এই ব্লগটি সন্ধান করুন

বৃহস্পতিবার, ২৯ জুন, ২০১৭

জুনাইদ'দের বাড়ী ফেরা হয় না..!  
_______________________________

পনেরো বছরের জুনাইদ বড় ভাইয়ের সাথে ঈদের বাজার করে ট্রেনে বাড়ি ফিরছিলো। সারাদিন রোজা ছিলো সে এবং কথা ছিলো কেনাকাটা সেরে বিকেলে মায়ের সাথে ইফতার করবে সবাই মিলে।  কিন্তু তার আর বাড়ী ফেরা হয়নি। কেন জানেন?? তার অপরাধ সে মুসলমান।সংখ্যালঘু।আর যেহেতু সংখ্যাগুরুর দেশে সংখ্যালঘু মানেই গরুখেকো, পাকিস্থানের চর, দেশদ্রোহী। কোনো প্রমাণ, সাক্ষী লাগে না একথা প্রমাণ করতে। সংখ্যাগুরুরা এগুলোকে বেদবাক্য হিসেবে মেনে চলেন। তো এই অপরাধে সেদিন চলন্ত ট্রেনে সহযাত্রীরা প্রথমে গো-হত্যা ও গোমাংস খাওয়ার জন্য তাদের গালাগালি করে।তারপর গণপিটুনি। শেষে ছুরি দিয়ে কোপানো হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মৃত্যু হয় জুনেইদের। তার সঙ্গী মইন ও মহসিন এবং বড়ভাই শাকির গুরুতর আহত হয়ে এখন হাসপাতালে। পুলিশ ও তার প্রাথমিক তদন্ত থেকে বলেছে ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকেই এই হামলা হয়েছে। 

জুনেইদের সঙ্গী মহসিন এনডিটিভি কে বলেছে, তারা ট্রেনের চেন টেনেছিল, কিন্তু ট্রেন থামেনি। তারা রেল পুলিশের সাহায্য চেয়েছিল, কিন্তু তারা কর্ণপাত করেনি।

এই ঘটনায় এ পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রমেশ নামক ওই অভিযুক্ত বলেছে , সে নাকি  মদ্যপ ছিলো। তার বন্ধুরা বলেছিল, ওরা গরুর মাংস খায়। 

গ্রামের মানুষের অভিযোগ, ট্রেনে-বাসে যাতায়াতের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজনকে প্রায়ই হেনস্তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এইসব খবর যখনই দেখি আমার প্রচন্ড ভয় হয়! গরুর মাংস খাওয়ার কারণে কী ভাবে একজন মানুষকে মেরে ফেলা যেতে পারে!!  একটি প্রাণী, যাকে কিনা কিছু মানুষ নিজেদের “মা” মনে করে – তার প্রাণ কীভাবে একজন মানুষের প্রাণের থেকে মূল্যবান হয়ে যেতে পারে? আমার মৌলিক অধিকার কি করে কারুর ব্যক্তিগত মানসিকতা কিংবা ধর্মীয় অনুভূতির লক্ষ্য হতে পারে ??  আমি কী খাবো সেটা কি করে  অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারে??  যারা গরুকে দেবতুল্য সম্মান দেয়, তাদের ধর্মীয় অনুভুতির প্রতি যেরকম সম্মান প্রদর্শন করা  উচিত, ঠিক সেইভাবে অন্য ধর্মের মানুষ, যারা গরুকে দেবতা মনে করেন না, তাদের প্রতিও সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে সংবিধানে । তাহলে কোন ভিত্তিতে দেশের সাধারন নিরীহ  নাগরিকদের একের পর এক খুন হতে হচ্ছে?? গরু রক্ষার নামে রাষ্ট্রের নাগরিকদের খুন হতে হবে, এটা কোন ধরনের ধর্ম রক্ষা?? এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র??

ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটার মানে কী?  রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেবে না। কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাবে না। অথবা কাউকে আলাদা করে বিরোধিতা করবে না। নাগরিকদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পর্যায়ে বিশেষ বিশেষ ধর্মাচরণের অধিকার থাকবে, কিন্তু তা কখনই অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে না।এটাই তো?? তাহলে প্রশ্ন জাগে  ভারতীয় রাষ্ট্র কি এই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ?

এপ্রিল-জুন, এই কমাসে প্রায় বারোজন মুসলিম মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়েছে গোমাংস খাওয়ার গুজব রটিয়ে। কি নৃশংশ!! শুধুমাত্র মুসলিম হলেই পিটিয়ে মারা যায়? দলিত হলেই পিটিয়ে মারা যায়? এর আগেও বিজেপিশাসিত রাজস্থানের আলওয়ারে গো-রক্ষকদের গণপিটুনিতে মুহাম্মদ পহেলু খান নিহত হন। একই ভাবে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মুহাম্মদ আখলাককে গণপিটুনিতে হত্যা করে উগ্র ধর্মান্ধরা। সম্প্রতি ঝাড়খন্ডে ও গোমাংস গুজবে এক পরিবারের উপর হামলা চালানো হয়।  এবারেও এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল একেবারে দেশের রাজধানী দিল্লির নাকের ডগায়। অথচ কেন্দ্র অথবা হরিয়ানার বিজেপি সরকারের কোনো হেলদোল নেই!! নিরীহ মানুষ খুন হচ্ছে আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পাত্তাই দিচ্ছেন না!! এই নীরবতা কি  জাতি-হত্যাকে প্রশ্রয় জোগাচ্ছে না?? মুখে ডিজিট্যাল ইন্ডিয়া আর ভেতরে ভেতরে দেশজুড়ে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোই কি তাঁর দলের গোপন এজেন্ডা?? 

সারা দেশ জুড়ে এক শ্রেণির বিকৃত উন্মাদ, মানুষ নামধারী কিছু জানোয়ার, মানুষ নিধন যজ্ঞে মেতেছে বিভিন্ন রুপে, বিভিন্ন চেহারায়।কোথাও গোরক্ষার নামে,কোথাও হিন্দুত্ব রক্ষার নামে। আমার ধর্ম তোমার ধর্ম থেকে ভালো। আমার ধর্ম সংখ্যাগুরুদের ধর্ম। অতএব তুমি সংখ্যালঘুকে আমার ধর্ম মেনে চলতে হবে। তোমাকে 'জয় শ্রী রাম' বলতে হবে, তোমাকেও গরুকে দেবতা জ্ঞানে পূজো করতে হবে।  আমার ধর্মটাই মেনে চলতে হবে, আমার চিন্তাধারাই সাবস্ক্রাইব করতে হবে, নইলে শালা তোমায় ক্যালাবো, প্রকাশ্যে হিউমিলিয়েট করব, তোমাকে খুন করব, তোমার বাড়িতে ছেলে ঢুকিয়ে মেয়েদের রেপ করাবো। এই হলো দেশের একশ্রেণীর মানুষের ধারনা। আর তাদের পরোক্ষে, অনেকক্ষেত্রে প্রকাশ্যে মদত দিচ্ছে খোদ রাষ্ট্র। দলিত, সংখ্যালঘু, সেক্যুলার, মানবতাবাদীরা, সরকার, রাষ্ট্রের সমালোচনাকারীরা আক্রান্ত, অত্যাচারিত,পরাধীন,বিপন্ন। সারা দেশ জুড়ে তীব্র অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে। তাই দেশের এহেন পরিস্থিতিতে রাস্তা একটাই, ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ,রাস্তায় নেমে বুলেটের মুখে, ঝলকানো ছোরার সামনে।

#Not_In_My_Name

রবিবার, ২৫ জুন, ২০১৭

নারীর যৌনতা যে সমাজে ট্যাবু
___________________________

সুস্থ যৌনতা বলতে যেটা বোঝায়, সেটা আমাদের সমাজে ট্যাবু। ইদানীং আমাদের দেশের কিছু তথাকথিত গোষ্ঠীও এ ট্যাবুটাকে আরো বেশী করে  বাক্সবন্দী করতে ব্যস্ত। তাই বারবার সুস্থ যৌনতাকে বিকৃত করে উপস্থাপনা করা হচ্ছে (প্রচার করা হচ্ছে ময়ুর সেক্স করে না, ছেলে মুয়ুয়ের চোখের জল খেয়ে প্রেগন্যান্ট হয় মেয়ে ময়ূর!)। যৌনতাকে যে সমাজ ট্যাবু করে রেখেছে, সেখানে আরো একধাপ এগিয়ে নারীর যৌনতার অধিকার নিয়ে সওয়াল করলে সমাজের স্বঘোষিত কর্তারা যে ছি ছি করে তেড়ে আসবেন, আর সেই তেড়ে আসাতে কিছু পতাকাবাহী তাবেদার শ্রেণীর নারীও যে হাততালি দেবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। সেই ছি ছি কে উপেক্ষা করেই বাকি লেখাটা লিখছি। 

আমাদের প্রচলিত কোনো ধর্মগ্রন্থই নারীকে যৌনতা উপভোগের কোনো বিধান দেয়নি। কোনো ধর্মগ্রন্থের কোথাও বলা হয়নি  স্ত্রী যদি যৌনতায় সন্তুষ্টি লাভ না করে তবে স্বামীর পাপ হবে। বরং বিধান দিয়েছে নারীর একমাত্র কাজ স্বামীর যৌনতার আনন্দটুকু নিশ্চিত করা। স্বামী অক্ষম হলেও তাকে ছেড়ে যাওয়ার অধিকার নারীকে দেওয়া হয়নি। যে সমাজে যৌনতা শব্দটাই নিষিদ্ধ, সেখানে কোনো নারী যদি যৌনতার কথা বলে তাকে কি নামে ডাকা হয়, সেটা আমাদের কারুরই অজানা নয়। যাইহোক, সমস্ত বিষয়টাকে ধর্মের ছাঁচে ফেলে এমনভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছে যাতে নারীরা নিজেদের জন্য যৌন আনন্দ বলে যে কিছু আছে, সেটার কথা কস্মিনকালেও  না ভাবতে পারে। 

নারী পুরুষের তুলনায় যৌনতায় কখনোই পিছিয়ে ছিলো না। নারী যে পুরুষের চেয়ে যৌনতায় বেশি সক্রিয় এর অসংখ্য প্রমাণও আছে। 'সেক্স ডিফারেন্স ইন সেক্সচুয়াল ফ্যান্টাসি' বইটি তে এলিস স্যামন্স বলেছেন যৌনতার ক্ষেত্রে নারীরা অনেক সময় পুরুষের তুলনায় ৭ গুণ বেশি সক্রিয় থাকে। 

কিন্তু বাস্তবে যৌনতাকে পুরুষ নিজেদের কব্জায় রেখেছে যুগ যুগান্তর থেকে। নারীর ও যে কম বেশী যৌনচাহিদা থাকতে পারে সেটা তারা মেনে নিতে পারে না। বিছানায় যে নারী নিজে এগ্রেসিভ ভুমিকা নেয় বা পুরুষটিকে গাইড করতে চায়, তার সেই ডমিনেশন পুরুষটি মেনে নিতে চায় না, অথবা ভাবে নারীটির নিশ্চয় সেক্সের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। অতএব কর্তার ইচ্ছাই কর্ম। এবং যৌনতার ক্ষেত্রে পুরুষ তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। বেশীরভাগ পুরুষ নিজের তৃপ্তিটুকুই চায়, সঙ্গিনীও তৃপ্ত  কিনা, সে বিষয়ে ফিরেও দেখে না। যা প্রচন্ড রকমের স্বার্থপরতা। আমাদের সমাজে অনেক নারী ই আছেন যারা বছরের পর বছর অতৃপ্ত থেকেও সংসারধর্ম পালন করে যাচ্ছেন। পতি পরমেশ্বরের যৌন চাহিদা যন্ত্রনাদায়ক, বিরক্তিকর হলেও মুখ বুজে, লোকলজ্জার ভয়ে টু শব্দটি করছেন না। কারন, যুগ যুগ ধরে তাদের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আসা হয়েছে। যৌনতা কি সেটা পরিপূর্ণভাবে জানতে দেওয়া হয়নি। অধিকাংশ নারীই জানে না ‘অরগাজম’ আসলে কি? 

ধর্ম, সমাজ, নারীকে ছোট থেকেই পই পই করে শিখিয়ে দিয়েছে, নারীকে নিজের যৌনচাহিদা দমন করে রাখতে হয়, সেটার কথা মুখে বলা পাপ, সেটা যে নারী বলে সে বেশ্যা। বিধবাদের যৌনচাহিদা না হওয়ার জন্য তাদের আমিষ খাওয়া বারন। যৌন চাহিদা শুধুমাত্র পুরুষের আছে এবং যখন যেভাবে ইচ্ছা তারা সেটা মেটাতেও পারে। তাদের জন্য ঘর ও আছে, বাইরেও আছে। মধ্যযুগে কোন এক জায়গায় নাকি পরিবারের পুরুষেরা বিদেশ বিভুইয়ে যাওয়ার সময় পরিবারের নারী সদস্যের যোনী তালা দিয়ে যেত। কুমারী মেয়েদেরও বিয়ে না হওয়া অব্দি যোনী তালা দেওয়া থাকত। আমাদের দেশে আক্ষরিক অর্থে তালা দেওয়া হয়না বটে, তবে হাজার হাজার অদৃশ্য শেকল আর তালা নারীকে ঘিরে রাখে। নারী জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি শুধু দিয়েই যাবে, তার চাহিদা, ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনো মূল্য নেই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। 

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বলতে আমরা শুধু মারপিট কেই বুঝি। কিন্তু যৌনচাহিদা থেকে বঞ্চিত করাও যে একধরনের ডমেস্টিক ভায়োলেন্স সেটা আমরা বুঝতে চাই না। যৌনচাহিদা দমন করতে করতে একসময় অনেক নারী মানসিক ভাবে অসুস্থ ও হয়ে পড়তে পারে। ঘুম, খাওয়া, পায়খানা প্রসাব করার মতো যৌনচাহিদাও যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব প্রাণীর  একধরনের সাধারণ শরীরবৃত্তীয় ঘটনা, যা আমরা নিয়ন্ত্রন করতে পারি, উপেক্ষা নয়, এটা বুঝতে আমাদের সমাজের এখনো কয়েকশ বছর লেগে যাবে! 




রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

আমার পোষাক নিয়ে তোমার এত মাথাব্যাথা কেন, হে সমাজ!!




সেই ছোটোবেলা থেকে গ্রাজুয়েশন ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা অব্দি আমার চুল একদম ছোটো করে কাটা ছিল, মানে ছেলেদের চুলের মতো। ইদানীং একটু লম্বা হয়েছে। ছোটোবেলা প্রতি রোববার দিন বাপী আমাকে আর আমার ছোটবোন মুনকে সঙ্গে নিয়ে সেলুন থেকে চুল কাটিয়ে আনতেন। বড় হয়ে সেলুনে না গেলেও, পার্লার থেকে ছোট করে চুল কাটিয়ে আসতাম। ছোটোবেলা থেকেই আমি সবসময় প্যান্ট সাথে শার্ট বা টি-শার্ট পরতাম। এমনকি এখন অব্দি তার হেরফের হয়নি। এখন ও পরি। যতদুর মনে পড়ে প্রাইমারী স্কুলেও আমি প্যান্ট আর শার্ট পরে যেতাম। মাধ্যমিকে আমাদের স্কুলে মেয়েদের ড্রেস ছিলো শাড়ি। সমস্ত শাড়ি সেফটিফিন দিয়ে কোনোক্রমে গায়ে ঝুলিয়ে স্কুলে যেতাম।  জামা বা চুড়িদার আমাকে কখনো কিনে দেওয়া হয়নি। এখন ও নেই।  ছোট থেকে এগুলোই আমার পছন্দের পোশাক। মাঝে মধ্যে এখন অবশ্য ইচ্ছে হলে  শাড়ি পরি। তাও সর্বসাকুল্যে দু-তিন বারের বেশী পরিনি।

সে যাই হোক। আমার জীবনের রামকাহিনী লিখতে বসিনি এখানে। যে প্রসঙ্গে এই কথাগুলোর অবতারনা সেটা হলো, সেই ছোটোবেলা থেকে এই সমাজের একটা প্রশ্নে আমি জেরবার হয়ে আছি, সেটা হলো আমি ছেলে না মেয়ে? মেয়ে হলে সালোয়ার কামিজ না পরে প্যান্ট টি-শার্ট পরি কেন?? বয়কাট চুল কেন?? এক অদ্ভুত চোখে তারা দেখতে লাগলো আমায়। একটু বড় হওয়ার পর শুরু হলো ধর্মীয় অনুশাসনের কথা। গ্রামের বাড়ি বছরে যে দুবার যেতাম, গ্রামের চাচী,ফুফু, খালা, চাচাতো বোন, সবার একই কথার সাথে যোগ হলো আল্লার আদেশ উপদেশের কথা। এসব পোষাক পরলে পাপ হয়। নরকে যায় মৃত্যুর পর ইত্যাদি ইত্যাদি। বাপিকে একবার মসজিদের ইমাম বললেন আপনার মেয়েকে এসব পোষাক না পরিয়ে সালোয়ার কামিজ পরতে বলবেন। আমার বাপি বললেন, আমার মেয়ে কি পরবে না পরবে সেটা বলার আপনি কে? আমার মেয়ে তো খালি গায়ে হাঁটছে না! যথেষ্ট ভদ্র পোষাকই পরে আছে। সত্যি কথা বলতে কি বাপি কোনোদিন আমাদের  কোনো ধর্মীয় অনুশাসনে বেঁধে রাখেননি। মুক্তভাবে, মুক্তমনে বড় করেছেন। কৃষকসভা, পার্টির কাজ শেষে যেটুকু সময় পেতেন আমাদের বিভিন্ন ফাংশনে নিয়ে যেতেন, কমিউনিজম সম্পর্কে বোঝাতেন, প্রচুর বই কিনে দিতেন। পরিক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে বই উপহার দিতেন। কোনোদিন ছেলে-মেয়ের তফাৎ শেখান নি। সারাজীবন বাপির এই সাহস যুগানো থেকেই আজকের আমি হয়তো এইরকম হতে পেরেছি। যাইহোক, শুধু গ্রামের আত্মীয়-কুটুম ই নয়, প্রাইভেট টিউশনের বন্ধুরা থেকে শুরু করে পাড়ার বয়স্ক কাকিমা - সবার মুখে একই প্রশ্ন। এখনো। যেন আমার বয়কাট চুল আর প্যান্ট-শার্ট তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে!!

এসব প্রশ্ন আমার বড় অদ্ভুত  লাগে। আচ্ছা আমি ছেলে হই বা মেয়ে তাতে এই সমাজের মানুষের এত মাথাব্যাথা কেন?? তাদের এত সুড়সুড়ি কেন লাগে?? আমি বুঝতে পারি না। আমি তো কাউকে বলি না, তুমি কেন শাড়ী পরেছো? তুমি কেন সালোয়ার কামিজ পরেছো? তুমি কেন হিজাব পরেছো? তাহলে অন্য একজন কি পরলো, গলায় ওড়না দিলো কিনা, জিন্স-টি-শার্ট পরলো কিনা, সেটা নিয়ে তাদের এত মাথাব্যাথা কেন?? পোশাক মানুষ নিজের ইচ্ছেয় পরে। চুল মানুষ নিজের ইচ্ছেতে ছোট করে অথবা লম্বা করে! মানুষের ইচ্ছের উপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার কে এই মানুষগুলোকে দিয়েছে??

আসলে কি জানেন, নারীকে মাংসপিন্ড শুধু পুরুষ ই ভাবে না, ক্ষেত্রবিশেষে নারীরাও ভাবে। পুরুষতন্ত্র তাদের মাথায় পই পই করে ঢুকিয়ে দিয়েছে নারীর সংজ্ঞা। ভালো নারী খারাপ নারীর সংজ্ঞা। ভালো নারী মানে তোমাকে সালোয়ার কামিজ পরতে হবে। ভালো নারী মানে আধহাত ঘোমটা বা হিজাব পরা এক জড়বস্তু। যে বাবুরাম সাপুড়ের সাপের মতো 'করে নাকো ফোঁসফাস, নেই কোনো উৎপাত। একজন নারীর হাত, পায়ের পাতা, গলা, মুখ, সবই এই সমাজে সেক্স অবজেক্ট । তাই তাকে আপাদমস্তক ঢেকে থাকতে হবে। তার চুল কেমন হবে, হাঁটা চলা কেমন হবে হবে সেটাও পূর্বনির্ধারিত করে দেওয়া হবে। এর বাইরে কোনো মেয়ে অন্যরকম কিছু করতে চাইলেই সে খারাপ মেয়ে।

কিন্তু তারা জানে না তাদের এইসব প্রশ্নে আমার রাগ উঠে না, করুণা হয় তাদের প্রতি। করুণা হয় এটা ভেবে, তারা জানে না যারা পোশাকের দোহাই দিয়ে নারীকে বন্দি রাখতে চায়, একজন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায়, কুপুরুষের কুরুচিকে জায়েজ করতে চায়, তাদেরকে আমি মানুষ সারিতেই ফেলি না!!

সোমবার, ৫ জুন, ২০১৭


দেশ দেশ খেলা!






আজ দেশপ্রেম দিবস। কারন আজ ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ। প্রতিবার ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের সময়, আমরা দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে থাকি। 

বন্ধুরা মিলে খেলা দেখার সময়, পাশের মুসলিম বন্ধুটিকে শুনিয়ে, আরো জোরে জোরে বলে উঠবে, 'জিতেগা ভাই জিতেগা, হিন্দুস্তান জিতেগা' । তারা ধরেই নেবে পাশের বন্ধুটি যেহেতু মুসলিম, তাই সে পাকিস্তানের সাপোর্টার। ভারতের প্রতিটি সিক্সে অথবা পাকিস্তানিদের প্রতিটি আউটে বোমা ফাটানো হবে মুসলিম এলাকা দেখে। যেহেতু মুসলিম মানেই পাকিস্তানের সাপোর্টার। আজ মুসলিম প্লেয়াররা খারাপ খেললে তাদের দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অথচ, ইংল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যখন খেলা হয়, তখন কেউ এইরকম দেশপ্রেম দেখাতে আসে না!! 

এই প্রসঙ্গে আমার এক ছাত্রের কথা মনে পড়লো। কদিন আগে কমন রুমে তার সাথে কথা বলছি। ছেলেটির নাম ওয়াহাব। কথা প্রসঙ্গে উঠলো ক্রিকেট ম্যাচের কথা। ছাত্রটি বললো, ম্যাম জানেন আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন তোমার পাকিস্তানকে ভালো লাগে??  ও বললো, না ম্যাম, আমার পাকিস্তানকে ভালো লাগে না, তবু শুধু ক্রিকেট খেলার সময় আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার হয়ে যাই। আমার আরো অবাক হওয়ার পালা! তারপর বললো, ম্যাম, আমি ছোটো থেকেই শচীনের খুব বড়ো ফ্যান। আগে খেলার সময় আমি শচীনের জার্সি পরে খেলা দেখতাম। কিন্তু আমার বন্ধুরা পাকিস্তান হারলে আমাকে ক্ষেপাত, বলতো, দ্যাখ তোর দেশ হেরেছে! পাকিস্তান সিক্স মারলে আমায় বাজে ভাষায় গালি দিত। আমি যত ওদের বলতাম আমি ইন্ডিয়ার সাপোর্টার, ওরা তত ক্ষেপাত আমায়। এরপর আমি ভাবলাম, আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার নই, তবু ওরা আমায় বলে আমি পাকিস্তানের সাপোর্টার! তাহলে এবার থেকে আমি পাকিস্তানকেই সাপোর্ট করবো ক্রিকেটে। আর এরকম হতে হতে এখন ম্যাম আমি পাকিস্তানকে সাপোর্ট করি ক্রিকেটে!!

আমি ওকে বলেছিলাম একটা কথা সবসময় মনে রেখ, বেশীরভাগ মানুষ তোমার ভিতরে ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে চাইবে। কিন্তু তুমি সেই ফাঁদে পা দিয়ো না। বরং তুমি যেটা বিশ্বাস করো, যেটাকে মন থেকে ভালোবাসো, সেটাই করবে। তুমি মুসলিম, তাই তোমাকে পাকিস্তানের সাপোর্টার হতেই হবে, এইসব কথা যারা বলে তারা তোমার মধ্যে খুব পরিকল্পিত ভাবে ঘৃণা ঢুকিয়ে দিতে চাইছে। তুমি সেটা হতে দিয়ো না। ঘৃণার পরিবর্তে ঘৃণা নয়, ভালোবাসতে শিখো। ভালোবাসা ছড়াও। দেখবে ওরা হেরে যাবে। 

আসলে কি জানেন, ঘৃণা খুব ছোট্ট শব্দ, কিন্তু এর পরিধি বিশাল। টাকার কয়েনের মত ঘৃণারও দুদিক থাকে। একটা ছোটো ছেলে বা মেয়েকে এইরকম ঘৃণার আবহে বড় করে তোলা হচ্ছে। আর তারপর আমরা আশা করছি আমাদের ছেলে মেয়েরা সহিষ্ণু হবে!!? 










যুদ্ধটা আসলে নিজের পেটের সাথে, জাত-ধর্মের সঙ্গে নয় !!







এইমুহুর্তে আমার আপনার, মানে আমরা যুবসমাজের প্রধান সমস্যা কি বলুন তো? বেকারত্ব। আমরা একটা বয়স অব্দি লেখাপড়া করেছি, এক একটা ডিগ্রি নিয়ে রেখেছি, কিন্তু আমাদের হাতে কোনো চাকরী নেই। আমাদের মধ্যে প্রচুর আছে যারা অনেক আর্থিক অসুবিধার মধ্যেও নিজের পড়াশুনো টা চালিয়ে গেছে, শুধুমাত্র একটা ভালো চাকরীর আশায়। স্বপ্ন দেখেছি, এখনো দেখছি, একটা চাকরী পেলেই মা-বাবার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নেব। বিশেষত অনেক ছেলেরা আছে,  চাকরী নেই বলে বিয়ে করতে পারছে না। মেয়েপক্ষ এই সমাজে বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চায় না মেয়ের। 

ভারতবর্ষে এই মুহুর্তে শিক্ষিত বেকারের সমস্যা সবচেয়ে ভয়াবহ। সরকারী যে কোনো চাকরীতে আবেদন পত্র জমা পড়ছে কয়েক হাজার। শুধু এটাই নয়, নিম্নপদের চাকরীর জন্যেও আবেদন করছে অনেক উচ্চ শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা। অনেক ছেলে মেয়েরা লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলেও, মৌখিক পরীক্ষায় রিজেক্ট হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র ঘুষের টাকা যোগাড় করতে না পারায়, অথবা কোনো প্রপার চ্যানেল না থাকায়। যে কিছু সংখ্যক ছেলে মেয়ের টাকা আছে বা মন্ত্রী- বিধায়কদের সাথে চ্যানেল আছে তারাই চাকরী পাচ্ছে। বাদবাকীরা হতাশ হয়ে পায়ের স্যান্ডেল ছিঁড়ছে চাকরীর সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে। 

শুধুমাত্র সরকারী হিসেব মতেই, গত এক বছরে ভারতে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে এক কোটির মতো। অথচ কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র এক লাখ লোকের। গত বছর কেন্দ্রীয় সরকারের সাড়ে ২৪ হাজার শূন্যপদের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল প্রায় দেড় কোটি। চলতি অর্থ-বছরে পদের সংখ্যা ২৫ হাজার বাড়লেও এর বিপরীতে আবেদন ছাড়িয়ে গেছে আড়াই কোটি। এক বছরের মধ্যেই একই সংখ্যক পদের জন্য প্রায় এক কোটি প্রার্থী বেড়ে যাওয়ায় এটা স্পষ্ট, বেসরকারি খাতেও যথেষ্ট চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলছে। 

২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে বছরে এক কোটি ব্যক্তির কর্মসংস্থান করা হবে। এক কোটি  তো দূরে থাক, শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসেবে ২০১৬ সালে মাত্র দেড় লাখ চাকরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির কি হলো?? 

অথচ আমাদের যুবসমাজকে আমি কখনোই দেখি না নিজেদের রোজকার জীবনের এই চাওয়া পাওয়া বা অধিকার দাবী গুলো নিয়ে সরব হতে! সরকারকে প্রশ্ন করতে!  নিজেদের রোজকার জীবনের প্রয়োজনীয় দাবীগুলো ভুলে তারা ব্যস্ত গরু, ধর্ম, আর দেশপ্রেম-দেশদ্রোহীতা নিয়ে। মৌলবাদী শক্তিগুলো তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে ধর্ম আর জাতিবাদের বিষ। এই বিষ দেশ, সমাজকে বিষাক্ত করতে করতে যে তাদেরকেও  গিলে খাবে এটা তারা বুঝতে পারে না। 

তারা বুঝতে পারে না, এইভাবে ধর্ম, জাতি-বর্ণের নামে মিথ্যা প্রচার করে  মৌলবাদী শক্তিগুলো একটা বেকার যুবককে ভুলিয়ে দিচ্ছে, সে বেকার। একজন শ্রমিককে ভুলিয়ে দিচ্ছে, সে একজন শ্রমিক। তার কাছে প্রধান করে তুলছে তার হিন্দুত্বের পরিচয়। মোসলমানিত্বের পরিচয়।তাকে তার রুজি-রোজগারের চিন্তা ভুলিয়ে দিতে তার কানে কানে বলছে – ‘গরব সে কহো হাম হিন্দু হ্যায়’ অথবা  "বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদ করো, পৃথিবীতে ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠা করো।" 

তারা বুঝতে পারে না, এই উগ্র মৌলবাদী শক্তিগুলো গরীব মানুষদের তাদের জীবন-জীবিকার প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে দুরে সরিয়ে দিতে চায় ধর্ম, সম্প্রদায়ের দোহাই তুলে। গরীবী, বেকার সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধি, আর্থিক বৈষম্য, লিঙ্গ সাম্যের অধিকার, সর্বোপরি মানুষ যাতে তার বেসিক মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে কথা বলতে না পারে, তারজন্যে প্রতিনিয়ত খুব সূচারোভাবে তাদের মগজ ধোলাই করছে। মানুষকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে লড়িয়ে দিয়ে এই মৌলবাদী শক্তিগুলো নিজেরা 'রামরাজ্যের' হাওয়া খায়, 'ইসলামিক শাসনের' হাওয়া খায়।

তাই এবারে এই যুবসমাজকেই বুঝতে হবে, কোনটা আমাদের জন্য জরুরী?  ভাবতে হবে 'রামরাজ্যে' বা 'ইসলামিক শরিয়া আইনের দেশে' আমরা  একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো পাবো তো? চাকরী, আর্থিক অবস্থার উন্নতি সব হবে তো?? সাম্য পাবো তো? ভাবতে হবে, আর কতদিন আমরা আমাদের অধিকার গুলো থেকে বঞ্চিত হব? এবং বুঝতে হবে, ধর্ম, রামরাজ্যে, ইসলামী রাষ্ট্রের ফোলানো প্যাকেটে আমাদের পেট ভরবে না। বিধর্মী, নীচুজাত এদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ টা নয়, যুদ্ধটা নিজের পেটের সাথে। যুদ্ধটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের যোগান দিতে পারে না, আর্থিক রোজগারের পথ দেখাতে পারে না। 

তাই অনেক দেরী হয়ে যাওয়ার আগে ভাবো, এবং  নিজেদের মৌলিক দাবীগুলো আদায়ের জন্যে লড়াই করো। 








  








যে দেশপ্রেম নব্বই শতাংশের  ব্যথা-যন্ত্রণা বোঝে না, সেই দেশপ্রেম নিয়ে কী করবেন, হে আমজনতা?? 



" হামে চাহিয়ে আজাদি
মনুবাদ সে আজাদি 
ফ্যাসিবাদ সে আজাদি
পুঁজিবাদ–সামন্তবাদ সে আজাদি
জাতিবাদ সে আজাদি
মেহেঙ্গাই সে আজাদি
হাম লে কে  রহেঙ্গে আজাদি"

জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের তোলা এই স্লোগানে দেশে ঝড় উঠেছিলো কদিন আগে। এবং তার রেশ এখনো চলছে। এই শ্লোগানের নিরিখে দেশ জুড়ে শুরু হল দেশভক্ত আর দেশদ্রোহী খোঁজার পালা।কিছু মনগড়া ধারণা আর কিছু মিডিয়ার খাওয়ানো খবরের ভিত্তিতে শাসকের তাবেদার একশ্রেণীর জনগন তৈরি করলেন তাদের নিজস্ব মতবাদ/দেশপ্রেম,দেশদ্রোহী থিয়োরী। 

'আজাদি' মানে মুক্তি, 'আজাদি' মানে স্বাধীনতা। আর  এই আজাদি, স্বাধীনতা চাওয়াতে দেশের শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের তাবেদার শ্রেণী জনগনের বড় ভয়। শাসক শ্রেণী তো দূর, এই দেশের সাধারন মানুষেরাও ভেবে দেখতে চায়না, কোন পরিস্থিতি দেশের একশ্রেণীর মানুষ আজাদ ভারত থেকে আজাদি চাইছে। তারা ভেবে দেখতে চায়না কেন রোহিত ভেমুলারা শুধুমাত্র দলিত, আধিবাসী পরিচয়ের কারনে লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়? তারা ভেবে দেখতে চায়না কোন পরিস্থিতিতে মনিপুরের মেয়েরা নগ্ন হয়ে বলেন "ইন্ডিয়ান আর্মি রেপ আস"? কেন একজন মানুষকে দশক ধরে অনশন চালিয়ে দাবী জানাতে হয় 'আফস্পা আইন বাতিল করো'? কোন পরিপ্রেক্ষিতে রোহিত ভেমুলার মৃত্যুতে দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকরা প্রতিবাদ করে বলছেন, এটা সাধারন আত্মহত্যা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক খুন ? কোন পরিস্থিতিতে দেশের ভাত  যারা ফলায়, দেশের কনজিউমেবল গুডস গুলো যারা উৎপাদন করে সেই চাষীরা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন? কেন ছত্তিশগড়ের আদিবাসী নারীদের উপর শুধু দল বেঁধে ধর্ষণই নয় বরং তাঁদের স্তন টিপে দেখা হয় যে তাঁরা নকশাল কিনা ? 

ভাবুন হে আমজনতা। ভাবতে শিখুন।তারপর বলুন কারা দেশপ্রেমী? যারা একদিকে "ভারত মাতা কী জয়' স্লোগানে আকাশ বাতাস আন্দোলিত করে, অন্যদিকে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার, এমনকি আকাশ অব্দি তুলে দেয় সস্তায় বিদেশী কোম্পানির হাতে? যারা দেশের কৃষি পণ্যকে মাল্টিন্যাশনেল কোম্পানি গুলোর হাতে তুলে দিয়ে চাষীদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়? যারা বিদেশী কোম্পানির স্বার্থে শ্রম আইন সংস্কার করে এদেশের শ্রমিকদের ন্যুনতম অধিকার কেড়ে নেয়? 

কারা দেশপ্রেমী?? যারা একদিকে দেশের সেনা জওয়ানদের জন্য চোখের জল ফেলে, আবার সেই নিহত সেনার কফিন কেনার বরাদ্দ টাকা থেকে কাটমানি খায়?? জীবনদায়ী ওষুধের উপর থেকে নিয়ন্ত্রন তুলে নিয়ে, সেই ওষুধকে সাধারন মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে পাঠিয়ে দেয়? ডিমনিটাইজেশনের নামে বড় বড় কথা বলে দেশের ঋণের দায়ে জর্জরিত ব্যাঙ্কগুলোর ঝুলি ভরে আপনার আমার জমানো টাকায়, ওদিকে আদানীদের দুইশত কোটি টাকার 'গ্রীণফাইন' মাফ করে দেয়?? 

কারা দেশপ্রেমী? যারা আপনার আমার ট্যাক্সের টাকায় মার্কিন শিল্পপতিদের খুশী করতে ঘনঘন বিদেশ যাত্রা করে?? যারা দেশের মানুষের উপর গণহত্যা চালায় কথিত 'রামরাজ্য' সৃষ্টির লক্ষ্যে? সেই রামরাজ্য, যেখানে সীতাদের বারবার অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়! সেই রামরাজ্য যেখানে শুদ্র হয়ে জ্ঞানচর্চ্চা করার, তথা বেদ পাঠের অপরাধে শম্বুককে মৃত্যদণ্ডে দন্ডিত করা হয়!

কারা দেশপ্রেমী? যারা আমাদের দেশের সম্প্রীতির ঐতিহ্য ও ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করতে চায়? ধ্বংস করতে চায় এদেশের শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসকে? কারা দেশপ্রেমী? যারা তাদের মতের বিরুদ্ধে কথা বললেই মেয়েদের ধর্ষনের হুমকি দেয়? যারা মৃত সৈনিকের মেয়েকেও ধর্ষনের হুমকি দিতে দ্বিধা বোধ করেনি? যারা এই শতাব্দীতে এসেও ভাবে 'মেয়েদের স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই, তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করে রাখতে হয়'? যারা বিজ্ঞান মনস্ক মানুষদের গুপ্তহত্যা করে অপবিজ্ঞান ফেরি করে বেড়ায়? যারা সংখ্যালঘু নারীর পেট চিরে গুজরাটে গর্ভের ভ্রুণ বের করে এনে তলোয়ারের ডগায় নাচায়? কারা দেশপ্রেমী?? যে  উচ্চ বর্ণের পয়সাওয়ালা লোকেরা পায়ের উপর পা তুলে বলবে ওই নীচু জাতের লোকগুলো, ঐ ওদের অধিকার নিয়ে চিৎকার করা ছেলেমেয়েগুলো দেশের শত্রু, জঙ্গী, ওদের মেরে ফেলায় বা ওই মুসলমান মেয়েদের কবর থেকে তুলে একটু ধর্ষণ করলে ক্ষতি নেই?? দলিতদের গাছের সাথে বেঁধে মারলে কোনো দোষ নেই??  যারা মহিলাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় স্যানিটারী ন্যাপকিনের উপর ট্যাক্স বসায় তারাই কি দেশপ্রেমী?? 

যখন রাষ্ট্রনেতারা যুদ্ধে মাতেন আবার কিছুদিন পরে সেই শত্রুদেশের নায়কদের সঙ্গে কোলাকুলি করে চা খান সেগুলো দেশপ্রেম? খুন-ধর্ষণসহ অন্যান্য অভিযোগে অভিযুক্ত প্রার্থীদের বিপুল সংখ্যক ভোট দিয়ে নির্বাচনে জিতিয়ে মন্ত্রী  করার দায়িত্ব নেন যারা,  গর্হিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি জেলে থাকার পরও তাকে বিপুল সংখ্যক ভোট দিয়ে জিতিয়ে আনেন যারা , তারাই কি আমাদের প্রকৃত দেশপ্রেমীকগন ? এর নাম দেশপ্রেম?



আর বলুন কারা দেশদ্রোহী? যারা রাষ্ট্রের কাছে দাবী করে আমাদের দেশের সম্পদের উপর আমাদের দেশের মানুষেরই অধিকার? যারা মনে করে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকজন মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে বাস করার অধিকার আছে? যারা সাহসের সাথে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আকাশে ছুড়ে দিয়ে বলে দেশের প্রতিটি মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজের অধিকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে? যার প্রকৃত অর্থে ভারতবর্ষকে একটা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ গড়ে তুলতে চায়?? যারা ভাবে দেশটা প্রতিটি জাতিসত্বার মিলনে প্রকৃত অর্থে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠুক?? যারা চায় সীমান্তে আমাদের দেশের ছেলেদের এভাবে যেন আর মৃত্যু নাহয়?? যারা বলে যুদ্ধ শুধু ধ্বংস করে, সৃষ্টি নয়? যারা চায়, বর্ণ ব্যবস্থা, জাতি ব্যবস্থা ভেঙ্গে দলিত, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীরাও যেনগর্বের সাথে তাদের আত্মপরিচয় নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে? যারা স্বপ্ন দেখে, সব ধরনের শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন থেকে মুক্ত একটা দেশ?? কারা দেশদ্রোহী? যারা প্রশ্ন তুলে, গণতন্ত্র মানে কি দেশের সবচেয়ে গরিব ৮৩ কোটি মানুষের উপর যুদ্ধ ঘোষণা করা ? গণতন্ত্র মানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়ে ভোটে জেতা ? যারা প্রশ্ন তুলে আদানি, আম্বানি, টাটা, জিন্দল, যোগী, সাধ্বীদের শাসনের উপর?? বিদেশী পূজির পা না চাটে না যারা যারা দেশদ্রোহী?? সাধারণ মানুষের করের পয়সায় পার্লামেন্ট ক্যান্টিনে যে মন্ত্রীরা ১০টাকা ৯০পয়সার মটন কাটলেট চিবিয়ে দেশোদ্ধার  করেন, তাদের উপর যারা প্রশ্ন তুলে,তারা দেশদ্রোহী??  সুপ্রীম কোর্ট ও সংবিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতি প্রশ্ন যারা তুলে , তারা দেশদ্রোহী? যে দেশের শতকরা ষাটভাগ মানুষের ঘরে পানযোগ্য জল নেই, না আছে শিক্ষা না আছে দু মুঠো ভাত, মাথার উপর না আছে চাল,না চিকিৎসার সুযোগ, তাদের অধিকারের কথা যারা বলে, তারা দেশদ্রোহী ? যারা প্রশ্ন তুলে কাশ্মীরিদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তারা দেশদ্রোহী?? পৃথিবীর দিকে তাকান, স্কটল্যান্ড গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে থাকা নিয়ে  গণভোট হয়। কুইবেক প্রদেশ কানাডার মধ্যে থাকবে কিনা সেটা নিয়েও কয়েকবার গণভোট হয়েছে। এটাই গনতন্ত্রের চাহিদা। অথচ ভারতবর্ষে কেউ যদি কাশ্মীরিদের গণভোটের দাবি তোলে, সে হয়  দেশদ্রোহী? 

একদিকে শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন, শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের চাকরী সংস্থান নেই, চারদিকে বেকারত্ব, অন্যদিকে কৃষকরা আত্মহত্যা করছে। এই শ্রমিক, শিক্ষিত, অশিক্ষিত ছেলেমেয়ে, কৃষকরাই ভারতীয় জনগনের নব্বই শতাংশ। যে দেশপ্রেম আপনার আমার, আমরা নব্বই শতাংশের  ব্যথা-যন্ত্রণা বোঝে না, সেই দেশপ্রেম নিয়ে কী করবেন, হে আমজনতা?? ভেবে দেখেছেন কখনো?