জগাই'র পরীক্ষা বেত্তান্ত
***********************
কোনো এক অখ্যাত কারনে স্কুল হইতে শুরু করিয়া সমস্ত জেলায় এমন কেহই ই নাই, যে জগাই কে চেনে না! যে মুখচোরা, গরুর মতো নিরীহ ছেলেটি বা মেয়েটি কাহাকেও চিনে না, কাহাকেও জানে না, সেও সবার আগে জগাইকে চিনিয়া লয়। কারন তার কথাবার্তা, ব্যবহার, মুখের চেহারায়, পোশাক পরিধানে এমন কিছু আছে, যাহা দেখিয়া সবাই বুঝিতে পারে এই মেয়েটিই জগাই। তাহার চোখদুটি অসম্ভব রকমের ছোটো এবং মাথায় চুলের বদলে এক বস্তা তামার তার চতুর্দিকে স্প্রিং এর মতো ছড়াইয়া ছিটাইয়া পড়িয়াছে। সে যখন রাগ করিয়া তাহার ছোট ছোট চোখদুটিকে আরো ছোটো করিয়া মাথার তামার তারগুলি ঝাকাইয়া ঝগড়া করিতে করিতে চিংড়ি মাছের মতো হাত পা ছুঁড়ে, তখন ওপাড়ার গবা পাগলাও নিশ্চিত হইয়া যায়, এ জগাই ই! ছোটবেলা হইতেই কোনো এক অজানা কারনে জগাই'র মা জগাইকে 'বৃটিশ' বলিয়া ডাকেন..!! জগাই বহুবার তাহার মাকে বহুভাবে জিজ্ঞাসা করিয়াও সেই ডাকের রহস্য ভেদ করিতে পারে নাই। যাহা হউক সে বেত্তান্ত নাহয় আরেকদিন বলা যাইবে। এক্ষনে তাহার পরীক্ষা বেত্তান্ত বলা যাক।
জগাই সারাজীবন পরীক্ষাকে যমের মতো ভয় পাইয়া আসিয়াছে, কিন্তু তাহার জীবনেই বারবার পরীক্ষা নামক যমদেবতাটি ঘুরিয়া ফিরিয়া আসে। সারাজীবন প্রতিটা পরীক্ষা দিয়া সে মনেমনে নিশ্চিত থাকে সে ফেইল করিবে, কিন্তু কিভাবে যে সে পাশ করিয়া ফেলে তাহা সে নিজেও বলিতে পারে না।
মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে জগাই তাহার ইলেক্টিভ সাবজেক্ট লইয়াছিলো ইতিহাস। তখন সমগ্র জেলার অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রী ইলেক্টিভ সাবজেক্ট লইয়াছিল ঐচ্ছিক অঙ্ক/সংস্কৃত/হিন্দি। ইতিহাস কেহ ই নেয় নাই, যার দরুন ইতিহাস বই ও লাইব্রেরীতে আসে নাই। জগাই প্রথম তিন চার মাস খোঁজ লইয়া যখন দেখিল ইতিহাস বই আসার আর কোনো চান্স ই নাই, তখন সেও হাল ছাড়িয়া তাহার অন্যান্য কাজে মনোনিবেশ করিল। সারাবছর ঘরের সবার বিশেষত মা- বাপী-মেজদির সব বকা-মার-মানসিক হেনস্তা- তাচ্ছিল্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইয়া জগাই নাচিয়া কুদিয়া, সিনেমা দেখিয়া, ঝগড়া করিয়া, হো হো করিয়া হাসিয়া, রাক্ষসের মতো খাইয়া -দাইয়া, অক্টোপাসের মতো হাত পা ছুড়িয়া ঘুমাইয়া কাটাইলো। যথারীতি পরীক্ষা আসিল এবং জগাই সকালে মায়ের হাতের শিঙি মাছের ঝোল দিয়া হাপুস হুপুস করিয়া ভাত খাইয়া, মাথায় তেল দিয়া বাপীর হাত ধরিয়া পরীক্ষা দিতে গেল। প্রশ্ন দেখিয়া জগাই প্রথমে ভয় পাইলো, তারপর সেই ভয়কে ফেইস করিয়া সে লিখিতে বসিল। জগাই লিখিল। যাহা তাহার মনে আসিল সে লিখিয়া গেল। পরীক্ষার ফাইনাল ঘন্টা বাজার আগে সে পাশের ছেলেটির খাতার দিকে একবার এমনিই চাহিয়া ছিলো, কিন্তু ইনভিজিলেটর জগাইর চাওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখিলেন এবং তাহাকে কড়া চোখে ধমক দিলেন। জগাই দাঁতে দাঁত চাপিয়া ক্রোধ সংবরণ করিল। যাহাহউক, এভাবে ইতিহাস পরীক্ষায় ও সে লিখিল। মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব সম্পর্কে বড় প্রশ্নটির উত্তর লেখিয়া নিজের ক্রিয়েটিভিটি দেখিয়া জগাইর নিজেকে নোবেল প্রাইজ দিতে ইচ্ছা জাগিল।
যথারীতি পরীক্ষার ফলপ্রকাশের দিন আসিল। ঘরের সবাই নিশ্চিত জগাই ফেইল করিবে। জগাই ও নিশ্চিত। সকাল হইতেই সে বুঝিতেছে ঘরের সবাই তার দিকে কেমন যেন অদ্ভুত চোখে তাকাইতেছে। জগাই ভাব সুবিধের নয় বুঝিয়া সকাল সকালই রান্নাঘরে গিয়া ভাত এবং আর যা যা ছিলো তা খাইয়া ফেলে কারন রেজাল্টের পর যে তাহার ভাগ্যে মার ছাড়া আর কিছুই জুটিবে না, তাহা সে বিলক্ষন জানিত। বেলা এগারোটার দিকে মা-বাপী-মেজদি তিনজন গেলেন জগাইর রেজাল্ট দেখিতে। লিস্টের শেষ থেকে দেখা শুরু করলেন তিনজনাই। কারন তারা জানিতেন উপর দিকে দেখা জগাইর ক্ষেত্রে বৃথা। কিন্তু লিস্টের শেষে মানে থার্ড ডিভিশনে যখন দেখিলেন জগাইর নাম নাই, তখন মা-বাপী ফিরিয়া আসিতে উদ্যত হইলেন। মেজদি কোন এক অজানা কারনে আরেকটু উপর দিকে দেখলো, তারপর আরেকটু উপরে দেখলো জগাইর নাম মিটমিট করিতেছে। ওদিকে জগাইর টেনশনে অথবা অতি খাওয়ার ফলে পেটখারাপ হইয়াছে। সে টয়লেট আর ঘরে পর্যায়ক্রমে দৌড়াইতেছে। এমন সময় দেখে তাহার যমের মতো বাবা মিষ্টির প্যাকেট লইয়া ঘরে ঢুকিতেছেন, পেছনে একগাল হাসিয়া তাহার মাতৃদেবীও..! জগাই যখন বুঝিলো পিঠে মার নাই, জগাই অতিরিক্ত ভাব দেখাইয়া বলিল, "কি? খুব তো বলেছিলে ফেইল করবো, এখন কি?" বলিয়া দুপদাড় করিয়া নিজের রুমে ঢুকিয়া হো হো করিয়া উপুড় হইয়া হাসিল অনেকক্ষণ। কেন হাসিল তাহা সে নিজেও বুঝিতে পারে নাই।
উচ্চমাধ্যমিকও একই রকম কাটাইলো জগাই। সে নির্ঘাত জানিত ইকোনমিক্সে ফেইল করিবে। ঘরের সবাই ও নিশ্চিত ছিলো মাধ্যমিক উতরে গেলেও উচ্চমাধ্যমিক উতরানো এর কম্মো নয়। যথারিতী রেজাল্টের দিন ও মাধ্যমিকের পুনরাবৃত্তি ঘটিলো। জগাই দন্তবিকশিত করিয়া গ্রাজুয়েশনে ভর্তি হইলো। জগাইর ইচ্ছা ছিলো ফিলসফি নিয়ে পড়বে, জগাইর রাগী পিতৃদেব তাহাকে ইংলিশ অনার্স দিয়া ভর্তি করাইলেন। জগাই প্রথমে প্রতিবাদ করিয়াছিল, কিন্তু দু-তিনটে চড় থাপ্পড় খাইয়া সে জেদ তাকে ছাড়তে হলো। জগাই ক্লাসে যায়, কিন্তু কিছুই সে বুঝিতে পারে না। জগাই ইংলিশ অনার্সের বই রাখিয়া অফ পিরিয়ডে লাইব্রেরীতে বসিয়া "কালবেলা" পড়ে, ফ্রয়েড পড়ে, ইমানুয়েল কান্ট পড়ে, ভারতীয় দর্শনের বই পড়ে। বাড়ীতে আসিয়া নাক ডাকাইয়া ভোস ভোস করিয়া ঘুমায়, তারপর রাত জাগিয়া কম্পিউটার গেম খেলে। ক্রমে পরীক্ষা আসিল। জগাই পরীক্ষার আগের রাতে মনোযোগ সহকারে দিদির মোবাইলে "ব্লক পাজল্" গেম খেলিল। পরীক্ষার হলে প্রশ্ন দেখিয়া জগাই ভাবিল পাস মার্ক তোলা যাইবে। জগাই লিখিতে বসিল, কিন্তু অদৃষ্টের নিষ্ঠুর পরিহাসে লিখিতে বসিয়াই তাহার চোখে ভাসিয়া উঠিল ব্লক পাজল গেইমের "লাল-নীল গুটি"। জগাই চোখ বন্ধ করিয়া ভাবিতে বসিল। সব মনে আসে জগাইয়ের, কবে কাকে মুরগি বানিয়েছিল, কিভাবে রান্নাঘরে ঢুকিয়া কড়াই হইতে চিংড়ি মাছ ভাজা সব খাইয়া বেড়ালের উপর দোষ ফেলিয়াছিল, কিভাবে বড়দির প্রসাধন বাক্স হইতে মুখে মাখার ক্রিম চুরি করিয়া মেজদির ঘাড়ে দোষ ফেলিয়া বড়দি মেজদির ডব্লিউ ডব্লিউ ই লাইভ দেখিয়াছিল, কিভাবে ছোটোবোনের পয়সা জমানোর মাটির ঘট হইতে নরুন দিয়ে টাকা বের করিয়াছিল, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর তাহার মনে আসে না। কোনোরকম যাহা মনে আসিল টুকরো টাকরা ভাবে, সে তাহাই লেখিল। এইভাবে তিনটে বছর কাটাইয়া সে কোনোক্রমে গ্রাজুয়েশন পাস করিল। তাহার পর এম. এ ও পাশ করিল।
এম. এ করিয়া জগাই ভাবিয়াছিল আর তাহাকে পড়িতে হইবে না। পরীক্ষায়ও বসিতে হইবে না। কোনোমতে স্কুলে একটা চাকরী জুটাইয়া জগাই মনের সুখে তাহার কাজকর্ম চালাইয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু ভাগ্য জগাইর এই অবস্থা মেনে লইবে কেন! আবার ডি.এল.ইডি নামক এক পরীক্ষা আসিয়া তাহার জীবনে উপস্থিত হইলো। জগাই শুনিলো ডি এল ইডি খুব সহজ, না পড়িলেও তাতে পাশ করা যায়। জগাই তাহাই বেদবাক্য বলিয়া ধরিয়া লইলো। সারাবছর সে ফেইসবুক করিয়া, লোকজনের পোষ্টে পোষ্টে গিয়া তাদের খিস্তি দিয়া, ছবি আঁকিয়া, গেইম খেলিয়া, হি হি করিয়া, নিয়ম ছাড়া খাইয়া, সিগারেট ফুকিয়া, ইস্কুলে গিয়া, সিরিয়াস মুখে ছাত্র-ছাত্রীদের উপদেশ বাণী ঝাড়িয়া দিন কাটাইলো। পরীক্ষার আগের রাতে বইখাতা মেলিয়া তাহার উপরে অক্টোপাসের মতো হাত পা ছুড়িয়া সে ঘুমাইলো এবং পরদিন গাড়ী করিয়া পরীক্ষা দিতে গেল। পরীক্ষা হলে দেখিলো তাহার ই এক ছাত্রী তাহার আগের ডেক্সে বসিয়াছে। এবং ছোটোবেলা যে ছেলেটার মাথা ব্যাট দিয়া ফাটিয়েছিল, সে তাহার নিজের ডেক্সে বসিয়াছে। জগাই যে কাউকে একটা ছোটো প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞেস করিবে, সে উপায় ও নাই। কারন তাহার এই ছাত্রীটিকে সে পড়ালেখা যে কত সহজ এবং পরীক্ষা হলে যে নিজের খাতার দিকে চেয়ে লেখতে হয়, সে সম্পর্কে একদা অনেক জ্ঞান ঝাড়িয়াছিল। যাইহোক, জগাই প্রথমে ছোট প্রশ্ন গুলো লিখিল। বড় প্রশ্ন দুইটা তাহার জানা ছিলো, সেইগুলি সুন্দর করিয়া ব্যাখ্যা করিয়া ফিক ফিক করিয়া হাসিয়া হাসিয়া লিখিতে লিখিতেই দুই ঘন্টা পার হইয়া গেল। বাকী এক ঘন্টা সে পাঁচ মার্কের ছয়টা প্রশ্নের মধ্যে মাত্র তিনটে কোনোমতে লিখিতে পারিল। একটা প্রশ্নের উত্তরের জন্যে পিছনের জনার খাতার দিকে একবার মোটে তাকিয়েছিল, কিন্তু যেই দেখলো ওর ছাত্রীটি ওর দিকে দেখিতেছে, সে তাড়াতাড়ি সোজা হইয়া বসিল। বাকী দুদিনের পরীক্ষা ও একই রকম গিয়াছে। সে এখনো নিশ্চিত নয় সে পাশ করিতে পারিবে কি না। যাহাহউক, পরীক্ষা দিয়া সে প্রতিদিনই আপন মনে 'লাল গানে নীল সুর, হাসি-হাসি গন্ধ ' গাহিতে গাহিতে বাড়ী ফিরিয়াছে। নিন্দুকেরা তাহা দেখিয়া ভাবিয়াছে না জানি তাহার পরীক্ষা কতই না ভালো হইয়াছে!!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন