এই ব্লগটি সন্ধান করুন

মঙ্গলবার, ১২ জুন, ২০১৮

বিরসা মুন্ডা - এক শেষ না হওয়া লড়াইয়ের নাম
___________________________________________

"কেউ যদি আমাদের অরণ্য মাকে কেড়ে নিতে চায়, কেউ যদি আমাদের জাতিকে খারাপ বলে, কেউ যদি আমাদের ধর্মকে ধর্ম মনে না করে, কেউ যদি আমাদের শুধু শোষণ করে তবে আমি বিদ্রোহ করবই।"

আদিবাসীদের নিজস্ব জীবনের জন্য, জল-জঙ্গল-মাটির ন্যায্য অধিকারের জন্য
যিনি লড়াই করে জীবন দিয়েছিলেন, উনিশ শতকে যাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম আদিবাসী বিদ্রোহ অথবা বলা যায় অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রথম ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াই, এই কথাগুলো তিনিই বলেছিলেন। আজ তাঁর ১১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। ৯ই জুন ১৯০০ সালে জেলের মধ্যে খাবারে বিষ মিশিয়ে তাঁকে খুন করে তৎকালীন ইংরেজ সরকার।

তিনি বিরসা মুন্ডা। আদিবাসীদের কাছে ভগবান বিরসা। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ভোরের পাখি। এ রকম ভোরের পাখিদের কলকাকলীই তো বয়ে এনেছিল স্বাধীনতার সোনালি সকাল। দুঃখের বিষয় এটাই বিরসা মুন্ডা তথা মুন্ডা বিদ্রোহের ইতিহাস স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষের বেশীরভাগ ছেলেমেয়েই জানে না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কথা নাহয় বাদ ই দিলাম। অবশ্য তাতে তাদের তেমন দোষ ও তো দেখি না। কারন বৃটিশ পরবর্তী ভারতবর্ষের ইতিহাস বিরসা দের চিরকাল ব্রাত্যই রেখেছে। পাঠ্যপুস্তকের সিলেবাসে রাষ্ট্র শুনিয়েছে (এখনোও) মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী, নেহরু, প্রমূখ রাই ভারত নামক রাষ্ট্রটিকে স্বাধীন করিয়েছেন। (২০১৪ পরবর্তী ভারতবর্ষ অবশ্য নেহরু, গান্ধীদেরও খলনায়ক আখ্যা দিয়ে সাভারকরদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নতুন নায়ক হিসেবে পাঠ্যপুস্তকে হাজির করিয়েছে)।  নিদেনপক্ষে ভারতীয় সিনেমা ভগৎ সিং, মঙ্গল পান্ডেদের নিয়ে সিনেমা করিয়ে বলেছে না না এঁরাও ছিলেন। কিন্তু উনিশ শতকে প্রথম বৃটিশ উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন যে আদিবাসী মুন্ডারা গড়ে তুলেছিলেন, সে কথা আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলো খুব সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছে। এখনো যায়। 

এর কারন হয়তো, মুন্ডা বিদ্রোহ মূলত ইংরেজদের বিরুদ্ধে হলেও আসলে তো এই বিদ্রোহের ভিত ছিল সর্বপ্রকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে। এবং সেই শোষক শুধুমাত্র বৃটিশ রা ছিল না, ভারতের ভিন্নভাষার, ভিন্ন বর্গের - বিহারি, পাঞ্জাবী, বাঙ্গালী, রাজপূত, জমির মালিকরা ও ছিল। আদিবাসীদের ভাষায় 'দিকু'। এরা আদিবাসীদের নানাভাবে শোষন করতো। চড়া ঋণের দায়ে ফেলে, সুদের জালে আটকে তাদের জমিজমা কেড়ে ভূমিদাসে পরিণত করত। আজ ও করছে। হয়তো জমিদারি প্রথার বদলে কর্পোরেট আদলে। কেড়ে নিত বা নিচ্ছে তাদের জল-জমি-অরণ্যের অধিকার। খাবার, ঘরবাড়ী, জমি, জঙ্গল হারিয়ে অসহায় হয়ে টাঙি, বর্শা নিয়ে রাষ্ট্রের গুলির সামনে এসে দাড়াতে হয় তাদের আজ ও। তাই এদের কথা রাষ্ট্র তার পাঠ্যপুস্তকে দিতে ভয় পায়। তার নাগরিকদের জানাতে ভয় পায়।

বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট এবং বিদ্রোহ ...
______________________________

ঊনিশ শতকের গোড়ার দিক।  মুন্ডারা দেখল তাদের পরিষ্কার করা জমি বণিক ও মহাজন বেশে আসা জায়গিরদার ও ঠিকাদারের হাতে ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মুন্ডাদের জমি হারানোর এই প্রক্রিয়া ব্রিটিশদের ভারতে আসার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল কিন্তু ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার  সাথে সাথে আদিবাসী অঞ্চলে অ-আদিবাসীদের আসা-যাওয়া ভীষণভাবে বৃদ্ধি পায়। সাথে বাড়তে থাকে বলপূর্বক শ্রম এর ঘটনা। একদিকে  মহাজন ও জমিদারদের অকথ্য অত্যাচার, নির্যাতন,  অপরদিকে বৃটিশ সরকারের উচ্চহারে কর আদায়। একদিকে অনাহারে মানুষের দিন কাটছে অন্যদিকে খাদ্যের লোভ দেখিয়ে একশ্রেণীর মিশনারিরা মুন্ডাদের খ্রীষ্টান ধর্মে ধর্মীন্তরিত করার প্রবল চেষ্টা চালাচ্ছে। বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে তখন শুরু হয়  গ্রামের পতিত জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলন।

সমস্ত  দেশের অসংখ্য আদিবাসীরা একে একে বিরসা মুন্ডার ডাকে সাড়া দিয়ে বিদ্রোহে সামিল হয়। ভয় পেয়ে বৃটিশ সরকার বিরসা মুন্ডাকে  সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করে  এবং  শেষে  ১৮৯৫ সালে বিরসা মুন্ডাকে  দুবছরের জন্য কারাগারে বন্দি করে। মহাজন, জায়গীরদাররা মুন্ডাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে।

জেল থেকে বেরিয়ে বিরসা মুন্ডা নতুন কূটনীতির আশ্রয় নেন। এক গভীর জঙ্গলে নৈশ ভোজন করার জন্য জায়গীরদার, মহাজন,  হাকিম ও খ্রিষ্টানদের আমন্ত্রণ করেন তিনি। একদিকে ভোজের আয়োজন তার সাথে আদিবাসীদের গান ও সুরা এসবের মধ্যেই বিভোর হয়ে থাকে তারা। অন্যদিকে বিরসার ইশারায় ঝোপঝাড়ের মধ্যে থেকে উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর। মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ হারায় বেশ কয়েকজন জায়গীরদার, মহাজন, হাকিম ও মিশনারি।

ব্রিটিশদের অমানুষিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে ১৮৯৯ সালে বড়দিনের আগে মুন্ডারা রাঁচি ও সিংভূম জেলার ছয়টি থানায় আগুন লাগায়। এই কান্ডকলাপে ব্রিটিশরা বিরসার উপর আরও খেপে ওঠে এবং চরম প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। বিরসা মুন্ডা সহ তার সমগ্র বিপ্লবী দলকে বন্দী করতে সমর্থ হয় ব্রিটিশ সরকার। চারিদিকে তখনও বিক্ষিপ্তভাবে চলছিলো মুন্ডা বিদ্রোহীদের আন্দোলন। ব্রিটিশ সরকার এই আন্দোলনকে একেবারে নির্মূল করার জন্য ৩০০ র উপর বিদ্রোহীকে হত্যা করার পাশাপাশি অসংখ্য বিদ্রোহীকে কারারুদ্ধ করে। বিরসা মুন্ডাকে জেলের মধ্যেই খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়। 

রাজা আসে রাজা যায়, চরিত্র থাকে একই ...
___________________________________

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের প্রথম দশক থেকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের যে ভীত রচিত হয়েছিল তার সামনের সারিতে ছিলেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের লড়াকু মানুষেরা। "বাবা তিলকার লড়াই"  (১৭৭৫-৮৫), "সিদো-কানহুর হুল" (১৮৫৫-৫৬), "বীরসা মুন্ডার উলগুলান" (১৮৭২-১৯০০), "ভগীরথ মাঝি এবং জ্ঞান পারগনানার আন্দোলন", "দুবিয়া গোঁসাইয়ের খেরওয়াল আন্দোলন" (১৮৮০) সেদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।

অথচ সভ্য ভারতবর্ষ তার অরণ্যের কালো ছেলে- মেয়েগুলোকে  ঠিক আপন বলে চিনতে পারেনি আজোও। এদের অভাব-অভিযোগের নালিশকে বর্বর, কালা আদমির অভ্যুত্থান বলে নাক সিটকেছে। কখনো উগ্রপন্থী, মাওবাদী তকমায় ভূষিত করেছে এদের বেঁচে থাকার লড়াইকে। নিজের অধিকার আদায়ের লড়াইকে। ঋকবেদেও দেখা যায় এদের রাক্ষস, অসুর, জন ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে। সুতরাং একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সভ্যতার শুরু থেকে আজ অব্দি ভারত নামক ভূখন্ডের আদি বাসিন্দারাই সবচেয়ে বেশী অবহেলা, নির্যাতন আর শোষনের শিকার। বৃটিশদের হাতেও শোষিত হয়েছে এরা আবার নিজ ভূখন্ডের অন্যান্য বাসিন্দাদের হাতে আজোও শোষিত হয়ে যাচ্ছে।

সংবিধানের ৩৪২ (১) নং ধারায় আদিবাসীদের অধিকারের বিভিন্ন কথা ফলাও করে লিপিবদ্ধ করা আছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল সেগুলি আছে শুধু কাগজে কলমেই। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও কেড়ে নেওয়া হয় তাদের পাট্টা, বর্গা, ফাঁসানো হয় মিথ্যা মামলায়! বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পে বহু সংখ্যক আদিবাসী বিনা ক্ষতিপূরণ বা নামমাত্র ক্ষতিপূরণে উৎখাত হোন নিজেদের জমি থেকে। ভারতীয় সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে আদিবাসী এলাকার দখলে থাকা  জমি হস্তান্তরে গ্রাম সভার অনুমতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংবিধানকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোন প্রকার অনুমতি ছাড়াই শিল্প স্থাপন ও খনিজ উত্তোলনের জন্য কেন্দ্র ও অনেক রাজ্য সরকার বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি, কর্পোরেট সংস্থাকে দিয়ে যাচ্ছে!

তাই আজকের সময়ে দাড়িয়ে আবার একজন বিরসা মুন্ডার খুব প্রয়োজন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর হাত থেকে নিজেদের জল-জমি-অরণ্যের অধিকার ছিনিয়ে আনতে আরেকটা উলগুলান আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাক আগামীর বৃহত্তম লড়াইয়ের ময়দানে। সংঘবদ্ধ করে তুলুক আমাদের।

শেষ করা যাক শবর সম্প্রদায়ের একটা গান দিয়ে -

"বাস করি ধুঁদে ঝাড়ে
ব্যাঙ, ইঁদুর মারে খাই
বোইল্যে দে-ন ভাই
ইটাকে কি বাঁচা বলা যায়?
বন-বাদাড় হ'রে ‍‌লিল-শিকড় বাকড় ফুরাঞ গেল
কেমন ক'রে কাল কাটাই?"

রবিবার, ৩ জুন, ২০১৮

জগাই'র পরীক্ষা বেত্তান্ত
***********************

কোনো এক অখ্যাত কারনে স্কুল হইতে শুরু করিয়া সমস্ত জেলায় এমন কেহই ই নাই, যে জগাই কে চেনে না!  যে মুখচোরা, গরুর মতো নিরীহ ছেলেটি বা মেয়েটি কাহাকেও চিনে না, কাহাকেও জানে না, সেও সবার আগে জগাইকে চিনিয়া লয়। কারন তার কথাবার্তা, ব্যবহার, মুখের চেহারায়, পোশাক পরিধানে এমন কিছু আছে, যাহা দেখিয়া সবাই বুঝিতে পারে এই মেয়েটিই জগাই। তাহার চোখদুটি অসম্ভব রকমের ছোটো এবং মাথায় চুলের বদলে এক বস্তা তামার তার চতুর্দিকে স্প্রিং এর মতো ছড়াইয়া ছিটাইয়া পড়িয়াছে। সে যখন রাগ করিয়া তাহার ছোট ছোট চোখদুটিকে আরো ছোটো করিয়া মাথার তামার তারগুলি ঝাকাইয়া ঝগড়া করিতে করিতে চিংড়ি মাছের মতো হাত পা ছুঁড়ে, তখন ওপাড়ার গবা পাগলাও নিশ্চিত হইয়া যায়, এ জগাই ই!  ছোটবেলা হইতেই কোনো এক অজানা কারনে জগাই'র মা জগাইকে 'বৃটিশ' বলিয়া ডাকেন..!! জগাই বহুবার তাহার মাকে বহুভাবে  জিজ্ঞাসা করিয়াও সেই ডাকের রহস্য ভেদ করিতে পারে নাই। যাহা হউক সে বেত্তান্ত নাহয় আরেকদিন বলা যাইবে। এক্ষনে তাহার পরীক্ষা বেত্তান্ত বলা যাক। 

জগাই সারাজীবন পরীক্ষাকে যমের মতো ভয় পাইয়া আসিয়াছে, কিন্তু তাহার জীবনেই বারবার পরীক্ষা নামক যমদেবতাটি ঘুরিয়া ফিরিয়া আসে। সারাজীবন প্রতিটা পরীক্ষা দিয়া সে মনেমনে নিশ্চিত থাকে সে ফেইল করিবে, কিন্তু কিভাবে যে সে পাশ করিয়া ফেলে তাহা সে নিজেও বলিতে পারে না। 

মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে জগাই তাহার ইলেক্টিভ সাবজেক্ট লইয়াছিলো ইতিহাস। তখন সমগ্র জেলার অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রী ইলেক্টিভ সাবজেক্ট লইয়াছিল ঐচ্ছিক অঙ্ক/সংস্কৃত/হিন্দি। ইতিহাস কেহ ই নেয় নাই, যার দরুন ইতিহাস বই ও লাইব্রেরীতে আসে নাই। জগাই  প্রথম তিন চার মাস খোঁজ লইয়া যখন দেখিল ইতিহাস বই আসার আর কোনো চান্স ই নাই, তখন সেও হাল ছাড়িয়া  তাহার অন্যান্য কাজে মনোনিবেশ করিল। সারাবছর ঘরের সবার বিশেষত মা- বাপী-মেজদির সব বকা-মার-মানসিক হেনস্তা- তাচ্ছিল্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইয়া  জগাই নাচিয়া কুদিয়া, সিনেমা দেখিয়া, ঝগড়া করিয়া, হো হো করিয়া হাসিয়া, রাক্ষসের মতো খাইয়া -দাইয়া, অক্টোপাসের মতো হাত পা ছুড়িয়া ঘুমাইয়া কাটাইলো। যথারীতি পরীক্ষা আসিল এবং জগাই সকালে মায়ের হাতের শিঙি মাছের ঝোল দিয়া হাপুস হুপুস করিয়া ভাত খাইয়া, মাথায় তেল দিয়া বাপীর হাত ধরিয়া পরীক্ষা দিতে গেল। প্রশ্ন দেখিয়া জগাই প্রথমে ভয় পাইলো, তারপর সেই ভয়কে ফেইস করিয়া সে লিখিতে বসিল। জগাই লিখিল। যাহা তাহার মনে আসিল সে লিখিয়া গেল। পরীক্ষার ফাইনাল ঘন্টা বাজার আগে সে পাশের ছেলেটির খাতার দিকে একবার এমনিই চাহিয়া ছিলো, কিন্তু ইনভিজিলেটর জগাইর চাওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখিলেন এবং তাহাকে কড়া চোখে ধমক দিলেন। জগাই দাঁতে দাঁত চাপিয়া ক্রোধ সংবরণ করিল। যাহাহউক, এভাবে ইতিহাস পরীক্ষায় ও সে লিখিল। মোগল সম্রাট  ঔরঙ্গজেব সম্পর্কে বড় প্রশ্নটির উত্তর লেখিয়া নিজের ক্রিয়েটিভিটি দেখিয়া জগাইর  নিজেকে নোবেল প্রাইজ দিতে ইচ্ছা জাগিল। 

যথারীতি পরীক্ষার ফলপ্রকাশের দিন আসিল। ঘরের সবাই নিশ্চিত জগাই ফেইল করিবে। জগাই ও নিশ্চিত। সকাল হইতেই সে বুঝিতেছে ঘরের সবাই তার দিকে কেমন যেন অদ্ভুত চোখে তাকাইতেছে। জগাই ভাব সুবিধের নয় বুঝিয়া  সকাল সকালই রান্নাঘরে গিয়া ভাত এবং আর যা যা ছিলো তা খাইয়া ফেলে কারন রেজাল্টের পর যে তাহার ভাগ্যে মার ছাড়া আর কিছুই জুটিবে না, তাহা সে বিলক্ষন জানিত। বেলা এগারোটার দিকে মা-বাপী-মেজদি তিনজন গেলেন জগাইর রেজাল্ট দেখিতে। লিস্টের শেষ থেকে দেখা শুরু করলেন তিনজনাই। কারন তারা জানিতেন উপর দিকে দেখা জগাইর ক্ষেত্রে বৃথা। কিন্তু লিস্টের শেষে মানে থার্ড ডিভিশনে যখন দেখিলেন জগাইর নাম নাই, তখন মা-বাপী ফিরিয়া আসিতে উদ্যত হইলেন। মেজদি কোন এক অজানা কারনে আরেকটু উপর দিকে দেখলো, তারপর আরেকটু উপরে দেখলো জগাইর নাম মিটমিট করিতেছে। ওদিকে জগাইর টেনশনে অথবা অতি খাওয়ার ফলে পেটখারাপ হইয়াছে। সে টয়লেট আর ঘরে পর্যায়ক্রমে দৌড়াইতেছে। এমন সময় দেখে তাহার যমের মতো বাবা মিষ্টির প্যাকেট লইয়া ঘরে ঢুকিতেছেন, পেছনে একগাল হাসিয়া তাহার মাতৃদেবীও..! জগাই যখন বুঝিলো পিঠে মার নাই, জগাই অতিরিক্ত ভাব দেখাইয়া বলিল, "কি? খুব তো বলেছিলে ফেইল করবো, এখন কি?" বলিয়া দুপদাড় করিয়া নিজের রুমে ঢুকিয়া হো হো করিয়া উপুড় হইয়া হাসিল অনেকক্ষণ। কেন হাসিল তাহা সে নিজেও বুঝিতে পারে নাই।

উচ্চমাধ্যমিকও একই রকম কাটাইলো জগাই। সে নির্ঘাত জানিত ইকোনমিক্সে ফেইল করিবে। ঘরের সবাই ও নিশ্চিত ছিলো মাধ্যমিক উতরে গেলেও উচ্চমাধ্যমিক উতরানো এর কম্মো নয়। যথারিতী রেজাল্টের দিন ও মাধ্যমিকের পুনরাবৃত্তি ঘটিলো। জগাই দন্তবিকশিত করিয়া গ্রাজুয়েশনে ভর্তি হইলো। জগাইর ইচ্ছা ছিলো ফিলসফি নিয়ে পড়বে, জগাইর রাগী পিতৃদেব তাহাকে ইংলিশ অনার্স দিয়া ভর্তি করাইলেন। জগাই প্রথমে প্রতিবাদ করিয়াছিল, কিন্তু দু-তিনটে চড় থাপ্পড় খাইয়া সে জেদ তাকে ছাড়তে হলো। জগাই ক্লাসে যায়, কিন্তু কিছুই সে বুঝিতে পারে না। জগাই ইংলিশ অনার্সের বই রাখিয়া অফ পিরিয়ডে লাইব্রেরীতে বসিয়া "কালবেলা" পড়ে, ফ্রয়েড পড়ে, ইমানুয়েল কান্ট পড়ে, ভারতীয় দর্শনের বই পড়ে। বাড়ীতে আসিয়া নাক ডাকাইয়া ভোস ভোস করিয়া ঘুমায়, তারপর রাত জাগিয়া কম্পিউটার গেম খেলে।  ক্রমে পরীক্ষা আসিল। জগাই  পরীক্ষার আগের রাতে মনোযোগ সহকারে দিদির মোবাইলে "ব্লক পাজল্" গেম খেলিল। পরীক্ষার হলে  প্রশ্ন দেখিয়া জগাই ভাবিল পাস মার্ক তোলা যাইবে। জগাই লিখিতে বসিল, কিন্তু অদৃষ্টের নিষ্ঠুর পরিহাসে লিখিতে বসিয়াই তাহার চোখে ভাসিয়া উঠিল ব্লক পাজল গেইমের "লাল-নীল গুটি"। জগাই চোখ বন্ধ করিয়া ভাবিতে বসিল। সব মনে আসে জগাইয়ের, কবে কাকে মুরগি বানিয়েছিল, কিভাবে রান্নাঘরে ঢুকিয়া কড়াই হইতে  চিংড়ি মাছ ভাজা সব খাইয়া বেড়ালের উপর দোষ ফেলিয়াছিল, কিভাবে বড়দির প্রসাধন বাক্স হইতে  মুখে মাখার ক্রিম চুরি করিয়া মেজদির ঘাড়ে দোষ ফেলিয়া বড়দি মেজদির ডব্লিউ ডব্লিউ ই লাইভ দেখিয়াছিল, কিভাবে ছোটোবোনের পয়সা জমানোর মাটির ঘট হইতে নরুন দিয়ে টাকা বের করিয়াছিল, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর তাহার মনে আসে না। কোনোরকম যাহা মনে আসিল টুকরো টাকরা ভাবে, সে তাহাই লেখিল।  এইভাবে তিনটে বছর কাটাইয়া সে কোনোক্রমে গ্রাজুয়েশন পাস করিল। তাহার পর এম. এ ও পাশ করিল। 

এম. এ করিয়া জগাই ভাবিয়াছিল আর তাহাকে পড়িতে হইবে না। পরীক্ষায়ও বসিতে হইবে না। কোনোমতে স্কুলে একটা চাকরী জুটাইয়া জগাই মনের সুখে তাহার কাজকর্ম চালাইয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু ভাগ্য জগাইর এই অবস্থা মেনে লইবে কেন! আবার ডি.এল.ইডি নামক এক পরীক্ষা আসিয়া তাহার জীবনে উপস্থিত হইলো। জগাই শুনিলো ডি এল ইডি খুব সহজ, না পড়িলেও তাতে পাশ করা যায়। জগাই তাহাই বেদবাক্য বলিয়া ধরিয়া লইলো। সারাবছর সে ফেইসবুক করিয়া, লোকজনের পোষ্টে পোষ্টে গিয়া তাদের খিস্তি দিয়া, ছবি আঁকিয়া, গেইম খেলিয়া, হি হি করিয়া, নিয়ম ছাড়া খাইয়া, সিগারেট ফুকিয়া, ইস্কুলে গিয়া, সিরিয়াস মুখে ছাত্র-ছাত্রীদের উপদেশ বাণী ঝাড়িয়া দিন কাটাইলো। পরীক্ষার আগের রাতে বইখাতা মেলিয়া তাহার উপরে অক্টোপাসের মতো হাত পা ছুড়িয়া সে ঘুমাইলো এবং পরদিন গাড়ী করিয়া পরীক্ষা দিতে গেল। পরীক্ষা হলে দেখিলো তাহার ই এক ছাত্রী তাহার আগের ডেক্সে বসিয়াছে। এবং ছোটোবেলা যে ছেলেটার মাথা ব্যাট দিয়া ফাটিয়েছিল, সে তাহার নিজের ডেক্সে বসিয়াছে। জগাই যে কাউকে একটা ছোটো প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞেস করিবে, সে উপায় ও নাই। কারন তাহার এই ছাত্রীটিকে সে পড়ালেখা যে কত সহজ এবং পরীক্ষা হলে যে নিজের খাতার দিকে চেয়ে লেখতে হয়, সে সম্পর্কে একদা অনেক জ্ঞান ঝাড়িয়াছিল। যাইহোক, জগাই প্রথমে ছোট প্রশ্ন গুলো লিখিল। বড় প্রশ্ন দুইটা তাহার জানা ছিলো, সেইগুলি সুন্দর করিয়া ব্যাখ্যা করিয়া ফিক ফিক করিয়া হাসিয়া হাসিয়া লিখিতে লিখিতেই দুই ঘন্টা পার হইয়া গেল। বাকী এক ঘন্টা সে পাঁচ মার্কের ছয়টা প্রশ্নের মধ্যে মাত্র তিনটে কোনোমতে লিখিতে পারিল। একটা প্রশ্নের উত্তরের জন্যে পিছনের জনার খাতার দিকে একবার মোটে তাকিয়েছিল, কিন্তু যেই দেখলো ওর ছাত্রীটি ওর দিকে দেখিতেছে, সে তাড়াতাড়ি সোজা হইয়া বসিল। বাকী দুদিনের পরীক্ষা ও একই রকম গিয়াছে। সে এখনো নিশ্চিত নয় সে পাশ করিতে পারিবে কি না।  যাহাহউক, পরীক্ষা দিয়া সে প্রতিদিনই আপন মনে 'লাল গানে নীল সুর, হাসি-হাসি গন্ধ ' গাহিতে গাহিতে বাড়ী ফিরিয়াছে। নিন্দুকেরা তাহা দেখিয়া ভাবিয়াছে না জানি তাহার পরীক্ষা কতই না ভালো হইয়াছে!!