমে পড়েছিলাম, তারচেয়ে দ্বিগুন প্রেমে পড়েছিলাম "সাম্যবাদী"র 'মানুষ' পড়ে । -

"কোথা চেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!"

এই দুই লাইনে কি ছিলো তখন বুঝতাম না, কিন্তু  এটুকু বলতে পারি এই দুটো লাইন থেকেই আমার যাবতীয় চিন্তার সুত্রপাত। 

নজরুল ছিলেন মনেপ্রাণে বিদ্রোহী। তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় যে তীব্র প্রতিবাদের জোয়ার উঠেছিল, তা থামাতে ইংরেজ সরকার তাঁকে জেলে পুরেছিল। নজরুলের আগেও কিছু বাঙ্গালি কবির ভাগ্যে রাজরোষ জুটেছিল, তবে তাঁর মত এত তীব্রভাবে কাউকে আক্রমণ করা হয়নি।  ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশের কিছুদিন পরেই তা বাজেয়াপ্ত করেছিল ইংরেজ সরকার। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ব্যান করে।

জেলে বন্দী অবস্থায় ও নজরুল তাঁর প্রতিবাদী সত্ত্বাকে বিসর্জন দেননি। জেলখানায় কারাবন্দীদের সঙ্গে নির্যাতনমূলক আচরণ, বৈষম্য ও রাজবন্দীর প্রাপ্য মর্যাদা না দেয়ায় প্রতিবাদে তিনি অনশন শুরু করেন। সারা ভারতবর্ষে তুমুল আলোড়ন তুলে ঘটনাটি। এ সময়ই রবিঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ গ্রন্থ নজরুলকে উত্সর্গ করে বলেছিলেন, -

 ‘জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল তাই আমার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থখানি ওকেই উতসর্গ করছি’। 

সম্ভবত এই সময়ই রবি ঠাকুর নজরুলকে অনুরোধ করে বলেছিলেন, ‘সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জাগাবার কবিও তো চাই’।

নজরুল ছিলেন দ্রোহ ও প্রেমের কবি। তাঁর কবিতায়, গানে বিদ্রোহ ও প্রেমের দ্বৈত ছবি একইসঙ্গে ধরা দিয়েছে। বিদ্রোহের আগুনে পুড়লেও শাশ্বত প্রেমের আহ্বানকে উপেক্ষা করেননি কখনোই। একদিকে যুদ্ধজাহাজে যাত্রা অপরদিকে ভেলা ভাসিয়েছেন প্রেমের সাগরেও। আর সেজন্যই "বিদ্রোহী প্রেমিক" শব্দবন্ধটি নজরুলের ক্ষেত্রে শতভাগ সত্য। 

একদিকে তাঁর বিদ্রোহী সত্ত্বা ঝঙ্কার তুলছে -

"মহা প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন,
আমি ধ্বংস
আমি ভেঙ্গে করি সব চুরমার।"

অন্যদিকে তাঁর প্রেমিক সত্ত্বা বলছে - 

"মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী
দেব খোঁপায় তারার ফুল।।"

একইসঙ্গে দ্রোহ ও প্রেমকে ধারণ করে এমন স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ শুধুমাত্র  নজরুলের পক্ষেই সম্ভব।

রবীন্দ্র সঙ্গীত আমার প্রতি দিনের সঙ্গী। কিন্তু নজরুলের গানের যে শব্দ ঝংকার আছে, তা রবীন্দ্রনাথের গানে পাইনি। রবি ঠাকুরের গান হৃদয়ে গিয়ে লাগে, আর দুখু মিয়ার গানের প্রতিটি শব্দ একদম মস্তিষ্কের ভিতরে গিয়ে লাগে। - 

“শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে বাহিরে ঝড় বহে নয়নে বারি ঝরে” 

অথবা 

"আধো আধো বোল লাজে বাধো বাধো বোল ব'লো কানে কানে যে কথাটি আধো রাতে মনে জাগায় দোল ব'লো কানে কানে"

 "ভুলি কেমনে আজো যে মনে বেদনা-সনে রহিল আঁকা
 আজো সজনী দিন রজনী সে বিনে গণি তেমনি ফাঁকা"

নজরুলের এইসব গানগুলি আমাকে ভাবায়। তাঁর দ্রোহী স্বত্ত্বার সাথে তাঁর এই মহান প্রেমিক হৃদয়ের সহাবস্থান - ভাববার বিষয় বৈকি। 

তাঁর আরেকটা গান - 

 “আমি চিরতরে চলে যাবো 
তবু আমারে দেবো না ভুলিতে
আমি বাতাস হইয়া জড়াইবো কেশ বেণী 
যাবে যবে খুলিতে 
তবু আমারে দেবো না ভুলিতে” - 

শুধু দ্রোহ নয় প্রতিবাদ নয় বরং জীবনের মৌলিক ও নান্দনিক অনুভুতিগুলোর সংমিশ্রনে নজরুল যে কতটা অনিবার্য তা তাঁর এইসব হৃদয়স্পর্শী গানগুলো শুনলে কিছুটা হলেও বোঝা যায়। আর মানবিক অনুভুতিগুলোকে যাঁরা এমনতর ভাষাময় করে তুলতে পারেন তাঁদেরকে কি ভোলা যায়? … যায় না। আর তাই নজরুলকেও ভোলা সম্ভব নয়। আগামী কয়েক প্রজন্ম, কয়েক দশক অব্দি, তাঁকে ছাড়া বাঙালির চলবে না। চলা সম্ভব নয়। 

প্রিয় কবি, আপনার কাছে একটা বিষয়ে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। মাধ্যমিক অব্দি  যখন ই পরীক্ষায় রচনা লিখতে হত 'আমার প্রিয় কবি', আমি কখনই আপনার নাম লিখতে পারিনি। লিখেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমার ক্লাসের সবাই "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর" লিখতো বলেই হয়তো। অথবা প্রাইভেট স্যার "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের" রচনাতেই জোর দিতেন বলেই হয়তো! কিন্তু মাধ্যমিকের খাতায় আমি লিখতে পারিনি শুধু রবি ঠাকুর নন, আপনিও  আমার সবচেয়ে প্রিয় কবিদের একজন। 

শুভ জন্মদিন। শুভ জন্মদিন দুখু মিয়া।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন