এই ব্লগটি সন্ধান করুন

সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

সরস্বতী পূজো ও ধর্মনিরপেক্ষতা
______________________________


স্কুলজীবনে মায়ের শাড়ী পরে সরস্বতী পূজোতে বন্ধুদের সাথে স্কুলে যেতাম! বেশী ভালো লাগত, মানে এখন ও লাগে, খিচুড়ী খেতে..! কিন্তু অদ্ভুত ভাবে লক্ষ্য করতাম আমার বন্ধুরা আমায় প্রসাদের ফলমূল কাটতে বা ছুঁতে দিত না ! একবার ভুলক্রমে ফল কাটতে বসে গেছিলাম বলে বড় ক্লাসের দিদিরা একযোগে আৎকে উঠেছিল, আমি নাকি সব প্রসাদ নষ্ট করে ফেলেছি..! প্রথমে বুঝতে পারি নি, তারপর সবার সামনে নিজেকে প্রচন্ড ছোট লেগেছিল ! সরস্বতী ঠাকুর যে ঘরে রাখা হত তার সামনে আমার বন্ধুরা আল্পনা এঁকে রাখত, অনেক রঙের আবির দিয়ে, কিন্তু আমায় আঁকতে দিত না! ছোট ক্লাসে, মানে ক্লাস সেভেন এ থাকতে বন্ধু মৌপ্রিয়াকে জিঞ্জেস করছিলাম, বলেছিলো, "তুই তো মুসলিম, তাই ! " অবাক হয়ে জিঞ্জেস করেছিলাম, মুসলিম হলে ছোঁয়া যায় না ঠাকুরের জিনিষ? বন্ধুটা উত্তর দিয়েছিল "পাপ হয়, ঠাকুর রাগ করলে পরিক্ষায় ফেল করবি!" 

সেই থেকে সারা স্কুলজীবন বন্ধুদের চাপে পড়ে পূজোতে গেলেও, অদ্ভুত এক পাপের ভয়ে ঠাকুরের মূর্তি, ঠাকুরের প্রসাদ কাটার পাশ থেকে শতহাত দূরে দূরে থাকতাম ! যেতাম, বেঞ্চিতে বসে খিচুড়ী খেতাম তারপর বন্ধুদের সাথে বাড়ী ফিরে আসতাম। বড় ক্লাসে উঠার পর আমার সেই স্বতঃস্ফুর্ততা হারিয়ে গেছিল, পূজোর দিন স্কুলে গেলে কেমন যেন হীনমন্যতায় ভুগতাম! কলেজ জীবনে আর কখনো পূজোর দিন কলেজে যাইনি..! 

স্কুল-কলেজে প্রায় সমস্ত সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা মিলে মিশে একসঙ্গে পড়াশোনা করে। সকলেরই নানা রকম উৎসব-অনুষ্ঠান রয়েছে। অথচ সরস্বতী পুজো ছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলির কোনো ধর্মীয় আচার স্কুলে বা কলেজে পালন করা হয় বলে তো শোনা যায় না। ভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সত্ত্বেও হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে তবে এই ব্যতিক্রম কেন? শুধুমাত্র সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় ভাবাবেগকে লালন করা আর ধর্মীয় স্বাধীনতার জয়গান করা তো একজিনিস নয়। বরং এই প্রবণতা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শকেও কলুষিত করে।

ভারতীয় সংবিধানের ২৮(১) নং ধারায় সরকারি বা সম্পূর্ণভাবে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান/শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধর্মাচারণ  ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার , স্কুলের মতো সর্বজনীন, সমাজিক প্রতিষ্ঠানে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন তো শুধুমাত্র সংবিধানের উলঙ্ঘন নয়, ধর্মীয় ভেদাভেদকেও একপ্রকার মান্যতা দেওয়ার প্রচ্ছন্ন বহিঃপ্রকাশ ! 

স্কুল কলেজে  খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্কসভা, বিজ্ঞান প্রদর্শনী সহ স্কুলের যাবতীয় কার্যক্রমকে সহ-পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভূক্ত বলে বিবেচনা করা হোক না, কিন্তু সরস্বতী পুজোর মতো কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসব কী করে স্কুলের সহ-পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভূক্ত হতে পারে, নাকি হওয়া উচিত? 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চরিত্র ধর্মনিরপেক্ষ হবে, সেটাই তো কাম্য। ধর্মের ভিত্তিতে শিশুদের পরিচয় নির্ধারণ করা, শিশুমনের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাতে ধর্মীয় মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া মানে তো শিশুর মৌলিক অধিকার খর্ব করা। 

শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ আনুষ্ঠান পালনে  উৎসাহিত করা উচিৎ। শিশু যাতে জীবনের শুরুতে কোনো ভেদনীতির শিকার না হয়, তা দেখাও রাষ্ট্রের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তার পরিবর্তে রাষ্ট্র নিজেই যদি ভেদাভেদকে প্রশ্রয় দেয়, নির্দিষ্ট একটি ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাকে গণতন্ত্র বলা যায় কী?? 

বর্তমানে আমাদের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা, অসহিষ্ণুতা নিয়ে নানা রকমের চর্চা, তর্ক-বিতর্ক শোনা যাচ্ছে। কিন্তু যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বোঝা প্রয়োজন, ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা যাদুমন্ত্রবলে তৈরি হয় না। নিরন্তর অনুশীলন ও শিক্ষার মধ্য দিয়েই তা সম্ভব। তবেই তো আজকের শিশুরা প্রকৃত অর্থে আগামী দিনের সুনাগরিক হয়ে উঠবে। কেবল মাত্র উপসর্গ নয়, উৎস জানাটাও রোগ নির্ণয়েয় জন্য সমান জরুরি।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন