এই ব্লগটি সন্ধান করুন

শনিবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৭


তোমার রসিকতা এবং আমার রাগ, হে আমার পুরুষবন্ধু
_______________________________________________




শুরুতেই একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। এক নবাবের সভায় সবচেয়ে ধারালো অস্ত্রের প্রতিযোগীতা চলছে। অনেক লোক প্রতিযোগীতায় নাম লিখিয়েছে। কেউ হাতের তলোয়ার দিয়ে লোহা কাটছে, কেউ বর্শা দিয়ে গাছের গুড়ি এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে। তো এরকম এক ওস্তাদ, তার সামনে এক পালোয়ানকে দাড় করিয়ে তরোয়াল ঘোরালেন, পালোয়ানটিকে তখনও দাড়িয়ে থাকতে দেখে ওস্তাদ বললেন, বেয়াদব, সেলাম করো। পালোয়ানটি যেই ঝুকলো ওমনি তার মাথা খসে পড়ে গেল। নবাব বাহবা দিয়ে ওস্তাদকে পুরস্কার দিতে যাবেন এমন সময় এক রোগা হাড় ঝিরঝিরে লোক ছুটে এলো তার পুরো মুখ ঢাকা বউকে নিয়ে। জাঁহাপনা, সব চাইতে ধারালো অস্ত্র দেখে নিন, বলেই বউয়ের মুখের কাপড় খুলে দিল সে। লম্বা জিভ বের করে দিল বউ। ব্যস পুরস্কার নিয়ে গেল রোগা লোকটাই। মেয়েদের জিভের চাইতে ধারাল অস্ত্র হয় নাকি?

আমাদের সমাজের পুরুষদের অধিকাংশ রসিকতাই নারীকেন্দ্রিক। অথবা এভাবেও বলা যায়, আমাদের সমাজ নারীদের নিয়ে রসিকতা করতে খুব পছন্দ করে। নারীদের হেয় করে, তাদের নিয়ে রঙ্গরস করে আলাপ না করলে আমাদের সমাজের পুরুষদের আড্ডা জমে না। শুধু কি আড্ডা! সোস্যাল মিডিয়ায় ও নারীদের নিয়ে নিম্নমানের রসিকতা রীতিমত ট্রোল করা হয়। এবং ওই ট্রোল পেজ গুলোতে হাজার হাজার লাইক কমেন্ট উপচে পড়ে। 

এই ফেসবুকেই বিভিন্ন পোষ্টে প্রায়শই চোখে পড়ে নারীদের নিয়ে চটুল জোকস্। বউরা কান ঝালাপালা করে সর্বক্ষণ, তাদের কথার খোঁচায় পুরুষের মন নাকি সর্বদা জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হয়! অবশ্য অঙ্গার হওয়ার ই তো কথা। নারীর কথায়, প্রতিক্রিয়ায় কান দিতে নারাজ পুরুষদের 'তুমি থামো' বলে ধমক দেওয়াটাই যে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এটাই যে রীতি। 

সেদিন এক পোষ্টে দেখলাম একজন লিখেছে, "যদি দেখেন বিয়ের রাতে বিনা রক্তপাতে যুদ্ধ হয়ে গেছে, তবে ভাববেন দেশ অনেক আগেই স্বাধীন হয়ে গেছে" - হাসি মস্করার সেই পোষ্ট দেখেও অবাক হইনি। কারন আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষদের কাছে বিয়ের আগে সেক্স এডভেঞ্চার আর বিয়ের পর ঘরের নিরামিষ রেখে মাঝেমধ্যে বাইরের পোলাও বিরিয়ানি খাওয়া দোষের কিছু নয়। অথচ একই কাজ তার স্ত্রী করলে, তাকে কুলটা, বেশ্যা উপাধিতে ভুষিত করতে পিছপা হয়না সে। আমাদের সমাজের পুরুষের কাছে বিয়ে মানেই ভার্জিন যোনী। অবাক করা বিষয় হলো, এই পুরুষেরাই বিয়ের আগে সেক্সের  অভিজ্ঞতার জন্য চায় ভার্জিন যোনি, বিয়ের জন্যও খুঁজে ভার্জিন যোনি, বিয়ের পর মাঝে মধ্যে  'বিরিয়ানি' খেতেও খুঁজে ভার্জিন যোনী। তা সে নিজে যতই ভার্জিন না হোক! যৌনতার ক্ষেত্রে পুরুষের ধ্যানজ্ঞান ভার্জিন যোনীময়। হাত চালিয়ে বিশেষ অঙ্গে কড় পড়ে যাওয়া পুরুষ বিয়ের আগে বের হয় 'সতী' নারী খুঁজতে!!  

তো যা বলছিলাম, যেকোনো পাবলিক প্লেস, সে হোক ঘরোয়া আড্ডা, বন্ধুদের আড্ডা, ফেইসবুক, হোয়াটসআপ, ইন্টারনেট, রাস্তা, বাস, প্রতিনিয়ত পুরুষরা নারীদের নিয়ে এরকমই নীচুমানের জোকস্ বলে একধরনের সুতীব্র সুখ অনুভব করে। শুধু যে মজা বা তামাশা করার জন্য এসব বলা হয় তা কিন্তু নয়, এসবের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি বিদ্বেষও ফুটে উঠে। এবং পুরুষের এহেন বিকৃত রসবোধে ক্ষেত্রবিশেষে বিব্রত হতে হয় নারীদের ই। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করি প্রতিবাদ করার পরিবর্তে কিছু সংখ্যক নারীও ওইসব মজায় গা-ভাসান। কারন বুঝি, পুরুষতন্ত্র তাদের মাথায় জন্মের সময় থেকে ঠেসে গুজে দিয়েছে 'ভালো মেয়ের' সংজ্ঞা। 'ভালো মেয়েরা' মুখ বুজে সব সহ্য করে, 'ভালো মেয়েরা' প্রতিবাদ করে না, 'ভালো মেয়েরা' এহেন বিব্রত হওয়াকে খুব সহজে হজম করে ফেলে। অন্যায়কে মেনে নেওয়ার শিল্পটা পুরুষতন্ত্র বেশ ভালো করিয়েই রপ্ত করিয়েছে তাদের।

তাইতো পুরুষের এহেন নোংরা রসবোধের প্রতিবাদে তারা কুন্ঠা বোধ করে। কারন এই সমাজ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে প্রতিবাদী নারী মানে কুলটা, অভদ্র, ঝগড়ুটে। আমাদের সমাজে প্রচলিত ই আছে, "পুরুষ রাগলে হয় বাদশা, আর মেয়েমানুষ রাগলে হয় বেশ্যা"। আর এসব উপাধি থেকে বাঁচার জন্য, নিজেকে তথাকথিত 'ভালো মেয়ে' সাজিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা করে যায় তারা। কিন্তু আর কত?? 

এই যে আমার বোকসোকা, ভালো মেয়েরা, দিদিরা, বোনেরা, বন্ধুরা, তোমাদের ই বলছি... আর কতো?? শোনো, তোমাদের সম্মান রক্ষায় তোমরা যদি ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা প্রতিবাদী হও, তোমরা কিন্তু মোটেই কুলটা, ঝগড়ুটে হয়ে যাবে না! বরং যারা তোমাদের এইগুলো বলতে আসবে, জেনে রেখো তারা তোমাদের সাহস আর শক্তিকে ভয় পাচ্ছে বলেই মরিয়া হয়ে তোমাদের দমানোর শেষ চেষ্টা করছে ওই উপাধিগুলো দিয়ে। তাই নিজের সম্মান রক্ষার্থে প্রতিবাদ করতে শেখো এহেন নোংরা রসিকতার।

আর আমার পুরুষ বন্ধু, প্রেমিক, দাদা, ভাই, বন্ধুদের বলছি, এবার সময় এসেছে সংযত হওয়ার। নিজেদের এহেন রসবোধকে নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করুন। নিজেদের বিকৃত রসবোধ নিয়ে সোস্যাল মিডিয়া, অথবা অন্যান্য জায়গায় নারীকে অস্বস্তিতে ফেলা বন্ধ করুন। আর না হলে, যেদিন আমরা রসিকতায় নামব, সেদিন পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না। তাই সময় থাকতে সংযত হোন!! 


বৃহস্পতিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৭



এবার চলো মুখোমুখি দাঁড়াই
__________________________





প্রিয়তমেষু,
তুমি যখন খুব ব্যস্ত রামনবমীর মিছিল, হনুমান জয়ন্তী, নবীদিবস, ওয়াজ মেহফিল নিয়ে, ঠিক তখন আমি তোমার পাশেই হেঁটে অফিস থেকে ফিরছি, আমাদের শহরের ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে। দেখোনি আমায়? দেখবেই বা কি করে, হাজারের বিপরীতে একা একজন মানুষকে চোখে পড়ার কথা নয়। যেভাবে একদিন তোমার নবী দিবসের উন্মাত্ততা দেখেছিলাম, সেভাবেই তোমার 'জয় শ্রীরাম' ধ্বনিতে অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখলাম, বিহ্বল হয়ে। এবং ঠিক সেই মুহুর্ত থেকেই প্রতিবারের মতো তুমি প্রিয়তমেষু থেকে আমার প্রতিপক্ষ হয়ে উঠলে।

তোমাকেই লিখছি আজ। হয়তো তুমি আমার প্রেমিক, বন্ধু, সহকর্মী, সহপাঠী, পাশের বাড়ীর কেউ। কিন্তু ইদানীং এইগুলো পরিচয় থেকেও বেশী মুখ্য হয়ে উঠেছে তোমার উগ্র ধর্মীয় পরিচয়। আমি যত মানুষ হিসেবে তোমাকে সম্মান করতে চাই, ভালোবাসতে চাই, তুমি ততোবেশী সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মীয় উন্মাদনার চোরাবালিতে আটকে যেতে থাক। যতবার আমি তোমায় সমতার কথা বলি, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলি, ততোবার তুমি উগ্র ধর্মান্ধ স্বরূপ নিয়ে তেড়ে আস আমার দিকে।

আজকে সারাদেশ জুড়ে উচ্চবর্ণ - নিম্নবর্ণ, ধনী-গরীবে, ধর্মে-ধর্মে, এতো বৈষম্য, এত ঘৃণা, এত হিংস্রতা, এত নিপীড়ন, নির্যাতন - আমি যখন এসবের প্রতিবাদ করি, তুমি প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করো।যখন বলি রাষ্ট্রের যেরকম নিজস্ব কোনো ধর্মমত থাকবে না, রাষ্ট্র হবে ধর্ম নিরপেক্ষ, রাষ্ট্রনেতাদের ও কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকবে না; তুমি বিরক্ত হও, রাগ কর। তোমার ঐ উগ্র ধর্মান্ধতার চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করলে তুমি আরো বেশী আক্রমনাত্বক হয়ে উঠো। অশ্লীল বাক্যবানে বিদ্ধ করো আমায়, খুনের হুমকি দাও, ধর্ষনের হুমকি দাও। আমার তখন মায়া হয় তোমার জন্য। সমতা, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তোমার ভয় দেখে, তোমার জন্য করুণা হয় আমার।

উগ্র ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার মিথ্যা প্রচারে তুমি একজন সাধারন মানুষকে তার জীবন জীবিকার আসল সমস্যা থেকে দুরে সরিয়ে দিতে চাও উগ্র হিন্দুত্ব আর উগ্র মুসলমানিত্বের জিগির তুলে। তার কানে কানে তুমি বলে দাও, 'গরব সে কহো হাম হিন্দু হ্যায়', 'জেহাদ করো, বিধর্মী মারো'। সাধারন মানুষ যাতে তার সংবিধান স্বীকৃত অধিকারগুলো না চাইতে পারে তারজন্য প্রতিনিয়ত তাদেরকে তুমি উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির জালে জড়িয়ে ফেলতে চাও। আমি এবং আমাদেরও তুমি ঐ দলে টানতে চাও। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হও, তখন তোমার আস্ফালন আরো বেড়ে যায়। তুমি আমাকে, আমাদেরকে সেকু, মাকু, চীনের দালাল এসব হাস্যকর ছেলেমানুষী তকমায় ভুষিত করে দমিয়ে রাখতে চাও। দেশটাকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি , এবং পাকিস্থানকে নিজেদের দাদুর সম্পত্তি ভেবে, তোমার বিরুদ্ধ মতের লোকদের পাকিস্থান চলে যাওয়ার ফতোয়া দাও। কারন, তুমি আমাকে, আমাদেরকে ভয় পাও। প্রচন্ড ভয় পাও। যদি আমি এবং আমাদের কথায়, একজন সাধারন মানুষও তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে, তবে তো তোমাদের মিথ্যে ধার্মিক সাজার মুখোশ খুলে যাবে। ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্বার্থসিদ্ধির পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

অনেক ছায়াযুদ্ধ হলো তোমার আমার। এবার চলো মুখোমুখি দাঁড়াই। উগ্র ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে যতদিন তুমি মানুষকে পুড়িয়ে দিতে আসবে, মানুষ হয়েই তা প্রতিহত করবো আমি, আমরা। যত বেশী দমন পীড়ন করবে তুমি, ততোবার তোমাকে মানুষের শক্তি দেখাবো আমরা।

তোমার-আমার সম্পর্ক ভাঙবে, ভাঙুক। সব ভেঙ্গে চুরে ধ্বংস হয়ে নতুন করে গড়ে উঠুক সভ্যতা। যেখানে তুমি সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মীয় উন্মাদনার চোরাবালি চিনতে পারবে, মানুষের সভ্যতা গড়তে শিখবে। সেদিন দেখা হবে আবার।

রবিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৭


রামনবমী উদযাপন এবং অস্ত্র মিছিল
_________________________________









ধর্মীয় উৎসব ভারতবর্ষে নতুন কিছু নয়৷ কিন্তু এবারে ভারতীয় ক্যালেন্ডারে এমন এক উৎসব সংযোজন হলো যার উদ্যোগ এবং উদ্দেশ্য যথেষ্ট সন্দেহজনক। বিজেপি সরাসরি না থাকলেও তাদের প্রত্যক্ষ মদতে এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, বজরং দল ও বিশ্ব হিন্দু  পরিষদের উদ্যোগে আসাম সহ সারা দেশ জুড়ে পালিত হলো রামনবমী। না, রামনবমী উৎসব পালন নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। রামের জন্মতিথিতে তাঁর ভক্তরা উৎসব, পূজো করতেই পারেন। সেটা তাদের ধর্মীয় অধিকার। 

"জয় শ্রী রাম" ধ্বনি দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল হলো রামভক্ত মানুষের। এই মিছিল বা শোভাযাত্রা নিয়েও আমার কোনো অসুবিধে নেই। আমার অসুবিধে হলো অন্য জায়গায়। বিভিন্ন স্থানে হাতে ভোজালি, তলোয়ার, হাঁসুয়া, টাঙ্গি, কাটারি এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র নিয়ে হয় মিছিল। বাদ যায়নি শিশুরাও। এবারে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, রামের জন্মতিথির সাথে অস্ত্র মিছিলের কি সম্পর্ক?? ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ও জন্মতিথি পালন হয়, কিন্তু সেখানে তো অস্ত্রমিছিল হয় না! তবে রামচন্দ্রের জন্মদিন পালনে অস্ত্রমিছিল কেন?? দুদিন থেকে অনেক পড়াশুনো করেও এর কোনো সদ্উত্তর পাইনি। কারুর জানা থাকলে বলবেন আমায়?? এহেন ধর্ম বিকৃতি কেন, সেটার ও উত্তর জানা থাকলে বলবেন? 

এই যে এত হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ হাতে অস্ত্র নিয়ে মিছিলে হাটলেন, তাদের মনে এই প্রশ্নটুকুও জাগলো না দেখে অবাক হয়েছি। 

এবার, এই ফেসবুকেই দেখলাম অনেকে বলছেন,  "মহরমের মিছিল যদি হতে পারে, তা হলে রামনবমীর মিছিল হলে আপত্তি কোথায়!" তারা কি মহরম আর রামনবমীকে একসাথে গুলিয়ে ফেলছেন? নাকি রামনবমীকে মহরমের সমান বানাতে চাইছেন? এই দুই উৎসব তো পরস্পর বিরোধী। রামনবমী খুশীর উৎসব, রামচন্দ্রের জন্মতিথি, অপরদিকে মহরম শোকের উৎসব! তারা কি মহরমের ইতিহাস জানেন না? 

মহরম ইসলামিক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র একটি মাস। প্রথা অনুযায়ী অধিকাংশ সিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিম এই মাসে ১০ দিনের উপবাস রাখেন। মহরমের দিন, সিয়া শ্রেনির মুসলিমরা কারবালার যুদ্ধে হুসেনের মৃত্যুর শোকপালন করেন ও একটি  শোকমিছিল আয়োজন করেন।

১৪০০ বছর আগে আরব দেশের কারবালা প্রান্তরে হজরত মহম্মদের নাতি ইমাম হোসেন হঠাৎই এক অসম লড়াইয়ের সম্মুখীন হন। মরুপ্রান্তরে  বন্দি  অবস্থায় তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বেশ কয়েকজন শিশু ও মহিলাসহ সপরিবারে সপার্ষদে তিনি প্রাণ হারান। সেই দিনটি ছিল হিজরি মহরম মাসের ১০ তারিখ। 

মুসলিম সিয়া সম্প্রদায় প্রতি বছর এই তারিখে মহরম পালনের মধ্যে দিয়ে সেদিনের ওই নির্মম ও হৃদয়বিদারক ঘটনাকে স্মরণ করে। অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন ঈদ ও ঈদুজ্জোহা -র মতো মহরম কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। নতুন কাপড় পড়া, খাওয়া-দাওয়া, সমবেত নামাজ পাঠ বা পাড়ায় পাড়ায় বড়দের মালা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে এর সমাপ্তি হয় না। অধিকাংশ  ধর্মপ্রাণ মুসলিম নামাজ, কোরান পাঠ, গরীব অসহায়দের দান দক্ষিণার মধ্যে দিয়ে নীরব শ্রদ্ধা পালন করে থাকেন। কিছু সংখ্যক মুসলিম সিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বানায় তাজিয়া। প্রতি বছর নতুন নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে, নানান বৈচিত্রে,  জারি লোক-গাথা গান গেয়ে মহরম পালন করে তারা। সঙ্গে চলে তলোয়ার, বল্লমের খেলা (যা আখড়া নামেই পরিচিত)। সঙ্গে চলে "হায় হোসেন, হায় হোসেন" ধ্বনি। এটি একটি বহুপ্রচলিত পুরনো কারবালা যুদ্ধের মহড়া, যা প্রতিবছর মহরমের দিন পুনরাবৃত্ত হয়ে থাকে।

তাহলে, কারবালা যুদ্ধের মহড়ার সঙ্গে রামনবমী-র মতো খুশীর উৎসবে অস্ত্র হাতে মিছিলের সম্পর্ক কোথায়?? কিভাবে?? তবে কি ইতিহাস এবং ধর্ম বিকৃত করে মহরমের সাথে রামনবমী-র কোনো কম্পিটিশন চালানো হচ্ছিল , "দ্যাখ, কে কত অস্ত্র দেখাতে পারে"? সবথেকে বড় প্রশ্ন মুসলিমরা কারবালা যুদ্ধের মহড়া দেওয়ার জন্য অস্ত্রমিছিল করে, রামনবমী তে অস্ত্র নিয়ে কিসের মহড়া দেওয়া হলো?? 

আর যারা বলছেন, "আর পাঁচটা ধর্মীয় উৎসবের মতো যদি রামনবমীও হয়, তাহলে ক্ষতি কী!", তাদের বলি, ক্ষতি কিছুই নেই। কিন্তু সমস্যা হলো ধর্ম বিকৃত করে অস্ত্রের মিছিল নিয়ে। সমস্যা হলো শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া নিয়ে!  হ্যাঁ, মহরমেও শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার ঘোর বিরোধী আমি। 

রামনবমীর অনেক মিছিলেরই যাত্রাপথ ছিল মুসলিম-প্রধান এলাকা দিয়ে৷ কাজেই এই উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ কিন্তু থেকেই যায়।